বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১১

রক্তে ঘৃণার বিষ: আইখমান

আইখমানের সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছু জানিনা। এই সময়ে কোনকিছু সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া অবশ্য কঠিন কিছু নয়। চাইলেই যে কোন কিছু অথবা যে কারো ইতিহাস জেনে ফেলা যায়। এমনকি হাজার মাইল দূরে থেকেও জেনে নেয়া যায় কার ছাদের টবে আজ কী ফুল ফুটেছে! আইখমানের সম্পর্কে আমি বেশি কিছু জানিনা কারণ আমি সেই চেষ্টা করিনি। জানার চেষ্টা করিনি আমি ভীতু বলে। নৃসংশতা, সে দীর্ঘ অতীতের হলেও আমার দেখতে/জানতে ভয় লাগে। অবশ্য আইখমানের কর্মকান্ড বেশিরভাগই মানুষের অগোচরে রয়ে গেছে। আমি চাইলেও তার খুববেশি কখনোই জানতে পারব না। সে সময়কার দলিল দস্তাবেজ সবই নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। অল্প যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা থেকেই মানুষ সৃষ্টির নৃশংসতম প্রাণি আইখমানের কর্মকান্ড সম্পর্কে জানে। আর জানে লক্ষ প্রাণের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া থেকে। কারণ, মৃত্যু কখনো মুছে যায় না। কিছু যন্ত্রণা হাজার বছরেও অমলিন থেকে যায়।

আইখমানের জন্ম মার্চের ১৯, ১৯০৬ এ। জার্মানিতে। তার মায়ের নামটি নিতে চাইনা। নিজ গর্ভে এরকম শ্বাপদের জন্ম হবে নিশ্চয়ই তিনি ভাবেন নি। বেচারী মরে বেঁচেছিল আইখমানের বালক বেলাতেই। বেঁচে থেকে সন্তানের কীর্তি দেখলে নিশ্চয়ই তিনি আগুনে পুড়ে মরতে চাইতেন। আইখমানের বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। ব্যবসাও করেছেন জীবনে। তার নামটিও সঙ্গত কারণেই নিচ্ছি না।

১৯১৪ তে আইখমানের পরিবার অস্ট্রিয়াতে চলে যায়। আইখমান স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ঠিক, কিন্তু সে গন্ডি পেরোয়নি। আমার দৃষ্টিতে অবশ্য সেটা খুব ভালো হয়েছিল। শিক্ষা অপাত্রে যত কম যায় ততো ভালো। পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে আইখমান মেকানিক হবার একটা প্রাথমিক চেষ্টা চালালেও সেটিতে সে ব্যর্থ হয়। ১৭ বছর বয়সে সে তার বাবার মাইনিং কোম্পানিতে কাজ শুরু করে। তারপর ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার পেশা ছিল তেল কম্পানির চাকরি। ১৯৩৫ এর মার্চে বিয়ে করে আইখমান। তাদের চারটি ছেলে হয়। আইখমানের স্ত্রী অথবা সন্তানদের কারো নামই এখানে নিচ্ছি না। যদিও তার স্ত্রী ঘৃণার ভাগ কিছু কম পায় না। আইখমানের সব নৃশংসতার পরেও সে তার সঙ্গে ছিল। তার বড় ছেলেটির বিরুদ্ধেও বাবার হত্যাযজ্ঞ গর্বভরে প্রচার করার অভিযোগ রয়েছে!

আইখমান: দেখতে মানুষের মতই [ছবি: উইকিপিডিয়া]
নাজি পার্টিতে যোগ দেয়ার আইখমানের আবেদন গৃহীত হয় ১৯৩৩ সালে। সেসময় থেকেই বস্তুত তার নিজস্ব প্রাণি সত্বার বিকাশ শুরু হয়। ডাশাও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্টাফ থেকে তার শুরু। ডাশাও ছিল নাজিদের প্রথম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। নৃশংসতায় জন্মগত দক্ষতা থাকায় আইখমানের উন্নতি হতে সময় বেশি লাগেনি। সারা ইউরোপ থেকে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলার যে মিশন (Final Solution to the Jewish Question) ছিল নাজিদের, সেই অপারেশনের ট্রান্সপোর্টেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্ব পায় সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে। সারা ইউরোপ থেকে ট্রেনে ভর্তি করে ইহুদিদের তখন পাঠানো হত সদ্য দখলকৃত পোলান্ডের ডেথ চেম্বার গুলোতে। নিজস্ব প্রাণি সত্তায় আইখমান অনন্য ছিল। বেশী বেশী মানুষকে সহজে মেরে ফেলার নানা অভিনব উপায় বের হয়েছিল তার মাথা থেকে। তার নির্দেশেই বেশি বেশী মানুষ মেরে ফেলার জন্য নানা রকম স্থাপনা তৈরি হয়েছিল। বিশাল বিশাল গ্যাস চেম্বার আর মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার চুল্লি ছিল এগুলোর মধ্যে বেশি। সেসময় বয়োজ্যেষ্ঠ আর শিশুদেরকে সবার আগে মেরে ফেলা হত তারা কর্মক্ষম নয় বলে। তারপর প্রয়োজনানুসারে কর্মক্ষমদের রেখে মেরে ফেলা হত বাকিদের। ট্রান্সপোর্টেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্টাফ হিসেবে সে ঠিক করে দিত বন্দী ইহুদিদের মধ্যে কাদেরকে কোথায় কিভাবে মেরে ফেলা হবে। গ্যাস চেম্বারে ৬০ লক্ষের মত ইহুদিকে মেরে ফেলা হয়েছিল এসময়। কেবল ইহুদীদেরকে হিসেব না করলে ১১০ লক্ষ থেকে ১৭০ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছিল কেবল মেরে ফেলার জন্যই। আইখমানকে বলা হয় এই হত্যাযজ্ঞের স্থপতি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে যখন হেইনরিখ হিমলার (আইখমানের উর্ধতন কর্মকর্তা, পরবর্তীতে হিটলারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হিমলার আর আইখমানের মধ্যে কে নৃশংসতায় সেরা তা হিসেব করা দায়!) ইহুদী হত্যা বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের সব নজির নষ্ট করে ফেলতে আদেশ দেয় তখনো আইখমান অফিসিয়াল আদেশ অমান্য করে হত্যা চালাতেই থাকে।

মা ও শিশুদেরকে গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে [ছবি: উইকিপিডিয়া]
যুদ্ধ শেষে আইখমান ধরা পড়ে আমেরিকান সৈন্যদের হাতে। তারা অবশ্য আইখমানকে চিনতে পারেনি। নিজেকে অটো একমান পরিচয় দিয়ে ১৯৪৬ এর শুরুর দিকে সে পালায়। ইউরোপেই দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকে ১৯৫০ এ ইতালিতে রিকার্ডো ক্লেমেন্ট নাম নিয়ে সে নিজেকে শরনার্থী দাবী করে। এলোইজ হুদাল নামক এক রোমান বিশপের সাহায্যে এরপর সে সংগ্রহ করে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্যা রেড ক্রসের একটি পাসপোর্ট। সেই পাসপোর্ট নিয়ে সে আর্জেন্টিনা পালায় ১৯৫০ এর ১৪ই জুলাই। সেখানেই সে পরবর্তী ১০ বছর নানা ছোটখাট পেশায় কাজ করে আইখমান। নিজের পরিবারকে পরবর্তীতে আর্জেন্টিনাতে নিয়ে আসে সে।

সিআইএ অবশ্য জানত আইখমান আর্জেন্টিনায় লুকিয়ে আছে। তবে তারা সেই তথ্য প্রকাশ করেনি রাজনৈতিক স্বার্থে। আইখমান ধরা পড়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হাতে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নাজি যুদ্ধাপরাধীদের খুঁজে বের করে আইনের মুখোমুখী করা মোসাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা অনেক ইহুদিও নাজি যুদ্ধাপরাধীদের খুঁজে বের করায় সক্রিয় অংশ নিয়েছিল। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর আইখমানকে মোসাদের এজেন্টরা আর্জেন্টিনা থেকে গোপনে ধরে নিয়ে এসেছিল ইসরাইলে। আইখমানের পরিচয় কিভাবে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল সেটি অবশ্য বিতর্কিত। তবে এর পেছনে বড় একটা ভুমিকা ছিল তার পরিবারে সদস্যদের নাম। নিজের নাম বদলালেও তার পরিবারের সদস্যদের নাম সে বদলায়নি। ব্যাপরটি অবশ্য ভালই। নোংরা কীটেরা বুদ্ধিমান হলে জগতে মানুষের টিকে থাকাই মুস্কিল হত!

আইখমানের বিচার হয় ইসরাইলে। তার বিচারকার্য সারা পৃথিবীতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবশ্য এই প্রাণিটি তার অপরাধ স্বীকার করেনি। তার মধ্যে কোন গ্লানি ছিল না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে বিশ্বাস করত সে যা করেছে ঠিকই করেছে। এই বিশ্বাস অবশ্য নতুন কিছু নয়। এখনো সারা পৃথিবীতে আইখমানের উত্তরসূরিরা মানুষ মেরে ফেলার প্রশিক্ষণ নেয়, হাতে কলমে নির্যাতন করতে শেখে, এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করে তারা যা করছে সেটাই ঠিক, সেটাই করা উচিত! সৌভাগ্যের বিষয় শেষ পর্যন্ত মানুষই টিকে থাকে। প্রতিহিংসার জন্যে নয় অবশ্য, সুবিচারের জন্য। এজন্যই আইখমানকে কেবল মেরে না ফেলে তার বিচার করা হয়েছিল। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে আইখমানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ৩১ মে ১৯৬২'র মধ্যরাতে। ইসরাইলে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। আইখমানের মৃত্যুদণ্ডই সেখানে কার্যকর হওয়া একমাত্র মৃত্যুদণ্ড।

মৃত্যুর পর আইখমানকে কবর দেয়া হয়নি। তার মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে তার দেহাবশেষ পৃথিবীর সব দেশের সীমান্তের বাইরে ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেয়া হয় যেন এই প্রাণির দেহাবশেষও কোন দেশের মাটিকে বইতে না হয়! আজ এতবছর পরেও আইখমানের জন্য মানুষের রক্তে ছুটে বেড়ায় ঘৃণার বিষ। কারণ মৃত্যুদণ্ডেই সব শেষ হয়ে যায় না। ৫ লাখেরও বেশী শিশুকে মেরা ফেলা হয়েছিল মাত্র ৪ বছরে। ৫০ লক্ষ আইখমানকে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেললেও সেই শিশুদের মাত্র একজনের একঝলক হাসিও ফিরে আসবে না...

ছবি দেখতে চাইলে: http://www1.yadvashem.org
সূত্র
১. উইকিপিডিয়া
২. হিস্ট্রি চ্যানেল
৩. আমেরিকান হলোকাস্ট মিউজিয়াম
৪. জিউইশ ভার্চুয়াল লাইব্রেরি
৫. আইখমান (বিচারের পূর্বে আইখমানকে যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তার পাণ্ডুলিপির উপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্র)

৮ জানুয়ারি ২০১১ শনিবার সচলায়তনে প্রকাশিত

৬টি মন্তব্য:

অন্দ্রিলা বলেছেন...

আইখম্যানের পুত্র দেখি জার্মানিতে থাকে।

লেখা পড়ে উইকি করলাম। মুভিগুলা দেখতে হবে। এখন জিওনিজম নিয়াও একটা লিখা দিবা নাকি?

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

হুঁ, যতদূর জানি তার ছেলেগুলো বেঁচে আছে। তার বউও মরছে বেশিদিন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পশুগুলোর অনেকেই সম্প্রতি মরছে! সবগুলো মরছে কিনা কে বলবে!!!
জিওনিজম নিয়ে লিখতে গেলে আগে পড়তে হবে। তুমিই লেখনা কেন! :)

সাকিলা রুমা বলেছেন...

পটু,আসলে নাজিদের নৃশংসতার কথা অনেকেই জানে না তাতে আমার কোন কষ্ট নেই। ঘৃণা করি তাদেরকে যারা এটাকে ইহুদি ধ্বংস করা হয়েছে বলে আত্নতুষ্টি লাভ করে...তুমি জান কিনা জানি না তবে তাদের অনেকেই তথাকথিত ইসলামের পুজারী..........
আর একটা বিষয় ভেবে দেখতে পারো.. মানুষরুপী ঘৃণ জীবগুলোকে কোন পশুর সাথে তুলনা নাই বা করলে.. আমি বিশ্বাস করি পশুরা অমন নৃশংস হয় না....

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

আপু, আমি সচেতনভাবেই এই প্রাণিকে কোন পশুর সঙ্গে তুলনা করিনি। পশুরা হিংস্র হতে পারে, নৃশংস নয়। জীবন বাঁচানোর তাগিদে ছাড়া তারা অন্য প্রাণিকে খুন করে না।

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

এরকম লেখা আমি পড়ি না, পারতে। জানার চে' অনেক বেশি ভেঙে পড়ি এইসবে। নেহাত তুই পড়ালি বলে পড়লাম। 'দুর্দান্ত'তেও ক্লিক করলাম। কিন্তু, মন তিতিয়ে মৃতপ্রায় উঠলো আবার পুরোনো সুপ্ত বিষে।
ভালো থাক ভাই। ঘৃণা বাঁচিয়ে বেঁচে থাক।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

এরকম কথা আমারো লিখতে ইচ্ছে করেনা ভাই। ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকা নরকবাসের সমান। কিন্তু ঘৃণা না করার কোন উপায় নেই। পৃথিবী মানুষের নয়, মানুষ বড়ই দুর্ভাগা...