সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

পুনরায় শুকরের জ্বর বিষয়ক প্যাচাল...

শুকরের জ্বর (সোয়াইন ফ্লু) থেকে রক্ষার উপায় সবাই জানে। আর এর ওষুধ ও বাজারে এসে গেছে মাশাল্লাহ। সুতরাং আসুন আমরা অযথা আতঙ্কিত না হয়ে শুকরের জ্বর বিষয়টি নিয়ে খোশগল্প জুড়ে দেই। মানে বোঝার চেষ্টা করি কিভাবে এই বেক্কল ভাইরাস বাতাসে উড়ে এসে, আমাদের ফুসফুস জুড়ে শুয়ে-বসে, নানান তামাশা দেখায়...

পুরান প্যাচাল বিষয়ক কিছু কথা:
অ-নে-ক আগে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং রোগ প্রতিরোধ বিষয়ক কয়েকটি লেখা লিখেছিলাম। সেখানে "ভাইরাস চরিত" সহজে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। নিতান্ত অখাদ্য হওয়া সত্ত্বেও আপনারা সেকথা সাফসাফ বলতে লজ্জা পেয়েছিলেন। যাই হোক, এই লেখাটি সিরাতুল মুস্তাকিমের মতো সহজ সরল করতে পারিনি। পড়তে বেশি কষ্ট হলে নিজগুনে ক্ষমা করবেন।

ইনফ্লুয়েঞ্জা বিষয়ক কিঞ্চিৎ প্যাচাল:
ভাইরাস আমাদের ফুসফুসের কোষগুলাকে আতুরঘর ভেবে বাচ্চা দেয়ার জায়গা বানালে যখন আমরা বেদনা পাই আর শ্বাসকষ্টের নানা উপসর্গ দেখা যায় তখন তাকে আমরা বলি ইনফ্লুয়েঞ্জা। খালি মানুষের না, স্তন্যপায়ী অ-নে-ক প্রাণির ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়। এমন কি তিমি মাছের শরীরেও পাওয়া যায় এই ভাইরাস। কেবল স্তন্যপায়ী না, ইনফ্লুয়েঞ্জা হয় পাখিদেরও।

ভাইরাসের আকিকা বিষয়ক প্যাচাল (এই অংশটুকু ইচ্ছে করলে নাও পড়তে পারেন):
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের পরিবারের নাম "অর্থোমিক্সোভিরিডি"। এই পরিবারে ভাইরাসেরা তিনভাই: ইনফ্লুয়েঞ্জা এ, ইনফ্লুয়েঞ্জা বি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা সি। শুকরের জ্বর হয় বড়ভাই "ইনফ্লুয়েঞ্জা এ" এর কারণে। বড়ভাইজানকে আবার অ-নে-ক ভাগে ভাগ করা যায়। ভাগ করা হয় তার ব্যবহৃত দুটি অস্ত্রের ধরণের উপর ভিত্তি করে। মানে, মনে করুন সবাই সবাই পিস্তল ব্যবহার করে, তবে কেউ বিদেশি .৩২ ক্যলিবার আর কেউ দেশি 'নো' ক্যালিবার। এদের অস্ত্রের নাম জানলে পরে ফায়দা হবে। এজন্যই বড্ড খট্টমট্ট নাম হওয়া সত্ত্বেও এই দুই অস্ত্রের নাম লিখে দিচ্ছি: নিউরামিনিডেজ (এখন পযর্ন্ত ভাইরাসের ৯ রকমের নিউরামিনিডেজের খোঁজ পাওয়া গেছে) এবং হেমাগ্লুটিনিন (হেমাগ্লুটিনিনের খোঁজ পাওয়া গেছে ১৫ রকম)। বর্তমানে যে ধরনের শুকরের জ্বর বাজারে ব্যপকহারে চলছে তার জন্য দায়ী একধরনের বড়ভাই ভাইরাস। মানে 'ইনফ্লুয়েঞ্জা এ' ভাইরাস। তার হেমাগ্লুটিনিনের ধরন '১' আর নিউরামিনিডেজের ধরনও '১'। সবমিলিয়ে তাই তার পুরো নাম: "ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (হেমাগ্লুটিনিন ধরন '১' নিউরামিনিডেজ ধরন '১')" [influenza A (H1N1)]
জন্মবৃত্তান্ত:

influenza A (H1N1) এর জন্মবৃত্তান্ত বড়ই অদ্ভুত। বলতে গেলে এরকম অদ্ভুতভাবে জন্ম নিতে পারে বলেই আমরা তাদের এতো ভয় পাই। (আগে একটি লেখায় এই ব্যাপারটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম খেলোয়াড়, সাঁতারু আর দৌড়বিদ ভাইরাসের মাধ্যমে)। সংক্ষেপে বললে, এরা আসলে একধরনের মানুষের জ্বরের ভাইরাস, একধরনের পাখির জ্বরের ভাইরাস এবং দুই ধরনের শুকরের জ্বরের ভাইরাস, মোট চার ধরনের ভাইরাসের একটি শংকর প্রজাতি।

ইহাদের রণকৌশল:

ভাইরাসের রনকৌশলে সবার আগে আছে অনুপ্রবেশ। এনারা বাতাসে ভেসে একস্থান থেকে অন্য স্থানে সফর করেন। এনাদের আক্রমনস্থল ফুসফুস, সুতরাং আধবোতল ফ্লু ভাইরাস যদি আপনি চামচে নিয়ে জেলির মতো রুটিতে মাখিয়ে খেয়ে ফেলেন তবে কোন অসুবিধা নাই কিন্তু দু'চারটি ফুসফুসে ঢুকতে পারলেই বিপদ! এদের দুটি অস্ত্রের কথা আগেই বলেছি। সহজে মনে রাখতে এবং পড়তে অস্ত্রদুটির নতুন নামকরণ করা যাক: হাজাম (হেমাগ্লুটিনিন) এবং নিজাম (নিউরামিনিডেজ)। ভাইরাস যখন আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে তখন আমাদের ফুসফুসের একপ্রকার এনজাইম হাজাম'কে দুভাগ করে দেয়। দাঁত বের করার কোন কারণ নেই, হাজাম দ্বিখন্ডিত হলে ভাইরাসের ক্ষতি হয়না বরং লাভ হয়! দ্বিখন্ডিত হাজামের একটুকরা গিয়ে আমাদের কোষের যে খাদ্য ধরার হাত থাকে তাদের একটাকে ধরে ফেলে। আমাদের বেক্কল কোষও নিজহাতে টেনে ভাইরাসটিকে নিজের ভেতরে নিয়ে আসে! এরপর শুরু হয় তামাশা !

তামাশার প্রথম পর্যায়ে ভাইরাস তার জিন বের করে দেয়। সেই জিন গিয়ে আমাদের কোষের মালমশলা ব্যবহার করে ভাইরাসের শরীরের কলকব্জা বনায়। তারপর সেই কলকব্জা মিলে তৈরি হয় নতুন ভাইরাস। নতুন ভাইরাস এবার বাডিং প্রক্রিয়ায় কোষের বাইরে আসে নতুন শিকার খুঁজতে। আর একাজে সে ব্যবহার করে নিজাম'কে। সবমিলিয়ে এভাবেই আমাদের ফুসফুসের কোষগুলো পরিনত হয় ভাইরাসের বাচ্চা দেয়া ইনকিউবেটরে। সক্ষম কোষের অভাবে আমাদের...(সোয়াইন ফ্লু হলে কি কি হয় তা তো রোজ পত্রিকায় দিচ্ছে। কষ্ট করে পড়ে নিন দেঁতো হাসি )

হুদাই কেন চিল্লাইতাছি:
ফ্লু কি আর মানুষের হয়না! এইটা নিয়া এতো চিল্লাপাল্লা কেন! কারণ হচ্ছে, মানুষ সাধারণ ফ্লুতে আগেও ভুগছে। আমাদের অন্তর্গত যোদ্ধারা সাধারণ ফ্লু'র ভাইরাস চেনে। শক্ত লড়াই করতে তাই সমস্যা হয়না। কিন্তু শুকরের জ্বরের এই ভাইরাস একবারে আনকোরা। আমাদের শরীরে তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রস্তুতি নেই। তাই হামলা হলেই আমরা ভেঙ্গে পড়ছি। হামলা ঠেকিয়ে অনেকেই আর কুলিয়ে উঠতে পারছিনা। (মেক্সিকোতে এই কারণেই অসংখ্য মানুষ মরেছে। নতুন এই ভাইরাস তাদের শরীরে হামলা করলে, তাদের অন্তর্গত যোদ্ধারা বুঝে উঠতে পারেনি। বিপদ সংকেত পাঠিয়েছে মূহুর্মূহু। আর এতবেশি বিপদ সংকেতের ধকল সইতে পারেনি হাজারো শরীরের সিস্টেম। পুরো ব্যপারটা ব্যাখ্যা করতে গেলে আরেক রামায়ন হয়ে যাবে। দেখি এযাত্রা পাঠককে সহনশীল মনে হলে সেই রামায়ন পাঠের দুঃসাহসও নাহয় দেখানো যাবে...)
২০০৯-০৯-১২ শনিবার সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: