বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১১

রাসায়নিক প্রেমপত্র এবং শ্রমিক ব্যাকটেরিয়া

জার্মান দূতাবাসের ভিসা অফিসার আমার কাছে জানতে চেয়েছিল অণুজীব সম্পর্কে এমন কোন তথ্য যেটা সাধারণ মানুষ জানে না। একটু ছেলেমানুষি ধরণের প্রশ্ন বটে। আমিও ওনাকে ছেলেমানুষ ধরে নিয়েই উত্তরটা দিয়েছিলাম।

-আপনার শরীরে যতগুলো কোষ আছে, অণুজীব আছে তার কমবেশি দশগুণ!

-বলেন কি! এরা কোন ক্ষতি করে না? [আলোচনাটি তীব্রভাবে সংক্ষেপিত]

জীবাণুদের দিকে কেউ ট্যারা চোখে তাকালে কেন জানি আমার কলিজায় লাগে। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে যাই আর হড়বড় করে জ্ঞান কপ্‌চাতে থাকি! দূতাবাসে আমার সেই সাক্ষাৎকারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জীবাণুদের উপর দীর্ঘ একটা লেকচার ঝেড়ে দিয়েছিলাম। সেই লেকচারের একটা অংশ এখানে আরেকবার লিখছি।

জীবদেহ গঠন করে কোষ। আর কোষ তৈরির ইট হল প্রোটিন। প্রোটিন তৈরির মশলা হল এমাইনো এসিড। আর এমাইনো এসিড মাত্রেই নাইট্রোজেন থাকতেই হবে। সুতরাং ব্যাপারটা পরিষ্কার, নাইট্রোজেন নাই তো জীবন নাই।

প্রকৃতির কুদরতে পরিবেশে নাইট্রোজেনের অভাব নেই। বাতাসের প্রায় ৮০ ভাগ নাইট্রোজেন। কিন্তু প্রকৃতির ইয়ার্কিতে মানুষ-জীবজন্তু বা গাছেদের কেউই বাতাস থেকে নাইট্রোজেন নিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারেনা। কারণ বাতাসে নাইট্রোজেন জোড়া বেঁধে থাকে। আর দুটি নাইট্রোজেন অণুর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা সাংঘাতিক শক্ত। সেই শক্ত ভালোবাসা ত্যাগ করে তারা প্রাণীর উপকারে আসতে চায় না। জোড়া বেঁধে নির্বিবাদী হয়ে ঘুরে বেড়াতে চায়।
তাহলে প্রাণিকুল নাইট্রোজেন পায় কোথায়?

প্রাণিকুলের নাইট্রোজেন পাওয়ার বেশ কয়েকটি উপায় আছে। তার মধ্যে সবচাইতে কার্যকরি আর চমকপ্রদ উপায়টি হচ্ছে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে নাইট্রোজেন পাওয়া। এই ধরণের ব্যাকটেরিয়াকে বলে 'সিমবায়োটিক নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়া'। এই ব্যাকটেরিয়ারা বিশেষ কিছু গাছের সঙ্গে একটা চুক্তিতে আসতে পারে। চুক্তিটা হয় এরকম, ব্যাকটেরিয়া গাছকে দেবে নাইট্রোজেন আর গাছ ব্যাকটেরিয়াকে দেবে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য আর উপযুক্ত পরিবেশ।

ডাল জাতীয় গাছেরা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে এরকম ভালোবাসার চুক্তি করতে পারে। এসব গাছকে বলে 'লেগিউম'। লেগিউম গাছের শেকড় যখন মাটিতে বাড়তে থাকে তখন তা থেকে এক ধরণের রাসায়নিক বের হয়। যেটা মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়ারা বুঝতে পারে। এইসব ব্যাকটেরিয়াও গাছকে সংকেত দিতে পারে বিশেষ রাসায়নিক তৈরি করে। অনেকটা প্রেমপত্র চালাচালির মত। যাকে বলে একেবারে রাসায়নিক প্রেমপত্র।

গাছের প্রেমপত্র পেয়ে ব্যাকটেরিয়ারা যখন শেকড়ের কাছাকাছি পৌঁছায় তখন গাছ তার শেকড়কে ছাতার হাতলের মত বাঁকিয়ে একটা গুটুলি পাকিয়ে ফেলে। সেই গুটুলির মধ্যে থেকে যায় ব্যাকটেরিয়াগুলো। গুটুলিতে ঢুকে ব্যাকটেরিয়াগুলো গলি ঘুপচি ধরে শেকড়ের আরো ভেতরে চলে যায় আর বাচ্চা দিয়ে সংখ্যায় বাড়তে থাকে। এভাবে জ্ঞাতি গোষ্ঠী বাড়িয়ে একটু জাঁকিয়ে বসে তারা নজর দেয় বাতাসের নাইট্রোজেনের দিকে।

বাতাসে জোড়া বেঁধে থাকা নাইট্রোজেনগুলোকে গুটুলিতে থাকা ব্যাকটেরিয়ারা ধরে ধরে এক আলাদা করে ফেলে। আর তারপর সেই আলাদা করা নাইট্রোজেনের সঙ্গে আরো কিছু মৌল মিশিয়ে গাছের খাবার বানিয়ে দেয়। এই কাজে ব্যাকটেরিয়া ব্যাবহার করে 'নাইট্রোজিনেজ' নামের এক বিশেষ অস্ত্র। 'নাইট্রোজিনেজ' জাতিতে এনজাইম। হাতেগোনা কিছু ব্যাকটেরিয়া ছাড়া সৃষ্টিকুলে আর কারো এই অস্ত্র নেই। এই অস্ত্র দিয়ে একজোড়া নাইট্রোজেনকে ভেঙে ফেলতে ব্যাকটেরিয়ার প্রয়োজন হয় ১৬টি এটিপি (ATP: জীবদেহের জ্বালানি)। কিভাবে বোঝাব বুঝতে পারছি না, কেবল বলে রাখি ১৬টি এটিপি মানে বেশ দস্তুরমত শক্তি।

ব্যাকটেরিয়ার যে নাইট্রোজেন ভাঙার অস্ত্র নাইট্রোজিনেজ, এটির আবার মস্ত একটা দুর্বলতা আছে। বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে এগুলো অকেজো হয়ে যায়। তাই শেকড়ের যেসব গুটুলিতে এসব ব্যাকটেরিয়ারা থাকে, গাছেরা সেখানে তৈরি রাখে 'লেগহিমোগ্লোবিন' নামের এক বিশেষ চুম্বক। এই চুম্বক বাতাসের অক্সিজেনকে আটকে ধরে রাখে যাতে অক্সিজেন ব্যাকটেরিয়ার নাইট্রোজিনেজের কোন ক্ষতি করে ফেলতে না পারে। এরকম উপযুক্ত পরিবেশ আর দুবেলা গাছের দেয়া ডালভাত পেয়ে ব্যাকটেরিয়ারা একেবারে জানপ্রাণ দিয়ে নাইট্রোজেন বানাতে লেগে পড়ে। এভাবে ব্যাকটেরিয়ারা গাছকে দেয় নাইট্রোজেন। আর গাছ থেকে নাইট্রোজেন পায় সারা প্রাণিকুল।

কেউ যদি একটা বাড়ন্ত ডাল গাছ উপড়ে ফেলে তাহলে তার শেকড়ে দেখতে পাবে ছোট ছোট পুটুলি। সেই পুটুলি কোন সাধারণ বাজারের থলি নয়। ওগুলো আসলে প্রাণিকুলের প্রোটিনের কারখানা। সেখানে ব্যাকটেরিয়ারা দিনরাত খেটে চলেছে সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখতে। যেসব শ্রমিক ব্যাকটেরিয়ারা ওইসব কারখানায় খাটছে, ভালো শ্রমিক হওয়ার জন্যে ওদেরকে শারিরিক ভাবে বদলে যেতে হয়েছে। সেই বদল কেবল একমুখী বদল। ওরা কখনোই আর আগের অবস্থায় কখনোই ফেরত যেতে পারবে না। গাছটির আয়ু ফুরালে ব্যাকটেরিয়ারাও মরে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।

প্রকৃতিতে এরকম শ্রমিক ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কম নয়। এদের সংখ্যার তুলনায় চোর-ছ্যাঁচড় ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। মানুষের শরীরে যে তার কোষের চাইতে দশগুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে তারাও আদতে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। এরা না থাকলে মানুষ জন্মের পরেই মরে ভুত হয়ে যেত। দুয়েকটা দুশ্চরিত্র জীবাণুর জন্যে এরকম উপকারি হাজারো জীবাণুর দিকে যখন কেউ ট্যারা চোখে তাকায় তখন রেগে না গিয়ে উপায় থাকে বলুন?

২৬ জানুয়ারি ২০১১ সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: