সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

মানুষের নীতিমালা: পাদ্রীর গল্প

জনাব মোল্লা ভাই অথবা আঁতেল ভাই,
মানতে না চাইলে না মানুন। কিন্তু দয়া করে বাংলা সিনেমার ডায়ালগ দিয়ে মানুষের মহত্ব জাহির করতে আইসেন না। প্রাচীনকালে মানুষ আগুন সম্পর্কে জানতনা। আগুনের অপার রহস্যময়তা'র জন্য তখন তাই আগুনকে পূজা'ও করা হয়েছে। আর এখন 'পুলাপানের' পকেট খুঁজলেই আগুনের বাক্স পাওয়া যায়। মহান অগ্নি দেবতাকে বাক্সে ভরে পকেটে নিয়ে ঘোরাঘুরি! তার 'ইয়ে' দিয়ে কান চুলকানো! এসব কথা বলে আপনি আজ আর চিল্লাপাল্লা করতে আসেন না।
আপনি বুঝে গেছেন চিল্লাপাল্লা করে সুবিধাও করতে পারবেন না। অথচ টাইম মেশিনে হাজার তিনেক বছর পেছনে যেতে পারলেই দেখা যেতে পারে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক দাদা সম্পর্কীয় কেউ নেংটি পরে অগ্নিদেবতার ফুলশয্যায় চোদ্দ বছরের কিশোরী উঠিয়ে দিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছেন।
মানুষ সম্পর্কেও আপনি জানেননা দেখে তাকে আকাশে তুলে দিয়ে উদ্বাহু নৃত্য (আচ্ছা এই নাচটা আসলে কেমনে নাচে!) করবেন সেটা গ্রহনযোগ্য নয়। মানুষ হিসেবের বাইরে নয়। তাকে খুব চুলচেরা হিসেব করা যায়। বলতে চাইছি আসলে মানুষের নীতিমালার কথা। যে নীতিমালায় মানুষ চলে সেটি'র অনেকখানিই আমরা বুঝে ফেলেছি। সবটুকু বুঝে ফেললেই অযথা টেনশনের দিন শেষ। তখন আপনার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীর নীতিমালার একটা কপি পড়েই আপনি জেনে যেতে পারবেন আপনার 'অক্ষমতায়' বিরক্ত হয়ে প্রতিবেশীর তার সঙ্গে ভেগে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু!
মানুষের নীতিমালার ব্যপারটি বোঝাতে গেলে অনেক পেছনের কাহিনী দিয়ে শুরু করতে হবে। সবার আগে পাদ্রীর গল্প বলি। পাদ্রীর নাম গ্রেগর জোহান মেন্ডেল। তিনি ১৮২২ সালে জন্ম নিলেন চেকোস্লোভাকিয়ায় (চেক রিপাবলিক)। তারপর পড়াশোনা করলেন পদার্থ বিজ্ঞানে, হইলেন পাদ্রী আর গবেষনা করলেন জীববিজ্ঞানে। ইয়ের একটা সীমা থাকে!
মাঝে মধ্যে আমার খুব দুঃখ হয় যখন মনে হয় আমাদের এলাকায় আপেল গাছ হইলে আমার দাদার বাপ চাচাদের কারো নিশ্চয়ই 'নিউটন' হওয়ার ব্যপক সম্ভাবনা ছিল। সময় মতো মাথায় একটি আপেল পড়লেই কেল্লা ফতে হয়ে যেতো! কিন্তু মেন্ডেলের কাহিনী মনে পড়লেই আবার আপেল গাছ না থাকার দুঃখটা নিজের পূর্বপুরুষের উপর আমার অভিমানে পরিণত হয়! আরে, এই পাদ্রীও তো মটরশুঁটি লাগাতো আপনারাও তো লাগাতেন। পাদ্রী লাগাতো কোথায় পিচকা বাগানে। আপনারা লাগাতেন মাঠকে মাঠ। হায়! মটরগাছ দেইখা জেনেটিক্সের একটা সুত্রও কি আপনারা দিতে পারতেন না!
যাকগা, তো হল কি, গির্জার বাগানে পাদ্রী মহাশয় লাগালেন মটরশুঁটি। আজাইরাভাবে লাগালেন না। হিসাব করে লাগালেন। যে মটরশুঁটি হলো সেটার বীজই আবার লাগালেন। সেটার বীজ দিয়ে আবার। তারপর আবার। এভাবে লাগাতে থাকলেন আর প্রতিবার মটরশুঁটি ফললেই কি কি জানি নোট নিতে থাকলেন। কেউ কেউ নিশ্চয়ই সেসময় ভেবেছিল, পাদ্রী পাগল হয়ে গেছে। মটরশুঁটি লাগানো আর থামবেনা এই পাদ্রীর। কিন্তু থামলো অবশেষে। থামলো মানে বন্ধ হয়ে গেল তা নয়। থামলো মানে উনি কেবল মটরশুঁটি লাগিয়ে লাগিয়ে ঘাড় গুঁজে নোট নেয়া বন্ধ করে তার পাগল হওয়ার কারণটা মানুষকে বুঝিয়ে বললেন। বললেন 'মানুষের নীতিমালার' কথা।
কেউ ভাববেন না যে পাদ্রী 'মানুষের নীতিমালা" লেখার কথা প্রথম বলেন। আসলে উনি নীতিমালার উপস্থিতির কথা বলেন। সেটির গঠন গাঠন হিসেব করে সেটি পড়তে শেখার কথা বলেন। আর সবশেষে নীতিমালা যে ভাষায় লেখা হয়েছে সেটির মর্মোদ্ধার করে সেটি বোঝার কথা বলেন। যাতে "অনেক কিছু" হয়। তো পাদ্রী প্রথম যে নীতি'টির কথা বললেন সেটি নীতিমালা গঠনের নীতি অ্যাঁ মন খারাপ
- "দৈহিক গঠনের ধরণ ক্ষুদ্র কণার মতো উত্তরাধিকারসুত্রে পাওয়া যায়" (physical traits are inherited as “particles”)। তার মানে হচ্ছে, আপনি উত্তরাধিকার সুত্রে নিজের শরীরে 'ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা' নিয়ে আসছেন যে কণাগুলোই নির্ধারণ করবে আপনার দৈহিক গঠন কেমন হবে।
এই প্রথম আমরা জানলাম পূর্বপুরুষের সঙ্গে দৈহিক গঠনের মিল বা অমিলের ব্যপারটা আন্দাজে বা অলৌকিক কারো ইশারায় হয়না (সরি মোল্লা ভাই এবং আঁতেল ভাই)। এইটার কোন একটা নীতিমালা আছে। সেই নীতিগুলোকেই পাদ্রী বলেছিলেন, particle বা 'ক্ষুদ্র কণা'। পাদ্রী তখনো ক্রোমোজম (chromosome) এবং ডিএনএ'র (DNA) কথা জানেননা। তখনো এসব আবিষ্কৃত হয়নি। অথচ তিনি ক্ষুদ্র কণা বলে আসলে এই দুটোরই বর্ণনা দিলেন। চেহারা আর শারীরিক গঠনের কথা না জানলেও পরিষ্কার বলে দিলেন চরিত্রের কথা। (পাদ্রী, আপনার প্রতিভার কথা ভাবলে আমার বিস্ময় কাটেনা। এই সুযোগে তাই আপনাকে আমার সব শ্রদ্ধাসহ প্রণতি।)
কাজের কথায় আসি। এর অনেক পরে, কোন একটা 'পরবর্তীতে' আমরা জানলাম আরো অনেক কিছু। এই নীতিমালা কেবল দৈহিক গঠন নয় আচরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নীতিমালা অনুযায়ীই সব হয়। এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। ভবিষ্যতের অমোঘ বিধান যদি নিয়তি হয় তবে সব সময়ের অমোঘ বিধান এই নীতিমালা। এই নীতিমালার নাম ক্রোমোজম (chromosome)। কেবল মানুষের নয় সব প্রাণিই নিয়ন্ত্রিত হয় নিজ নিজ এরকম অমোঘ নীতিমালার বিধানে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পাদ্রী আসলে মটরশুঁটির মধ্যে কী দেখেছিল যার ফলে সে একবারে মড়মড় করে মানুষের টনক ধরে ঝাঁকি দেয়ার সাহস পেল!
পাদ্রী আসলে অনেকগুলো ভিন্ন চরিত্রের মটরশুঁটি গাছ নিয়ে গবেষনাটি চালিয়েছিল। যেমন, হলুদ দানা, সবুজ দানা, মসৃন দানা, অমসৃন দানা লম্বা গাছ, ছোট গাছ ইত্যাদি। পাদ্রী যখন একটা হলুদ দানার গাছ আর একটা সবুজ দানার গাছের মধ্যে সংকর করলেন তখন দেখলেন পরবর্তী প্রজন্মের (১ম প্রজন্ম) মধ্যে সবগুলোর দানাই সবুজ, কোন হলুদ দানা নেই। তিনি আবার এই পরবর্তী প্রজন্মেরই দুটি গাছের মধ্যে সংকর করে (১ম প্রজন্ম X ১ম প্রজন্ম) দেখলেন তাদের বংশধরদের চারটির মধ্যে তিনটির দানা সবুজ বাকি একটির দানা হলুদ। আমার বাগানে এরকম হলে আমি নিশ্চয়ই কোনটা আগে খাব আর কোনটা পরে খাব সেই হিসেব করতাম। বোকা পাদ্রী করল অন্য হিসাব। অন্য সেই হিসাব জানতে হলে প্রথমে এই ছবি দেখুন (ছবি পেস্টাইতে পারিনা দেখে আগের কোন লেখাতেই ছবি দিতে পারিনি। এখন চেষ্টা করে পারব কি না তা বুঝতেছিনা!)
পাদ্রীর পরীক্ষা (১) (ক্লিক করলে বড় করে দেখাবে)পাদ্রীর পরীক্ষা (১) (ক্লিক করলে বড় করে দেখাবে)
প্রথম ছবিতে যে ঘটনা ঘটেছে এইটা দেখে পাদ্রী পড়ে ফেললেন প্রাণিদের নীতিমালার দুইটা নীতি।
প্রথমটা "দমন নীতি", "'মিশ্রিত প্রজন্মের' একটা 'এলিল' আরেকটাকে দমিত করতে পারে।" (In a heterozygote, one allele may conceal the presence of another)
চিল্লায়েন না। বুঝাইতেছি হাসি
আপনার যে কোন বৈশিষ্ঠ প্রকাশের জন্য যে নীতির ফাইল দেঁতো হাসি থাকে সেখানে এক সঙ্গে থাকে দুইটা নীতি। নীতিমালা অবশ্য একটা হইলেও হয়। কিন্তু দুইটা থাকারও দরকার আছে। নাহলে মানুষে আর রহস্য থাকবে না। সুন্দরীরাও সব রহস্যহীন হয়ে যাবে। এই ব্যাখ্যা পরে দেয়া যাবে। আগে দুইটা নীতির ব্যাখ্যা দেই। মটরশুঁটির (যে কোন প্রাণির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য) রং নির্ধারনের জন্য যে নীতিমালা আছে সেখানে আসলে একটা ফাইলে আছে দুইটা নীতি। একটাতে লেখা "রং হইতে হইবে সবুজ"। আরেকটিতে লেখা, "রং হইতে হইবে হলুদ"। এই নীতি দুটি সে পেয়েছে তার দুই মাতৃ/পিতৃ পুর্বপুরুষের কাছে থকে। যেহেতু দুই পূর্বজের কাছ থেকেই নীতি নিতে হয় তাই একটি নীতি নেয়ার উপায় থাকেনা। দুজনের কাছ থেকে দুটি নিয়ে একটি "রং বিষয়ক নীতি"র ফাইল বানিয়ে দুটিই একসঙ্গে রাখতে হয়। এই ফাইলের নীতিদুটির একটিকে আরেকটির এলিল (allele) বলে।
এবার বুঝাই মিশ্রিত প্রজন্ম (heterozygote) কাকে বলে। যার কোন একটি বৈশিষ্ঠের নীতির একটি ফাইলে দুই রকমের দুটি নীতি থাকে, তাকে বলে মিশ্রিত প্রজন্ম। আমরা বলি "প্রজন্ম ১" (F 1 generation)। মাতৃপ্রজন্মের (P generation) কোন বৈশিষ্ঠের জন্যেও নীতির ফাইল থাকে। তবে সেখানে দুইটা নীতিতেই লেখা থাকে একই কথা। মানে রংয়ের ক্ষেত্রে ধরেন একজনের দুটি নীতিতেই লেখা "রং সবুজ হইবে" আরেকজনের দুটি নীতিতেই লেখা "রং হলুদ হইবে"। এইদুইজনের নীতি থেকে একটি একটি করে ফটোকপি নিয়েই তৈরি হয় মিশ্রিত প্রজন্ম (প্রজন্ম ১) এর নীতির ফাইল।
এখন ব্যাখ্যা করি পাদ্রীর পুরো কথাটাকে। পাদ্রী বলছে, মিশ্রিত প্রজন্মের একটা এলিল আরেকটাকে দমিত করতে পারে। মানে জলবৎ তরলং। মিশ্রিত প্রজন্মের নীতি'র যে একটা ফাইলে দুইটা দুই রকমের নীতি ছিল তার একটা আরেকটারে চাপা দিতে পারে। যেখানে দুইটা নীতির একটাতে বলা হইছে "রং হইবে সবুজ" আরেকটাতে বলা হইছে "রং হইবে হলুদ" সেখানে শুধু একটা নীতি মেনেই রং নির্ধারিত হবে। দুইটাই মানা হবে না। এইটা আবার নির্ভর করে নীতি'র ক্ষমতার (আক্ষরিক অর্থে নয়) উপর। মটরশুঁটিতে সবুজ রংয়ের জন্য যে নীতি তার ক্ষমতা হলুদের চাইতে বেশি বলে সবুজ আর হলুদ এক সঙ্গে থাকলে প্রকাশিত হবে শুধু সবুজ রং। সবুজের নীতি দমন করবে হলুদের নীতিকে। এটাই দমন নীতি।
মেলা প্রশ্ন জাগছে নিশ্চয়ই,
তাইলে প্রথম প্রজন্মের চারটার মধ্যে একটা যে হলুদ হইল? তিনটা সবুজ আর একটা হলুদ চারা দেইখাই সে এতাবড় কথা কেমনে কইল? নীতিমালায় কোন ফন্টে লেখা হয়? সেইডা পড়ে কেমনে? যদি প্যাঁচাল লাগে? 'হ্যানো' হইলে কি হয়? 'ত্যানো' হইলে?
বলব, বলব, অবশ্যই বলব। তবে ধুগো'দা আর হিম্ভাই কোথায় চা খাইতে যায় আমি জেনে ফেলছি। সেইখান দিয়ে একটা চক্কর দিয়ে এসে তারপর। পাশে গিয়ে চা খাইতে বসলে নিশ্চয়ই ওনারা চক্ষুলজ্জার খাতিরে চায়ের দাম না দিয়ে পারবেনা! আর তাছাড়া যুধিষ্ঠির'দা ও সেদিন আমাকে চায়ের বিরতি নিয়ে নিয়ে লিখতে বললেন। হে হে দেঁতো হাসি
[জেনেটিক্সের (genetics) কঠিন সব তত্ত্ব লিখব বলে শুরু করেছি। প্রথম দুয়েকটি পর্বে যা-ই বলি তা বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রই জানেন। তারপরও এইকথাগুলো না বলে আরো কঠিন কথায় যাওয়া যেত না। এখানে অনেক বিজ্ঞান লেখক আছেন যাদের নখের যোগ্যও আমি না। জেনেটিক্সের মতো এমন ভারি একটি বিষয় নিয়ে তাদের সামনে লিখতে কিছুটা হলেও সংকোচ হচ্ছিল। তারপরও তাঁদের মহানুভবতায় আস্থা আছে বলে শুরু করলাম। সব ভুলের জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আর কষ্টকরে আমাকে শুধরে দেবার অনুরোধ করছি।
যে ছবিটা দিয়েছি সেটা আরো বড় দেখা যায় এমনভাবে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নিয়ম জানিনা! কষ্টকরে আলাদা উইন্ডোতে নিয়ে দেখতে হবে। হাসি
'মানুষের নীতিমালা' না দিয়ে, শিরোনাম 'প্রাণিদের নীতিমালা' দেয়া উচিত ছিল। কারণ এই নীতিমালা সব প্রাণির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তারপরও আমার এই শিরোনামটাই দিতে ইচ্ছে হল। লেখকের নিশ্চয়ই অল্প একটু আধটু যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার থাকে! হাসি ]
২০০৯-১১-০৬ শুক্রবার সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: