মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১১

অন্য পৃথিবীর গল্প (৮): আমার পৃথিবী

এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেনের ভ্রমন ছিল ঘন্টা তিনেকের। ইয়েনা ওয়েস্টে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সাদ্দাম ভাই। তাঁকে দেখার পর বেশ নির্ভার লাগছিল। ট্রেন থেকে নেমে উঠেছিলাম ইয়েনার ট্রামে। ট্রামগুলো চমৎকার। ট্রামে খুব বেশি সময় লাগেনি আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে। শ্লেগেলস্ট্রাসে, আমার ঠিকানা। পরিপাটি চমৎকার রাস্তা ধরে সরাসরি গিয়েছিলাম সাদ্দাম ভাইয়ের ডর্মে। সেখানে খেলাম, সাদ্দাম ভাইকে জানালাম যাত্রার বিস্তারিত। তানভীর ভাই আর আরেফিন আসল সন্ধ্যায়। তাদের সঙ্গে কথা বললাম। রাতে সাদ্দাম ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিলাম কোথায় কিভাবে যেতে হবে। ওনার সারাদিন ল্যাবে সময় দিতে হয়, অথচ আমার প্রয়োজনিয় কাজ ছিল। তাই তানভীর ভাই বললেন উনিই পরদিন অফিস ফাঁকি দিয়ে আমাকে সাহায্য করবেন।

পরদিন অনেক সকালে সাদ্দাম ভাই বের হয়ে গেলেন। আমি বেরোলাম বোধহয় সকাল দশটার দিকে। ৫ নাম্বার ট্রাম টা শ্লেগেলস্ট্রাসে থেকে ভার্সিটিতে যায়। আমি তাতেই চেপে বসলাম। তবে কেবল চেপে বসলেই হয় না। টিকেট কাটা দরকার। টিকেটের মেশিন থাকে রাস্তার পাশে। ট্রামেও থাকে। কিন্তু কিভাবে টিকেট কাটতে হয় জানিনা। জার্মান ভাষায় সব নির্দেশনা দেয়া। কী বিপদ! উপায়ান্তর না দেখে টিকিটের বাক্সের দিকে শকুনের দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে বসে থাকলাম। পরের স্টেশনে যারা উঠলো তাদের মধ্যে কেউ কেউ টিকেট কাটল। তাদেরটা দেখে এবার নিজে চেষ্টা চালালাম। কত দূরে যাব প্রথমে সেটা ঠিক করে বোতামে চাপ দিতে হবে। কী বিপদ! আমি কীভাবে জানব কত দূরে যাচ্ছি! উপায়ান্তর না দেখে একটা ধারণা করার চেষ্টা করলাম। ট্রামে চেপে আমার ভার্সিটিতে যেতে লাগে ১৭ মিনিট। এই ১৭ মিনিট ট্রামে চড়ার হাদিয়া ১.৭ ইউরোর বেশি হওয়ার কথা না। আমি ঝুঁকি না নিয়ে ২.৩০ ইউরোর বোতামে চাপ দিয়ে মেশিনের হা করা মুখের ভেতরে পয়সা ফেললাম। মেশিন সেসব গিলে ফেলে আমাকে বাড়তি পয়সা ফেরত দিল। আর দিল একটা টিকেট। আমি সেটিকে পতাকার মত ধরে রেখে পুষ্পের হাসি হাসলাম। আমি অবশ্য তখনো জানিনা যে টিকেট কাটলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ট্রামে কতকগুলো হা করা বাক্স আছে। টিকেট নিয়ে সেসব বাক্সের কোন একটির মুখে ঢুকিয়ে তারিখ আর সময়ের ছাপ দিয়ে নিতে হয়। তারপর কেবল সেই টিকেটখানা তার আপন ক্ষমতাবলে যাত্রীকে জরিমানার হাত থেকে বাঁচাতে পারে! আমার সৌভাগ্য, সেই ট্রামে কোন চেকার ওঠেনি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অফিস সারাদিন খোলা থাকে। কিন্তু ভিজিটিং আওয়ার বাঁধা ধরা। আমি গিয়ে ভিজিটিং টিকেট নিয়ে কথা বললাম। জানালাম, ওরিয়েন্টেশনে আসতে পারিনি ভিসা পেতে দেরি হয়েছে বলে। আমার পাঠানো ইমেইলটার কথা মনে করিয়ে দিলাম। আমাকে দুদিন পরের তারিখ দেয়া হল। আমি দুদিন ঘুমিয়ে টুমিয়ে তরতাজা হয়ে ইন্টারন্যাশনাল অফিসে গেলাম নির্দিষ্ট সেই তারিখে। জানলাম আমি একাই হতভাগা নই। আমার মত আরো অনেকেই দেরিতে এসেছে।

সেদিন একটা ছোটখাটো ওরিয়েন্টেশনের ব্যাবস্থা ছিল আমাদের জন্য। আমাদেরকে একটা বই দেয়া হল। কবে কোথায় কী করতে হবে সেসব খুঁটিনাটি লেখা তাতে। নতুন দেশে, নতুন শহরে নানা নিয়ম কানুন। সেসব তাতে লেখা। কবে কোথায় কীভাবে ব্যাংক একাউন্ট করতে হবে, সিটি রেজিস্ট্রেশন কোথায়, কোথায় লাইব্রেরি, কোথায় ভিসা অফিস, হেল্থ ইন্স্যুরেন্স কোথায় এরকম সব তথ্য সেখানে দেয়া। কেবল বইটাই নয়, আরো বেশ কিছু উপহার পেলাম ভার্সিটি থেকে। এবং অবশ্যই, পেলাম আমার অস্থায়ী 'থসকা'। যে ক'দিন স্থায়ী 'থসকা' না পাচ্ছি সে ক'দিন অস্থায়ী'টা দিয়েই চালাতে হবে। 'থসকা' এখানকার স্টুডেন্ট আইডেন্টিটি কার্ড। অবশ্য পরিচয় দেয়া ছাড়াও থসকার আছে নানাবিধ মাহাত্ম্য। অনেকটা যাদুর কাঠির মত।

জার্মানিতে সবক্ষেত্রেই স্টুডেন্টরা অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। সব রকমের সব সুযোগ সুবিধার চাবি থসকা। এই যাদুর কাঠি থাকলে বাস, ট্রাম অথবা ট্রেনে ভাড়া দিতে হয় না। এটা দিয়ে ক্যান্টিনগুলোতে প্রায় এক তৃতীয়াংশ দামে খাবার পাওয়া যায়। ফটোকপি মেশিন অথবা প্রিন্টার ব্যাবহার করতে গেলে এই কার্ড দিয়ে মেশিন চালু করতে হয়। ভার্সিটির সবখানে এই যাদুর কাঠিটিকে পোস্টপেইড ক্রেডিট কার্ড হিসেবে ব্যাবহার করা যায়। লাইব্রেরি থেকে বই নিতে গেলে এই কার্ডটি দিয়ে কম্পিউটারকে জানান দিতে হয় কে বই নিলো! ক্যান্টিনের ক্যাশ কাউন্টারের মেশিনগুলো ব্যাংক কার্ড না পড়তে পারলেও থসকা ঠিকই পড়তে পারে। মানিব্যাগের ভেতরে থাকলেও থসকা থেকে সে ঠিক ঠিক খাবারের দাম নিয়ে নিতে ভুল করে না। এরকম অসংখ্য মাহাত্ম্য আমাদের এই যাদুর কাঠির। :)

১১ তারিখ আমি জার্মানি পৌঁছেছি। ১৮ তারিখে আমার ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। ক্লাস অবশ্য সেদিন শুরু হয়নি। ডিপার্টমেন্টের হালহকিকত আর কবে-কখন-কী হবে তা জানিয়ে একটা মিটিংয়ের মত হয়েছিল। সেখানে প্রথম সেমিস্টারের আমার তিনজন প্রফেসরের মধ্যে দু'জন ছিলেন। প্রফেসর ডিকার্ট আর প্রফেসর কোথে। ছিলেন না প্রফেসর ভোস্টেমায়ার। আমার ক্লাস শুরু হয়েছিল ২২ তারিখ থেকে। ২৫ তারিখ থেকে ল্যাব।

স্টুডেন্টদেরকে দুইটা ব্লকে ভাগ করে ল্যাব শুরু হয়েছিল আমাদের। আমাদের ব্লকের আমরা ১৪ জন প্রফেসর ডিকার্টের ল্যাব দিয়ে শুরু করেছিলাম। ইয়েনা শহরের বাইরের দিকে পড়েছে ল্যাবটা। বিশাল একটা বিল্ডিং। আমি যদিও প্রায়ই সুযোগ পেলে সারা বিল্ডিংয়ে চক্কর কাটতাম তারপরও সেই ল্যাবের একটা ছোট অংশই আমি দেখেছি। আমাদের ল্যাব এডভাইজর ছিল ড. সান্দ্রা নামের চমৎকার একটি মেয়ে। সে তার পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করছে সেখানে। আমাদেরকে সাহায্য করত সবসময় হাসিমুখের একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান। ইফোন। সান্দ্রা আর ইফোন আমাদের সঙ্গে ছিল ল্যাব কোর্সের অর্ধেকটা সময়। বাকি অর্ধেক সময়ে এডভাইজর ছিল ড. টর্স্টেন। সেও পোস্ট ডক্টরাল স্টুডেন্ট। পেগি নামের একটি মেয়ে ছিল আমাদের ল্যাব টেকনিশিয়ান। ল্যাবে প্রায়শই খুব অবাক হয়ে আমি ল্যাবের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বিশেষত ড. সান্দ্রা আর ড. টর্স্টেনের দিকে। এক অল্প তাদের বয়স! অথচ পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করছে! তাও এরকম বড় একটা ল্যাবে!!!

সান্দ্রা আর টর্স্টেনের মত অনেকেই কাজ গবেষণা করছে ফ্রেডরিশ শিলার ইউনিভার্সিটিতে। দেখলে তাদেরকে খুব সাধারণই মনে হয়। অথচ সারা দুনিয়ায় এদের মত অল্পকিছু হাতেগোনা ছেলেমেয়ের সফলতার উপর নির্ভর করে পুরো মানব জাতির ভবিষ্যৎ। এদের উপর নির্ভর করে ঘরে ঘরে মূর্খরা যেসব এক্সডিআর (XDR) জীবাণু বানাচ্ছে রোজ, সেগুলোর হাতে মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কি যাবেনা! এদের উপর নির্ভর করে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতি মুহূর্তের যুদ্ধে মানুষ টিকে থাকবে কি থাকবে না!

টর্স্টেন আর সান্দ্রার মত মানুষের কথা, আমার শহরের কথা, ভার্সিটির কথা, প্রফেসরদের কথা, ল্যাবের কথা, বন্ধুদের কথা, সবার কথা আলাদা আলাদা করে বলার মত। এরা সবাই, এই সব কিছু আমার পৃথিবীটাকে তৈরি করে। একটা ব্লগে আমার এই পৃথিবীর কথা বলে শেষ করার নয়। অবশ্য সেসব আমি এখানে বলতে চাইওনি। এখানে বলতে চেয়েছিলাম একটা পথের কথা। যে পথটি এসে আমার সত্যিকারের পৃথিবীতে মিশেছে। যে পৃথিবীর একটা কণাও নোংরা অন্ধকারের আর কুৎসিত মিথ্যের নয়। যে পৃথিবী আমাকে বাঁচিয়ে রাখে ভালোবাসায়। যে পৃথিবীর জন্য আমি বাঁচি...

৫টি মন্তব্য:

অন্দ্রিলা বলেছেন...

জার্মানি যামু। 'থসকা' নিয়া ঘুরমু। আমাদেরকে টিকিট পাঠাউ। লেখা ভালু ভালু। তুমি তো দেখি অনেক গুণের ছেলে।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

ভিসার ব্যবস্থা করো, টিকিট নিয়া চিন্তা কইরো না।:)

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

হুম্। বেঁচে থাক সফলকাম আর পরিষ্কারভাবে।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

বড়ভাইয়ের আদেশ শিরোধার্য :)

নামহীন বলেছেন...

যে পথটি এসে আমার সত্যিকারের পৃথিবীতে মিশেছে। যে পৃথিবীর একটা কণাও নোংরা অন্ধকারের আর কুৎসিত মিথ্যের নয়। যে পৃথিবী আমাকে বাঁচিয়ে রাখে ভালোবাসায়। যে পৃথিবীর জন্য আমি বাঁচি...