সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০১১

ফেব্রুয়ারির গল্প: তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা...

১৫ই ফেব্রুয়ারি আমার জন্য বিশেষ একটা দিন।  পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটাই আমার জন্য বিশেষ।  সবার মাঝে ২০১০ এর ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের সবচাইতে ঝলমলে ফেব্রুয়ারি।  ওরকম ফেব্রুয়ারি আর কখনো ফিরবে না।  এমনিতে 'শেষ' শব্দটা দারুণ অপছন্দ আমার।  কোনোকিছু ঘোষণা দিয়ে শেষ হয়ে গেলে মনের ভেতর বড্ড খুঁতখুঁত করতে থাকে।  খুব নিরুপায় লাগে।  আমি ভয়ঙ্কর আশাবাদী মানুষ।  পাতালে পড়ে গেলেও আমি উঠবার আশা দেখি।  কখনো কখনো যুক্তি না মেনেই।  সবকিছু ধংস হয়ে গেলেও ভাবি, বাহ, বেশতো, সব নতুন করে আবার আরম্ভ করা যাবে।  এরকম আশাবাদী হয়েও আমি ২০১০ এর ফেব্রুয়ারির মতো ঝলমলে কোনো ফেব্রুয়ারি আমার জীবনে আশা করিনা!

গত ফেব্রুয়ারির একটা দীর্ঘ সময় আমার কেটেছে শুদ্ধস্বরে।  কখনো আজিজের অফিসে তো কখনো বইমেলায়।  ছবির হাটের নিয়মিত আড্ডায় বিরতি পড়েছে প্রায়শই।  সন্ধ্যার সময়টুকু বেশিরভাগ আমি দিয়েছি বইমেলাকে।  আমার মনে আছে সেইসব দিনপঞ্জি।  পরীক্ষার জন্য কখনো কিছু মুখস্ত না করতে পারলেও এইসব বিষয়ে আমার স্মরণশক্তি টনটনে।  কিচ্ছু ভুলিনি।  প্রায়শই বিকেল পড়ে এলে শুদ্ধস্বর থেকে বেরিয়ে কাঁটাবন মোড় থেকে রিক্সায় চেপে নেমেছি রাজু ভাস্কর্যের ছায়ায়।  কখনো কখনো দেখেছি লম্বা লাইন মেলায়।  একা থাকলে অথবা প্রকাশনীর কেউ সঙ্গে থাকলে লাইনে দাঁড়াবার ঝক্কি এড়িয়ে প্রকাশনীর লোক বলে টুপ করে ঢুকে গেছি মেলায়।  পরিচিত কাউকে না কাউকে মেলায় পাওয়া যেত সবসময়।  সেরকম কাউকে খুঁজে নিয়ে কখনো দোকানে দোকানে উল্টেপাল্টে দেখেছি বই, কখনো শুদ্ধস্বরের সামনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করেছি আড্ডায়।  কোনো কোনোদিন স্বজনদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে, নতুন বইয়ের প্রকাশ উপলক্ষ্য হয়েছে উৎসবের।  মাত্র মেলায় এলো যে বইটা সেটা গরম গরম কিনে ফেলে স্বাক্ষর নিয়েছি লেখকের।  সেইসব ক্ষণ এখনো চকচক করে মনের ভেতর...

প্রায়শই সন্ধ্যায় একপর্ব চা-পুরি খেতে যাওয়া হত বাংলা একাডেমির পেছনে চায়ের দোকানটাতে।  চায়ের তৃষ্ণা মিটলে আবার মেলায় ফেরা আর জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ, সবধরনের আলোচনায় ডোবা।  কোন বইটা ভালো, কোন বইটা কোথায় পাওয়া যাচ্ছে কমদামে, কোন লেখক কীরকম লেখেন, কোন কবিতাটা না পড়লেই নয়, অথবা কোন ব্যাবসায়ী লেখক ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছেন আরো বেশি, আমাদের এতসব আলোচনার সঙ্গে পাল্লা দিতে সময় বেচারা হাঁপিয়ে উঠতো সচরাচর।  আটটা বাজতে মেলা শেষ হয়, তারপরও আমাদের শুদ্ধস্বরের স্টলটা বন্ধ করতে করতে আরো কয়েক মিনিট আড্ডা চলতে পারত।  অবশ্য মেলা থেকে বেরোলেই যে সেই আড্ডার সমাপ্তি হত তা নয়।  বাংলা একাডেমির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পথে কেনা এটাসেটা চিবোতে চিবোতে এসে পড়তাম আমাদের বিদায়ী চায়ের দোকানগুলোতে।  টিএসসির মোড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কিনার ঘেঁষে যে দোকানগুলো সেখানে চলতো শেষ দফা চা পর্ব।  টেক্সটাইল কালারে রং করা লাল রঙা চিংড়ি ভাজাও খাওয়া হত প্রায়শই।  কখনো কখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়তাম ছবির হাটে।  কখনো কখনো টিএসসি থেকেই রিক্সায় চেপে বাড়ির পথে আমি আর লীলেন'দা।

ফেব্রুয়ারি জুড়েই আমার ছবির হাটে দৈনন্দিন আড্ডায় বেশ ভাটা পড়েছিল।  ব্যস্ত ছিলাম মেলার আমোদে।  মেলাকে অন্য এক পৃথিবী বানিয়ে নক্ষত্রের হাত ধরে আকাশগঙ্গা ভ্রমণের ইচ্ছেটাও অপূর্ণ থাকেনি আমার।  মেলা শেষেই আমার বেলা শেষ হয়নি।  বইয়ের ব্যাগ হাতে অন্তরে এক নক্ষত্র পোষার আনন্দে পথ চলেছি।  মেলা শেষ হবার একদিন আগে কথা নেই বার্তা নেই আচমকা উঠে বসেছি দূরপাল্লার বাসে।  সময়ের দিকে তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিয়ে নিয়ম ভাঙার সে কী উৎসাহ! আমার পৃথিবীতে কারো নিয়মের ধারধারিনা বলে নগ্ন পদক্ষেপে হেঁটেছি তার অলিতে গলিতে, ঘুমিয়ে পড়া শহরে।  রাত্রির শেষটুকুকে বানিয়েছি পথচলার সময়।  দিনটাকে উৎসবের।  আবার ফিরব তা বলার প্রয়োজন মনে করিনি।  তখন আমার স্পর্ধা আকাশ ছোঁয়া।  আমি বিশ্বাস করি আমি ফিরব।  তখন আমি জানি ফেরার কথা আমার বলে দেয়ার প্রয়োজন নেই।  আমি কেবল জানিনা, জীবনকে আমি বড্ড কম চিনেছি।  তখন আমি জানিনা আমার আর কখনো ফেরা হবেনা সেই পুরোনো পৃথিবীতে।  আর তাতে কিছু এসে যায় না কারো।  এক অর্বাচীন-বোকা-আবেগী বালকের না থাকাতে পৃথিবীর উৎসব থেমে থাকে না।  যে পৃথিবীকে নক্ষত্র বলে জানি, সেখানে উৎসব শুরু হতে প্রয়োজন হয় কেবল সহজলভ্য মাংস আর মদের।  কোথায় কতটুকু প্রাণের পূর্ণতা, কোথায় কতটুকু সত্যের স্বচ্ছতা সে হিসেব করে পরবাসী হয় কেবল আমার মত নির্বোধেরাই... 

এই লেখাটি আধলেখা হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন।  ফেব্রুয়ারির কথা আমি লিখতে পারিনা।  অন্তত যখন আমি জানি ফেব্রুয়ারির উৎসবের পরে আসে মার্চের দুঃসময়।  ফেব্রুয়ারির পরে অবিশ্বাস আসে, মৃত্যু আসে।  বিশ্বাসের স্পর্ধায় অন্ধ হয়ে থাকলে ভবিষ্যৎ দেখা যায়না।  হাজার মাইল দূরের এই শীতল উপত্যকায় আজকের আমাকে তাই আমি দেখতে পাইনা ফেব্রুয়ারিতে।  ফেব্রুয়ারিতে আমার চোখে ধরা পড়েনা পৃথিবীর মরুময়তা।  ফেব্রুয়ারিতে আমি অস্বীকার করি সব অন্ধকার! দুর্নিবার স্পর্ধায় আমি স্পষ্ট উচ্চারণ করি, প্রিয়তম পৃথিবী, তোমাকে অভিবাদন, ভয় নেই, দেখো এমন দিন এনে দেবো...

ফেব্রুয়ারিতে আমাকে স্পর্ধায় আকাশ ছুঁতে শেখান এক প্রিয়তম কবি।  কবি টের পেয়ে যান, তখন পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয়, তখন আমার অন্তরে নক্ষত্রের আলো, তখন আমার চোখে উৎসবের দিন।  আমি অন্তর থেকে কবির অনুমতি নেই, তাঁর অক্ষরের স্পর্ধাকে নিজের বলে বিশ্বাস করে ফেলি...

ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।

ভয় নেই...আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা!

সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হবে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয় পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।

ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।

ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন আক্রমণের মতো
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে,

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।
[তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা/ শহীদ কাদরী]

আমার প্রিয়তম এই কবি এই ফেব্রুয়ারিতেই একুশে পদক পেয়েছেন।  খবরটা শোনার পর থেকেই এই লেখাটা শেষ করতে চাচ্ছিলাম।  ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে লিখতে পারিনা বলে ঠিকঠাক লেখা হয়ে ওঠেনি অবশ্য।  যা লিখতে চাই তা আসলে কখনোই লেখা হয়ে ওঠে না আমার।  তবে আমি ভরসা হারাই না।  একদিন নিশ্চয়ই আমি লিখতে শিখবো।  একদিন নিশ্চয়ই আমি লিখতে পারবো।  একদিন নিশ্চয়ই আমি লিখব আমার একেকটি ফেব্রুয়ারির কথা, একেকটি মার্চের কথা।  একদিন নিশ্চয়ই আমি লিখব আমার একেকটি মৃত্যু আর পূণর্জন্মের কথা।  একদিন নিশ্চয়ই স্মরণের সব দায় অক্ষরের কাঁধে চাপিয়ে আমি নির্ভার হবো, একটা প্রশ্বাস নেবো পরিপূর্ণ...

শহীদ কাদরীর কবিতা "তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা" অবলম্বনে "তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা" গানটি গেয়েছিলেন কবির সুমন।  কবিতাটির সঙ্গে গানটিও আমার অসম্ভব প্রিয়...

55. Tomake obhibad...

২টি মন্তব্য:

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

যা লেখা হয়, তা-ও তো দৌড়ায়! এত ভালো আর এত ভেজা লিখিস তুই সবসময়,- একটা লেখাও মন ভালো রেখে শেষ করে উঠতে পারি না! :-( ভালো থাকিস- সব ক'টা মৃত্যু আর পুনর্জন্ম ধন্য করে।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

বলতে চান কি সবসময় কেবল বিষন্নতার লেখাই লিখি আমি...! :(