বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০১১

নতশির শ্রদ্ধা তোমাকে নারী...

যে সমাজে আমি বেড়ে উঠেছি সেখানে নারীর প্রতি প্রথম অনুভূতি কৌতুহল।  তীব্র কৌতুহল।  শৈশবের নারী মানেই এক অচেনা পৃথিবী।  সেই রাজ্যে না জানি কোন অন্তহীন অনুভূতির গোলকধাঁধা।  অদ্ভুত ঘোরের এক অলৌকিক অমানিশা সে।  কাছে থেকেও তাতে ঘোর, দূরে গিয়েও। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, নারীর থাকে আফিমের কৌটো।  আমার মতে কৌটো নয়, নারীর বলয়ে থাকে আফিমের অদৃশ্য সুরা।  সে মদ পান করতে হয়না।  সে নিঃশ্বাসের সঙ্গে রক্তে মিশে পুরুষকে স্থবির করে তোলে।  গৃহীকে তো বটেই, সন্ন্যাসীকেও।

বালক বয়স পেরোলে কৌতুহলের ঘোরের জায়গা নিয়ে নেয় তৃষ্ণা।  অন্তত আমার তাই মনে হয়।  অবশ্য এও জানি যে, কারো কারো বালক বয়স পেরোতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়! সেই সময় পেরিয়ে যখন ঘোর কাটে তখন তার বার্ধক্য! সে বয়সে ঘোর থাকে না, তৃষ্ণা থাকে না, যা থাকে সে কেবল স্মরণের এক অবাক অনুভূতি।  সেই অনুভূতি মাথার ভেতর তীব্র আবেশে হতবাক করে দিতে পারে মানি, কিন্তু তাকে ঘোর বলে স্বীকার করিনা।

ব্যক্তির বাইরে এসে যখন দেখার দৃষ্টি মেলে, তখন নারীর চারধারে অন্ধকারের অমানিশা নজরে পড়ে।  সেই অন্ধকার অনুভবের সাধ্য নেই।  কল্পনাতেও আসে না।  যে মরেনি, মৃত্যুর স্বাদ তার জানার সুযোগ হয় না কখনো।  অতি কল্পনাতে একটা কিছু ধরে নেয়া যায় বটে, তবে সে বাস্তবতার ধারে কাছেরও কিছু না! নারী না হয়ে তাই নারীর চারপাশে সামাজিকতার অন্ধকার বোঝার সাধ্য হয়না কারো।  আমার সমাজে নারীরা তাই দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মায় বলে বিশ্বাস করি।  সেই বিশ্বাস থেকে তীব্র দায় আর অপরাধের বোধ নারীকে শ্রদ্ধা করতে শেখায় আমাকে।

পুরুষের কল্পনা করার সাধ্য নেই, নারীর পক্ষে বুঝিয়ে বলাও সম্ভব নয়।  তারপরও চিন্তা থামিয়ে রাখা যায় না।  আমার জীবনের নানা উপলব্ধির একটি হচ্ছে 'চিন্তা' ব্যাপারটিতে আমার বিরাট সীমাবদ্ধতা আছে। চিন্তা থামিয়ে রাখতে পারিনা আমি।  অসহায়ের মত আমার চিন্তাকে অনুসরণ করে চলতে হয় আমাকে।  সহ্য করে চলতে হয় তা সে তীব্র যন্ত্রণার হলেও! নারীর বিষয়েও এরকমই চিন্তা অনুসরণ করে দেখেছি নারীর চারপাশে কী ব্যাপক, কী তীব্র অন্ধকার! নোংরা কীটের মতো কখনো এই ভেবে শান্তনা পেয়েছি যে, নারী হয়ে জন্মাইনি! নারী জন্মে আমার সমাজে আকাশ বাতাস পানি মাটি পরিজন সবকিছু শত্রু হয়ে ওঠে।  আতঙ্কের বিষয়, এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেছি নিজের অজান্তে মায়েরাও নারীর শত্রু হয়ে ওঠেন।  আমার দৃষ্টিতে অবশ্য নারীর প্রথম শত্রু ব্যাপক আকারে সে নিজেই!

আমার সহপাঠিনীদের দেখেছি দাসত্বকে স্বাভাবিক ধরে নিতে।  যে নারী অন্ধকারে থাকাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন, তার শত্রু তিনি  নিজে বলেই মানি।  তবে অবশ্যই নারীর এই ভাবনাটি গড়ে দিয়েছে সমাজ।  এই কথাটি বলতে গেলেই আমার একটি মাত্র উদাহরণের কথা মনে পড়ে।  সতীদাহ প্রথা! আমার দেশে শিশুদেরও স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হয়েছে বিশ্বাসের মোহে।  বিশ্বাস করি যেসব নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে স্বামীর চিতায়, তাদের স্নেহময়ী মায়েরাও সেই ব্যাপারটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন।  তাদের হয়তো মনে হয়েছে, আহা, বেচারীর স্বামী মরে না গেলে কত ভালো হত! তাদের মনে হয়নি, স্বামী মরে গেলে তাতে মেয়েটির কোনো দায় নেই। স্বামীর সঙ্গে মেয়েটিকেও পুড়িয়ে মারাটা স্বাভাবিক কিছু নয়।

অনেকের নিশ্চয়ই মনে হয়েছে।  নিশ্চয়ই হয়েছে।  হয়তো ঠেকাতে পারেননি।  এখনো অনেকেই পারেনা।  হাজারো সতীদাহ প্রথা এখনো পুড়িয়ে মারে নারীকে।  চোখ খুললেই দেখতে পাই।  যেসব নারী সেসবকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেন না তাঁদেরকে শ্রদ্ধা করি।  যে নারী সেসব স্বাভাবিক বলে মনে করেন, তাঁর জন্য করুণা হয়।  দায়টা অবশ্য সব সময়েই আমি অন্যের কাঁধেই চাপাই।  শিশুর বোধ গড়ে তোলে তার সমাজ।  অপরাধকে আমার সমাজ স্বাভাবিক বলে ভাবতে শেখালে তাতে কী-ই বা করার আছে শিশুদের!

নারীর মধ্য থেকেই আমার চোখে দেবী হয়ে ওঠেন অনেকে।  এখানেই।  আমি জানি অসংখ্য নারীর কথা, যাঁরা ধারণ করেছিলেন মনুষত্বের সবটুকু অমৃত।  আমি জানি এই সভ্যতা গড়ে উঠেছে নারী হাতে।  অলৌকিকতার দোহাই আছে অসংখ্য, সেটাই একমাত্র অস্ত্র পোকাদের, তাছাড়া যুক্তির শক্তিতে নারীকে ছোট করে দেখার মত কিছু সৃষ্টিতে নেই।  বরং জানি, কেবল নারীরই সাধ্য আছে মানুষের অধিক মানুষ হয়ে ওঠার।  আমার জন্মান্তরের সৌভাগ্য,  আমি এরকম মানুষ দেখেছি, তাঁদের সংস্পর্শে আসতে পেরেছি।  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষ হতে চাই বলে, নারীত্বের সঙ্গে যারা মনুষত্ব ধারণ করেন মাথা নিচু করে তাঁদেরকে শ্রদ্ধা দেখাতে ভুল করি না কখনো।

মিথ্যে নয়, নারীর ভেতর তীব্র অন্ধকারও দেখি।  জেনেটিকস আর সাইকোলজির প্রথম পাঠ থেকে জেনেছি আমার সমাজে নারীর যে নোংরা দিকগুলো দেখা যায় প্রায়শ, সেসব তার একার দায় নয়।  নিতান্ত নিরুপায় হয়ে তার ভেতর হাজার বছর ধরে বেড়ে উঠেছে যে অন্ধকারের বীজ, প্রয়োজন না থাকলেও অনেকেই সেই অন্ধকারের দাসত্ব উপভোগ করে।  অনেকেই আপন আলোয় নিজেকে জয় করে নিতে পারেন।  তাঁদেরকে শ্রদ্ধা করি।

একটা পৃথিবী সে আলোর হোক আর অন্ধকারের, তাকে একাধারে চিনিয়ে শেষ করে দেয়া সম্ভব নয়।  সেই চেষ্টাও করিনা।  এই লেখাটি তাই নারীকে নিয়ে ছন্নছাড়া অনুভুতি আর উপলব্ধির একটানে লিখে যাওয়া সংক্ষিপ্ত একটি খসড়া।  এই সুযোগে স্বীকার করে যাই, কখনো নারীর কথা উঠলে এক বাক্যে আমাকে বলতে হয় নারীত্বে অবিশ্বাসের কথা।  সে নিতান্তই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা।  নারী অথবা পুরুষে নয়, শ্রদ্ধা করি কেবল মানুষকে।  এই কথাটিতেও তাই সব শেষ হয়ে যায়না।  কারণ নিজের ভেতর আমি জানি, মানুষ হয়ে ওঠা সবার আগের একটা সিঁড়ি কেবল।  সেই সিঁড়ি মনুষত্ব থেকে বিচ্যুত না করে পৌঁছে দিতে পারে নারীত্বে আর পুরুষত্বে।  সেইখানে নারীর স্থান সবসময়ই উপরে।  কারণ জানি, নারীত্বের সেরা রূপ মা, মনুষত্বেরও।  আবার বিশ্বাস করি কেবল জন্ম দিলেই মা হয়না কেউ।  শরীরে জন্মগত জরায়ুর উপস্থিতি কাউকে মনুষত্বের টিকিট দিয়ে দেয় না! জন্মগত অন্ধকারকে পুঁজি করে যে প্রাণি প্রভাব বিস্তার করতে চায় সে বড়জোর উঁইপোকা হতে পারে!

বিরল সৌভাগ্য যেসব অসামান্যা নারীর সংস্পর্শে আসতে পেরেছি, একটুখানি সুযোগ পেলেই নতশিরে তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে চাই তারস্বরে।  যেসব মায়েদের-মেয়েদের, সহোদরাদের আর বন্ধুদের যত্নের দানে আজকের এই আমি তাঁদের সামনে নতশির না হলে নিজেকে পোকা মনে হত পারে বলে আশংকা করি! এইসব নারীরা আমাকে স্থির হতে শেখান।  এইসব নারীরাই তাঁদের অমৃত স্পর্শে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন মৃত্যুর অন্ধকার থেকে।  এইসব নারীর মুখ চেয়ে আমি অন্ধকারের দিকে না ফিরে পথ চলতে শিখি।  এইসব নারীর সংস্পর্শে এসে তীব্র পরাজয়ের পরেও আমি আবার মানুষ হবার স্পর্ধা দেখাই...

মানুষের অধিক যাঁরা মানুষ, জন্মগত অন্ধকারের দায় এড়িয়ে যাঁরা নিজেকে পরশ পাথার করে তোলেন, নারীত্বকে শ্রদ্ধা করেই যাঁরা মানুষ, নারী দিবসে সেইসব নারীকে শ্রদ্ধা।  আমার অস্তিত্বের প্রতিটি মুহূর্তে আমি নতশির তাঁদের সামনে...