শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১০

অন্য পৃথিবীর গল্প (৬): আলো-আঁধারির যাত্রা

যে বিমানে চড়ে মুম্বাই পর্যন্ত গিয়েছিলাম সেটি ছোট সাইজের একটা ভাড়া করা বিমান। এত অল্প সংখ্যক যাত্রীর জন্য বড় বিমান এনে পোষায় না, তাই বোধহয় ভাড়া করা ছোট বিমানের আয়োজন। বিমানটা লক্কড় ঝক্কড়! সিটগুলোও সুবিধার নয়। অবশ্য যাদুকর ডাইনীর ঝাড়ু'র পিঠে চড়ে যেতে হলেও 'যাবোনা' বলার উপায় ছিল না আমার। ওই বিমানটা বরং একটা যোগ্য কানামামা ছিল। কানামামা'র পিঠে চড়ে বসার পর বেশি দেরি হয়নি যাত্রা শুরু হতে। প্রথমে অবশ্য কিছুক্ষণ বেশ চিন্তা করছিলাম মামা চাকায় ভর দিয়ে যাবে নাকি ডানায় ভর দিয়ে! কারণ যাত্রা শুরুর পর অনাবশ্যক দীর্ঘক্ষণ সে চাকায় ভর দিয়েই চলছিল। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য ভূল ভেঙেছিল আমার। কানামামা শেষ মুহূর্তে আচমকা ঝেড়ে দৌড় দিয়ে একলাফে ডানায় ভর করেছিল।

বিমানে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু সেখানে কিছু দেখছিলাম না। বরং মাথার ভেতরে টুকরো টুকরো অতীতেরা আসছিল একের পর এক। মনে পড়ছিল ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ, মার্চ থেকে এপ্রিল, এপ্রিল থেকে মে, মে থেকে...। সে এক আলো আঁধারের খেলা যেন! যদিও আলো সেখানে সামান্যই!

ঢাকা থেকে মুম্বাই যাওযার পথে বিমানে যা খেতে দিয়েছিল তা আর বলার নয়! সে খাবার বিশ্রী, কুৎসিত এবং জঘন্য! বেশ খিদে ছিল পেটে বলে খাওয়ার একটা চেষ্টা চালিয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু পরমুহূর্তেই বুঝেছিলাম এ খাবার খেতে হলে আমাকে অন্তত মাসখানেকের ক্ষুধার্থ হতে হবে! ওই বিমানে অবশ্য খাবারের চাইতে আরো উপাদেয় ব্যপার ছিল। যেমন তার টিভিস্ক্রিন। গোটা বিমানে গোটাকয়েক স্ক্রিন সবার জন্য। ব্যক্তিগত স্ক্রিনের ব্যবস্থা নেই। আর তাই মাথার উপর ঝুলে থাকা সেই সব স্ক্রিনে বিমানবালারা যা দেখাচ্ছিল সেটা দেখা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না! প্রথমে নিয়মানুসারে সেখানে ছিল বিমান নিরাপত্তাজনিত নিয়মকানুন শিক্ষার মিনিট দশেকের ক্লাস! তারপরে সেখানে চলছিল একটা হিন্দী সিনেমা! তবে অবশ্যই শব্দহীন! একটু পরে দেখলাম বিমানবালারা ট্রে'তে করে হেডফোন ফেরি করছে, একটার দাম ১ ডলার! মনে ভাবলাম, হায়! হায়! আকাশে উড়েও ফেরিওয়ালাদের হাত থেকে নিস্তার নেই! এয়ার ইন্ডিয়াতে বিনোদনের এই পরাকাষ্ঠার মাঝেও অস্বীকার করার উপায় নেই, বিমানবালাদের একজনের সঙ্গে আমার বেশ চোখাচোখি হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা দেখা যাওয়ার সম্ভবনা দেখা যাচ্ছিল প্রায়! কিন্তু কে না জানে, এখানে লোকে শখের বশে ভালোবাসে, আর ওরা তো রীতিমত পয়সা পায়!

মুম্বাই এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছেছি তখন রাত দশটা। বাংলাদেশে অবশ্য সাড়ে দশটা বাজে। ওখানে আমার অপেক্ষা করতে হয়েছিল ঘন্টা তিনেকের মত। এই সময়ে চন্দ্রপতি শিবাজী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির (মুম্বাই এয়ারপোর্ট) একটা কোণা একচক্কর ঘুরে দেখে নিয়েছিলাম। এয়ারপোর্টটি বিশাল। উইকি'তে দেখলাম ঢাকা এয়ারপোর্ট মুম্বাই'র চাইতে ঢের বেশি জমির মালিক। কিন্তু সেই জমিতে কোন অবকাঠামো না থাকায় তাতে ঢাকা এয়ারপোর্টের বিশেষ উপকার হয়নি। বাড়েনি এর জৌলুস! জৌলুসের দিক থেকে মুম্বাই এয়ারপোর্ট ঢাকা এয়ারপোর্টের চাইতে পঞ্চাশ গুণ এগিয়ে আছে। অবকাঠামো আর আয়োজনের দিক দিয়েও। মুম্বাই এয়ারপোর্ট অবশ্য ঢাকার চাইতে শতগুণে বেশি যাত্রীর যাত্রাপথে পড়ে। সেই হিসেবে এর জৌলুস আর আয়োজন থাকারই কথা।

মুম্বাই এয়ারপোর্টে ভেবেছিলাম এক মগ কফি খাবো। কফির দাম জিজ্ঞেস করলাম, দোকানি বলল ২০ রুপী! আমি ভাবলাম কী আপদ! এখন আমি রুপী কোথায় পাই! জিজ্ঞেস করলাম, ইউরো চলবে? বলল, ইউরো দিলে ১ ইউরো দিতে হবে! ভাবলাম, ও হরি, ইউরো দিলে ৫ গুণ দাম! 'কী আর করা' ভেবে আমি অবশ্য সেই ইউরো দিয়েই কফি কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্য হতভাগা মুখ গোমড়া করে বসে ছিল! আমার কাছে তাই ভাংতি টাকা ছিলনা। আর ভাংতি ছিলনা বলেই বিপত্তিটা বাধল। আমি বললাম ভাংতি নেই। দোকানি বলল তাতে সমস্যা নেই, সে আমাকে ভাংতি দিতে পারবে কিন্তু কফির দাম রেখে ফিরতি যা দেবে সে ইউরোতে নয়, রুপীতে! আমি ভাবলাম সর্বনাশ! এতগুলো রুপী নিয়ে ইউরোপে গিয়ে আমি করব'টা কী! অগত্যা ফিরলাম যেদিকে দুটি মানি একচেঞ্জের দোকান দেখেছিলাম সেদিকে। বিপত্তি অবশ্য সেখানেও! মানি একচেঞ্জের দোকানি আমাকে ইউরো ভাঙিয়ে রুপি দিতে পারবে কিন্তু যত ইউরোই দেই সবটা রুপি হয় যাবে! অল্পকিছু রুপি নিয়ে বাকি মুদ্রা ইউরোতে নেয়ার কোন উপায় নেই! কফি লালসায় ক্ষ্যান্ত দিয়ে প্লেনের জন্য বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর বিশেষ কিছু করার ছিলনা! আর অন্য কিছু করার ছিলনা বলেই আমি সেই আলো আঁধারির অতীতে ডুবে অপেক্ষা করছিলাম আমার বিমানের জন্য।
মুম্বাই থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট আসার বিমানটা ছিল বড়সড় আর আধুনিক। সিনেমা টিনেমা দেখা যেত অথবা গান শোনা যেত ইচ্ছে করলে। কিন্তু কেন জানি ভাবনায় এক অদ্ভুত নেশা ধরা ভালোবাসা আছে আমার। আকাশ পাতাল অথবা আকাশ কুসুম যাই হোক বসে বসে ভাববার মত বিষয়ের আমার কোন অভাব হয়না কখনো! আর তাছাড়া সেসময় ভাবনার এক্সক্লুসিভ বিষয় হয়ে আমার সঙ্গে ছিল আমার 'আলো আঁধারির যাত্রা'। সুতরাং বসে বসে ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতেই সামনের স্ক্রিনটাতে খুঁচিয়ে দেখছিলাম মাঝে মধ্যে। দেখছিলাম বিমানের বাইরের ক্যামেরাগুলোতে কী দেখা যায়! খালি চোখে জানালা দিয়ে দেখলে কী দেখা যায়! নিকষ অন্ধকার ছিল বাইরে! বস্তুত কিছুই দেখছিলাম না। না ক্যামেরায়, না খালি চোখে! ভাবনায় অতীতের আলো আঁধারির যে যাত্রা ছিল, সেটাও ঠিকঠিক মিলে যাচ্ছিল সে সময়ের আমার বাস্তবের সেই যাত্রাপথের সঙ্গে! 

অন্ধকার আর আদিগন্ত শূন্যতার ভেতর দিয়ে আমি এগোচ্ছি! কোন উষ্ণতা নেই! পাতলা চাদরে খুব একটা উপকার হয়না। বরং সে আরো বেশি স্পষ্ট করে তোলে জমাট বরফের ধারালো স্বাদ! তীব্র আমার গতি। সেই গতি শূন্যতাকে আরো প্রকট করে তোলে চারধারে। অথচ আমি চোখ বন্ধ করে নিজেকে লুকোবার চেষ্টা করছি না। বরং সেই অন্ধকার আর শূন্যতার চোখে চোখ রেখে স্থবির হয়ে তাকিয়ে আছি। কারণ আমি জানি এই পথ আমার নিজের পছন্দের। আলো আঁধারির এই পথে আমি এসেছি একেবারেই নিজের ইচ্ছায়, এক নিমেষে ভেঙেচুরে অন্ধকারে হারানোর ঝুঁকিটাকে জেনে বুঝেই।

অবশ্য সেজন্য নিজেকে দোষ দেই না আমি। কারণ জানি, মানুষকে ঝুঁকি নিতেই হয়। চোখবন্ধ করে ভরসা রাখতেই হয় ভালোবাসায়...

কোন মন্তব্য নেই: