সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

ভাইরাসের গর্ভধারণ বিষয়ক প্যাঁচাল এবং আপনার নীতি বিষয়ক একটি প্রশ্ন...

মানুষের চাইতে ভাইরাস অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে। দুইটা ব্যপার বলি, প্রথমত মানুষ গর্ভবতী হলে বাইরে থেকে দেখেও বোঝা যায়। ভাইরাসের ক্ষেত্রে যায়না। আর দ্বিতীয়ত, মানুষকে যথা সময়ে বাচ্চা দিতে হয়। সে ইচ্ছেমতো অপেক্ষা করতে পারেনা। ভাইরাস পারে। এই দুটি ক্ষমতার জন্য ভাইরাস যে কতো সুবিধা ভোগ করে সেটা বুঝতে পেরে প্রথমবার আমার চোয়াল ঝুলে পড়েছিলো। বস্তুত সেই প্রথম আমি বুঝতে পারি কিভাবে মানুষের চোয়াল ঝুলে পড়তে পারে!

ভাইরাস অবশ্য নিজে কখনো বাচ্চা দিতে পারেনা। সুতরাং যে অর্থেই হোক, গর্ভবতী হওয়া এবং বাচ্চা দেয়া বিষয়ক কোন কথাই তার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। ভাইরাস বাচ্চা দেয় আমাদের কোষকে ব্যবহার করে (এমন কোন প্রানী নেই যার কোষ ব্যবহার করে ভাইরাস বাচ্চা দেয় না! এমন কি ব্যাকটেরিয়া কোষও সে ব্যবহার করে!)। ভাইরাস কিভাবে আমাদের কোষের নিয়ন্ত্রন নিয়ে তার নিজের বাচ্চাদেয়ার ইনকিউবেটরে পরিনত করে তা আগে কয়েকটি লেখায় বলেছি। আজকে সেদিকে যাবনা। আজকে প্যাঁচাল পাড়ব ভাইরাসের বাচ্চা দেয়ার দুটি পদ্ধতি নিয়ে।
প্রথম পদ্ধতিতে ভাইরাস আমাদের কোষের নিয়ন্ত্রন নিয়ে কোষের মালমশলা ব্যবহার করে নিজের বাচ্চা বানায়। এরপর সেই বাচ্চারা কখনো কোষটি ছিঁড়ে তছনছ করে বেরিয়ে আসে আবার কখনো বাডিং পদ্ধতিতে কোষটি দৃশ্যত অক্ষত রেখে বাইরে বেরিয়ে আসে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ভাইরাস কেবল আমাদের কোষটির জিন'এ তার নিজের জিন ঢুকিয়ে দেয়। আর কিছু করে না। চুপচাপ বসে থাকে। তার এই চুপচাপ বসে থাকাটা কতোটা ভয়ঙ্কর সেটা ব্যাখ্যা করছি। আমাদের কোষ যখন সংখ্যায় বৃদ্ধি পায় তখন সে ক্রমবর্ধমান হারে দ্বিগুন হতে থাকে। অর্থাৎ একটা থেকে দুইটা হয়, দুইটা থেকে চারটা হয়, চারটা থেকে আটটা...এভাবে। কোষ আবার একটা থেকে দুইটা হওয়ার সময় সবার আগে দ্বিগুন হয় কোষের ক্রোমজমের কপি নাম্বার। মানে কোষের জ্বিন সবার আগে দুইটা হয়। দুইটা মানে 'হুবহু' দুইটা। কোথাও কোন নড়চড় নেই! এখন ধরুন আমাদের একটি কোষে ভাইরাস তার জিন ঢুকিয়ে দিল কিন্তু কোষের নিয়ন্ত্রন নিয়ে বাচ্চা দিলনা আর কোষটিকেও ধ্বংস করল না। কেউ কিন্তু কিচ্ছু টের পাবেনা। আমাদের কোষ তার নিজের নিয়মে বাড়তে থাকবে ভাইরাসের জিনটি নিয়ে। সেই একটি কোষ থেকে যদি একবছরে একহাজার কোষ তৈরি হয়, সেই একহাজার কোষের মধ্যেই থাকবে ভাইরাসের জিন। (এই সংখ্যা থেকে কেউ দয়া করে কোন ধারণা নেবেন না। এই সংখ্যা শরীরের বিভিন্ন কোষের ধরণের উপর ভিত্তি করে লক্ষ-কোটি, কোটি-কোটিও হতে পারে। তবে হাজারের মতো ছোট সংখ্যা কখনোই নয়!) এরপর যখন ভাইরাসের সময় হবে (সে অনুকুল পরিবেশ পাবে অথবা আরো অনেক কারণে হতে পারে), তখন সে বাচ্চা দেবে একসঙ্গে লক্ষ-কোটি। এতদিন আমাদের যে কোষগুলি আমাদের প্রয়োজন মেটাচ্ছিল সেগুলি আচমকা ধ্বংস হয়ে যাবে। আচমকা ধ্বসে পড়বে আমাদের কোন অর্গান !
আপনার নীতি বিষয়ক প্রশ্ন (এই কথাটুকু বলার জন্য এতকিছু লিখেছি। দয়া করে পড়ুন):
দিনে যে কোনসময় যে কারো হাত থেকে কলিফর্ম/ফিকাল কলিফর্ম (যে জীবানুগুলি পাওয়া গেলে প্রমাণিত হয় নমুনাটির সঙ্গে যে কোনভাবে 'পাকস্থলিজাত বর্জের !' সংস্পর্শ আছে বা হয়েছে) বের করা সম্ভব। আমার চারপাশে আমি যতো মানুষ দেখেছি তাদের সবার ক্ষেত্রেই কথাটি সত্যি; আমি নিজেও সবার ভেতরেই পড়ি। সেই হাত আমরা না ধুয়ে সবকিছু খাই। ভাত খাওয়ার আগে ক্ষুধার চোটে যেরকম দায়সারাভাবে আমরা হাত ধুই, তাতে জীবানুদের গোসল হয়ে যায় ঠিক, কিন্তু সাধারণত বানের তোড়ে ভেসে যাওয়া জাতিয় ঘটনা এর ফলে তাদের জীবনে ঘটে না। 'যাউগ্গা, হাত ধুয়ে পারেন না ধুয়ে পারেন যেমনে পারেন আপনি খান। না খেয়ে মরার চাইতে খেয়ে মরা ভালো।' কি বলেন?
আমাদের দেশে প্রতি ১২ জনের মধ্যে একজন হেপাটাইটিস 'বি' অথবা 'সি' তে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস হয় হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে। সাধারণত, আক্রান্ত হওয়ার পর বছরের পর বছর কোন লক্ষণ দেখা যায়না (এই সময় ১৪/১৫ বছরও হতে পারে। আশাকরি এখন আর বুঝিয়ে বলতে হবেনা কেন!)। যখন লক্ষণ প্রকাশ পায় তখন, 'যাউগ্গা, হাত ধুয়ে পারেন না ধুয়ে পারেন যেমনে পারেন আপনি খান। না খেয়ে মরার চাইতে খেয়ে মরা ভালো।' এই কথা বলা ছাড়া ডাক্তারেরও আর কোন উপায় থাকে না। কারণ ততদিনে লিভারের কোষগুলো ভাইরাসের রক্ষিতায় পরিণত হয়। তারা আর রক্তকোষ বানায়না, ভাইরাসের বাচ্চা বানায়।
১২ জনের মধ্যে ১ জন। হার'টি কিন্তু অনেক বেশি। আপনার বাড়ির আর আপনার চাচাদের বাড়ির যে ১২ জন মানুষ তাদের মধ্যে লটারিতে আপনি আটকা পড়েননি তো! আমার মনে হচ্ছে, আপনিই আটকা পড়েছেন। আপনার হেপাটাইটিস বি অথবা সি আছে।
আর আপনি হয়তো আপনার স্বামী অথবা স্ত্রীকে ইতিমধ্যেই রোগটি উপহার হিসেবে দিয়েও ফেলেছেন! আপনি নারী হলে আপনার সন্তানও এ থেকে বঞ্চিত হবেনা! আপনি পুরুষ হলে আপনার স্ত্রীর মাধ্যমে তারা পেয়ে যাবে এটি! আর আপনি যার জীবন বাঁচাবার জন্য রক্ত দিয়েছিলেন তাকেতো রক্তের সঙ্গে ফ্রি দিয়েছেন হেপাটাইটিস ভাইরাস। যাউগ্গা, না ভালোবেসে মরার চাইতে ভালোবেসে মরা ভাল। কি বলেন?
হেপাটাইটিস টেস্ট করতে খুব বেশি খরচ হয়না, অনেক সময় দিতে হয়না, অনেক ব্যাথাও লাগেনা। আপনি যদিও অ-নে-ক ব্যস্ত। সময় পাবেননা। তারপরও একটু কষ্ট করে দেখবেন টেস্টটি করিয়ে নেয়া যায় কিনা? যদি নিশ্চিত থাকেন যে, জীবনে কখনো 'নির্দিষ্ট সময়' ফুটিয়ে ছাড়া পানি পান করেননি, কখনো কোন দুষিত পানীয় পান করেননি, কখনো দুষিত রক্ত নেননি, কোন দুষিত সুচের মাধ্যমে ইঞ্জেকশন নেননি আর আপনার স্বামী বা স্ত্রীর হেপাটাইটিস (জন্ডিস) 'বি' বা 'সি' নেই তাহলে অবশ্য টেস্টের দরকার হবেনা।
পানি অথবা তরল খাবার খাওয়ার সময় কি একটু কষ্ট করে সচেতন হবেন, প্লিজ? নাকি, না খেয়ে মরার চাইতে খেয়ে মরা ভালো।' নীতিতে বিশ্বাসী আপনি?
২০০৯-০৯-১৫ মঙ্গলবার সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: