বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০১১

ফিরনি? ফের নি?!

দুনিয়ায় আমার সবচাইতে অপ্রিয় কাজ রান্না করা। অপ্রিয় কাজের মধ্যে 'খাওয়া'ও আছে। তবে ওটা প্রথম সারিতে পড়ে না। রান্না করার একমাত্র ভালো দিক হচ্ছে রান্নার সময় পড়াশোনার চাপ থাকে না। তাই রাঁধতে রাঁধতে ব্লগ লেখা যায়। ঢাকায় যখন একা ছিলাম তখন অবশ্য দীর্ঘদিন রান্না করেছি। তবে কিনা, বেঁচে থাকার জন্য কোন রকমে খাওয়ার পক্ষপাতি ছিলাম বলে রান্নার উপাদান সীমাবদ্ধ থাকত আলু, ডাল আর ডিমে। মশলা অবশ্যই সবসময় পেঁয়াজ মরিচ আর লবন। এর বাইরে রান্নার আর কোন উপাদান বিশেষ ব্যাবহার করতে শিখিনি কখনো।

বিপত্তিটা বেধেছে এখানে এসে। সর্ষের তেল পাওয়া যায়না বলে আলু ভর্তায় বিশেষ সুবিধা করতে পারছি না। ডাল কিনতে যেতে হয় ইয়েমেনি দম্পতির দোকানে। সে ডালও টিস্যু পেপার দিয়ে বানানো বলে সন্দেহ করি। আর ডিম বস্তুটা দুই চক্ষে দেখতে পারিনা গত বছর কয়েক। সব মিলিয়ে আমাকে সিলেবাসের বাইরে রান্না করতে হচ্ছে এখন। তাতে অবশ্য বিশেষ সমস্যা নেই। আমার জিহ্বার স্বাদ মুকুলগুলো আমার মতই অলস। খাবারে কোন উপাদান অত্যাধিক বেশী-কম না হলে তারা খাবারের মান নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেনা। এখানে আসার সময় আপু'রা ব্যাগে ভরে দিয়েছিল গুঁড়া মরিচ, হলুদ আর মাংসের মসলার প্যাকেট। মাংস রান্না করতে গেল আমি সব মশলাই খানিকটা করে দিয়ে দেই। এক বড় ভাই সম্প্রতি বললেন, আদা এবং রসুন ছাড়া মাংস রান্না করা নাকি কেতাবে নিষেধ। তাই শুনে আমি রসুনের গুঁড়ার একটা কৌটো কিনে এনেছি। মাংস রাঁধতে গেলে সেটা থেকেও খানিকটা ঢেলে দেই। আদার গুঁড়া দোকানে দেখিনি বলে সেটা আপাতত বাদ আছে। নতুন মশলা যোগ হওয়াতে অবশ্য মাংসের স্বাদের কোন পার্থক্য ধরতে পারছি না। আর তাছাড়া যাদেরকে রেঁধেছি সেই সব মুরগিরা কখনোই আদা রসুন না দেয়ার কোন প্রতিবাদ করেনি। তাই আমিও মশলার ব্যাপারে বিশেষ চিন্তিত হইনি কখনো।

এই পর্যন্ত জীবন সুখের ছিল। বিপত্তি বাধাল আমার ভারতীয় দুই সহপাঠি। বড়দিনের ছুটির আগে তাদের মাথায় ইন্টারন্যাশনাল ডিনারের ভুত চাপল। তার মানে সবাই যার যার দেশিয় কোন খাবার রান্না করে নিয়ে যাবে। তারপর গালগল্প করে একসঙ্গে খাওয়া। আমি পড়লাম বিপদে। প্রথমত, ছুটির আগের দিন আমাদের ল্যাব প্রটোকল জমা দিতে হবে। তার আগের দিন তাই রান্নার সময় নেই। আর সময় থাকলেও আমি রাঁধতে জানি কচু। অথচ ডিনারে না যাওয়াটা খারাপ দেখায়। কারণ দাওয়াত পেয়েছি দীর্ঘদিন আগে। সাত পাঁচ না ভেবে তখন বলেছি, যাবো। আর গেলে কিছু একটা রাঁধতে হবে। কী যন্ত্রণা!

রান্নার জন্য সময় বরাদ্দ করলাম ১ ঘন্টা। যেতে আসতে গপ্প মারতে আরো ২ থেকে ৩ ঘন্টা । সব মিলিয়ে সন্ধ্যার তিন-চার ঘন্টা পানিতে। রাতভর ল্যাব প্রটোকলের ঘানি টানতে হবে তারপর! সে যাই হোক, রান্নার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসারে পরের প্রশ্ন সামনে আসল, কী রাঁধবো! প্রকাশ্য সূত্রে জানি, দিশা মেয়েটা রাঁধে চমৎকার।  আর তাছাড়া সে প্রায়ই অনলাইনে থাকে বলে সারাটা সময় আমাকে পরামর্শ দিয়ে সব রকমের বিপদ থেকে বাঁচাতে পারবে। সুতরাং দিশার দ্বারস্থ হবার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু, ও হরি, সে দেখি অনলাইনে নেই। এখন কী হবে! অগত্যা তাকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে বসে রইলাম আমি।

দিশা ফিরল একটু পরে। জিজ্ঞেস করল, কী চাই? আমি বললাম, পরিত্রাণ! দিশা বলল, খিচুড়ি রাঁধো। আমি বললাম, তা রাঁধা যায় বটে, কিন্তু ও জিনিস রাঁধতে ডাল লাগে শুনেছি! দিশা বলল, মরণ! আমি বললাম, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি!

ভাবলাম, বুদ্ধি করে লেবু কিনে আনলে লেবুর শরবত রান্না করা যেত! মার মুখে শুনেছি ছোটবেলায় আমার বুদ্ধি ছিল। বড় হয়ে এক প্রেমিকার মুখেও শুনেছি। কিন্তু কোন তথ্যই নির্ভরযোগ্য নয়। দুনিয়ার সব মায়েরাই সন্তানকে আইনস্টাইন মনে করেন। আর প্রেমিকারা বাই-ডিফল্ট মিথ্যেবাদী (আমারটা মিথ্যেকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিল!)। সে যাই হোক, আমার বিশাল মাথায় বুদ্ধি হাতড়ে অনর্থক সময় নষ্ট না করে দিশাকে বললাম, ভাত খিচুড়িতে না গিয়ে ছোটখাট কিছু রান্না হলেই আমার সুবিধে। দিশা বলল, ফিরনি অথবা পায়েস?
বললাম, তথাস্তু।
দিশা বলতে লাগল, চাল ভেজাতে হবে। ব্লেন্ডারে ঘুঁটা দিতে হবে। দুধ গরম করে...

ভালো কোন চাল হবে ভেবে কিনেছিলাম যে চাল, সেটার প্যাকেট খুলে দেখি তাতে বাংলাদেশে সবচে মোটা যে চাল পাওয়া যায় সেই চাল, আর কখনো দেখিনি এরকম কালো এক ধরনের চাল একসঙ্গে মেশানো। আমি ভেবেছিলাম প্যাকেটে চিকন চাল জাতীয় কিছু থাকবে। কী আর করা। কালো দানাগুলো বেছে আলাদা করে সেই চালই দিলাম ভিজিয়ে। খানিক পরে ব্লেন্ডারে ঢেলে যখন ওই লোহার টুকরো গুলো ভাঙতে যাব তখন দেখি ব্লেন্ডার নষ্ট! ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি, এযাত্রা আমাকে বিরাট একটা বাস্তব কৌতুকের ভেতর দিয়েই যেতে হবে!

ব্লেন্ডারে ভাঙতে না পেরে ভাবলাম দুধে সিদ্ধ করলে নিশ্চয়ই চাল গলে যাবে। তাই সিদ্ধ করতে থাকলাম চাল। ইতিমধ্যে দিশা আমাকে রন্ধন প্রণালীর বাকি অংশ জানালো।
- বাদাম-কিসমিস দিতে হবে।
- মশলা মাখানো কাজুবাদামের টিন ছিল। তার থেকে খানিকটা নিয়ে মশলা ধুয়ে ফেলে ছেড়ে দিলাম।
- এলাচ দারুচিনি...
- নাই
- সুগন্ধী?
- গায়ে মাখার পারফিউম আছে, দেবো?
- ইয়ার্কি মাইরো না। কোন ফল আছে বাসায়? কয়েক টুকরো কেটে...
- আলু?
- উহুঁ, কাঁচা খাওয়া যায় এরকম?
- পেঁয়াজ অথবা কাঁচা মরিচ কি ফলের মধ্যে পড়ে? অন্য কোন ফল খাইনা তো! কাটা ছেঁড়ার যন্ত্রণা অনেক। ফলের জুস আছে, চলবে?
- কী ফলের জুস?
- টমেটো আর কমলা লেবু। টমেটোর জুসে হালকা লবন মেশানো আছে বোধ হয়। কমলা লেবুরটা একশো ভাগ খাঁটি। ছোকলা-মোকলা সুদ্ধ। ঢেলে দেই?
- মারবো...

এরপর আর কথা থাকে না। রান্না ঘরে গিয়ে তাই আমি চাল সিদ্ধ করার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু ও চালের বাপ দাদার বংশে কেউ রাবার ছিল নিশ্চিত (সেই প্রথম আমি বুঝতে পারি গোত্রের বাইরে বিয়ে করতে হয়না!) তাই যতই সেদ্ধ করি, সেই চাল 'হাল্ক'-এর মত ফুলে ওঠে কিন্তু নরম হয়না। ওদিকে পাত্রের দুধ শুকিয়ে যাচ্ছে প্রায়। অতিরিক্ত দুধ ঢেলে কয়েকবার সেটা বাড়িয়েও দিলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলনা। মাঝখান থেকে রান্নার জন্য ব্যায় করা সময়ের হিসেব এক ঘন্টা পেরিয়ে দুঘন্টা হয়ে গেল। অবশেষে আমিও ইস্তফা দিলাম। রাত হয়ে যাচ্ছিল। তাছাড়া আমার প্রটোকল নিয়ে বসার দরকার ছিল যত দ্রুত সম্ভব।

যে বস্তু রান্না করেছিলাম তা নাকি ঠান্ডা করে খেতে হয়। বারান্দায় তুষারের স্তুপ হয়ে ছিল। তার উপর হাঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে পোশাক বদলে রেডি হয়ে নিলাম। সহপাঠীর বাসায় পৌঁছে সবার আগে ব্যাখ্যা করে বললাম, আমি আসলে রাঁধুনি মোটেই সুবিধার নই। যে বস্তু রান্না করে এনেছি তা মোটেও আমার দেশিয় ঐতিহ্যের কিছু নয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোমরা এটা খেয়ে দেখতে পারো। কিন্তু ভেবে বসোনা আমার দেশের মানুষ এরকম কুৎসিত জিনিস রান্না করে খায়। এই বস্তুর সব দায়ভার কেবল আমার।

পরের দিন যখন দিশা জিজ্ঞেস করেছিল রান্না কেমন হয়েছিল তখন আমি কিছু বলতে পারিনি তাকে। নিজে যা খাইনি তা কেমন হয়েছে কী করে বলি! ফিরনি রাঁধতে গিয়ে যে বস্তু রেঁধেছিলাম তা আমি নিজে চেখে দেখার সাহস করিনি! কিভাবে জানিনা, আমার গোটাদশেক দেশের সহপাঠিদের মধ্যে যারা সেখানে ছিল তারা ওই বস্তু খেয়ে শেষ করে ফেলেছিল সেদিন!

সচলায়তনে প্রকাশিত

৬টি মন্তব্য:

. . . বলেছেন...

- যদ্দুর মনে আছে, রামপুরার বাসায় তুমি ডিম আর ভাত করে দিতে- সে বস্তু খেয়ে আমি বহাল তবিয়তে আছি :)
তবে, প্রেমিকা সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছ সেটার জন্য একটা "দুর্দান্ত" দিলাম।

নামহীন বলেছেন...

দিশা পাইলাম ...

খালি ঠোঙ্গা বলেছেন...

আমিও দিশা পাইলাম... বহুত হ্যাপা :)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

..., বেঁচে থাকার জন্য খাওয়ার মত রান্না তো সবাই করতে পারে! আর যে সময়ের কথা বলছ সেই সময়ের কেবল রান্না নয়, সবকিছু নিয়েই ইতিহাস লেখা যায়!
নামহীন এবং খালি ঠোঙ্গা, আপনাদের মন্তব্য বুঝতে পারিনি। অনেক কিছুই ভেবে নিতে পারছি কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছি না!

. . . বলেছেন...

- সেই সময় নিয়ে লিখে ফেল, আর কেউ নাই যে লিখবে। :)
বাই দ্যা ওয়ে, ইমপ্রেস-টিমপ্রেস হয়নি দু'একজন, যেহেতু কেউ মরে-টরেনি ওই ফিরনি খেয়ে সেহেতু দু'একজন পাগল-টাগল হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। :P আপডেট দিও :D

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

..., কত কিছু যে লিখতে হবে তার ইয়াত্তা নেই। লেখার সময় পাইনা। তবে লিখব নিশ্চয়ই। জীবনের এক একটা ইঞ্চি অক্ষরে বন্দী করব বেঁচে থাকলে।