শনিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১০

বর্মধারী ব্যাকটেরিয়া এবং...

যুদ্ধে যাওয়ার সময় বর্ম পরার নিয়ম ছিল আগে। কারণ সবার জানা। তলোয়ার, বল্লম অথবা ওই রকমের অস্ত্র থেকে আত্মরক্ষা। এখন অবশ্য সড়কি-লাঠি নিয়ে সেই রকমের যুদ্ধ আর নেই। বদলে গেছে অস্ত্র শস্ত্রের ধরণ। সেই সঙ্গে বদলে গেছে বর্ম-ও। সিনেমায়-টিনেমায় দেখেছি বিষাক্ত গ্যাস থেকে বাঁচতে নাকে-মুখে বর্ম পরে আজকাল। বোমা বিশেষজ্ঞরা ভারী ভারী জোব্বা মার্কা বর্ম পরে বোমা খুঁজতে যায়। আরো কত রকমের বর্ম আছে সেটা কে বলবে! আমি অবশ্য সেই মানুষের বর্ম নিয়ে বকবক করতে চাইছিনা। বকবক করতে চাইছি বর্মধারী এক ব্যাকটেরিয়াকে নিয়ে।

ব্যাকটেরিয়াদের আত্মরক্ষার নানারকম উপায় আছে। যেসব ব্যাকটেরিয়ারা মানুষ অথবা অন্য প্রাণির রোগ বাধায় জীবদেহের বাইরের পরিবেশ তাদের কাছে সবসময় খুব সুবিধার নয়। মাটিতে উপরে থাকলে সেখানে রোদে পুড়তে হয়, পানিতে থাকলে ভিজে মরতে হয়, খাবার দাবার পাওয়া যায়না ঠিকমতো, তার উপরে বেশিরভাগ জায়গায় সবসময় কোন না কোন জীবাণু আস্তানা গেড়ে থাকে। উড়ে এসে সেসব জায়গায় জুড়েও বসা যায়না। এজন্য ব্যাকটেরিয়ারা বর্ম পরে থাকে। বর্ম আছে মূলত দুরকমের। একটা কিছুটা মানুষেরটার মতই। জামাকাপড়ের উপর শক্ত চামড়া অথবা ধাতুর আরেকটা জামার মতো। আরেকটা হচ্ছে ব্যাকটেরিয়াদের জন্য 'ইসপিশাল'। এটাকে বলে এন্ডোস্পোর। এটা ব্যাকটেরিয়ারা পরে পেটের ভেতর। আজকে কেবল এইটা নিয়েই বলতে চাই।
ব্যাকটেরিয়ারা (সব ব্যাকটেরিয়া নয়) এন্ডোস্পোর তৈরি করে প্রতিকূল পরিবেশে। নিজের পেটের মধ্যে তারা তাদের প্রয়োজনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থালাবাসন একটা পুটুলি করে বেশ শক্ত খোলস দিয়ে মুড়ে একেবারে সিলগালা করে দেয়। এখন যদি তাকে রোদে পোড়ানো হয়, তাপে সিদ্ধ করা হয়, রেডিয়েশনে ঝলসানো হয়, ঠান্ডায় জমানো হয়, না খাইয়ে রাখা হয়, ভয়ঙ্কর সব কেমিকেল দিয়ে গোসল দেয়া হয়, তাহলেও তার কিছু যায় আসবে না। ওই অবস্থায় সে হাজারখানেক বছর অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে শীতনিদ্রায়। এমনকি এরকম অবস্থায় এন্টিবায়োটিক দিয়েও ব্যাকটেরিয়াদের কিছু করা যাবেনা। এন্ডোস্পোর তাই ব্যাকটেরিয়ার একটা দারুণ আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এন্ডোস্পোরের একটামাত্র সমস্যা হচ্ছে এই অবস্থায় ব্যাকটেরিয়ারা বাচ্চা দিতে পারেনা। অবশ্য পারলেও আমার মনে হয়না এরকম প্রতিকূল পরিবেশে তারা সংসার পাততে চাইতো!
একটুখানি বলে নেই হাসি , এন্ডোস্পরের বড় একটা প্রয়োজন অন্যখানে। সেই ব্যপারটা বোঝার জন্য জানা দরকার, ব্যাকটেরিয়াদেরকে তাদের অক্সিজেন সহ্য ক্ষমতার উপর বিশেষভাবে ভাগ করা যায়। সব ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন সহ্য করতে পারেনা। কেউ কেউ অল্প একটুখানি অক্সিজেন সহ্য করতে পারে, কেউ কেউ মোটামুটি পারে আর কেউ কেউ একেবারেই পারেনা। এইসব ভাগের ব্যাকটেরিয়াদের নানারকম খটমট নাম আছে। এখন কেবল একটা জানলেই চলবে। স্ট্রিক্ট এনারোবিক। এই ভাগের ব্যাকটেরিয়ারা একেবারেই অক্সিজেন সহ্য করতে পারেনা। একটুখানি অক্সিজেনের কাছে আনলেই এরা পটল তোলে। এইরকম ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কম নয়। এদের মধ্য অনেকেই মানুষের ভয়ঙ্কর শত্রু। এইরকম ব্যাকটেরিয়া জীবদেহের বাইরের খোলা পরিবেশে এন্ডোস্পোর তৈরি করে বাঁচে। এন্ডোস্পোর তাদেরকে অক্সিজেনের মতো ভয়ঙ্কর বিষ থেকে বাঁচায়।
প্রকৃতিতে পাওয়া সবচাইতে ভয়ঙ্কর তিনটি বিষের মধ্যে দুটি বানায় যারা অক্সিজেন একেবারেই সহ্য করতে পারেনা সেইসব স্ট্রিক্ট এনারোবিক ব্যাকটেরিয়ারা। যে ব্যাকটেরিয়াটির কথা বলতে চাচ্ছি সেটা বিষ বানানোতে প্রথম দ্বিতীয় না হতে পারলেও একেবারে ফেলনা কেউ নয়। এদের নাম ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস। এরা মানুষ এবং গবাদিপশুর ভয়ঙ্কর এনথ্রাক্স রোগের জন্য দায়ী।
ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস দেখতে সরু লম্বাটে। এরা এন্ডোস্পোর বানায় তবে সেটা অক্সিজেন থেকে বাঁচার জন্য নয়। অক্সিজেনে এরা এমনিতেই বাঁচে। একবার এন্ডোস্পোর বানালে এরা সেইভাবে হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারে।
এনথ্রাক্সের এন্ডোস্পোর সাধারণত মাটিতে থাকে।
আর মাটিতে পড়ে থাকে বলে এরা ঘাস লতাপাতায় লেগে থাকতে পারে সহজেই।
আর গরু ছাগল অথবা এইরকম প্রাণিরা ভালো করে ধুয়ে ঘাস লতাপাতা খায়না।
আর তাই এসব প্রাণির পেটে পৌঁছে যেতেও এদের খুব একটা বেগ পেতে হয়না।
কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণির মুখে থাকে লাইসোজাইম নামের ছিদ্রকারক। লাইসোজাইম ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াদের চামড়া ফুটো করে দিয়ে মেরে ফেলে। আর তাছাড়া প্রাণির পেটে থাকে ভয়ঙ্কর এসিড! সেই এসিড গড়পড়তা ব্যাকটেরিয়াকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস ‌গড়পড়তা নয়। তার আছে এন্ডোস্পোরের মতো বর্ম। সে তাই সহজেই মুখের ড্রিলমেশিন আর পেটের এসিড থেকে বেঁচে যেতে পারে। এবং তারপর হিসেব অনুযায়ী পাকস্থলীজাত বর্জ্যের সঙ্গে তার বের হয় যাওয়ার কথা। সেই প্রাণীর শরীরে সংক্রমণ ঘটানোর কথা না। কিন্তু তারা সংক্রমণ ঘটায়।
কিভাবে সংক্রমণ ঘটায় সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা যায় না। এই বিষয়ক একটি প্রস্তাবনা আছে কেবল। সেটা হচ্ছে, গরুরা যা পায় তা প্রথমে গিলে ফেলে (সাধে কী আর গরু!)।
আর ঘাসের মতো সবজির চারপাশ ধারালো হয়।
আর সেই ধারালো অংশে তাদের পেটের ভেতরে হালকা ছড়ে-ছিঁড়ে যায় মাঝেমধ্যে।
আর সেই ছড়ে যাওয়া যায়গা দিয়ে ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস ঢুকে পড়ে শরীরে।
এরপর তাদের এনথ্রাক্স হয়। গরুর এনথ্রাক্স হলে মানুষেরও হতে পারে। কারণ, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, গরুসঙ্গে এনথ্রাক্স।
এনথ্রাক্স মূলত তিন ধরণের। ত্বকের এনথ্রাক্স, পাকস্থলির এনথ্রাক্স আর ফুসফুসের এনথ্রাক্স। এর মধ্যে আবার জটিলতা আছে। যেমন ধরেন, গোটা দশ থেকে পঞ্চাশটা এনথ্রাক্সের জীবাণু হলেই ত্বকের এনথ্রাক্স হতে পারে। ফুসফুসের এনথ্রাক্স এত অল্পতে হয়না। তার জন্য লাগে অন্তত দশহাজার এনথ্রাক্সের ব্যাকটেরিয়া। পাকস্থলীর এনথ্রাক্সের জন্য আবার প্রয়োজন হয় আড়াই থেকে দশলক্ষ জীবাণুর সংক্রমণ। সময়মত চিকিৎসা না হলে ত্বকের এনথ্রাক্স ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে ২০ ভাগ ক্ষেত্রে। পাকস্থলীতে ঘাঁটি গড়তে পারলে অবশ্য ব্যাকটেরিয়ারা এত কমে ছেড়ে দেয়না। পাকস্থলীর এনথ্রাক্সে মারা যায় ২৫ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত রোগী। তবে বিপদ সবচাইতে বেশি ফুসফুসের এনথ্রাক্সে। এই ক্ষেত্রে মৃত্যু মোটামুটি নিশ্চিত।
এনথ্রাক্সের জীবাণুরা খাওয়া দাওয়া এবং বাচ্চা দেয়া ছাড়া আর কিছু করেনা। সমস্যা হচ্ছে এই কাজটা তারা করে মানুষের শরীরে। এবং তাতেই বিপদটা বাধে। বাইরে থেকে ব্যাপারটা অবশ্য প্রথম দিকে সাধারণ দেখায়, ত্বকে সামান্য ফুসকুড়ির মতো হয়। তারপর সেখানে একেবারে কালো ক্যাটক্যাটে ঘা (ব্যতিক্রম আছে) হয়ে যায়। ভেতরের দিক থেকে ব্যাপারটা হয় অন্যরকম। ত্বকের একটুখানি ছেঁড়াফাটা দিয়ে যে জীবাণুরা ঢুকে পড়ে তারা সংসার করে বাচ্চা দিতে শুরু করে সেখানে। আর তাই দেখে আমাদের শরীরের রক্ষীবাহিনীর যারা গিলেখাদক (মানে যারা জীবাণু গিলে খায়) তারা ছানাপোনাসহ এনথ্রাক্স পরিবারকে সবংশে গিলে ফেলে। অনেকক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়। গিলেখাদকের পেটেই এইসব এনথ্রাক্স ছানাপোনারা পটল তোলে। কিন্তু যদি দুয়েকটি ফাটকাবাজি করে টিকে যায় তাহলে শুরু হয় আরেক মহাকাণ্ড। গিলেখাদকের পেটে করেই এরা পৌঁছে যায় লসিকাতন্ত্রে। লসিকাতন্ত্র হচ্ছে রক্তের মত তরল পরিবাহী শিরা-উপশিরার তন্ত্র। লসিকাতন্ত্রে গিয়ে এরা সেই গিলেখাদকের পেটে বসেই বাচ্চা দিতে থাকে। আমাদের মন্ত্রীসভায় যেভাবে রাজাকার ঢুকে পড়ে, সেভাবে।
শেষপর্যন্ত এনথ্রাক্সের ছানাপোনারা যখন সব ভেঙেচুরে বেরিয়ে রাজপথে নামে অর্থাৎ রক্তে মিশে যায় তখন আর বিশেষ কিছু করার থাকেনা শরীরের। শেষ সময়ে এন্টিবায়োটিক দিয়ে এদেরকে মারলেও রক্তে ছেড়ে দেয়া এদের বিষ ঠিকই ছাত্রশিবিরের মত নিশ্চিত সর্বনাশটি সম্পন্ন করে ছাড়ে।
পুনশ্চ: আজ (১১ই ডিসেম্বর) রবার্ট কঁকের জন্মদিন। ১৮৭৭ সালে এই জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী এনথ্রাক্সের জীবাণু ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস আবিষ্কার (সনাক্ত করেন এবং আলাদা করেন) করেন। যক্ষা আর কলেরার জীবাণুও তাঁরই আবিষ্কার। ১৯০৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া এই বিজ্ঞানীর মূল কৃতিত্ব অবশ্য অন্যখানে। এই মহামানব প্রথম রোগের কারণ হিসেবে জীবাণুর সক্রিয়তা প্রমাণ ('কঁক'স পস্টুলেটস' নামে বিখ্যাত) করেন। (তার সেই আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত কেবল খারাপ বাতাস আর ডাইনীর নজর লেগেই মানুষের রোগ হত)। বস্তুত তাঁর আবিষ্কারের পর থেকেই জেনে-বুঝে জীবাণুর বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ শুরু হয়। তখন থেকেই আমরা জানি, রোগের কারণ জীবাণু। জীবাণু মারলেই রোগমুক্তি।
কে বলবে গত সোয়া শতাব্দীতে এই মহান মানুষটির জন্য কত প্রাণ বেঁচেছে! কে বলবে আগামী সহস্র বছরে আরো কত বাঁচবে! হয়ত মানুষ জানবেও না তাঁর নাম। যেমন আজকে পেনিসিলিন নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরা লক্ষ মানুষের মধ্যে হয়তো একজনও জানেনা কার কাছে তার জীবনের ঋণ! অবশ্য তাতে সত্যিকারের এসব মানুষের কী-ই বা যায় আসে!
অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ঈশ্বরের চাইতেও মহান এই মানুষটির জন্য।

২০১০-১২-১১ শনিবার সচলায়তনে প্রকাশিত