শনিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১০

অন্য পৃথিবীর গল্প (৪): শেষ সব দিন...

শূন্যতার যে বোধটার মুখোমুখি হচ্ছিলাম না সেটা একটা অবশ ভাব হয়ে ঘিরে ছিল সবসময়। তাই অনেক প্রতীক্ষিত ভিসাটি পেয়ে উল্লসিত হবার চাইতে বেশি ব্যস্ত হতে চাইছিলাম কাজে। একটা সিএনজি চালিত অটোরিক্সা নিয়ে নিয়ে দূতাবাস থেকে ছুটছিলাম ট্রাভেল এজেন্সিতে। টিকিট করার জন্যে। আগে যে টিকিট বুকিং দেয়া ছিল সেটার তারিখ দু'বার পেছানোর পর শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে আমার সাড়াশব্দ না পেয়ে। যত দ্রুত সম্ভব টিকিট করার প্রয়োজন ছিল তাই। ঢাকা তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল। আমার ব্যস্ততা বুঝে যানজট কমে যায়নি সেদিন। ট্রাভেল এজেন্সিতে যখন পৌঁছেছি তখন বোধহয় সাড়ে পাঁচটা বাজে। একটা ফোন করে রেখেছিলাম রাস্তা থেকে। ভয়ে ভয়ে ছিলাম অফিস বন্ধ হয়ে যায় কিনা!
খুঁজে পেতে টিকিট পাওয়া গেল 'এয়ার ইন্ডিয়া'তে। দশ তারিখ। সন্ধ্যা ৭ টা ২০ মিনিটে আমার ফ্লাইট। সেটা মুম্বাই পৌঁছবে রাত সাড়ে দশটায়। ঘন্টা তিনেক আমাকে সেখানেই বসে থাকতে হবে। রাত ১.৩০ মিনিটে আবার রওনা হওয়া সেখান থেকে। সকাল সাড়ে পাঁচটায় (সময়টা সাড়ে ৬ টাও হতে পারে, বয়স হয়ে যাচ্ছে, সবকিছু ভুলে যাই :( ) ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছবার কথা।

টিকিট একেবারে কেটে নিয়ে আসার মতো টাকা পকেটে ছিল না। ডেবিট কার্ডে অবশ্য ছিল। চাইলেই টাকা উঠিয়ে নিয়ে টিকিট কেটে ফেলতে পারতাম। কিন্তু কেন জানি সেটা করতে ইচ্ছে হলনা। জানতাম কোন সমস্যা হলে টিকিট আবার পেছাতে হতে পারে। (খুব ভেতর থেকে কে জানি বলছিল সেই সমস্যাটা ইচ্ছে করেই তৈরি করতে, টিকিটটা পিছিয়ে দিতে দুয়েকদিন!) টিকিট বুকিং দিয়ে ফেরার পথে সেজ'পুর সঙ্গে কথা হল। আপুর সঙ্গে দেখা করলাম নিউমার্কেটে। ব্যাগ কেনার দরকার ছিল, কিনে নিয়ে আপু চলে গেল বাসায়। আমি শাহবাগে গেলাম সবার সঙ্গে দেখা করতে। কাজ ছিলো অগুণতি। কিন্তু প্রথমত সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দোকানপাট সব বন্ধ। আর তাছাড়া আমার অবশ ভাবটাও যাচ্ছিল না। শাহবাগ একটা সময়ে ছিল সবকিছু মাথা থেকে ছুঁড়ে ফেলে রিফ্রেশ হয়ে যাওয়ার জায়গা। শেষদিকে অবশ্য সেরকম ছিলনা। ২০১০'র প্রথমভাগ থেকে শাহবাগের সেই আবেদন উড়ে গিয়েছিল। যদিও যাওয়া হত নিয়মিতই। কখনো কখনো মনে হত শাহবাগে যাচ্ছি কেবল অভ্যাস বশত। ৭/৮ বছর প্রায় প্রতিটা সন্ধ্যা কেটেছে যেখানে, সেই মায়া সহজে কাটিয়ে ওঠার নয়। যদিও মায়া ছাড়তেই হয়। যে ছাড়তে চায়না তাকে সেটা শিখতে হয় মূল্য দিয়ে। আমার ব্যক্তিগত একটা হাইপোথেসিস আছে মায়া কাটানো আর এর মূল্য বিষয়ে। মায়া যতটা সেটা কাটাতেও ঠিক ততটাই মূল্য দিতে হয়!

শাহবাগে খুব বেশি সময় ছিলাম না। পুরোনো বন্ধুরা ছিল সেখানে। সবাই সেই চেনা ভঙ্গিতেই হাসিতে আর ঠাট্টায় উড়িয়ে দিচ্ছিল জাগতিক আর জগতের বাইরের কঠিন নরম সত্য মিথ্যা সব। আমিও গিয়ে সেই উল্লাসে দাঁড়ালাম। কেন জানি বোধ করছিলাম সবার সেই পরোয়া না করা তীব্র ভাবের আড়ালেও একটা ছায়া।

পরের দিন অভি ছিল সঙ্গে। তার পরদিনও ছিল। স্পষ্ট অনুভব করতে পারি সেই সময়ে সে না থাকলে আমি ভেঙে পড়ে যেতাম। এটা কিনতে হবে সেটা কিনতে হবে করে করেও আসলে কাজ এগোচ্ছিল না। একটা ভরসা ছিল, মা আর আপুরা নিশ্চয়ই কোন যাদুবলে সব গুছিয়ে আমাকে প্লেনে তুলে দেবে। কখনোই কোন কাজ ঠিক ঠিক করতে পারিনা আমি! মা আমার চরম একটা সর্বনাশ করেছেন। আমার জন্য তিনি আরো চার-চারটা মা জন্ম দিয়েছেন। তার ফলে তিনি একা যতটা পারতেন, তাঁরা পাঁচজনে মিলে তার পাঁচগুণ অলস, বেপরোয়া আর নিষ্কর্মা করে তুলেছেন আমাকে। আমার ভরসা ছিল এই যে, তাঁরা জানেন আমি কতটা অলস আর নিষ্কর্মা। তাঁরা জানেন আমি কখন সত্য আর কখন মিথ্যা। মনে পড়ে একটা সময়ে নিতান্ত বিব্রত হয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলাম (কতটা বোকা আর অবিশ্বাসী ছিলাম আমি!)। আর সেই নাজুক অবস্থায় পেয়ে সময় একহাত নিয়েছিল আমাকে। হ্যাঁচকা টানে নিয়ে গিয়েছিল মিথ্যার মত নোংরা আর মৃত্যুর মত অন্ধকার একটা কূপে। সেখান থেকেও আমাকে জীবনের আলোয় নিয়ে এসেছিলেন আমার মায়েরাই।

শেষ সময়গুলোতে তাই গোছগাছ-কেনাকাটার মতো প্রয়োজনিয় কাজগুলো আপু'রা করছিল। আর আমি অভি'তে নিয়ে (বস্তুত অভি আমাকে নিয়ে) ঘুরছিলাম নানা কাজের ছুতোয়।

শেষ মূহুর্তে যন্ত্রণা হয়ে ঘাড়ে চেপে বসল একটা কাগজ। দাপ্তরিক নামটা এখন মনে পড়ছে না। তবে সেটা থানা থেকে নিতে হয়। তাতে লেখা থাকে আমার চরিত্র ভালো (থানাওয়ালারা তো মিথ্যা কথা লিখবেই!) এবং আমি বিদেশ যেতে চাইলে তাতে দেশ ও জাতির কোন আপত্তি নেই। কেউ বলল ওটা সরকারি চাকুরে'দের লাগে, সবার লাগে না। কেউ বলল একেবারেই লাগবে না। মান্না ভাই বললেন তিনি ওরকম একটা কাগজ নিয়েছিলেন ঠিক কিন্তু কেউ দেখতে চায়নি কখনো। আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। যদি এয়ারপোর্টে চেয়ে বসে! ওই কাগজ নিতে হবে গ্রামের থানা থেকে। পাসপোর্ট দেখাতে হবে নাকি তাদেরকে। লোকজন ছিল, তারাই হয়তো থানায় বলে কয়ে একটা ব্যবস্থা করতে পারতেন (আমি সত্যিই চাইনা আমার দেশে এই রীতিটা থাকুক। আইন না মানতে পারার যোগ্যতা/ক্ষমতা কাউকে মহান করেনা)। বাড়ি যেতে ৮/৯ ঘন্টা লাগে। তাছাড়া শুক্র-শনি দুদিন বন্ধ। রবিবার আমি চলে যাচ্ছি। মা বললেন কোন ঝুঁকিতে যাবেন না তিনি। তিনি গ্রামে যাবেন। আমি, আপুরা আমরা সবাই দীর্ঘদিন ধরে শহুরে। বছরে দুয়েকবার গ্রামে যাই। মা ছাড়া আর কেউ গেলে কাজে ঝুঁকি থাকতে পারত। জানতাম ওনার শরীর ভালো না। এতটা পথ বাসে চড়ে গিয়ে ছোটাছুটি করে আবার ফিরে আসাটা ওনার জন্য সুখকর কিছু নয়। তবে মা ছিলেন মায়ের মতই। বেশি খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে, দেশে আমার শেষ সময়টুকুর বেশির ভাগটাই ওনার কাটবে আমার জন্য ছোটাছুটি করে। সবার সঙ্গে থাকতে পারবেন না।

মা সেই কাগজটি নিয়ে ফিরেছিলেন পরদিন। যদিও সেই কাগজটির কখনোই কোন প্রয়োজন হয়নি আমার। বয়ে বেড়ানোই সার হয়েছিল!

আট তারিখে বোধহয় (কী সর্বনাশ! আমার স্মরণশক্তি তো মারা গেছে!) সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমার অনেক কাজ পড়ে ছিল তাই ঘোরাঘুরি না করেও উপায় ছিল না। অভিকে সঙ্গে নিয়ে তাই এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ, নিউমার্কেট চষে ফিরছিলাম। শাহবাগের আড্ডা আর মাশ্রুমাড্ডার অনেকের সঙ্গে দেখাও করেছিলাম। আড্ডা দেয়ার মত বেশি সময় ছিলো না। সন্ধ্যার পর তন্ময়'দার কাছ থেকে তাঁর গানে বি-শা-ল কালেকশনটা নিয়ে বাসায় এসেছিলাম। সারাজীবন ধরে একটু একটু করে যা তিনি গুছিয়েছিলেন সেসব আমি নিয়ে এসেছিলাম এক ঝটকায়। সঙ্গে তাঁর শুভকামনা আর ভালোবাসাও নিয়ে এসেছিলাম আকাশ সমান।

পরের দিনও ছিলো গতানুগতিক। টিকিটটি কেটে নিয়ে এসেছিলাম একফাঁকে গিয়ে। কলেজে যেতে হয়েছিলো। পরীক্ষার খাতা দেখেছিলাম, সেগুলো দেবার জন্য। মনে আছে, অভি বসে বসে কম্পিউটারের কিছু কাজ করে দিচ্ছিল আমার, আর আমি বসে বসে খাতা দেখছিলাম তার আগেরদিন অনেক রাত পর্যন্ত। কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার বললেন পরের দিন অল্প সময়ের জন্য হলেও যেন কলেজে যাই। বিকেলের দিকে একঝলক বাসায় এসেছিলাম খাওয়ার জন্য। খাওয়াটা বাইরেই করা যেত, কিন্তু সেই সময়ে বাসায় একবেলা খাওয়াটাও ছিল অনেক বড় ব্যপার। সন্ধ্যায় শাহবাগের কঞ্চিপায় অনেকে ছিল। পাবলিক লাইব্রেরি চত্ত্বরে অনেকে ছিল। শাহবাগের মোল্লা'তেও অনেকে ছিল। আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে অনেকেই কেবল আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য সেদিন এসেছিল শাহবাগ এলাকায়। বিদায় নেয়া কখনোই সহজ নয়! বিদায়ের অনেক কঠিন অভিজ্ঞতার পরও কেন যেন ব্যাপারটা কখনোই একটুও সহজ হয়ে ওঠেনা! তারপরও ফিরছিলাম সবার শুভ কামনা নিয়ে। ফোনেও বিদায় জানিয়েছিলাম অনেকেকে। বন্ধুরা এসেছিল মোড় পর্যন্ত, আমাকে এগিয়ে দেবার জন্য। হাসিব এসেছিল সিএনজির দরোজা পর্যন্ত। শেষ মূহুর্তে কেন জানি সে বেশ দুর্বল হয়ে উঠেছিল! ভুলে গেছিল বোধহয়, আমাদের আবেগী হবার নিয়ম নেই!

অভি সেদিন আর আমার সঙ্গে ছিলনা। অনেক রাতে চলে গিয়েছিল তার বাসায়। আমিও ব্যাগ-বোচকা গুছিয়ে নিয়েছিলাম। বলা উচিত আমার ব্যাগ-বোচকা গোছানো হয়েছিল। কারণ ওই কাজে (বস্তুত কোন কাজেই!) আমি একটা কুটাও নাড়িনি। ব্যাগের ওজন নিয়ে নানা ঝামেলা ছিল। এমনিতে আমার টিকিটে অনুমতি ছিল হ্যান্ড লাগেজ বাদে ২০ কেজি সঙ্গে নেয়ার। ট্রাভেল এজেন্সিকে বলায় সেটা বেড়ে হয়েছিল ৪০ কেজি। নানা ঝামেলা করে শেষমেশ প্রায় তেতাল্লিশ কেজি হয়েছিল আমার দুই ব্যাগের ওজন। আরেকটু বাড়লেই সেটা আমার ওজনকে ছাড়িয়ে যেত। তারপর হয়তো ব্যাগের জন্য টিকিট কেটে আমি ওগুলোর সঙ্গে যেতে পারতাম।  সেটা অবশ্য শেষ পর্যন্ত হয়নি। অনেক কিছুই হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে না। যেমন, ভেবেছিলাম, এই ব্লগে চড়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছুব, সেটা হলোনা। হয়তো হবেনা 'না হওয়া' আরো অনেক কিছুর ফিরিস্তি দেয়াও। হৃদয়ের ডানা কেটে গেলেও অনেক কিছু হওয়ানোর ইচ্ছেরও ডানা কেটে পঙ্গু করে দিতে হয়। কেবল শালার হোমো সেপিয়েন্স থেকে মানুষ হয়ে ওঠার ইচ্ছেটা পঙ্গু করতে পারিনা। কেবল শালার মানুষ হবার মায়াটাকে ছাড়তে পারিনা কখনো।

নিজের ভেতর যে আমি চোখ রাঙিয়ে বসে থাকে আর ঠিক করে দেয় কখন কী করতে হবে, কী করা যাবে আর যাবেনা, সেই শালার স্বৈরতন্ত্রীকে কেবল বিদায় জানাতে পারিনা কখনো...

৪টি মন্তব্য:

Tanmoy Kairy বলেছেন...

হ রে ভাই, অনেক বৃষ্টি হইছিলো সেইদিন। অনেক বৃষ্টি। ভালো থাইকো ভাই। :)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

ভালো থাইকেন ভাই...

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

"সেই শালার স্বৈরতন্ত্রী"টাকে বিদায় জানাসনে কখনও। তাহলেই এক না একদিন হয়তো পুষিয়ে যাবে আজকের এত এত বিদায়! ভালো থাকিস ভাই। মায়ায় থাক্, আবেগে থাক‌্, না হ'লে ভালো থাকবি না। অথবা- মায়ায় থাক‌্, আবেগে থাক‌্, তবুও ভালো থাক‌্।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

বিদায় কি আর পুষিয়ে যায় কখনো ভাই... ভাল আছি। আর স্বৈরতন্ত্রী'কেও খেদাচ্ছি না কখনো। ওই ব্যাটা আমাকে মানুষ বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, দেখি...