রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১১

ভালোবাসা এবং ঘৃণার দিন

১৯৮৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছিলেন রাউফুন বসুনিয়া।  স্বৈরশাসক বিশ্ববেহায়া জলপাই এরশাদের শ্বাপদবাহিনীর হাতে।  বসুনিয়া তোরণ পেরিয়ে রোজ আসে যায় হাজার ছেলেমেয়ে।  তাদের একশোতে একজনও বোধহয় জানেনা বসুনিয়া লোকটা কে ছিল!  আমি খুব অবাক হই, এরা শিখতে এসেছে অথচ জানতে চায়না!  অন্তত বসুনিয়ার আবক্ষ মূর্তিটা দেখেও তো এরা জানতে চাইতে পারে মূর্তিটা এখানে কেন! কে এই লোক!  আজকে নিশ্চয়ই বাসন্তি শাড়ি পরে মেয়েরা আর চটকদার পাঞ্জাবিতে ছেলেরা প্রেম করতে বেরোবে!  প্রেমে আমার আপত্তি নেই, আপত্তি অকৃতজ্ঞতায়!  যারা ভাইয়ের রক্তের ঋণ ভুলে যায় তাদের আমি ঘেন্না করি।

প্রেমের দিন কালকেও।  কবে কোন শতকে কে মরে গিয়েছিল তার প্রেমিকার জন্য সে ঘটনা সবাই জানে।  আহা, সাধু ভ্যালেন্টাইনের জন্য কত আফসোস বাঙালি তারুণ্যের!  আমি বলি, ধুর!  যে গর্দভ প্রেমিকার জন্য মরতে চায় তার মরাই উচিত!  নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া উচিত তার নাম।  অমর হওয়া উচিত যাঁরা মানুষের জন্য মরতে পারেন তাঁদের নাম।  অথচ, অবাক কান্ড, যাঁরা মানুষের জন্য, মুক্তির জন্য জীবন দিলেন তাঁদের কথা কেউ জানেই না।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ তে শহীদ হন আমার বোন আর ভাইয়েরা।  আমাদের জন্যেই।  শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হন জয়নাল, জাফর, আইয়ুব, দীপালী সাহা, ফারুখ, কাঞ্চন প্রমুখ।  ১৪ই ফেব্রুয়ারি কেবল ঢাকাতেই শহীদ হন দশজন। নিহতদের লাশ গুম করে ফেলা হয়। সরকারী হিসাবে দাবী করা হয় মারা গেছে মাত্র একজন! ওইদিন আন্দোলনে হামলায় আহত হয় অগুনতি মানুষ।  গ্রেফতারের সংখ্যাও অসংখ্য।  ১৪ আর ১৫ই ফেব্রুয়ারি সারাদেশে নিহত হন কমপক্ষে ৪৯ জন মানুষ।  হত্যাকারী একজনই, সামরিক শাসক এরশাদ!

এই মানুষগুলো আন্দোলন করছিলেন কেন!?

কারণ তাঁরা চেয়েছিলেন শিক্ষার খরচ বহন করবে সরকার।  শিক্ষার ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতাকে উচ্চশিক্ষা অর্জনের যোগ্যতা হিসেবে ধরা হবেনা।  তাঁরা চেয়েছিলেন বাঙালির শিক্ষা হবে মাতৃভাষায়।  শিশুদের উপর জোর করে আরবি অথবা ইংরেজির মত বিদেশী ভাষা শিক্ষার দায় চাপিয়ে দেয়া হবে না।  তাঁরা চেয়েছিলেন কোন অশিক্ষিত সেনাপ্রধান শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের চেয়ারম্যানের পদ কলঙ্কিত করবে না।  তাঁরা চেয়েছিলেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা।  তাঁরা চেয়েছিলেন অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কোন সামরিক খুনী স্বাধীন মানুষের দেশকে পরিচালনা করবে না।  দেশ মানুষের, দেশের নিয়ন্ত্রণও থাকবে মানুষের হাতেই...

যেসব মানুষগুলো অকাতরে মরে গেল আমাদের জন্য, কী অদ্ভুত, আমরা তাঁদের কথা ভুলে বসে আছি।  চারিদিকে মৃত্যু দেখতে দেখতে আমরা সর্বংসহা হয়ে গেছি।  আমরা বুঝে উঠতে পারিনা, কারো জন্য মরে যাওয়া অতো সহজ নয়।  মৃত্যু তীব্র কঠিন।  যে তার মুখোমুখি হয়নি সে কখনো কল্পনাতেও আনতে পারেনা তার স্বাদ কীরকম!  দেশের জন্য মরতে পারি বলে যারা আজকে বেশী বাগড়ম্বর করে সত্যি সেরকম পরিস্থিতি এলে তাদের লেজটাও দেখা যাবেনা!

আমি মানুষ না হতে পারি, অন্তত অকৃতজ্ঞ অমানুষ হতে চাইনা।  যাঁরা আমার জন্য প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের পায়ে মাথা নত করি সবসময়।  ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসার আগে আমি তাই আমার ভাই-বোনের রক্তের কথা স্মরণ করি।  স্মরণ করি জাফর, ফারুখ, দীপালী, কাঞ্চন, আইয়ুবের মত সব শহীদদের।  আর সেই সঙ্গে ঘেন্না ছুঁড়ে দেই সব মানুষ খুনের দিকে।  মানুষের একজন হবার কথা যেসব কীটেরা কেবল স্বপ্নেই ভাবতে পারবে...

রাইফুন বসুনিয়া, তাঁর মৃত্যু এবং সেদিনের ঘটনার উপর তাঁর বন্ধু এবং সহযোদ্ধা মুস্তাফিজ ভাইয়ের (মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান) অসামান্য একটি লেখতোমার মৃত্যুতে পৃথিবীর তিনভাগ জল হয়ে গেছে অশ্রু, রাজপথ হয়েছে সাহসী মিছিল। ১৪ই ফেব্রুয়ারি'র ইতিহাসের উপর সচলায়তনে ছোট করে একটা দারুণ ব্লগ লিখেছেন নজরুল ভাই।  নাম ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩।  যারা সত্যিকারের ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। এই বিষয়ে গৌতম'দার লেখাটিও ব্যাবসায়িক ভালোবাসা দিবসের মুখ ও মুখোশ চিনতে সাহায্য করবে। তাঁর ফেব্রুয়ারি ১৪: ব্যবসায়িক ভালোবাসা, নাকি চেতনার রক্তাক্ত জমিন? লেখাটিও অবশ্যপাঠ্য।

৬টি মন্তব্য:

সাকিব বলেছেন...

সত্যিই দাদা...মাথা হেঁট হয়ে আসছে...লজ্জায়... আপনার এই লেখাটা না পড়লে আগামীকালের সকালটাও আর দশজন ছেলের মতোই হতো...টি.এস.সির আশেপাশে কোথাও প্রেমিকার হাতে হাত রেখে স্বপ্ন দেখতাম একটি স্বচ্ছল ভবিষ্যতের, ছোট ছোট ছেলেমেয়ের আর কিছু ব্যাঙ্ক ব্যালান্সের... অথচ যাদের রক্তে লাল হয়ে আছে টি.এস.সি সহ সারা বাংলাদেশের রাজপথগুলো, যাদের উৎসর্গে গোলাপগুলো এত বেশী লাল... তাদেরকেই জানিনা আমরা...:(
সাকিব

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

...........

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

সাকিব, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। সবাই কখনো না কখনো প্রথমবার জানে। বিশ্বাস,, আর সবার মত তুমি ভুলে যাবে না। প্রেমে এবং স্বপ্ন দেখায় কোন সমস্যা নেই। ওসব জীবনেরই অংশ। কিন্তু সেই সঙ্গে যাঁরা আমাদের জন্য জীবন দিলেন তাঁদের জন্য শ্রদ্ধাটাও থাকা চাই :)

সাইফুল ভাই, ব্লগ লিখে কিছু বলে ওঠা যায়না বোধহয়। অথবা আমার লেখায় সেই জোর নেই। যা বলতে চাই তা ঠিকঠাক বলা হয়ে ওঠেনা কখনোই। যতটুকু শ্রদ্ধা জানাতে চাই, যতটুকু ঘৃণা দেখাতে চাই ততটুকু কখনোই লেখায় ধরাতে পারিনা...

অন্দ্রিলা বলেছেন...

আমি জানতামনা। বড়ো করে ক্যাম্পেইন করলে কাজ হইতো মেইবি। প্রথম আলো কী বালছাল বদলে দাও বদলে যাও, দেশ=মা ক্যাম্পেইন করে। এগুলা করে কচুর লিভারেজ পাইতেসে। ১৪ ফেবের এই ঘটনা প্রোমোট করলে ওদের ব্র্যান্ডিংয়েও কাজে দিতো, আর দেশের আসলেও উপকার হইতো।

উপকার হইতো লিখে মনে হইলো, আগে জানতামনা এখন জানলাম বসুনিয়াদের কথা, এতে দেশের কী উপকার হইলো? বরং যদি আমরা ভ্যালেন্টাইনস ডে'তে চারুকলার স্টুডেন্টের বানানো একটি কার্ড কিনি, আর অনেক গুলা কার্ড বিক্রির টাকা দিয়া সেই স্টুডেন্ট একটা দোকান খুলে, তা'হলে দেশের জিডিপি বাড়বে।

ভালো হইসে যারা মারা গেসে তারা আর দেখেনা আমরা কীবলিকীকরি।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

যাঁরা মারা গেছেন তারা প্রতিদানের আশায় মরেননি! তাঁরা যদি প্রতিদানের আশায় জীবন দিতেন তাহলে আজকে আমাদের এতো নখরামি থাকতোনা! হয় পাকি নাহয় বাঙালি জলাপাইয়ের বুটের তলায় থাকতে হতো! শহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা দেখানো আমাদের দায়, আমরা যারা শহীদদের আত্মত্যাগের সুবিধাভোগী! আমরা কতটুকু কৃতজ্ঞ আর শ্রদ্ধাশীল তারউপরে নির্ভর করে আমরা কতটুকু মানুষ!

পত্রিকা আর কর্পোরেটদের যেসব প্রচারণার কথা বললে সেগুলো নেহায়তই ব্যাবসা। এই ব্যবসায় তারা দেশপ্রেমের আবেগ খাইয়ে মানুষের আপন হওয়ার চেষ্টা করে...

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

না ভাই। বলে ওঠা যায় (বলে কী লাভ হয়- সে বিষয়ে অবশ্য আমি অ্যাতোদিনে যথেষ্ট নিরাশ)। বলতে পারিসও তুই, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ভালো থাক।