রবিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১০

অন্য পৃথিবীর গল্প (২): অপেক্ষা এবং...

ভার্সিটি থেকে মেইলে জানিয়েছিল, ওরা আমার কাগজপত্র পাঠিয়েছে অনেক আগেই। কাগজপত্র মানে অ্যাডমিশন পেপার। সে এক সোনার হরিণ। এর কাঁধে চড়ে কত যে খাড়া পার হয়েছি পরে! সে গল্প পরের, আপাতত তখন কাগজপত্র না পাওয়া পর্যন্ত আমার চলনশক্তি রহিত। সেটা ছাড়া দূতাবাস আমাকে ইন্টারভিউয়ের তারিখ দেবেনা। সেটাতে সব লেখাজোখা থাকবে কবে, কখন, কোথায়, কী! বসে থাকা ছাড়া তাই আর কোন উপায় নেই! বসে থাকাই যেত নিশ্চিন্তে! সমস্যা হচ্ছে আমার সন্দেহপ্রবণ কলিজা! অতীতে এক প্রাণিতে সন্দেহাতীত আস্থা রেখেছিলাম! সেই পাপের খেসারত দিতে গুনতে হয়েছে একটা জীবন, আর পুরোটা বিশ্বাস!
কোন কিছুতে তাই আস্থা রাখতে পারিনা। বসে থাকি, আর সন্দেহ করি! সত্যি আমি চান্স পেয়েছি তো! ভুল করে একটা ইমেইল তো চলে আসতেই পারে। ইউনি ইয়েনা'র ইন্টারন্যাশনাল অফিস তো ভুলও দেখে থাকতে পারে! সেই যে আগে একবার যেমন হয়েছিল...! সেই অপেক্ষা, সে এক বিশ্রী ব্যাপার। সন্দেহ করার মতো নোংরা স্বভাব আর হয়না! নিজেকে ইতর প্রাণি মনে হয়! সেই সঙ্গে আছে হারামি হাসিবের টিটকিরি আর খোঁচানো! আমার নাকি সবকিছুতেই সন্দেহ! আমি নাকি প্লেনে উঠে সন্দেহ করব প্লেন ক্রাশ করবে কিনা! আমি নাকি ইয়ে! আমি নাকি উয়া...!!! সবচাইতে বড় কথা শালা ভরসা দেয়ার বদলে পিটাইতে চায়! বলে, এরপর সন্দেহ করলে জুতাপেটা করবে! এমন বন্ধু থাকলে মানুষের আর শত্রুর দরকার কী!!! :(

বেশিদিন বসে থাকতে হলোনা অবশ্য। দিন তিনেক পর (সম্ভবতঃ অগাস্টের ২১ তারিখে) হাতে পেলাম সেই সোনার হরিণ। ভেবেছিলাম হাতে বেশ সময় থাকবে, ধীরে সুস্থে গুছিয়ে নেব। কিন্তু, ও হরি! সোনার হরিণ দেখি খ্যাক খ্যাক করে টিটকিরি'র হাসি দেয়! ভালো করে চেয়ে দেখি, ব্যাপারটা সময় সংক্রান্ত। আমার হাতে সময় আছে যতটা থাকার কথা তার অর্ধেক! কড়ায়গণ্ডায় দেড় মাস! দেড় মাসের মধ্যে ভিসা নিয়ে, সব প্রস্তুতি নিয়ে, বিদায় নিয়ে, বাসে অথবা নৌকায় গিয়ে হাজির থাকতে হবে ভার্সিটিতে। এবং সেখানে কোন লাফ দেয়ার অপশন নেই। মানে লাফ দিয়ে ঠুস করে পৌঁছে যাওয়া যাবে না। আমাকে পুলসিরাত পার হয়েই যেতে হবে জর্মন্দেশ! ফুসসসস... একটা গায়েবী আওয়াজ শুনলাম মনে হলো!

সোনার হরিণ যেদিন হাতে পেলাম সেদিন আর সময় ছিলো না। দূতাবাসে ছুটলাম তার পরের দিনেই। রিসিপশন অথবা ওরকম কিছু একটা থেকে ভিসা ফর্ম দেয়। ইন্টারভিউয়ের তারিখও দিয়ে দেয় সেই সঙ্গে। কথা বললাম সেখানে। সোনার হরিণ দেখে শুনে তারা আমার ইন্টারভিউয়ের তারিখ ঠিক করলো ১৬ই সেপ্টেম্বর। আমি বললাম, সে কী করে হয়! আমার তো কাল পরশু তারিখ দরকার! ওরা আরেক নজর খাতাপত্রে চোখ বুলিয়ে বলল, সে হবার নয়! ভেতরে ভিসা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারি আরো আগে সময় পাওয়া যাবে কিনা! গেলাম ভেতরে! এবার এ পাশের রিসিপশন থেকে সব শুনে-বুঝে আমার কাগজপত্র নিয়ে গেল আরো ভেতরে!!! আমি তখন মনে মনে ভাবছি, ভেতরে যখন এসেছি তখন প্রয়োজনে আরো ভেতরে যাবো। মানসম্মান একবারই যায়! ভেতরেও! সাত ছয় ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় কেটে গেলে এলো রিসেপশনিস্ট। সঙ্গে আমার কাগজপত্র। দেখলাম এবার তারিখ পেয়েছি সেপ্টেম্বরের আট। আটদিন এগিয়েছে। মনে মনে বললাম, যাও রতন, নির্বাণের জন্য দৌড়াও।

দৌড় দৌড় দৌড়। এরপরের কয়েকটা দিন কেবল একটাই কাজ। গ্রামে যাও। মা আর আব্বার সঙ্গে কথা বলো। আপুদের সঙ্গে কথা বলো। এই কাগজটা লাগবে, সেটা আনো, ওটা লাগবে, সেটা যোগাড় করো। সে এক বিরাট ব্যস্ততার সময়। অনেক পরে অবশ্য ভেবে দেখেছি, ব্যাপারটা ওরকম আহামরি কিছু নয়। আগে কখনো এরকম দৌড়ের পাল্লায় পড়িনি। তাই কাজের চেয়ে ঢের বেশি ছোটাছুটি আর ছোটাছুটির চাইতে ঢের ঢের বেশি ভাবনার কবলে পড়ে যে ব্যাপারটা শেষপর্যন্ত হয় সেটা হচ্ছে দৌড়ানো।

আট তারিখে সব কাগজপত্র নিয়ে গেলাম ভিসার ইন্টারভিউ দিতে। নানারকমের প্রশ্ন নাকি জিজ্ঞেস করে তারা। একেকজনের কাছে একেক রকম শুনেছি। তবে যেরকমটি ভেবেছিলাম, আমার ক্ষেত্রে সেরকম হলোনা। অতি সহজেই নিস্তার পেলাম। পরে অবশ্য ভেবে দেখেছি, বেচারী ভিসা অফিসার আমার কাছ থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য আমাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলো। তার সঙ্গে আমার কথোপকথনের সবটুকু মনে নেই। যেটুকু মনে আছে সেটুকু এরকম-

ভিসা অফিসার: মাইক্রোবায়োলজি পড়তে যাচ্ছেন?
আমি: জ্বি
-অনেকগুলো ভাগ থাকার কথা, কোনটা পড়বেন ভাবছেন?
-জ্বি আমার কয়েকটা পছন্দ আছে, মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজি, ইমিউনোলজি, ভাইরোলজি আর জেনেটিক্স, এখনো নিশ্চিত নই কোনদিকে যেতে পারবো।
-আচ্ছা, মাইক্রোবায়োলজি থেকে এমন কিছু বলেন যেটা আমরা সাধারণ মানুষ জানিনা।
-আপনার শরীরে যতগুলো কোষ আছে, জীবাণু আছে তার দশগুণ।
-বলেন কী!
-আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই!
-মানে এগুলো কি জন্মের আগে থেকেই শরীরে থাকে?
-জ্বি না, মায়ের গর্ভে শিশু জীবাণুমুক্ত থাকে, তার শরীরে জীবাণুর সংক্রমণ শুরু হয় জন্মানোর সময় থেকে। সে তার প্রথম ন্যাচারাল ফ্লোরা (ন্যাচারাল ফ্লোরার ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম কিনা কে জানে! দিয়ে থাকলে অবশ্য আমাকে আরো আগেই ছেড়ে দেয়ার কথা!) পায় তার মায়ের শরীর থেকে, এগুলো সাধারণত ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া, ল্যাকটোব্যাসিলাস ক্রিসপেটাস  হবার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশি। তারপর আশেপাশের সবকিছু থেকেই জীবাণু তার শরীরে বাসা বাঁধতে থাকে। খাওয়ার সময় প্রথমবার তার পেটে জীবাণুরা পৌঁছায়...
-এগুলো ক্ষতিকর না!?
-(ব্যাকটেরিয়াকে ক্ষতিকর বলায় রেগে গেছিলাম বোধহয়! ততক্ষণে আমার আর মনে নেই যে আমি একটা ইন্টারভিউ দিচ্ছি) মোটেই না! বরং এই ব্যাকটেরিয়ারা না থাকলে শিশু বাঁচবে না। আসলে মাত্র ৫ ভাগ ব্যাকটেরিয়া মানুষের জন্য ক্ষতিকর। বাকি সবাই উপকারি। উপকারি জীবাণুদের ছাড়া আমরা কেউই বেঁচে থাকবো না। মানুষ ছাড়া জীবাণুরা টিকে থাকবে, কিন্তু জীবাণু ছাড়া মোটামুটি কোন প্রাণিই টিকে থাকবে না। যেমন ধরেন আপনার কোষ তৈরি যে প্রোটিন দিয়ে সেটার জন্য দরকার হয় নাইট্রোজেন, যেটা আপনি পান গাছ থেকে, আর গাছেরা পায় ব্যাকটেরিয়া থেকে। তারপরে যে অক্সিজেন ছাড়া আপনি দুমিনিটেই কুপোকাত হয়ে যাবেন সেই অক্সিজেন আপনাকে বেশিরভাগটাই দেয় সায়ানোব্যাকটেরিয়া আর সবুজ এলগি, তারপরে যেমন ধরেন আপনার ত্বকে যে জীবাণুরা বাস করে তারা আপনাকে বদ জীবাণুদের হাত থেকে বাঁচায়। তারপরে আপনার পেটে...
-আপনি তো দেখি ব্যাকটেরিয়াদের ফ্যান একজন..!
-জ্বি একটু আধটু...
-আচ্ছা দাঁড়ান আমি কথা বলে আসছি...

একটু পরে কীসব ফিসফাস সেরে এসে ভদ্র মেয়ে আমাকে বললেন, 'অক্টোবরের ৪ তারিখে ভিসা পাবেন, চলবে'? আমি বললাম, '৮ তারিখ আমার ওরিয়েন্টেশন, তার আগে হেলথ ইন্স্যুরেন্স আর কী কী জানি ফরমালিটি আছে, সেই হিসেবে আমার অন্তত দুয়েকদিন আগে যাওয়া দরকার। ৪ তারিখে ভিসা পেলে কেম্নেকী'!

সুতরাং আবার ফিসফাস...

ভদ্রমেয়ে এবার বললেন, 'আমাদের কিছু করার নেই! তিন সপ্তাহ সময় এমনিতেই আমাদের দরকার। ছুটিছাটা মিলিয়ে ৪ তারিখের আগে কিছুতেই সম্ভব না। আপনি ৪ তারিখে ভিসা নিয়ে সেদিনই রওনা দেন, ৫ তারিখ থেকে জরুরী কাজ সেরে ফেলবেন'। ব্যাপারটা যে কীরকম 'অসম্ভবের ছন্দেতে' হয়ে যায় সে ভদ্রমেয়েকে কে বোঝাবে! মিনমিন করে বললাম, 'ভিসা পাবো কি? ভিসা পাবো জানতে পারলে গোছগাছ করতে পারতাম...'। বললেন, 'সেটা তো বলা যায় না। তবে আপনার কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে, প্রস্তুতি নিতে থাকেন। টিকিটও কেটে ফেলেন। আশাকরি ভিসা হয়ে যাবে'। আমি বললাম, 'তথাস্তু'।

অতএব, আমি পেটভর্তি দুঃশ্চিন্তা নিয়ে ফিরে এলাম। তাপসী বলল, ভিসা পেয়ে যাবি। হাসিব বলল, একটা কারণ দেখা ভিসা না পাওয়ার! আমি বললাম, কারণ থাকলে তো আর চিন্তা করতাম না! তাই শুনে, রনি আর রবার্ট সবগুলো দাঁত বের করে বলল, তুই তো ভিসা পাবিনা! সবাই ভিসা পায়না! আমি বললাম, আমি ভিসা না পেলে তোগোরে সবার আগে খুন করমু...

এবং অন্য এক পৃথিবীর গল্পের মাঝে তাই থাকলো আমার দুঃশ্চিন্তা। আমার পরিবার। আমার বন্ধুরা। এবং একটা পুরোনো পৃথিবী। যে পৃথিবীর গল্প কখনো বলা হয়ে ওঠে না। যে পৃথিবীর গল্প বলতে গেলে যতটা নগ্ন হতে হয়, ততটা নগ্ন হয়ে নিজের সামনে দাঁড়ানো যায়না কখনো...

২টি মন্তব্য:

nibirrashed বলেছেন...

ধীরে সুস্থে বাকি কাহিনি গুলোও লিখে ফেলুন রতন্দা

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

বল্লাই যখন তখন আর না লিখে উপায় কী! :D