শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০১১

প্রিয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আমরা অত্যন্ত দুঃখিত

প্রিয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ,

আমি জানি না ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট সমর্থকরা কেমন কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারে আমি বলতে পারি ক্রিকেট এদেশের সমর্থকদের রক্তে ছোটে। আমাদের ধর্মীয় উৎসবে এত মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে না যত মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে একটি ক্রিকেট ম্যাচের জন্য। একটি জয় এদেশের সমর্থকদের নিঃশর্ত উদার করে তোলে। একটি জয়ের পর এদেশের কিছু দস্যি ছেলেমেয়ে রাস্তায় নেমে চিৎকার করতে থাকে পাগলের মতো। একটি জয়ের পর এদেশের কিছু দস্যি ছেলেমেয়ে রঙ ছিটাতে থাকে পথচারীদের উপর। একটি জয়ের পর এদেশের ছেলেবুড়ো সবাই হাসিমুখে তারুণ্যের সব দস্যিপনা সহ্য করে যায়। নতুন কেনা শাড়িটিতে রঙ মাখিয়ে বাড়ি ফিরতে একটি মধ্যবিত্ত মেয়ের মুখের হাসি ম্লান হয় না। বাবা মায়েরাও একটি জয়ের পর দেরিতে বাড়িফেরা মেয়েটিকে বকা দিতে ভুলে যান। একটি জয়ের পর রাস্তায় দস্যি ছেলেমেয়ের চিৎকারে মাঝরাত পর্যন্ত ঘুমুতে না পারা মধ্যবিত্ত কেরানিটিকেও রেগে উঠতে দেখা যায় না পরদিন অফিসে দেরি হবে ভেবে!

এরকম একটা উৎসবের উপলক্ষ্য আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেলে তাই আমরা নিতান্ত দুঃখি হয়ে উঠি। সেটাই স্বাভাবিক। তবে তারপরেও আমরা আশা করে থাকি আরেকটি সুযোগের, আরেকটি উপলক্ষ্যের। আর এতে অস্বাভাবিকতা কিছু আছে বলেও মনে করি না। প্রত্যেকটি পরাজয়ের পর আমরা আবেগী হয়ে উঠি! আমাদের খেলোয়াড়দের দুয়ো দেই। আমাদের আর ক্রিকেট খেলাই উচিত নয় এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যকিছুতে মন দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখা যায় সেই আমরাই আবার দুদিন পরে কপালে পতাকা বেঁধে গ্যালারিজুড়ে লাফাতে থাকি জয়ের আশায়। শেষ বলটি পর্যন্ত উৎসাহ দিতে থাকি আমাদের ক্রিকেটারদের। অতীতের সব পরাজয়ের বেদনা ভুলে বসে থাকি। ভুলে বসে থাকি আর কখনো খেলা না দেখবার মতো কঠিন সব সিদ্ধান্তকে! শুরু থেকেই এটাই খুব সাধারণ একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জন্য।

তবে আজকের ব্যাপারটা খুব সাধারণ ছিল না। একটা উৎসবের আয়োজনের মতোই আপনাদের সঙ্গে খেলতে নামার আগেই আমরা নানা হিসেবনিকেশ করেছি মনে মনে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলার সাম্প্রতিক ইতিহাস বলে এই সময়ে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমকক্ষ একটি দল। একটা সময়ে যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে খেলায় আমরা প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো আশা দেখতাম না সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি আর সেরকম নেই এখন। বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুটি দলের মধ্যেই এসেছে বিরাট পরিবর্তন। এবং এইসব পরিসংখ্যান আর পরিবর্তনের উপর ভরসা করেই আমরা আজকে আশা করে ছিলাম একটি জয়ের। সেই আশাটি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল ঠিক, কিন্তু সবক্ষেত্রেই আমরা নিশ্চিত ছিলাম একটি শক্ত লড়াই দেখার।

এতখানি আশা নিয়ে যে আমরা মাঠে গিয়েছিলাম সেই আমরা আজকে ভেতরে ভেতরে ভয়ংকরভাবে দুমড়েমুচড়ে গিয়েছি। পরাজয়ে আমরা দুয়ো দেই আমাদের দলকে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে নিন্দার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি আমরা। আমাদের মনে হয়েছে এ স্রেফ এক দৈব বিপাক। বাস্তবে এরকম কিছু কখনোই ঘটতে পারে না। পরাজয় সহ্য করবার শক্তি আমাদের আছে। আবার লড়াই করবার উৎসাহে আমরা পরাজয় ভুলে যাই। কিন্তু আজকের এটি স্রেফ পরাজয় ছিল না। প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর নোংরামি ছিল এটি। যে মানুষদের রক্তে ক্রিকেট দৌড়ায়, যে মানুষগুলো সারারাত রাস্তায় ঠায় দাড়িয়ে টিকেট কিনতে চায় ক্রিকেটের জন্য ভালোবাসায়, যে মানুষগুলোর স্বপ্ন দাঁড়িয়ে থাকে কেবল আবেগের উপর সেরকম সমর্থকদের তাই আজকের এই পরাজয়টি একেবারে উন্মাদ করে তুলেছিল।

তবে কোনোভাবেই এরকম উন্মাদনা খেলোয়াড়দের গাড়িতে পাথর ছুঁড়ে মারার কোনো অজুহাত হতে পারে না। নিতান্ত নিরুপায় বলেই এতক্ষণ ধরে একটা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করবার চেষ্টা করেছি অপরাধবোধের দায় কিছুটা কমাতে। এতটা অপরাধবোধ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করাও শক্ত আমাদের জন্য। প্রিয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আমরা অত্যন্ত দুঃখিত আজকের এই ঘটনাটির জন্য। আপনারা আমাদের অতিথি। অথচ আপ্যায়নের বদলে আমরা আপনাদের গাড়ি লক্ষ্য করে আজকে পাথর ছুঁড়েছি। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কতটা লজ্জার তা প্রকাশ করবার সামর্থ্য নেই। আমরা বাংলাদেশের সব মানুষ আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এই ঘটনাটির জন্য। আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে।


যে অথবা যারা আপনাদের গাড়িতে ঢিল ছুঁড়েছিল তাদের লক্ষ্য আপনারা ছিলেন না। তারা রাগাস্বিত ছিল আমাদের ক্রিকেটারদের উপরেই। যদিও সেটিও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য কিছু নয়। শুধু আপনাদেরকে বলতে চাই, আমরা আপনাদের উপরে কোনো আক্রোশ পুষে রাখিনি। আপনাদের যোগ্যতাতেই আপনারা জিতেছেন। আমরা লড়তে চাই খেলার মাঠে। খেলার মাঠে আরো শতবার এরকম লজ্জাজনক পরাজয়ের শিকার হলেও আমরা আপনাদের উপরে হামলার মানসিকতা পোষণ করি না।

সবকিছুর পরেও, জানি আমাদের উপর আস্থা রাখা আপনাদের জন্য কঠিন হবে। আস্থা রাখার কোনো দায়ও আপনাদের নেই। আমাদের উপর বিশ্ব আস্থা হারালে তাতে কেবল আমাদেরই যায় আসে। আমরা জানি, আজকের একটি পরাজয়ের উন্মাদনায় যে ভুল আমরা করেছি তারপর আমাদের উপর আপনাদের এবং বাকি বিশ্বের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমাদেরকে দশক দশক অপেক্ষা করতে হবে। এবং তারপরেও হয়তো আমরা সেই আস্থা ফিরে পাবো না কখনো। আজকের ঢিলটির পরে আপনাদের দিকে গুলি ছোঁড়া হতে পারে বলে যে আশঙ্কাটি আপনারা ব্যক্ত করেছেন তারপর হয়ত ক্রিকেট পাগল মানুষের এই ভূখণ্ডটিকে ক্রিকেট খেলার অনুপযুক্ত বলে ভেবে নিতে পারে বিশ্ব। আমরা হারাতে পারি আমাদের সবচেয়ে আনন্দময় উৎসবের উপলক্ষ্যটিও। তারপরও আমরা আপনাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে চাই। আমাদের কৃতকর্মের দায় বয়ে নিয়েই আমরা সভ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে চাই আরেকবার...

আমরা অনলাইনে আপনাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করছি এইখানে: http://www.ipetitions.com/petition/apologytowi/signatures

বানান কৃতজ্ঞতা: তৃষিয়া নাশতারান
সচলায়তনে প্রকাশিত

1 টি মন্তব্য:

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

প্রিয় পাঠক, দয়া করে অনলাইন পিটিশনটিতে স্বাক্ষর করে আসুন।