শনিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০১১

টুকরো টুকরো দিন: ফুজিলি

পাস্তা রাঁধলাম। দুপুরের খাবার। পাস্তা ঠিক না, ফুজিলি। পাস্তা বংশীয় হবে কেউ একজন। ফুজিলি নামটা মজার বলে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, ধারণা করা হয় শব্দটা এসেছে ফিউজাইল শব্দ থেকে। রাইফেলকে আগে এই নামে ডাকা হত! রাইফেলের প্যাঁচানো ব্যারেলের সঙ্গে দেখতে মিলে যায় বলে এরকম নাম। ইতালিয় বর্ণমালায় অবশ্য ছোট আকারের উলের কাঠিকেও এই নামে ডাকা হয়। আমার অবশ্য রাইফেলেরটাই বেশী পছন্দ! রাইফেলের ব্যারেল সত্যি সত্যি প্যাঁচালো কিনা কে জানে! জানতে অবশ্য চেষ্টাও করছি না। যে যন্ত্র দিয়ে মানুষ মেরে ফেলতে হয়, তার প্রতি কোন ভালোবাসা নাই। বরং দুনিয়ার সব রাইফেল যদি ফুজিলির মত খেয়ে ফেলা যেত তাহলে বড্ড ভালো হত!

হঠাৎ মনে হল, বছরে একদিন অস্ত্র ভাঙ্গা দিবস উদযাপন করলে কেমন হয়! রাষ্ট্রীয় ভাবে সেদিন দেশের আনাচকানাচ থেকে সব অস্ত্র কুড়িয়ে এনে মটমট করে ভেঙে ফেলা হবে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা কাঠ-কাগজ দিয়ে অস্ত্র বানিয়ে একসঙ্গে পোড়াবে সেই দিন! একজন আরেকজনকে বলবে, দেখ, আমার কাছে কোন অস্ত্র নেই, আমি মানুষ।

ফুজিলি রান্না করা এক জটিল কাজ! আমি অবশ্য কোন কিছুই রান্না করে আরাম পাইনা। ফুজিলি এক চুলায় সিদ্ধ করতে দিয়ে ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে রেখেছি আরেক চুলার উপর, একটু পরে দেখি ফুজিলির চুলার সুইচ অন না করে অন করেছি যে চুলার উপর ডিম রেখেছিলাম সেটা! কী বিপদ! মাঝখান থেকে ডিম হয়ে গেল মুখপোড়া হনুমানের মত দেখতে! বেরসিক ফুজিলিগুলো নাড়াচাড়া করাও ঝামেলা! ফ্রাইপ্যানের একপাশে নাড়তে গেলে আরেক পাশ দিয়ে দুচারটা স্বাধীনতা ঘোষণা করে লাফিয়ে বেরিয়ে যায়!

শেষ পর্যন্ত যখন রান্না করে উঠেছি তখন চেখে দেখি এই বস্তু খেতে কুৎসিত হয়েছে! সিদ্ধ করা কেঁচো খাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে! কিন্তু কিছু করার নেই। সুরঞ্জনা একটা গান পাঠিয়েছে, সেটা শুনে, আর ব্লগ লিখে নিজেকে ব্যাস্ত রাখছি আর নিজেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কেঁচো খাচ্ছি একটু একটু করে।

বাজারে যেতে হবে একটু পরে। যে একগাদা বাজার করে গৃহবন্দী হয়েছিলাম সেসব শেষ! আমার ছুটিও শেষ! সোমবারে ল্যাব শুরু। আগামী শুক্রবারে সেমিনার দিতে হবে! অলসতাকে আপাতত ফ্রিজে তুলে রেখে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার সময় এখন। এই ছুটিতে অনেক মজার ঘটনা ঘটেছে। সব এখানে লেখা যাবে না! কিছু লিখতে হবে অদৃশ্য ব্লগে!

একগাদা ইমেইল করতে হবে প্রফেসরদেরকে। একটা সেমিস্টার শেষের পথে। কীরকম দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়। আমার বন্ধুভাগ্য বরাবরই ভালো। এখানে এসে যে চমৎকার কিছু বন্ধু জুটেছিল তাদের থেকে ছাড়াছাড়ির সময় আসছে। দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে যে যার পছন্দের বিষয় বেছে নেবে। স্বভাবতই সবার পছন্দ মিলবে না। কেউ নেবে বায়োটেকনোলজি, কেউ ফাইটোপ্যাথোলজি, কেউ জেনেটিক্স, কেউ মাইকোলজি, কেউ ব্যাকটেরিওলজি। আমি মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজি নেব আশাকরি। আমার সঙ্গে আর কে থাকবে কে জানে! আগামী সেমিস্টারে তাও কিছুটা, তার পরের বছরটাতে সবাই একা হয়ে যাব আমরা। যার যার গবেষণা নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে! কত অপ্রয়োজনেই তো আমরা সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলি! আর এখন তো প্রয়োজন! এইটুকু জীবন আমাদের! সবটাই শেষ হয়ে যায় সম্পর্কের তুমুল ভান করতে করতে। বেশীর ভাগেই কখনো বুঝতেও পারে না তারা কতটা একা! কতজনে কখনো জানতেও পারেনা তার সত্যিকার আপন কেউ নেই!

বন্ধুদের নিয়ে একটা ব্লগ লিখতে হবে। কতকিছু নিয়েই তো লিখতে হবে! লেখা হয়ে ওঠে না কখনো, কখনো লিখতে পারি না চেষ্টা করেও! যতটুকু লিখতে পারি আর যতটুকু ব্যস্ততার ফাঁকে সময় পাই ততটুকুই! ব্যস্ততা অবশ্য চমৎকার একটা জিনিস যদি সেটা হয় পছন্দের কাজে! ল্যাবে বসে ব্যাকটেরিয়ার পিণ্ডিচটকানোর চাইতে মজার কাজ মনে হয় আমি জীবনে পাবনা। ল্যাবের ব্যস্ততা তাই আমার জন্য স্বর্গবাসের মত! এরপরে আছে একটু একটু লেখালেখি। ব্লগ লিখে লিখে যতটুকু লিখতে শিখে ওঠা যায়। আর আমার ভাঙ্গা বেহালা। আহা বেচারী, মায়া লাগে খুব বেহালাটার জন্য।

সবমিলিয়ে এখন এই আমি। বাজারে যেতে হবে। ফুজিলি ও প্রায় শেষের পথে। সেমিনারের প্রস্তুতি। আর ল্যাব। ল্যাবের ভেতর জীবনটা পার হয়ে গেলে মন্দ হয় না। মাঝখানে দুয়েকটি মন খারাপের সন্ধ্যা থাকলো বেহালার জন্য। এইতো। সারা জীবন ল্যাবে মাথা ঠুকেও যদি একটা মানুষের জীবন বাঁচানোয় আমার একটুখানি অংশ থাকে, আর কী চাওয়ার থাকতে পারে আমার!

সুরঞ্জনার পাঠানো গানটা দিয়ে দিলাম :)
গানটা কে লিখেছেন, সুর করেছেন জানিনা। কে গেয়েছেন তাও না। যাঁরাই থাকুন এত চমৎকার একটা গানের সৃষ্টিতে, তাঁদের জন্য শ্রদ্ধা জানিয়ে গেলাম।

Morni.mp3

৮টি মন্তব্য:

cookingsherrydilemma বলেছেন...

ফুজিলি জিনিসটা আমি রাঁধলে যে খেতে ব্যাপক হবে কোনো সন্দেহ নেই। :D
দেশে আসার সময় নিয়ে আসবেন, রেধে খাওয়াবো। :)

গানটা অদ্ভূত সুন্দর। হিমালয়ের এতটুকুন ছায়া যেখানেই পড়ে, তাই সুন্দর হয়ে যায়।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

এখানে এসে রেঁধে খাওয়ানোর ব্যাপারটা কীরকম হয় :?
[স্কেচের ব্যাপারটা কিন্তু ভুলে যাইনি :(]
হিমালয়ের ওদিককার কোন বালিকাকে চেনা আছে নাকি তোমার? ;)

... বলেছেন...

"কিছু লিখতে হবে অদৃশ্য ব্লগে"
লিখলে লিংক দিও :P

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

উহুঁ, অদৃশ্য ব্লগের লিংক বিতরণ করা হয় না ;)

জুয়েইরিযাহ মউ বলেছেন...

হুম এরকমই জীবন ভাইয়া...
তবু কতজনা তো এই পছন্দের কাজটাই পায়না দিন থেকে দিন কেটে যায় অযথাই...
অনায়াসে...
ভালো থাকা হোক...
কিছু স্মৃতিকাতরতা থাকুক নাহয় ...

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

মউ, থ্যাঙ্কস ভাইয়া :)

. . . বলেছেন...

:D

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

..., :)) আমার কিছু বলার নেই...