সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

মুহম্মদ জুবায়ের: যার সঙ্গে লড়লেন

[পূর্বকথা: জুবায়ের ভাইকে আমি চিনেছি সচলে এসে। আমার সচলে আসার দিন যেহেতু খুব বেশি নয় তাই তাঁকে চেনার দিনও স্বল্প। সম্প্রতি তাঁর ল্যাপটপে পাওয়া লেখাটি পড়ে জানতে পারি তাঁর কি হয়েছিল। কেন কিভাবে কোন রোগ হয় সেটি জানার আগ্রহ আমার কেন জানি একটু বেশি বেশি। সেই আগ্রহ থেকেই জানার চেষ্টা করেছিলাম। যে কেউ চেষ্টা করলেই এই লেখাটির চাইতে অনেক বেশিই জানতে পারেন। তারপরও আমি যা জেনেছি তার সারমর্মটি লিখতে ইচ্ছে হলো...]

জুবায়ের ভাই যার সঙ্গে লড়লেন:
পালমোনারি ফাইব্রোসিস। পালমোনারি কথাটা ব্যাবহার করা হয় 'ফুসফুস সম্পর্কিত' বোঝাতে। আর ফাইব্রোসিস কথাটি এসেছে ফাইবার (বাংলায় তন্তু) শব্দটি থেকে। আমাদের শরীরের প্রধান চারধরনের টিস্যু'র মধ্যে একটি 'কানেকটিভ টিস্যু'। তন্তুজাতিয় এই কানেকটিভ টিস্যু'র আধিক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে একে বলে 'পালমোনারি ফাইব্রোসিস'। এটি অবশ্য এই রোগটির সবচাইতে বেশি প্রচলিত নাম। এছাড়া এই রোগটিকে 'ফাইব্রোজিং এলভিওলাইটিস', 'ইন্টার্সটিশিয়াল নিউমোনাইটিস', এবং 'হাম্মান-রিচ সিনড্রম'ও বলা হয়।
কি হয়:
আমাদের ফুসফুসে বাতাসের অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র থলি (এলভেয়লি) থাকে। এই এলভেয়লি থেকেই রক্তে কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর অক্সিজেনের অদল-বদল হয়।
বলেছিলাম তন্তুজাতিয় কানেক্টিভ টিস্যুর আধিক্যের কথা। আসলে এই কারণেই মুলত ফুসফুসের এলভেয়লিগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তন্তুজাতিয় টিস্যুগুলি অনেকটা এলভেয়লিগুলোকে মুচড়ে দেয়। যার ফলে বদলে যায় এলভেয়লির আকার আর সৃষ্টিহয় ক্ষতের। পরবর্তীতে ফুসফুসের কোষগুলি পুরু আর শক্ত হয়ে ওঠে। ফলে শুরু হয় শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা। এই রোগটি কখনো একটা পর্যায়ে গিয়ে স্থিরতা পায় আবার কখনো দ্রুত বাড়তে থাকে।
পালমোনারি ফাইব্রোসিসের ফলে কেবল ফুসফুসের এলভেয়লি নয়, ক্ষতিগ্রস্থ হয় এলভেয়লিগুলোর চারপাশ এবং ভেতরের কোষও। বাদ যায়না ফুসফুসে রক্ত বয়ে আনা শিরা-উপশিরাগুলিও। সবমিলিয়ে ফুসফুসের একাংশের অবকাঠামো পুরোটাই ধ্বসে পড়ে এই রোগটি হলে।
কেন হয়:
ব্যাপারটি জটিল। পালমোনারি ফাইব্রোসিস হওয়ার পেছনের জানা কারণ আছে অন্ততঃ ১৪০টি। অবস্থাদৃষ্টে মনেহয়, ফুসফুস কিছু ইমিউন এক্টিভিটির প্রেক্ষিতে সাড়া দিতে গেলে এই রোগটি হয়। ব্যপারটি ব্যাখ্যা করা দরকার। আমাদের শরীরের অনেক কোষ আছে যারা আমাদের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে (আগে এই বিষয়ে লিখেছি। এইখানে পুরোটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়)। এইসব কোষ সাধারণত ধ্বংস করে রোগের জীবানু অথবা তাদের বাসস্থান অথবা জীবানুর তৈরি বিষ। শরীরের অন্তর্গত কিছু দুর্ঘটনার ফলে কখনো কখনো আমাদের শরীরের জীবানু ধ্বংসকারি এই কোষগুলো আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় কোষকেই শত্রু ভেবে নিধন করতে শুরু করে। অথবা কখনো তাদের কোন কর্মকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ হয় শরীরের প্রয়োজনীয় কোষ। এটিও একধরনের রোগ। নাম 'অটোইমিউন ডিজিজ'। অনেকের মতে 'পালমোনারি ফাইব্রোসিস' একটি অটোইমিউন ডিজিজ। আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধের একটি প্রক্রিয়ার নাম 'ইনফ্লামেশন'। ইনফ্লামেশন হতে পারে যে কোন আঘাত, যে কোন কারণে ক্ষত সৃষ্টি, জীবানুর অনুপ্রবেশ, বৈদ্যুতিক শক, এসিড/বেজ অথবা কোন গ্যাসে এক্সপোজড হওয়া এমন অনেক কারণে (এই বিষয়ে একটি লেখা লিখতে ইচ্ছা রাখি)। যাইহোক, শরীরের কোথাও ইনফ্লামেশন হলে সেখানের কোষগুলোর আচরণ অনেকটা বদলে যায়। অবশ্য সেটা শরীরের প্রয়োজনেই বদলায়। কিন্তু ফুসফুস কোষের আচরণের পরিবর্তন (যেটাকে বলছিলাম ফুসফুসের কিছু ইমিউন এক্টিভিটির প্রেক্ষিতে সাড়া দেয়া) অনেক সময় পালমোনারি ফাইব্রোসিস নামক ফুসফুসের এই ভয়ঙ্কর রোগটির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এখন প্রশ্ন আসে কি কারণে ফুসফুসের কোষগুলি (শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষগুলির সঙ্গে মিলে) নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি নেয়! অর্থাৎ কি কারণে ফুসফুসে ইনফ্লামেশন হয় যার ফলে পালমোনারি ফাইব্রোসিস হতে পারে! কোন সদুত্তর নেই! অনেকগুলো কারণের যেকোন একটি হতে পারে! একের অধিক হতে পারে!! আবার কথিত কারণের একটিও না হতে পারে!!! যে কারণগুলি সাধারণত অনুমান করা হয় সেগুলোর মধ্যে আছে নানারকম রোগ। এগুলির মধ্যেও দুএকটি রোগ এমন যার কারণ আমরা জানিনা!
পালমোনারি ফাইব্রোসিস এর কারণ হতে পারে এমন একটি রোগ সার্কয়ডসিস (Sarcoidosis)। কিছু পেশার মানুষের এই রোগটি বেশি হতে পারে। যারা এসবেস্টস, ধাতব বর্জ্য এবং পাথরের সংস্পর্শে থাকেন বা এজাতিয় বস্তু প্রক্রিয়াজাত করার কাজ করেন তাদের পালমোনারি ফাইব্রোসিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি। ধুমপান সেই ঝুঁকি বহুগুনে বাড়িয়ে দেয়।
আমাদের চেনা যে রোগগুলি থেকে পালমোনারি ফাইব্রোসিস হতে পারে সেগুলোর মধ্যে টিউবারকিউলোসিস (যক্ষা) আছে সবার আগে।
যেসব ওষুধ এই রোগের কারণ হতে পারে:
১. 'নাইট্রোফুরান্টন' নামক এন্টিবায়োটিক (এটি বিশেষত গ্রাম নেগেটিভ ব্যাক্টেরিয়ার নিউক্লিয়িক এসিড নষ্ট করে দেয়) ২. এন্টিএরিদমিক এজেন্ট 'এমায়োডারোন' (হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়) ৩. গ্লাকোপেপ্টাইড এন্টিবায়োটিক 'ব্লিওমাইসিন' (ব্যাক্টেরিয়ার নিউক্লিয়িক এসিড ভেঙ্গে দেয়। সাধারণত ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।) ৪. নাইট্রোজেন মাস্টার্ড এলকাইলেটিং এজেন্ট 'সাইক্লোফসফামাইড' (অটোইমিউন ডিজিজ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়) ৫. এন্টিমেটাবোলাইট এবং এন্টিফোলেট ড্রাগ 'মেথোট্রেক্সেট' (অটোইমিউন ডিজিজ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়)
ওষুধ ছাড়াও চিকিৎসার জন্যে ব্যবহৃত রেডিয়েশন থেকে হতে পারে এই রোগটি। হতে পারে বিশেষ একটি জিনে মিউটেশনের ফলে (যেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রেডিয়েশনের জন্যেই হয়)।
কাদের হয়:
কোন ঠিক নেই। সাধারণত মধ্য বয়সী নারী-পুরুষের হয়। তবে দেশের সীমারেখা, জাত, রঙ, লিঙ্গ এজাতিয় বিধিনিষেধ এই রোগটি মেনে চলেনা।
চিকিৎসা:
রোগটি কেন/কিভাবে হয় সেটি বোঝাতে পেরেছি কিনা বুঝতে পারছিনা। আরেকবার বলি,
ধরুন আপনাকে কোন একদল ডাকাত আক্রমন করল। আর আপনি ধুপধাপ কারাতে'র মার দিয়ে তাদের সঙ্গে লড়তে লাগলেন। দেখা গেল ডাকাত আপনার কোন ক্ষতিই করতে পারেনি কিন্তু কারাতের মার দিতে গিয়ে আপনি নিজের হাতে নিজের নাক ভেঙ্গেছেন, হাতে-পায়ে ব্যাথাও পেয়েছেন। পালমোনারি ফাইব্রোসিস হয় ঠিক এরকম কোন বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে বাঁচতে যখন ফুসফুসের কোষগুলো এবং শরীরের অন্যান্য রোগপ্রতিরোধী কোষ লড়তে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি করতে থাকে তখন। ফুসফুসের ক্ষতিগ্রস্থ কোষ সুস্থতার জন্যে যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যায় সেটিও হতেপারে এই রোগের কারণ।
এবার বলি রোগের চিকিৎসার কথা,
চিকিৎসা দুটি, প্রথমত বহিঃশত্রুকে ঠেকানো আর দ্বিতীয়ত ফুসফুস কোষ যাতে নিজেকে রক্ষা না করতে যায় সেটি নিশ্চিত করা। কিভাবে এই দুটি কাজ করা যেতে পারে সেটি একটু চিন্তা করলেই বলা সম্ভব। কর্মক্ষেত্রের এসবেস্টস বা ধাতব বর্জের জন্য রোগটি হলে পরিবেশ বদলানো হয় অনেক সময়। কখনো এন্টিইনফ্লামেটরি ড্রাগের মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়া হয় ফুসফুস কোষের নিজেকে রক্ষার প্রক্রিয়া (কর্টিকস্টারয়েড নামক স্টেরয়েড হরমোন কার্যকর এমন একটি ওষুধ)। ইনফ্লামেশন থামানো গেলে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ভাবে ফুসফুস কোষের সুস্থতা ফিরে আসতে থাকে।
এছাড়া রোগীকে বাইরে থেকে অক্সিজেন দিয়ে অথবা কমপরিশ্রমে বেশি অক্সিজেন গ্রহনের পদ্ধতি শিখিয়ে যতক্ষন সম্ভব যতটা সম্ভব সুস্থ রাখার চেষ্টা করা হয়।
শেষ কথা:
সারা দুনিয়ায় অন্তত ৫০ লক্ষ মানুষ পালমোনারি ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত। কেবল আমেরিকাতেই আক্রান্ত অন্ততঃ ৫ লক্ষ মানুষ।
জুবায়ের ভাই আমার বিশ্বাস অনেক ভাগ্যবান মানুষ ছিলেন। যাওয়ার আগমূহুর্ত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিল হাজারো মানুষের ভালোবাসা। আমার মতো কতোজন তাকে কখনো দেখিনি, তিনি বেচে থাকতে তাঁর নামও শুনিনি অথচ তার মৃত্যুর দিনে হাজির হয়েছিলাম একসঙ্গে তাঁকে স্মরণ করতে। এই সৌভাগ্য সবার হয়না। মৃত্যুর পরেও মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রন করার এত ক্ষমতাও সবার থাকেনা।
আমি বিশ্বাস করি, আমরা অনেকেই মনে মনে একজন মুহম্মদ জুবায়ের হতে চাই।
[অটোইমিউন ডিজিজের ব্যপারটি থাকলেও পালমোনারি ফাইব্রোসিস বিষয়টি আমার পাঠ্যক্রমে ছিলনা। যেটুকু জেনেছি সবটাই আমার ইমিউনোলজির কয়েকটি বই আর অন্তর্জাল ঘেঁটে। এই অঙ্গনে অনেক গুণী এবং সম্মানীয় বিজ্ঞান লেখক আছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই ব্যপারটি আমার চাইতে ভাল করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। সব ভুলের জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।]
তথ্যসুত্র:
১. Roitt, Brostoff, Male; Immunology (6th edition) ২. Ivan M. Roitt; Essential Immunology (4th edition) ৩. Jewertz, Melnick, Adelberg; Medical Microbiology (23rd edition) ৪. http://pulmonaryfibrosis.org/ipf.htm ৫. http://www.lung.ca/diseases-maladies/a-z/pfibrosis-fibrosep/index_e.php ৬. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/sites/entrez ৭. http://www.nlm.nih.gov/medlineplus/pulmonaryfibrosis.html ৮. http://en.wikipedia.org/wiki/Pulmonary_surfactant ৯. http://en.wikipedia.org/wiki/Pulmonary_surfactant-associated_protein_C ১০. http://www.mayoclinic.com/health/pulmonary-fibrosis/DS00927 ১১. http://www.medicinenet.com/pulmonary_fibrosis/article.htm
২০০৯-০৯-২৯ মঙ্গলবার সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: