সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

ব্যাড়ে খোন্দ খায়

(১) ধরেন আপনার প্রেমিকাটি থাকে দোতলা বাড়িতে। রাস পূর্ণিমার রাতে আপনার ইচ্ছে হল নিজ হাতে তাকে লাল গোলাপ দেয়ার। কি করবেন? প্রথমে লাল গোলাপ কিনেন। তারপর তার ডাল থেকে কাঁটা ছাড়ান। তারপর প্রেমিকার বাসার সামনে গিয়ে প্রথমে আয়াতুল কুরসি আর দোয়া কুনুত পড়েন ৬ বার। এবার অতি সাবধানে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গান। বাথরুমের পাইপ বেয়ে দোতলায় উঠেন (গোলাপটি দাঁত দিয়ে ধরে নিন)। এরপর বাথরুমের জানালায় গোলাপটি রেখে নিচে নামুন। এবার প্রেমিকাকে ফোন দিন। সেই মুহূর্তের কথোপকথন:

আপনি: হ্যালো, ফুলবানু, একটু বাথরুমে যাওনাগো আমার ফিঙে... প্রেমিকা: কেন ময়নাপাখি! আমার তো বাথরুম পায় নাই! আপনি: আমার জন্যে, ভালবাসার জন্যে, এই রাস পুর্ণিমার রাতে তুমি সামান্য বাথরুমও করতে পারবে না, ফুলবানু!!!
ধরেন, এইখানে আপনি একটা ভুল করলেন। একটু আবেগাক্রান্ত হয়ে রাস পুর্নিমার রাতে বাথরুম সংক্রান্ত ডায়ালগটি বেশ উঁচু স্কেলে বলে ফেললেন। সর্বনাশ!!! এতো জোরে চিল্লাইতে আপনারে কে বলছে! ঝেড়ে দৌড় মারেন। বাড়িওয়ালার কুত্তা কিন্তু ভালোবাসার মর্ম বোঝেনা। দৌড়ান দৌড়ান। দাঁড়ান, সামনে কাঁটাতারের বেড়া। সাবধানে পার হোন, ঠিক যেভাবে প্রবেশ করেছিলেন সেইভাবে...
ধরেন, এইখানে আপনি আবারো একটা ভুল করলেন। কুত্তার দাঁত থেকে লেজ বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করলেন কাটাতারের বেড়াটি এক লাফে পার হতে। পার হতে তো পারলেনই না বরং শরীরে তার ফুটিয়ে একেবারে ধপাস করে 'পপাত চ্' হয়ে গেলেন। শুনশান অন্ধকার রাত চৌচির করে জেগে উঠেছে বাড়ির লোকজন। ধেয়ে আসছে বাস্কারভিলের হাউন্ড সাদৃশ্য নেড়ি বাড়িওয়ালার কুত্তা। এখন কি হবে!
এখন হবে ইনফ্লামেশন।
আপনার শরীরের যেখানে তার ফুটেছে সেখান থেকে এক ধরনের সংকেত পৌঁছে যাবে আপনার সারা শরীরে। সংকেতের ফলে সারা শরীর থেকে আহত স্থানে ছুটে আসবে আপনার শরীরের যোদ্ধারা। এই যোদ্ধাদের কথা আগের কয়েকটি লেখায় ব্যাখ্যা করেছি। এখানে ব্যাখ্য করা সম্ভব নয়, কেবল বলে রাখি এরা আপনার শরীরের বিভিন্ন প্রকার কোষ এবং তাদের তৈরী আরো অনেক উপাদান (immune cells and their products) যারা আপনাকে ক্ষতিকারক অনুজীব এবং অন্য অনেক কিছু থেকে সুরক্ষা দেয়। আক্রান্ত স্থানে সবার আগে আসে গিলেখাদকরা (phagocytes/এদের কথাও আগে বলেছি)। গিলেখাদকরা জীবানু ধরে ধরে গিলে খায়। আরো যারা যোদ্ধা আছে তাদের আক্রান্ত স্থানে আসতে একটু সময় লেগে গেলেও তারাও তাদের দ্বায়িত্বে অবহেলা করেনা। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা কেবল এইখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
আক্রান্ত স্থানে জীবানুর আধিক্য থাকে বেশি। তাই সেখানে যোদ্ধাও লাগে বেশি। আর বেশি যোদ্ধা আসতে চাই প্রশস্থ পথ। সুতরাং আক্রান্ত স্থানের আশেপাশে রক্তের সুক্ষ্ম শিরা-উপশিরাগুলোর সক্ষমতা বেড়ে যায়। বেড়ে যায় শিরা থেকে কোষে যেদ্ধাদের আসা-যাওয়ার হার। সহজ কথায় আক্রান্ত অঞ্চলের যেসব ফুটো-ফাটা দিয়ে রক্ত চলাচল করে সেগুলো যায় মোটা হয়ে। রক্তের আধিক্যের কারনে আক্রান্ত স্থান বেশি লাল দেখায়। কেবল এ-ই নয়। ইনফ্লামেশনের ফলে আক্রান্ত স্থানের চারধারে একটা বিশেষ প্রোটিনের বেড়া তৈরী হয় যাতে শত্রুরা ছড়িয়ে পড়তে না পারে। শিরা থেকে কোষে তরল যাবার পরিমান যেমন বেড়ে যায় তেমনি যাতে দরজা বড় করতে গিয়ে পুরো দেয়াল না ভাঙ্গে সে ব্যবস্থাও নেয় আপনার শরীর। আক্রান্ত স্থানে শরীরের যোদ্ধাদের এই ছোটাছুটি ও তাদের এবং আক্রান্ত স্থানের সাধারণ কোষদের নানান কর্মকান্ডের ফলে ঘটে বিশেষ কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। না, ঘটনা এইখানেই সমাপ্ত হয়না। আসল ঘটনা এখানে শুরু হয় মাত্র।
গিলেখাদকরা যখন জীবানু গিলে খায়। তারা কেবল খেয়েই ক্ষ্যান্ত দেয়না। আরো নানান অতুল কীর্তি রাখে। যেগুলোর মধ্যে সাইটোকাইন বলে একপ্রকারের পদার্থ নিঃসরণ অন্যতম (সাইটোকাইনের অনেকগুলো ধরণ আছে। একেক ধরণের সাইটোকাইনের কাজ একেক রকম)। সাইটোকাইন শালারপো'র কাজ হচ্ছে সংকেত দেয়া। এরা শরীরের বিভিন্ন কোষকে শত্রুর আক্রমন সম্পর্কে জানায়। বিভিন্ন কোষকে আপদকালীন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে। সমস্যা হচ্ছে প্রয়োজনীয় সংবাদও সবসময় ভালো ফলাফল বয়ে আনেনা। শালারপো'র ক্ষেত্রে এই কথাটি একমাত্রা বেশি সত্যি। সে গিয়ে আপনার হাইপোথ্যালামস'কেও সংকেত দেয়। শালারপো'র এই সংকেতের ফলে হাইপেথ্যালামস হালারপো'র মাথা যায় খারাপ হয়ে। এমনিতে হালারপো'র উপর শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখার দ্বায়িত্ব। সেই বলে দেয় শরীরের তাপমাত্রা কিরকম থাকবে। শালারপো'র খোঁচায় তার মাথা খারাপ হয়ে গেলে সে শরীরে সংকেত পাঠায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির। আর অবশ্যম্ভাবীভাবে শরীরের তাপমাত্র যায় বেড়ে। তাপমাত্রার এই বৃদ্ধিকে আমরা বাংলায় 'জ্বর' বলি হাসি । জ্বর এজন্যই সাধারণভাবে কোন রোগ নয়। রোগের উপসর্গ।
কেবল শালারপো'দের খোঁচা নয়, আরো অনেক কারনে হালারপো'র মাথা খারাপ হয়। আর কেবল তারের খোঁচা নয় আরো অনেক কারনে কোন স্থানকে 'আক্রান্ত' বলে বিবেচনা করে শরীর। এসবের মধ্যে আছে জীবানুর সংক্রমন, আঘাত পাওয়া, পুড়ে যাওয়া, বিষাক্ত কিছুর সংস্পর্শে আসা, ক্ষতিকারক রেডিয়েশন, ময়লা আবর্জনার সংস্পর্শে আসা এরকম অনেক কারণ।
জ্বর হওয়া সুতরাং খারাপ কিছু না। অন্ততঃ জ্বর হইলে আপনি জানতে পারলেন যে ঘটনা একটা ঘটছে। বিপদ অন্যখানে। শত্রুপক্ষ যদি শক্তিশালী হয় আর যদি শরীরের যোদ্ধারা যুদ্ধে পেরে না ওঠে তখন!? হয়ত আপনার সৈন্যরা যুদ্ধে হারে নাই, যুদ্ধ জারি আছে। কিন্তু চলমান যুদ্ধেরও আছে নানান পার্শপ্রতিক্রিয়া। এবং অনেক ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুল যুদ্ধের চাইতেও ভয়াবহ।
আগে বলি যুদ্ধ কখন দীর্ঘস্থায়ী হয়। শক্তিশালী শত্রুপক্ষ হলে স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের স্থায়ীত্ব বেড়ে যায়। তেমনি আমাদের অন্তর্গত যোদ্ধাদের কোন দুর্বলতা থাকলেও এরকম হতে পারে। শরীরের (কোষের) অবকাঠমো বা মালমসলায় যদি কোন সমস্যা থাকে তাহলেও যুদ্ধ জিততে সময় লাগে। পরিবেশের কারণেও হতে পারে একই সমস্যা। আরো নানান কারণ আছে সবগুলো লিখলে আপনি এইখানেই ক্ষ্যান্ত দিয়ে ভেগে যাবেন ভেবে লিখছি না।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলি এবার। মানে বলতে চাচ্ছি ইনফ্লামেশন যদি থেমে না গিয়ে চলতে থাকে তাহলে কী হয়। কত কি যে হয় তার সত্যিই কোন ইয়াত্তা নেই। অল্প কয়েকটির ইয়াত্তা দেই। শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি আংশিক বা অনেকাংশে অকেজো অথবা বিশৃংখল হয়ে যেতে পারে। যারা মুলত ইনফ্লামেশন ঘটায় তারাই অকেজো হয়ে যেতে পারে। মানে গিলেখাদকরা, যারা শত্রু গিলে খায় তারা পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। ক্যান্সার হতে পারে। আরো হাজারো সমস্যা যেগুলো লেখাটিকে কেবল ভারী করবে। কেবল জেনে রাখুন সেগুলোও ক্যান্সারের মতই ভয়ঙ্কর। জুবায়ের ভাই (মুহম্মদ জুবায়ের) যে রোগটির সঙ্গে লড়াই করেছিলেন, পালমোনারি ফাইব্রোসিস, সেটির একটি প্রধান কারন ফুসফুস কোষে দীর্ঘস্থায়ী ইনফ্লামেশন। ইনফ্লামেশন প্রক্রিয়ায়, বুঝতেই পারছেন, আক্রান্ত স্থানের কোষগুলি তো বটেই তাদের আশেপাশের বিস্তীর্ন এলাকার কোষগুলির স্বভাবিক কর্মকান্ডও ব্যহত হয়। আর ফুসফুস কোষের কর্মকান্ড ব্যহত হলে তো আমাদের চলেনা। রক্তে ঠিকমত অক্সিজেন পৌঁছায় না। জুবায়ের ভাইয়ের ফুসফুসে ঠিক এই সমস্যাটি হয়েছিল।
সবমিলিয়ে ইনফ্লামেশন এমন একটি প্রক্রিয়া যেটি শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। মাথা ব্যাথা, সামান্য জ্বর, কিছু এলার্জিক ক্রিয়া ইত্যাদি হলে তাই একটু ধৈর্য ধরাই মনে হয় ভালো। মনে করুন, আপনি ঘুমাচ্ছেন আর আপনার ঘরে চোর ঢুকেছে। এখন চোর ধরতে গেলে আরামের বিছানা ছেড়ে মাঝরাতে উঠতে হবে বলে কি আপনি চোর ধরবেন না! আমার মনে হয় না এত বেশি কম্পোস্ট সার আপনার মাথায় আছে। আপনি কি বলেন? তাই বলছিলাম কি, কিছু হতে না হতেই 'এন্টি-ইনফ্লামেটরি' (উধাহরণ: এসপিরিন) ওষুধ খেয়ে নিজেকে বাঁচানোর যুদ্ধে নিজেই অযাচিত হস্তক্ষেপ না করাই বোধহয় মঙ্গল।
অবশ্য, "তোর কি বোধহয় তাতে আমার কি যায় আসে! আমারে কুত্তায় তাড়া করছে আর উনি আসছেন ইয়ে করতে..." এ-ও আপনি বলতে পারেন। কারণ, স্বাধীন দেশে রাস পূর্ণিমা সবার, প্রেমিকা আপনার, বাড়িওয়ালা প্রেমিকার, কুত্তা বাড়িওয়ালার। আমার এখানে কিছুই না। অতএব, আপনি আপনার প্রেমিকার বাড়িওয়ালার কুত্তার কামড় খেয়ে লেজ হারাবেন নাকি আন্দাজমতো ওষুধ খেয়ে জীবন হারাবেন সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার... ।
(২) পারিশিষ্ট (আসলে 'ভূমিকা' হবে)
লোভ সামলাতে পারলাম না। তাই এইরকম একটি শিরোনাম দিলাম। অবশ্য বলছি না যে শিরোনামের সঙ্গে মুল পোস্টের কোন মিল নেই। আসলে আজকাল সচলে পাঠক পাওয়াই মুস্কিল। এখানে মুলত যিনি পাঠক তিনিও দারুন দারুন সব লেখা লিখতে ব্যস্ত থাকেন হরহামেশা। আর তাছাড়া আমার লেখাগুলি কখনোই বিশেষ 'জাতের' হয়না। তাই পাঠকের আকাল আমাকে পীড়া দিতে কার্পন্যও করেনা। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে আমি লিখি সব 'জ্ঞান দেয়া' ধরনের পোস্ট। নানান 'হালকা-পাতলা' কথায় সেই সব লেখাকে সহজপাচ্য করার চেষ্টা থাকলেও আসলে যে শাক দিয়ে মাছ অথবা বালিশ দিয়ে বিছানা ঢাকা যায়না সে আমি নিজেও বুঝি... [হায় হায় এইগুলা আমি কি লিখতেছি!!!]
লিখতে বসেছলোম কয়েকটি বিষয় নিয়ে। ইনফ্লামেশন, অটোইমিউন ডিজিজ, মাইস্থেনিয়া এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। জুবায়ের ভাইয়ের যে রোগটি হয়েছিল সেটি নিয়ে লেখার সময় আমি বলেছিলাম, ইনফ্লামেশন বিষয়ে লিখব। ব্যপারটা খুব মজার। এজন্যই আসলে লিখতে চাওয়া। এর সঙ্গে চলে আসে অটোইমিউন ডিজিজ। দুটো মধ্যে অনেক মিল। আর শেষের দুটি রোগ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন দু'জন সচল (আমি কৃতজ্ঞ যে তাঁরা আমাকে এই বিষয়ে লেখার যোগ্য ভেবেছিলেন। যদিও রোগদুটি সম্পর্কে আমি তখন বিশেষ কিছুই জানতাম না।)।
এই লেখাটি অনেকদিন ধরে লিখব ভাবছিলাম। দেরী করে ফেললাম। এবং শেষও করতে পারলাম না। ইনফ্লামেশনই ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) হয়ে উঠলো। আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। যদি আপনারা আশ্বাস দেন যে আমার সচলের সদস্যপদ বাতিল করা হবেনা তাহলে আগামী পর্বে বাকি টপিকগুলো নিয়ে লিখবার আশা রাখি। সেই সঙ্গে এরকম শিরোনাম দেয়ার একটি ব্যাখ্যাও ব্যাখ্যা করতে চাই হাসি
২০০৯-১১-০৩ মঙ্গলবার সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: