বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১০

অন্য পৃথিবীর গল্প (৭) : গন্তব্যে...

বিমানে দীর্ঘ যাত্রার শেষ দিকে একটুখানি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়। সে কতক্ষণের ঘুম জানিনা। বিমানে চড়ার আগে পর্যন্ত জমা থাকা সব ক্লান্তির ভার বোধহয় শরীর আর বইতে পারেনি শেষদিকে। ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছানোর সম্ভবত ঘন্টা দেড়েক আগে বিমানবালা ডেকে ওঠাল। জিজ্ঞেস করল ব্রেকফাস্ট করব কিনা। আমি ঘুমের ঘোরেই বললাম, তা করা যায় বটে। এবার বিমানবালা এক ভয়ঙ্কর কঠিন প্রশ্ন করে বসল! "Veg or non-veg, sir?" আচমকা আমি তখন অকুল পাথারে। স্পষ্ট বুঝতে পারছি সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে আমি তৃণভোজী নাকি মাংসাশী। কিন্তু দুটোরই ইংরেজি ভুলে গেছি। ভুলে গেছি মানে, ভেজ'রা মাংসাশী নাকি ননভেজ'রা মাংসাশী তা হিসেব করে বের করতে পারছি না! কী বিপদ! 'অমনিভোর' (omnivore) বললে কেমন হয়! নিশ্চিতভাবেই আমি হার্বিভোর (herbivore) নই!
এগুলো অবশ্য প্রচলিত ইংরেজি নয়। অন্তত বিজ্ঞান ক্লাসের বাইরে নয়! বিমানবালা কি বুঝতে পারবে! এতসব চিন্তা করতে করতে আমি একটি জটিল শব্দ উচ্চারণ করে বসলাম! কী ছিল সেই জটিল শব্দ কে বলবে! তবে সেটি যে অর্থবোধক কিছু ছিলনা তা নিশ্চিত। ভেজ, ননভেজ'র মাঝামাঝি একটা শব্দ হয়ে থাকবে! এবং অবশ্যম্ভাবী ভাবে, বিমানবালার মুখ থেকে আমার কাঙ্খিত শব্দটাই বেরোলো, 'সরি?' কী আশ্চর্য সেই একটি শব্দ জাদুমন্ত্রের মত কাজ করলো। আমি খুব সহজে তাকে আমার খাদ্যতালিকা জানানোর একটা উপায় পেয়ে গেলাম। বেশ একটা আন্তরিকতার হাসি দিয়ে বললাম, আমি মাংস খাই :)

তখন সবাই জেগে উঠেছে বিমানে। আলো জ্বলছে। সবার মধ্যেই একটা প্রস্তুতির ভাব। বিমান তার গন্তব্যের কাছাকাছি। অনেকের গন্তব্য বিমানের সঙ্গে মিলে যায়। অনেকের মেলেনা। বিমানের গন্তব্য তাদের কাছে আরেক গন্তব্যের শুরু কেবল। আমার কাছেও সেরকম। আমি হ্যান্ডব্যাগটা খুলে জ্যাকেটটা পিঠে চড়াই। তারপর নেমে আসি বিমানের সিঁড়ি ধরে। ভোর সাড়ে ৫ টার মত বাজে তখন। ফ্রাঙ্কফুর্টের মত এয়ারপোর্টেও ব্যস্ততা নেই। হাতেগোনা মানুষজন চোখে পড়ে। মিনিট কয়েক এদিক সেদিক হাঁটতে থাকি আমি। বুঝে নিতে চাই কোথায় কিভাবে যেতে হবে। তারপর গিয়ে দাঁড়াই ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে। পাসপোর্টটা বাড়িয়ে দেই। অফিসার আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কাগজটি দেখতে চান। আমি সেটি এগিয়ে দেই। কাগজটিতে নজর বুলিয়ে আমার পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেন তিনি সে। আমি সামনে এগোই। আমার ব্যাগগুলো কোথায় সেটি জিজ্ঞেস করে জেনে নেই একজন এয়ারপোর্ট কর্মীর কাছ থেকে।

আমার ব্যাগ দুটো মালিকের আশায় চক্কর দিচ্ছিল সারিতে। আমি ওগুলো উঠিয়ে নিয়ে পথের চিহ্ন ধরে ধরে এয়ারপোর্ট রেল স্টেশনের দিকে এগোতে থাকি। সবার আগে আমার লক্ষ্য একটা সিম কার্ড কেনা। যাতে আমি বাড়িতে ফোন করতে পারি। আর এখানে আমার বড় ভাইদেরকে জানাতে পারি আমার পৌঁছানোর খবর। আরেফিন, সাদ্দাম ভাই, অথবা তানভীর ভাই কেউ একজন আমাকে নিতে আসবেন। আমার ভার্সিটি থেকে অবশ্য আমাকে বলেছিল যেন জার্মানি পৌঁছানোর আগে তাদেরকে জানাই। কেউ একজন তাহলে আমাকে নিতে আসতে পারবে ভার্সিটি থেকে। ইয়েনা'তে সাদ্দাম ভাই আর তানভীর ভাইকে পেয়ে অবশ্য আমি ভার্সিটিকে আর কিছু জানাইনি আমার আসার ব্যপারে। পরিচিত কারো সঙ্গে যাওয়াটাই পছন্দ ছিল আমার। সাদ্দাম ভাইয়ের ল্যাব ছিল, তানভীর ভাই অফিসে ছিলেন আর আরেফিন  জার্মানীতে আমার মতই নতুন। সে আমার মাত্র মাসখানেক আগে এসেছে। কিছুই প্রায় চেনে না সে। সবকিছুর পরেও অবশ্য কেউ একজন আমাকে নিতে আসবে জানতাম। অবশ্য তার আগে আমাকে ইয়েনা ওয়েস্ট এ পৌঁছুতে হবে ট্রেনে চেপে। কীভাবে কী করতে হবে সাদ্দাম ভাই আমাকে আগেই বলে দিয়েছিলেন। সিম কেনা আর ট্রেনের পিঠে চড়া এই দুটি কাজ তাই আমার করার ছিল সেই সকালে। কিভাবে কী করতে হবে সেটা জানা থাকলেও ব্যাপারটা খুব সহজ ছিলনা আমার জন্য। জায়গাটা আমার কাছে একেবারেই নতুন আর বিশেষত আমি জার্মান বুঝিনা।

সবার আগে সিম কার্ডটা কেনার জন্য সারা এয়ারপোর্ট-স্টেশন চক্কর দিচ্ছিলাম আমি। জায়গাটা অনেক বড়। লাগেজের ট্রলি টেনে ওই বিশাল অঞ্চল ঘোরা খুব আরামদায়ক নয়। আমার অবশ্য কিছু করার ছিল না। "সাহায্য করতে চাই" লেখা ব্যাজ বুকে নিয়ে যেসব লোকেরা এয়ারপোর্টগুলোতে ঘুরে বেড়ায়, সেরকম একজনের কাছ থেকে জেনে নিলাম ফোনের দোকান টা কোথায়। অনেক ঘুরে ঘুরে সেখানে পৌঁছে দেখি এত সকালে সেই দোকান খোলেনি। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বাড়িতে একটা ফোন করার জরুরি দরকার ছিল। আরো জরুরি দরকার ছিল আমাকে যারা নিতে আসবেন তাদেরকে আমার পৌঁছানোর খবর জানানো। আমার কাছে যে ট্রেনের সময়সূচি ছিল সেটি বলছিল আমার হাতে সময় বেশি নেই। আমি তাই ট্রনের টিকিট কেটে ফেললাম। তারপর 'সিম কার্ড পরে দেখা যাবে' ভেবে রওনা দিলাম ট্রেনের উদ্দেশ্যে।

খুঁজে খুঁজে আমার প্লাটফর্মে পৌঁছাতে বেশ সময় লেগেছিল আমার। আমি যখন পৌঁছেছি তখন আমার ট্রেনের সময় হয়ে গেছে। প্লাটফর্মে একটা ট্রেন দাঁড়ানোও দেখলাম। ভাবছিলাম ট্রেনটা মাত্র এসেছে নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ দাঁড়াবে। ট্রেনটা অবশ্য সেরকম ভাবছিল না। আমি তার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই সেটি চলা শুরু করল। স্বয়ংক্রিয় দরজাগুলো তার আগেই বন্ধ হয় গেছে। আর আমার হাতে বিশাল সাইজের তিন তিনটা ব্যাগ। অবশ্য ব্যাগ না থাকলেও ফেরা ছাড়া আমার কোন উপায় ছিল না। ফিরে এসে আমি পরের ট্রেনটার সময় বুঝে নিলাম। আর সময় থাকতেই পৌঁছলাম গিয়ে প্লাটফর্মে। প্লাটফর্মে ট্রলি থেকে ব্যাগ নামিয়ে একেবারে প্রস্তুত হয়ে আমি বসেছি তখন আসলো আমার ট্রেন। আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আগের ট্রেনটা যেমন সিনেমায় দেখা ট্রেনগুলোর মত ছিল এই ট্রেনটা সেরকম না। এটা খুব ছোট একটা ট্রেন। এবং আমি বসে আছি প্লাটফর্মের একেবারে মাথায়। আমার জগদ্দল পাথরের মত ব্যাগগুলো নিয়ে ট্রেনটা যেখানে থেমেছে সেখানে পৌঁছতে আমার অন্তত মিনিট পাঁচেক সময় লাগবে। আমি অবশ্য হাল ছাড়লাম না। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে ট্রেনটা ধরার চেষ্টা করলাম। আমার আকুতি বুঝতে পেলে ট্রেনটা থেমে থাকত বলে আমি বিশ্বাস করি। আমার দুর্ভাগ্য ট্রেনগুলো ভালোবাসার মতই অন্ধ।

যথারীতি আবার ট্রেনের সময় দেখে নিয়ে বসে থাকলাম পরবর্তী ট্রেনের জন্য। এবার প্লাটফর্মের অন্য মাথায়। যেন ট্রেনের কেবল ইঞ্জিনটা থাকলেই আমি সেটিকে নাগালে পাই। কিন্তু সময় আমাকে অকৃত্রিম বন্ধু মনে করে। প্রেমিকাদের মত নোংরামি না করলেও আমার সঙ্গে মজা করতে সে কখনোই ছাড়ে না। এবার ট্রেনটা তাই এলোই না একেবারে। লাউডস্পিকারে কী জানি ঘোষণা শুনলাম। জার্মান বুঝিনা বলে কাউন্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নিতে হল। সেখানেই জানলাম এই ট্রেনটা আসছে না, আমাকে যেতে হবে পরের ট্রেনে। ততক্ষণে অবশ্য আমি বেশ বিরক্ত হয়ে গেছি। বার বার প্লাটফর্ম আর কাউন্টার করতে করতে বেশ ক্লান্তও। পরের ট্রেনেই আমাকে যেতে হবে এরকম টানটান ভাব ঝেড়ে ফেলে এবার তাই কিছুটা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরতে লাগলাম আমি। স্টেশনের মাঝে যেসব ছোট ছোট খাবারের দোকানগুলো থাকে সেগুলোর একটার দোকানীর নেইমট্যাগটা এসময় হঠাৎ আমার চোখে পড়ল আমার। তালুকদার। চেহারায় বাঙালি ভাব। জিজ্ঞাসা করলাম সে কোথা থেকে এসেছে। বলল বাংলাদেশ থেকে। দেশের একজন মানুষের দেখা পেলে এত অদ্ভুত অনুভুতি হয় আমি এর আগে জানতাম না। শুনলাম উনি তিরিশ বছরের মত ওখানে আছেন। আমি ওনার কাছ থেকে কিছু খাবার কিনলাম। আর একটা নোট ভাঙিয়ে খুচরো পয়সা নিলাম। সবশেষ তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় একটা সিম কিনতে পাব। উনি বললেন যে কোন দোকানেই পাওয়া যাওয়ার কথা। ওনার কথা শুনে আমি ঠিক পাশেই একটা পত্রিকার দোকান থেকে কিনে ফেললাম একটা সিম কার্ড। তারপর ওনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে ট্রেনের জন্য প্লাটফর্মের দিকে হাঁটা ধরলাম।

পরের ট্রেনটাতে ঠিকঠিক মত উঠতে পেরেছিলাম আমি। স্টেশনের একজন কর্মী না চাইতেই আমার ব্যাগগুলো উঠিয়ে দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। ট্রেনের ভেতরে কোথায় কী থাকে কিছু না জেনে যেখানে বসে পড়েছিলাম সেটা ট্রেনের ক্যান্টিন। ট্রেনটা ততক্ষণে ছুটতে শুরু করেছে। ওয়েটারকে বললাম একটা কোন জুস দিতে আমাকে। আর এক বোতল পানি।

জার্মানীর দূরপাল্লার ট্রেনগুলোর নাম 'আইস' (ICE : InterCityExpress) । প্রথম যাত্রাতেই আইস আমাকে মুগ্ধ করল তার গতি আর পরিপাটি অবয়ব দিয়ে। আমি তখন জানালার পাশে বসে আছি একটা গ্লাস হাতে। ট্রেন ছুটছে। চারিদিকে লোকালয় চোখে পড়ে কালেভদ্রে। মাঠ, পাহাড় আর গাছ। দৃষ্টিপথে এগুলোরই আধিপত্য বেশি। আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। ট্রেনটার গতি অসম্ভব রকমের বেশি। অথচ তাতে কী স্পষ্ট দৃঢ়তা। একরত্তি টলমলে ভাব নেই। ঝলমলে সূর্য তার দিনের যাত্রা শুরু করেছে। চারদিকে আলো আর আলো। নিজেকে 'অসংখ্য' বোধ করতে থাকি আমি। আমার মনে হতে থাকে এই যাত্রা কেবল আমাদের। এই সূর্য কেবল আমাদের জন্য উঠেছে। সেই সময়ের সেই বোধের সঙ্গে সঙ্গে স্মরণের তীব্র বিষগুলোও খুব অক্ষম হয়ে, মাথা নিচু করে ফিরে যাচ্ছিল আমার কাছ থেকে। স্বপ্নভঙ্গের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে আমি তখন। যে দুঃস্বপ্নেরা পোড়াতে পারত, সেগুলোও নিতান্ত অসহায় হয়ে আমার চোখের সামনে কুঁকড়ে গেছে। ততক্ষণে আমি জেনেছি কতটা নিকটে আমার গন্তব্য।

জেনেছি, হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন গন্তব্য নেই। সবার গন্তব্যই তার একান্ত হৃদয়...

৩টি মন্তব্য:

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

পড়তে পড়তে মজার আর সিরিয়াস মিলিয়ে বেশ অনেক কিছুই মনে জমছিলো মন-তব্যে কহতব্য হিসেবে। কিন্তু, যেভাবে শেষ করলি, বিষয়টাকে এতটা শকিং কেন যেন আশা করিনি এবারটায়! তাই অসম্ভব রকমের বেশি গতির একটা তড়িতাঘাত নিয়ে, আমি অন্য স্টেশনে যাচ্ছি। শুধু এটুকুই ভাষা পাচ্ছি- ঠিকমতো পৌঁছে যাস হৃদয়ের প্রতিটি যাত্রায়।

সবজান্তা বলেছেন...

হা হা... এতোবার ট্রেন মিস করার কাহিনী পইড়া হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হয়া গেসে... হা হা...

শেষের অংশটুকু বেশ ভালো লাগলো। কথাগুলি চমৎকার।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

ভাই, ... ... ...
জ্যোতি, ব্যাপারটা এখন মনে হইলে আমারো হাসি পায়। কিন্তু ওইদিন জানটা বের হয়ে গেছিল...