সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১০

অন্য পৃথিবীর গল্প (১): পতনের পর

প্রস্তুতির পূর্বের গল্প কিছুটা বিচ্ছিন্ন!

হেলতে দুলতে অনেকটা সময় নষ্ট করে যখন IELTS পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্ট পেলাম তখন ফেব্রুয়ারি। তখনও যথেষ্ঠ সময় থাকতে পারতো হাতে, কিন্তু ব্যক্তিগত একটা 'পতন' বুঝে সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে চলে গেল আরো অনেকটা দিন। শেষমেশ যখন অ্যাপ্লাই করতে গেলাম তখন বেশিরভাগ পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাই করার সময় চলে গেছে। ভাগে যে দুয়েকটা জুটলো অ্যাপ্লাই করলাম সেগুলোতে। সবার আগের লক্ষ্য ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স (বন-রাইন-জিগ)। আবেদন করলাম শেষ মূহুর্তে!

বুধবারে গেছি ডিএইচএল'এ। শুক্রবার কাগজপত্র পৌঁছাবার শেষ দিন। ডিএইচএল থেকে বলল, আর্জেন্ট সার্ভিসে না পাঠালে তারা শুক্রবারে কাগজপত্র পৌঁছাবার নিশ্চয়তা দিতে পারেনা। দ্বিগুন টাকা দিয়ে সেই সার্ভিসেই পাঠালাম। তারপর নেটে চোখ পেতে বসে থাকলাম। বুধবার যায়, বৃহস্পতিবার যায়, শুক্রবার যায়। আমার কাগজপত্র পৌঁছায় না। গেলাম ডিএইচএল'এ। বলল, যথাসময়ে কাগজ না পৌঁছালে পয়সা ফেরত দেবে। মনে মনে বললাম, আরে ব্যাটা পয়সা ফেরত নিয়ে কি নিজে ভার্সিটি খুলে পড়তে থাকবো! অবশ্য সেকথা চিৎকার করে বললেও লাভ হতো না। যা হবার তা হয়ে গেছে। ভাবলাম পয়সা ফেরত নেবার জন্য আবেদন করি। মিষ্টি গলার একটা মেয়ে সেই আবেদন পড়ে ফোনে জানালো সপ্তাহখানেক পর টাকা ফেরত নিয়ে যেতে পারবো। মনে মনে বললাম, বেশ। গরু গেলেও জুতো তো ফেরত পেলাম। কিন্তু না, পরের দিন সেই ভদ্র মেয়ে ফোন করে বলল, যে শুক্রবারে আমার কাগজপত্র পৌঁছাবার কথা, সেই শুক্রবারে নাকি জার্মানি'তে সরকারি ছুটি ছিলো। শনিবার রবিবার জার্মানিতে অফিস আদালত এমনিতেই বন্ধ। তাই আমার কাগজপত্র পৌঁছেছে সোমবার। নির্ধারিত সময়ের তিন দিন পর। কলিজার কোনায় চিনচিনে ব্যাথাটা বাড়লো আরো। তবে সময় আমার সঙ্গে ছিলো বোধহয়। একটা মেইল পেলাম ভার্সিটি থেকে। জানিয়েছে আমার আবেদনপত্র পেয়েছে তারা। রেজাল্ট জানাবে একমাস পর। বসে থাকলাম সেই আশায়, মাঝখান থেকে শেষ ভার্সিটিটাতে আবেদন করে ফেললাম। একমাস পর রেজাল্ট এলো, আমি চান্স পেয়েছি :D

আনন্দে উড়তে উড়তে পার করে দিলাম দুসপ্তাহ। তারপর খোঁজ খবর নিয়ে দেখি, এ ভার্সিটি মাত্র বছর পনেরো আগে জন্মেছে (জার্মানির ইউনিভার্সটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স কনসেপ্টটাই নতুন, তখন জানতাম না)! কী জানি কেমন ভার্সিটি! কেউ বলে দারুণ, তো কেউ বলে দূর দূর...! সিদ্ধান্ত নিলাম যাচ্ছি না সেখানে। আরেকটা ভার্সিটির রেজাল্টের জন্য বসে থাকব। এটাতে দুটো সাবজেক্টে এপ্লাই করেছি। মলিক্যুলার মেডিসিন আর মাইক্রোবায়োলজি। ভার্সিটির বয়স সাড়ে চারশো বছর! বিশ্ববিদ্যালয়টাও, ভালই! অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে একটা ফর্ম পাঠাল মলিক্যুলার মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট থেকে। সেখানে একগাদা ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্টের নাম। তার অর্ধেকের বেশির নামই শুনিনি কখনো। বলেছে আমি কোনটা কতটুকু পারি সেটা যেন তাদেরকে জানাই। জানালাম। লুকোছাপা না করে বুকে পাথর বেঁধে সব সত্যি সত্যিই জানালাম তাদেরকে।

ক'দিন পরের এক দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়মিত আড্ডার জায়গায় আড্ডা দিচ্ছি। উদ্যানে আড্ডা হতো অবশ্য সন্ধ্যায়। একপাল বন্ধুর সঙ্গে। সেদিন এক বালিকা ছিল সঙ্গে। সুন্দরী, কিছুটা ব্যথিত হৃদয়ের। ব্যথিত এক বালিকাকে সঙ্গ দিতে দুপুরে গিয়ে উদ্যানে বসে থাকাটা বিশেষ মন্দ নয় কখনোই। আর মন্দ হলেও মন্দ কাজে খুব একটা আপত্তি নেই আমার। তাই সেদিন দুপুরেই ছিলাম উদ্যানে। আচমকা এলো ফোন। নাম্বার চিনি না। ভাবলাম ভাই (অর্জুন মান্না) বোধহয়। উনিই সাধারণত দেশের বাইরে থেকে ফোন করেন। সুতরাং ফোন ধরেই বলে উঠলাম, "ভাই..."। অপর পাশ থেকে ঘড়বড় করে কী জানি বলল। বুঝলাম না কিছু। কানে বাংলা শব্দ আশা করছিলাম বলেই বোধহয়! সামলে উঠে ভালোমতো শুনে দেখি ফোনটা এসেছে আমার ভার্সিটি থেকে। ইন্টারভিউ নিতে চায়। আমার এখন সময় আছে কিনা জানতে চাচ্ছে। এরকম শুনে অভ্যস্থ নই। অফিস-ভার্সিটি থেকে যোগাযোগ করে সময় আছে কিনা কেউ জানতে চায়না এদেশে। তাদের সময় মতই সবাইকে সময় করে নিতে হয়। সে যাই হোক, মিনিট দশ-পনেরোর ইন্টারভিউ দিলাম। তারপর হাঁপাতে থাকলাম বসে।

অগাস্টের পনেরো'তে রেজাল্ট আসার কথা। পনেরো গেলো, ষোল গেলো, আমার যৌবন গেলো, কিন্তু রেজাল্ট এলোনা। সতেরো তারিখে সাহস করে মেইল করলাম। জবাব এলো সন্ধ্যায়। আমি চান্স পাইনি। খুব বুঝিয়ে শুনিয়ে ওরা জানিয়েছে, মাইক্রোবায়োলজিতে পড়েছি, মলিক্যুলার মেডিসিনের ল্যাবে অভিজ্ঞতা নেই কোনো। আমি তাই বাদ! নিজের ভেতর আমি তখন বরবাদ হয়ে গেছি। আগের সুযোগটা নষ্ট করেছি ইচ্ছে করে। বুঝলাম, মলিক্যুলার মেডিসিনে চান্স পাইনি যখন, তখন মাইক্রোবায়োলজিতেও পাইনি। একই বিশ্ববিদ্যালয়। একটার খবর জানিয়েছে। ওটাতে চান্স পেলে ঠিকই জানাতো এটার সঙ্গে।

নিজের পতন ঠেকাতে তখন খড়কুটো ধরার চেষ্টা করলাম। আরেকটা ইমেইল করলাম। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলাম. আমি মলিক্যুলার মেডিসিনে চান্স পাইনি কিন্তু আমি তো মাইক্রোবায়োলজিতেও অ্যাপ্লাই করেছিলাম, সেটার ফলাফলটা জানতে পেলে বাধিত হতাম। পরের দিন মেইলের জবাব এলো। জানতে পেলাম, সময় শালা একেবারে বেঈমানী করেনি। চান্স পেয়েছি। অন্য এক পৃথিবীতে প্রবেশাধিকার মিলেছে আমার। সেখানে মিথ্যের অন্ধকারকে আড়াল ভেবে পোকারা নোংরামিতে বুঁদ হয়ে নেই। সেখানে আছে সত্যের আলোর মতো পর্যাপ্ত রোদ, মায়ের আশ্বাস আর আশীর্বাদের হাত ধরে দেখা স্বপ্নের মতো ভিজে মাটি, আর শৃংখলহীনতার সুস্পষ্ট বাতাস। সেখানে শেকড় গেড়ে আমি আকাশ ছোঁবার স্বপ্ন দেখতেই পারি...

৫টি মন্তব্য:

taposhi বলেছেন...

সেখানে মিথ্যের অন্ধকারকে আড়াল ভেবে পোকারা নোংরামীতে বুঁদ হয়ে নেই।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

কেমন আছিস বন্ধু? তুই আমার ব্লগ পড়িস! আমি জানতাম না...

nibirrashed বলেছেন...

ঘুরতে ঘুরতে এসে দেখি এটা আপনার ব্লগ :P
আছেন কেমন :)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

আছিরে ভালই ভ্রাতা। তোমার কী অবস্থা? মানসন্মান শেষ করে এখন কী করতেছ? (তোমার মেসেজটা আমি আজকে দেখলাম! ইমেইলে সংকেত পাওয়ার কোন উপায় আছে বলে জান? আমি শালার এই ব্লগের নিয়মকানুন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা।)

psychosaika বলেছেন...

ভাল্লাগ্লো ভাইয়া... কিছু প্রাপ্তি অনেক সময়েই ব্যক্তিগত হতাশাকে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে! আর চেইঞ্জ অফ প্লেইস ইনভাইটস চেইঞ্জ অফ হার্ট! ইফ অনলি আই হ্যাড দ্যা চান্স! :(