মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০১১

আহা ফেব্রুয়ারি, স্মরণের আকাশগঙ্গা

ফেব্রুয়ারির অনেকগুলো রং আমার কাছে।  সবার আগে সে বইরং নিশ্চিত।  ফেব্রুয়ারির আর যা কিছু রঙীন ভেবেছিলাম, জেনেছি সেসব বড্ড বর্ণ শূন্যতা, বস্তুত অন্ধকার।  তারপরও ফেব্রুয়ারি আমার ডানা মেলবার দিন।  জলের অন্ধকার ছেড়ে ডানায় রোদের ওম মেখে জ্বলে ওঠবার দিন।

বইমেলায় বিশেষ কী আছে আমি জানিনা।  কেবল বোধ করি তার টান।  শাহবাগের মোড় থেকে মেলার দিকে হাঁটা ধরলে এক একটা মুহূর্তে শরীরে সব কোষ যেন আকাশ বাতাস থেকে শুষে নিতে থাকে বইমেলার স্বাদ।  বইমেলার অসহ্য ধুলো, ভীড়, মানুষের ধাক্কা, টং দোকানে ছাওয়া ফুটপাথ সবকিছুই যেন অমৃতের কণা হয়ে থাকে ফেব্রুয়ারিতে।  সেই অমৃতের তৃষ্ণা কীরকম, তা কাউকে বলে বোঝাবার নয়।

ফেব্রুয়ারিতে আমার বইয়ের জন্ম।  ফেব্রুয়ারিতে শুদ্ধস্বরের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি অচেনা পাঠক কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অখ্যাত লেখকের বই।  দেখেছি কলেজ পড়ুয়ারা তর্ক জুড়েছে আমার বই নিয়ে।  দেখেছি বন্ধুরা কিনছে আমার বই। নিজের বইয়ের পাতায় স্বজনকে লিখে দিয়েছি শুভেচ্ছার পংক্তি।  আহা ফেব্রুয়ারি, তুমি স্মরণের আকাশগঙ্গা...

গতবছর টুটুল ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন একটু সময় দিয়ে মেলার স্টলটা ঠিকঠাক করে দিতে পারব কিনা।  ওনার তুমুল ব্যস্ততা দেখছিলাম বেশ আগে থেকেই।  না বলতে পারিনি।  গতবছর মেলা শুরুর আগে থেকেই তাই আমি মেলায়।  মিস্ত্রিরা খাটছে দিনরাত।  বাংলা একাডেমির চত্বর তখন একটা যাদুর মাঠ।  স্টল তৈরির জন্য যার যা কিছু চাই সেখানে তা পাওয়া যাবে কারো না কারো কাছে। শেষ মুহূর্তে তবু কাঠের অভাব হল।  খিলগাঁও থেকে কষ্টেসৃষ্টে যে কাঠ আনা হল তা মাপে ছোট! কী জটিলতা। মিস্ত্রিদের একটু অন্যরকম কিছু বোঝাতে গেলেই তারা হা করে তাকিয়ে থাকে।  চার মিনিটে তারা চারপেয়ে চেয়ার বানাতে পারে।  কিন্তু যদি বলি আমার চেয়ার হবে পাঁচপেয়ে তখন তাদের মাথা আউলে যায়।  কোনক্রমে বোঝাতে পারলেও সে চেয়ার বানাতে তাদের সময় লাগে চারদিন।  মেলার একমাত্র ইলেক্ট্রিক মেকানিকের সময় নেই। অথচ আমার স্টলে লাইটের কোন ব্যাবস্থা হয়নি।  রং মিস্ত্রী রং করে গেছে উল্টা পাল্টা।  গুলিস্তানের লাইটের দোকানগুলোতে আমি খুঁজে খুঁজে সার হচ্ছি স্পট লাইট আর লাল আলো ছড়ানো টিউব।  হাতে একেবারেই সময় নেই।  যা কিছু করার তা করতে হবে এখনই।  জানুয়ারির ৩১ এ রাত তিনটা বাজে বোধহয় আমি আর শক্তি হাঁটছি একটা রিক্সার খোঁজে।  গত তিনদিন পায়ের উপর।  শরীরে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও তখন শেষ।  হাঁটছি কেবল হাঁটতে হবে বলেই।

ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে স্টলে এসেছে আমার বই।  হাতে পেয়েছি লেখক কপির প্রথম পাঁচটি।  একটি বই তার নিজের জন্য। বাকিগুলো পাঠাতে হবে মাকে বাবাকে বন্ধুকে...।  জানি তাদের কে আমার বইটির এক একটি শব্দ নেড়েচেড়ে দেখবে। জানি, কে দুয়েকটি পাতা উল্টে দায় সারবে কেবল।  তারপরও খামে ভরে পাঠিয়ে দেই বই।  কেউ জানতে পারে কোন পাতায় তার কী লেখা ছিল।  কোন শব্দের কী মানে!  কেউ জানতে পারে না কিছু লেখা ছিল কিনা শেষের পাতায়!

মেলা শুরুর দশ বারো দিন পর বোধহয় টুটুল ভাই বললেন আরো পাণ্ডুলিপি দিতে।  বললাম, একটা বই ছাপিয়ে যে ভুল করেছেন তার খেসারত দিয়ে নিন আগে।  উনি আমাকে পাত্তা দিলেন বলে মনে হল না।  দেশ ছাড়ার আগে পর্যন্ত উনি আমাকে পাণ্ডুলিপির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।  শেষের দিকে রাগ করে সহসা কিছু বলতেন না।  আমাকে শুনিয়ে বলতেন অন্য কাউকে।  কিন্তু ফেব্রুয়ারির পর থেকে নিজের ভেতর তখন আমার আর দাঁড়াবার শক্তি নেই।  খুব অকারণেই।  তারপর থেকে হতবাক অস্থিরতা প্রাণপণে দূরে সরিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি দেশ ছাড়ার।  নিজের ভাবনার থেকে লুকিয়ে যতটুকু পারা যায়।  তখন আমার কিছু লেখার সাধ্য নেই।  ওনাকে বলা হয়নি।  এই ডিসেম্বরেও যখন তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল তখন বললেন বইয়ের কথা।  বললাম, জানুয়ারির শেষের দিকে পাণ্ডুলিপি দিলে নেবেন?  উনি জানালেন, "পেঙ্গুইন আপনার পাণ্ডুলিপি না নিলে আমি তো আছিই"।  আমি হেসে ফেললাম।  বরাবর বইয়ের কথা উঠলেই ওনাকে বলে এসেছি, "এবার আর আপনাকে পাণ্ডুলিপি দিচ্ছি না।  পেঙ্গুইন আমার দরোজায় ধর্ণা দিয়ে পড়ে আছে পাণ্ডুলিপির আশায়"।  উনি ভোলেন নি...।

আপুও বেশ জোরাজুরি করছিল।  বলল, তুমি না থাকো, মেলায় তোমার বই থাকুক।  একটা পাণ্ডুলিপি দাও টুটুল ভাইকে।  প্রথম বইটাও যখন লিখব কী লিখব না করে দ্বন্দে ছিলাম তখন আপু নানা কিছুর লোভ দেখিয়ে লিখতে বলত মনে আছে!  মনে আছে আমার পাওনা দুটি উপহার।  একটি পাবো পাণ্ডুলিপি সময় মত জমা দিলে।  আরেকটি বই প্রকাশের পর।  এবার অবশ্য তাড়াহুড়া না করে সময় নেব বলেই সিদ্ধান্ত নিলাম শেষ পর্যন্ত।  গত বছরটা এরকম ঝড়ের মধ্যে দিয়ে না গেলে লিখতাম নিশ্চয়ই।  কিন্তু এতটা অন্ধকারের পর যখন আলোর ওমে কিছুটা জুড়িয়ে নিচ্ছি হৃদয়, তখন তাড়াহুড়া করতে মন চাইল না।

বইটা যখন বেরিয়েছে তখনও রোজ রোজ আপুর তাড়া।  একটা বিজ্ঞাপন দাও।  অন্তত একটা ডিজাইন করে দাও আমি ছাপানোর ব্যবস্থা করছি।  আমার কেন জানি নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়ার সংকোচ কাটত না।  সারাটা ফেব্রুয়ারি রিটন ভাই (লুৎফর রহমান রিটন) রোজ বিকেলে চ্যানেল আইতে সরাসরি মেলার কথা বলেছেন।  দর্শকের সঙ্গে লেখকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।  নতুন বই আর লেখকের কথা বলেছেন।  উনি বললেন, বিকেল বেলা নিজের বই নিয়ে হাজির থাকবা।  আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। বিকেলে অনুষ্ঠানের সময়টুকুতে মেলায় যাই না পারলে।  গেলেও খেয়াল রাখি যেন রিটন ভাইয়ের হাতে ধরা না পড়ে যাই।  পরে যখন দেখা হয় তখন বকা খাই তাঁর কাছে।  আমার মনে হয় যেন অনন্ত কাল ধরে তাঁর বকা খেতে থাকি।  মনে হয় তাঁর বকা খাওয়ার জন্য আরো খানিকটা নচ্ছারপনা করি।

আহা এত মানুষের স্নেহ পেয়েছি জীবনে।  কোন যোগ্যতা ছাড়াই।  এত মানুষের ভালোবাসা।  এত বন্ধুত্ব।  আজকে যখন আচমকা অনিচ্ছুক চোখ পড়ে পৃথিবীর অন্ধকারে।  আমার বড্ড করুণা হয়।  আহা, কত লোকে ভালোবাসা কাকে বলে কখনো বুঝতেও পারবে না।  কত লোকে কখনো জানতেও পারবে না তাদের সত্যিকারের আপন কেউ নেই...

(চলবে)

২টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

বই ও বইমেলার স্মৃতিচারণ ভালো লাগলো। আমিও কিছুটা নস্টালজিক হলাম। গতবারের নিজের বইয়ের স্মৃতি মনে পড়লো। রিটন ভাইয়ের কাছ থেকে আমিও পালিয়ে থাকতাম। পরে, আর পালিয়ে থাকতে পারি নি। বিশ মেলার পর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়েছে, একরাশ লাজুকতা নিয়ে!

পান্থ রহমান রেজা

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

রিটন ভাইয়ের কথা উঠলে মনে হয়, আহা, কত অযোগ্যতায়ও এইসব মানুষের স্নেহ পেয়ে গেলাম...

এবারে আর আপনার অটোগ্রাফসহ বই কেনা হল না পান্থ'দা :(