বুধবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০১১

টুকরো টুকরো দিন: তুমি আসবে বলেই

গানটা মাথার মধ্যে ঘুরছে। মাঝে মাঝে এরকম হয়। কোন একটা গান অথবা কোন একটা কবিতার লাইন মাথার মধ্যে অজান্তে ঢুকে যায়, আর সপ্তাহভর ঘুরপাক খেতে থাকে। সকালে ল্যাবে যাওয়ার আগে গানটা ছেড়ে ল্যাববুক'টা একবার দেখে নিচ্ছিলাম তখনই মাথায় ঢুকলো গানটা। সন্ধ্যায় বাসায় এসে থেকে গানটা বাজছে তো বাজছেই। তৃষ্ণা মিটছে না। হঠাৎ হঠাৎ কোন একটা গান অথবা কবিতার তৃষ্ণা জাগে এরকম। সেই তৃষ্ণা বুকের ভেতরটা ফাঁকা করে দেয়। কখনো কখনো একটা কন্ঠ, একটা শব্দের জন্য মহা সমুদ্রের মত তৃষ্ণা পায়...।

সেমিস্টারের শেষ ল্যাব'টা করছি এখন। সারাদিন ধরে তরল নাইট্রোজেনে ছত্রাক চুবিয়ে গুঁড়ো করলাম। এত এত সতর্কতা, তারপরও আহা উহু করতে হয়েছে কাজ করতে গিয়ে। জোর করে তরল করে রাখা হয় বলে যখন ছাড়া পায় তখন টগবগ করে ফুটতে থাকে বাতাসের সিংহভাগ দখলে রাখা এই গ্যাসটা। কোনকিছু নাগালে পেলেই সে পলকে শূন্যের নিচে ৭০ ডিগ্রী কমিয়ে দেয় তার তাপমাত্রা। অবশ্য আস্তে ধীরে নাড়াচাড়ার করারও উপায় নেই। যেখানেই রাখো, যাই করো, তার ছটফটানি থামেনা! চামচে নিয়ে বারবার এপাত্র ওপাত্র করতে গিয়ে তাই ভালই নাকানি চুবানি খেলাম এর হাতে! এখানেই অবশ্য শেষ না। পরের পদক্ষেপে আরেকটু উত্তেজনার ব্যাবস্থা ছিল আজ। ছত্রাকের গুঁড়োতে আরেকটা বিশেষ তরল যোগ করতে হবে। কিন্তু তা যোগ করতে হবে যেই মুহূর্তে ছত্রাকের গুঁড়োতে আর একটুও নাইট্রোজেন থাকবে না তখন। নাইট্রোজেন উড়ে যাওয়ার পর খুব দেরি করলে ছত্রাকের গুঁড়োর তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। অথচ যদি টিউবে একটুখানি নাইট্রোজেন উড়ে যেতে বাকি থাকে আর তাতে পরের রাসায়নিকটা যোগ করা হয় তাহলে সেটা একটা মাঝারি বোমার মত বিস্ফোরিত হবে! কী বিপদ! তরল নাইট্রোজেন পাত্রের চারপাশের বাতাসের পানিকে বরফ বানিয়ে পাত্র সাদা করে ফেলেছে। কিছু দেখাও যায় না। কাজটা করার সময় দাত বের করে ছিলাম যদিও, তবুও একটু একটু ভয় লাগছিল সত্যি! ল্যাবের কাজে অবশ্য ঝুঁকির শেষ নেই। সবকিছু নিয়ে একটা ব্লগ লিখতে হবে দেখি।

এই ল্যাবটা চলবে আগামী সপ্তাহ জুড়ে। কত দ্রুত শেষ হয়ে গেল সেমিস্টার। সময় এত দ্রুত ছোটে! কত কিছু করার বাকি! কতকিছু লেখার বাকি, কতকিছু পড়ার বাকি, কতকিছু দেখার বাকি, শোনার বাকি! মাত্রাতিরিক্ত গান পড়ে আছে হার্ড ডিস্কে একবারও শুনে দেখা হয়নি। শ'চারেক সিনেমা পড়ে আছে, দেখা হয়নি। গোটাদশেক জার্নাল পড়ব বলে নামিয়ে রেখেছি। পড়া হচ্ছে না। একটা পুরো জীবন লিখতে হবে। লেখা আগাচ্ছে না। মাঝখান দেখে সময় চলে যাচ্ছে! মাঝে চিন্তা করে দেখি কী ভয়ঙ্কর বুড়ো হয়ে গেছি। সময়ের কী বিভৎস অপচয় করেছি আমি! এত কাজ পড়ে আছে আমার, কখন করব!

মাঝে মাঝে খুব অবাক লাগে। পৃথিবীর সব সুন্দর গান কখনো শোনা হয়ে উঠবে না আমার। পৃথিবীর সব ভালো বই কখনো পড়া হবে না। সব ভালো সিনেমা দেখা হবে না। প্রিয় প্রিয় মানুষের কাছে থাকা হয়ে উঠবে না। অান্তর্জালের জালে আটকা পড়ে থাকবে কত কথা, কখনো বলা হয়ে উঠবে না। কত অভিযোগ, কত স্বীকারোক্তি, কত ভালো লাগা, কত ভালো না লাগা...। নিতাই কবির মত আমার জিজ্ঞেস করার কেউ নেই, 'জীবন এত ছোট কেনে!'

সময়ের কথা চিন্তা করলেই আমার নেকলেস গল্পের মফিলদে'র কথা মনে হয়, এতটা বছর একটা ধোঁকার পেছনে ছুটে মরল বেচারি! আমার আর মফিলদের মধ্যে বোধ হয় খুব পার্থক্য নেই! এখানে ছেলেমেয়েরা ২২ থেকে ২৪-এ মাস্টার্স শেষ করে ফেলে। ভারতীয় উপমহাদেশের আমরাই বোধহয় কেবল বুড়ো হয়ে আঁতেল হতে থাকি!

আজকের ল্যাববুক'টা ঠিক ঠাক করতে হবে। প্রফেসর ভোস্টেমায়ারের লেকচারগুলো নিয়ে বসা দরকার। আবজাব লিখতে গেলে ভাবতে হয়না বলে বসে বসে কী-বোর্ড চাপছিলাম এতক্ষণ। অসংখ্য লেখা হারিয়ে গেছে, অনেকগুলো লেখা মাথায় ঘুরছে এখনো, কিন্তু ওগুলো এরকম বেখেয়ালে বসে বসে লেখা যায় না। আজকাল তাই কেবল আবজাব লেখাই বের হয় কী-বোর্ড দিয়ে!

ব্যাঙ্ক থেকে, স্টুডেন্ট ক্লাব থেকে, আরও কার কার কাছ থেকে জানি একগাদা ই-মেইল এসেছে। জবাব দিতে হবে। ইদানিং ইনবক্স খুললেই একগাদা করে চিঠি পাই। এই ব্লগটাও বোধ হয় কেউ কেউ পড়েন আজকাল। মাঝে একটা 'ট্রাকার' লাগিয়েছিলাম। কোথা থেকে কোন পাঠক কবে কখন আমার ব্লগ পড়ছেন তা দেখতাম। পরে ট্রাকার'টা উঠিয়ে দিয়েছি। অনেক খানি সময় নষ্ট হয় এতসব খোঁজ খবর রাখতে গেলে। আর তাছাড়া মনে হল ওটার প্রয়োজন নেই। যে পাঠকের কিছু বলতে ইচ্ছে হবে তিনি তো তা বলবেনই।

আর তাছাড়া এই ব্লগটাও ব্যক্তিগত ব্লগ। 'যেমন ইচ্ছে লেখার' যে 'স্বাধীনতা' ছিল শামসুর রাহমানের, আমার সেটা এই ব্লগে। মনের ভুলে পিৎজা পুড়ে বিস্কুটের মত হয়ে গেলে যখন একটু একটু মন খারাপ হয় অথবা যখন প্রয়োজনিয় কাজের আগে একটুখানি জিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে অথবা যখন একটা গান মাথার মধ্যে ঘুরতেই থাকে, ঘুরতেই থাকে, তখন এক টুকরো দিনের কথা এখানে লেখা যায় আনমনে। তুমি আসবে বলেই...

Tumi asbe bole -- ...

তুমি আসবে বলেই
কথা, কন্ঠ, সুর: নচিকেতা

৫টি মন্তব্য:

Saika বলেছেন...

এতো বিষাদ কেন লেখায়? তুমি ভালো নেই?

পান্থ রহমান রেজা বলেছেন...

রতন, তোমার সময় তো দেখছি রকেট গতিতে চলছে। এই সেদিন গ্যালা, এর মধ্যেই এক সেমিস্টার শেষ! ওইখানে কি আট মাসে বছর? :)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

সায়কা, বিষাদ মাঝে মধ্যে লেখার মশলা হিসাবে কাজ করে। :D

পান্থ'দা, এখানে আসলেই ৮/৯ মাসে বছর। সময়ের গতি দেখে আমি নিজেও অবাক হই মাঝে মধ্যে :)

জুয়েইরিযাহ মউ বলেছেন...

"কখনো কখনো একটা কন্ঠ, একটা শব্দের জন্য মহা সমুদ্রের মত তৃষ্ণা পায়...।" - বেশ বলেছো তো ভাইয়া...

তাই... সত্যি তাই...
" অপেক্ষমাণ বুকের ভেতর কাঁসর ঘন্টা শাঁখের উলু...
একশ বনের বাতাস এসে একটা গাছে হুলুস্থুলু... "
(পুর্ণেন্দু পুত্রী)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

হুঁ, তবে তোর মতো তো আর লিখতে পারবো না রে :(