শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১০

অন্য পৃথিবীর গল্প (৩): ধন্যবাদ সময়

সময়টা ছিল এরকম, খানিকটা ভরসা পাচ্ছিলাম, খানিকটা পাচ্ছিলাম না। ভরসা না পাওয়ার রোগটা ছিল বলেই বোধহয় ভরসাহীনতার পাল্লাটাও ছিল ভারী। অথচ আমি বরাবরই চুড়ান্ত আশাবাদী মানুষ ছিলাম। অবশ্য সে পুরোনো জীবনের কথা, এ গল্প সেই জীবনের নয়, এই গল্প অন্য পৃথিবীর।

ভিসার ইন্টারভিউ দিয়ে আসার পরের দিনগুলোতে দুঃশ্চিন্তা খেলছিল মাথায়। আর সেই খেলাটাও হচ্ছিল কোন নিয়মকানুন রেফারি আম্পায়ার না মেনেই। কোন কাজ বিশেষ হচ্ছিল না।
স্থাবর যা কিছু প্রয়োজনিয় সেসব গোছগাছ করার দরকার ছিলো। দরকার ছিলো আরো অনেক কিছুই গুছিয়ে নেয়ার। কিন্তু সবখানেই একটা সন্দেহ কাজ করছিল, ভিসা পাব কিনা! সুতরাং কাউকে কিছুই জানাচ্ছিলাম না। কেনাকাটা গোছগাছেরও কিছু হচ্ছিলো না। মাঝখান দিয়ে সময় বেশ চুপিসারে সরে পড়ছিল। মনে আছে কেবল এর মাঝে একদিন শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে শীতের কাপড়গুলো কিনে এনেছিলাম।

ভিসা পাবার পূর্ণ নিশ্চয়তা ছিলো না। তারপরও একটা একটা দিন পার হচ্ছিল আর বিষন্নতার ধোঁয়াশা একটু একটু করে ঝাপসা করে দিচ্ছিল ভেতরটা।

গ্রামীন ক্যালেডোনিয়ান কলেজ অব নাসিং-এ পড়াতাম। অগাস্টের শুরুতে সেখানে নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে। আমার ক্লাস দেখলাম রুটিনে। আমি ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারকে বললাম আমি তো কতদিন আছি কোন ঠিক নেই। সেমিস্টার হয়তো শেষ করতে পারবো না। স্যার বললেন ক্লাস নিতে। বললেন সবকিছু ঠিকঠাক হলে যেন তাঁকে জানাই, আর এক্সট্রা ক্লাস নিয়ে সিলেবাস শেষ করে দেই। আমি তখন মহা বিপদে। নিশ্চিত কিছু জানিনা। ভিসা পেলে আমাকে দৌড়াতে হবে, আবার তাড়াতাড়ি বেশি বেশি ক্লাস নিয়ে যদি ভিসা না পাই তাহলে পুরো ব্যাপারটাই একটা হাস্যকর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে! সবকিছুর পরেও এক্সট্রা ক্লাস নিতে শুরু করলাম। প্রায়শই ক্লাস নিতে যাই আর বেরোনোর সময় রণ'দা কে একটা ফোন দেই। উনি গ্রামীনেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পাশের বিল্ডিঙেই ওনার অফিস। তাই ফোন দিয়ে এক সঙ্গে মিনিট পাঁচেক চা-আড্ডার আয়োজন হয়ে যায়। বাকি সময়টা ব্যস্ততার ভান করে কাটে। সন্ধ্যার কিছুটা সময় কাটে আড্ডায়।

সবকিছুর পরেও অবশ্য কিছু ব্যপার ঠিকঠাক করে নিতে হচ্ছিল। যেমন, জার্মানীতে আমার থাকার জায়গা ঠিক করা। আমি ভার্সিটিতে ভর্তির নিশ্চয়তা পেয়েছি অগাস্টে। আর ডর্মে রুমের জন্য আবেদন করতে হয় জুলাইয়ের মধ্যে। কী বিপদ! যেখানে যাবো, সেই ইয়েনাতে তখনো পরিচিত কারো খোঁজ পাইনি। মান্না ভাইকে জানালাম ব্যাপারটা। উনি লন্ডনে থাকেন। কেন জানি সব সময়েই আমার ওনাকে সব সমস্যার সমাধান দাতা বলে মনে হয়। আর কখনোই সেই মনে হওয়াটা ভুল হয় না। এবারো হলো না। উনি আমাকে ফোন নাম্বার আর ইমেইল এড্রেস দিলেন সুমিত ভাইয়ের। সুমিত ভাই জার্মানীতে থাকেন, তবে দূরে, ইয়েনাতে নয়। সুমিত ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাহায্য চাইলাম। আর ইন্টারনেটে যেখানে যতো ভাড়া বাসার হদিস পেলাম সবখানে মেসেজ পাঠিয়ে রাখলাম। সেসব ম্যাসেজের একটারও জবাব এলোনা। তবে সুমিত ভাই যোগাযোগ করতে বললেন তানভীর ভাইয়ের সঙ্গে। তানভীর ভাই ইয়েনাতেই থাকেন। পিএইচডি করছেন। ওনার আর আমার ভার্সিটিও একই। তানভীর ভাই বললেন, ইয়েনাতে মানুষ মোটে লাখ খানেক তার মধ্যে হাজার তিরিশেক শিক্ষার্থী। এই সময়ে থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব। তারপরও উনি খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন। এর মাঝে উনি আমাকে সাদ্দাম ভাইয়ের ইমেইল আর ফোন নাম্বার দিলেন। সাদ্দাম ভাই পড়েন মাইক্রোবায়োলজিতেই। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বললাম সবকিছু। উনি ভরসা দিলেন, বললেন, আরে আসো আসো, আগে আসো তারপর দেখা যাবে, এতো চিন্তা করোনা! আমি কিছুটা ভরসা পেলাম ঠিকই তবে চিন্তা থামাতে পারলাম না! পরে অবশ্য বুঝেছি, তানভীর ভাই আর সাদ্দাম ভাই না থাকলে আমি নিতান্তই জলে ভেসে যেতাম...।

কলেজে একদিন ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন টিকিট করেছ? আমি আমতা আমতা করতে থাকলাম। ভিসারই কোন ঠিক নেই, আর টিকিট! স্যার বললেন, আরে, বুকিং তো দিয়ে রাখতে হবে। তারপর ওনার গাড়িতে চেপে ওনার সঙ্গে গিয়ে টিকিটটাও বুকিং দিয়ে আসলাম একদিন। গাল্ফ এয়ারলাইন্সে। ৪ তারিখে আমার ভিসা পাওয়ার কথা। টিকিট বুক করলাম ৬ তারিখের। যেন সাত তারিখে পৌঁছে যাই আর ৮ তারিখে ভার্সিটিতে আমার এনরোলমেন্ট প্রোগ্রামে যোগ দিতে পারি।

এনরোলমেন্ট নিয়ে অবশ্য একটা আশংকা ছিল। কারণ ঠিকঠাক ৭ তারিখে পৌঁছে সব কাগজপত্র গুছিয়ে পরের দিন ভার্সিটিতে হাজির থাকতে পারবো কিনা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। ভার্সিটিতে তাই মেইল করলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, আমার ভিসা পেতে দেরি হবে, এনরোলমেন্ট কি আমি দেরিতে করতে পারব? জবাব পেলাম, এনরোলমেন্ট কিছুটা দেরিতে করতেই পারব কিন্তু আমার ক্লাস শুরু হবে ১৮ তারিখে। যে কোনভাবেই আমাকে তার আগে আসতে হবে। ভাবলাম, যাক! তাও কিছুটা সময় পাওয়া গেল। পাওয়া গেল সুযোগও। সেই সুযোগে প্লেনের টিকিটটা দুদিন পিছিয়ে দিলাম। বললাম ৮ তারিখে যাবো। মাঝখানের এই সময়টাতে কেবল এই ছিল আমার কাজ। কলেজের ক্লাসগুলো নিয়ে নেয়া। আমার ছাত্রীদেরকে ল্যাবের কিছু কাজ শেখানো। আর অপেক্ষা।

মা আর আব্বা গ্রাম থেকে ঢাকায় এলেন সম্ভবত সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখে। মান্না ভাই ইংল্যান্ড থেকে ঢাকায় এলেন তাদের দুদিন আগে। মা আর আব্বার সঙ্গে খুব বেশি কথা হলোনা। বলবার মতো কোন কথা ঠিক আমার কাছে ছিলনা সেসময়। রোজ বেরোতাম বাসায় ফিরতাম পুরোনো রুটিনে। দৈনন্দিন জীবনের খুব ব্যত্যয় ছিলনা। কেবল টের পাচ্ছিলাম কোথায় যেন একটা সুতো টান টান হয়ে আছে। এমনকি নিজের নিঃশ্বাসের বাতাসেও টের পাচ্ছিলাম সেই টান টান সুতোর কেঁপে ওঠা।

ইচ্ছে ছিল, ১ তারিখে কলেজে আমার বিষয়ের পরীক্ষাটা নিয়ে নেব। খাতাগুলো আমাকেই দেখতে হবে। সেজন্য হাতে দুদিন সময় থাকবে তাহলে। কিন্তু কলেজের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটা প্রয়োজনে সেটা সম্ভব হলোনা। পরীক্ষার দিন ঠিক হলো ৫ তারিখে। ঠিক তার আগের দিনে আমি গেলাম দূতাবাসে।

দূতাবাসে অপেক্ষা করতে কত যে বিরক্ত লাগত, সে বোঝাবার মতো নয়। রাস্তায় কতখানি কী যানজট থাকে না থাকে ভেবে আমি বেশ আগেই বাসা থেকে বের হয়েছিলাম । এবং সেদিন একেবারেই কোন যানজট ছিলনা। পৌঁছে গেছিলাম অনেকটা আগে। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু আমাকে সময় দেয়া ছিল দেড়টায়। সেই সময়ের আগে ভেতরে ঢুকে বসারও উপায় ছিলনা। দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে ভেতরেও ঢুকেও ছিল আরেক দীর্ঘ অপেক্ষার পালা। কখন আমার ডাক আসে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে সব দুঃসময়েরই শেষ থাকে। এবং তখন পরাজিত অতীতের দিকে তাকিয়ে খুব শ্লেষ ভরে হো হো করে হেসে ওঠা য়ায়। অথবা আমার মতো প্রতিশোধে নিরুৎসাহী মানুষ হলে ঠোঁটের কোনায় হাসি ধরে রেখে মনে মনে বলা যায়, কোন প্রয়োজন ছিলনা...

দূতাবাসের ওয়েটিং রুমে বসে বসে যখন ভাবতে শুরু করেছি যে আমার নামটা ভেতরে পৌঁছেনি অথবা তারা ভুলে গেছে অথবা তারা ঠিকই আমাকে ডেকেছে আমি শুনতে পাইনি। তারও অনেকটা সময় পরে আমার ডাক এলো। আমি দুরুদুরু বুকে ভেতরে গেলাম আমার পাসপোর্টটার চেহারা দেখার আশায়। কিন্তু দুঃসময়ের শেষ তখনো হয়নি। আমাকে বলা হলো। একটা সমস্যা আছে। কিছু সময় লাগবে। সব ঠিকঠাক থাকলে আশা করা যায় তিনদিন পর (৭ তারিখে) আমি আমার পাসপোর্ট ফেরত পাবো। আমার মনে হল, সময় আমার দিকে তাকিয়ে একটা চোখটিপি দিল। যেন বলতে চাইল, কী হে! কেমন মজা দেখালাম!

দুতাবাসের গেটে ফোন রেখে দেয়। যখন ফোন নিয়ে বেরিয়ে আসলাম তখন মান্না ভাই ফোন করলেন। বড়'পু ফোন করলো। হাসিব ফোন করলো। আমিও অনেককে ফোন করলাম। সবাইকে জানালাম কী হয়েছে। বিমানের টিকিটের বুকিং বাতিল করলাম। এবং অপেক্ষা করতে থাকলাম আবারো।

পরের দিন ছাত্রীদের পরীক্ষা নিলাম। খাতাগুলো দেখে ফেললাম তার পরের দুদিনে। এইসব দিনগুলোতে বেশ নিস্পৃহতা কাজ করছিলো নিজের ভেতরে। মনে হচ্ছিল, দূরছাই , যা হবার হবে!

এর মাঝে সাদ্দাম ভাই ইয়েনা থেকে ফোন করলেন। বললেন, আমার জন্য একটা রুম পাওয়া গেছে। ফার্নিশড। বাথরুম, রান্নাঘর আর বারান্দা আছে সংগে। আমি নিতে চাই কিনা। আমি একবাক্যে বললাম নিতে চাই ভাই। অবশ্যই নিতে চাই। যদিও তখনো আমি জানিনা আমি ভিসা পাচ্ছি কিনা। আমার আদতেও যাওয়া হচ্ছে কিনা ইয়েনাতে। অবশ্য তখনো দূরছাই যা হবার হবে ভাবটা রয়েই গেছে মনে। সবসময় মনে হয়, যেরকম সময় পার করে এসেছি তার চাইতে খারাপ কিছু আর কী হতে পারে!

কী হয়, কী হতে পারে সেটা দেখার জন্যেই দূতাবাসে গেলাম ৭ তারিখে। এবার অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা। অন্তত দূতাবাসের বাইরের রাস্তায় নয়। আগের দিনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে ইচ্ছে করেই দেরীতে গেছিলাম। দেড়টায় সময় দেয়া ছিল। তিনটা বাজতে মিনিট পাঁচেক আগে বোধহয় আমার ডাক এলো। ভেতরে গেলাম। পাসপোর্টটা ফেরত দিলেন ভিসা অফিসার। সঙ্গে ফেরত দিলেন আমার সব কাগজপত্র। আমার সব সার্টিফিকেট যেগুলো ভিসা ফর্মের সঙ্গে জমা দিয়েছিলাম।। বললেন, যেন চেক করে দেখি সব কাগজপত্র ঠিকঠাক ফেরত পেয়েছি কিনা। আমি অনেকটা স্থবির ভাবেই, মনে হল যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতেই ওয়েটিং রুমে ফিরলাম, এবং অনেক কষ্টে পাসপোর্টের পাতা ওল্টাতে থাকলাম একটা সম্ভাব্য ভিসার খোঁজে।

পাসপোর্টের পাতায় দেখলাম সময়ের সেই পুরোনো মুখ। এবারো তার মুখে মৃদু হাসি। সে বলতে চাইছে, আরে ব্যাটা এরকম কেন করিস! বেঈমানী করেছি নাকি কখনো? ভাবলাম, তা ঠিক। তুই তো আর আপাদমস্তক একটা যৌনাঙ্গ নস! নস নোংরা প্রজেস্টেরনের কুৎসিত থলি!

আর মনে মনে বললাম, ধন্যবাদ সময়।

৩টি মন্তব্য:

psychosaika বলেছেন...

সময়কে ধন্যবাদ দেবার মতো সময় একদিন আমারও আসবে! হয়তো...


সেই সময়ের অপেক্ষাতেই থাকি! :)

নামহীন বলেছেন...
এই মন্তব্যটি একটি ব্লগ প্রশাসক দ্বারা মুছে ফেলা হয়েছে।
অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

দিশা, অবশ্যই আসবে, তুমি বসে প্রতুলের একটা গান শুনতে থাকো, "ওঠো হে, দরজা-জানলা খুলে, সময়ের ঝুঁটিটা এইবেলা, শক্ত মুঠোয় ধরো...♫♪"