শনিবার, ২৬ মার্চ, ২০১১

নব্যরাজাকারের সঙ্গে কথোপকথন: কিছুটা নষ্ট সময়

ছেলেটির নাম ধরে নেই কাহান। ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র। তার ভেতরে বাইরে কী আছে না আছে সে জানার প্রয়োজন হয়নি কখনো, আগ্রহও বোধ করিনি। আচমকা তার সঙ্গে তর্ক বেধে গেল। তর্কের প্রসঙ্গ পাকিপ্রেম। প্রসঙ্গটা পুরাতন, যুক্তিগুলোও। এই বিষয়ে দীর্ঘদিন বকবক করতে করতে এতো ক্লান্ত হয়ে গেছি যে এখন খুবই বিরক্ত লাগে। তাছাড়া দীর্ঘদিন থেকেই দেখছি পাকিপ্রেমিদের প্রেম বড়ই শক্ত হয়। অনন্তকাল যুক্তিহীন তর্ক করতে পারে এরা। তাদের যুক্তি শুনলেই বোঝা যায় এরা বলতে চাইছে, "আমি বুঝবো না দেখি তুই কিভাবে বোঝাস!" এই হিসেবে তর্কে না গিয়ে আমার উচিত ছিল স্রেফ ছেলেটাকে চোখের সামনে থেকে বিদায় করে দেয়া। কিন্তু আমার মনে বোধহয় ক্ষীণ একটু আশা ছিল ছেলেটা বুঝতে পারবে, তাই তর্ক চালিয়ে গেলাম।
ব্যাপারটা শুরু হল এভাবে, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম:
আমার ফেসবুকে যদি কোনো পাকিসমর্থক থেকে থাকেন তাহলে নিজ দ্বায়িত্বে আমার বন্ধুতালিকা থেকে দূর হয়ে যান। লতায় পাতায় পাকিপ্রেমিরাও দূর হতে ইতস্তত বোধ করবেন না!
আমার স্ট্যটাস ছেলেটার গায়ে লেগে গেল। তবে সরাসরি সে আমার বিরোধিতা করল না। সরাসরি কিছু বললে তার পাকিপ্রেম নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়বে। বরং সে প্রমাণ করার চেষ্ট করল আমি ভণ্ড, আমি ভান করছি, সেজন্যে আমার পাকিদের ঘৃণা করার মানায় না! ছেলেটা বাংলা অক্ষরে বাংলা লিখতে চায় না। তার লেখাগুলো রোমান অক্ষরে লেখা বাংলা। এখানে তাই সরাসরি উদ্ধৃতি না দিয়ে বাংলা করে দিতে হচ্ছে, তার শুরুর কথাটি এরকম,

১. আপনার গত দুদিনের স্ট্যাটাস পড়ে আমি খুবই উৎফুল্ল ছিলাম। কিন্তু আপনার বন্ধুতালিকা দেখে মনে হলে আপনি গত দুদিনে যা বলেছেন তা নিতান্ত 'পাবলিসিটি স্ট্যান্ট' ছাড়া আর কিছু না।

২. আপনার বন্ধু তালিকার 'অমুক' (সঙ্গত কারণে নাম উল্লেখ করছি না) তো পাকিসমর্থক। সে যদি আপনার বন্ধু তালিকায় থাকতে পারে তাহলে আপনার স্ট্যাটাস তো মেয়েদের সঙ্গে তর্ক করার উপলক্ষ্য একটা।

৩. আমি 'অমুক' কে আমার বন্ধু তালিকায় রাখব কারণ, আমি যদি পাকিসমর্থক হতাম তাহলে তারই মত হতাম। আমি ক্রিকেটারদের 'প্যাশনের' সমর্থক। সে বাঙালি হোক আর পাকি হোক।

সবার আগে আমি 'অমুক' কে বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিলাম (ছেলেটির এইখানে ধন্যবাদ প্রাপ্য, সে বলার আগে আমি লক্ষ্য করিনি যে 'অমুক' পাকিপ্রেমি)। তার ১ নম্বর কথা নিযে তাকে কিছু বললাম না। ওটি আমার প্রতি নির্জলা বিদ্বেষ! ওতে তর্ক করার কিছু নেই। তবে ২ নম্বর যুক্তি নিয়ে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমার স্ট্যাটাস মেয়েদের সঙ্গে তর্ক করার উপলক্ষ মানে কী! শুধু তর্ক করার উপলক্ষ্য হলেও ভেবে নিতাম পাকিদের ঘৃণা করায় ছেলেটা আমার প্রতি তার বিদ্বেষ আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি! কিন্তু মেয়েদের কথা উল্লেখ করে দেয়ার কারণ কী! এ কি ছেলেদের এবং মেয়েদের সঙ্গে তর্ক করায় কোনো পার্থক্য খুঁজে পেয়েছে! আমার মনে হল লিঙ্গ বৈষম্য ছেলেটার রক্তে। অপ্রস্তুত মুহূর্তে না চাইলেও সেই বৈষম্যের প্রকাশ হয়ে যায়। আমার মনে পড়ে গেল নব্যরাজাকারগুলোর কথা, এরা স্পষ্টত নারীকে পুরুষের অধীন বলে মনে করে। লিঙ্ক বৈষম্য এদের শিরায় শিরায়! ছেলেটাকে আমি বললাম,
এক করে সবাইকে জানা সহজ নয়। এজন্যই আমি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। পাকিপ্রেম টের পাওয়ামাত্র আমি 'অমুক' কে বন্ধুতালিকা থেকে বাদ দিয়েছি। এখন তোমার কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে তুমি নিজে পাকিস্তানের সাপোর্ট করাকে কী চোখে দেখো?
 ছেলেটার জবাব চমকে দিল আমাকে। সে বলল,
কাউকে ঘৃণা করার আগে নিজেকে শুদ্ধ করতে হয়। আমরা বাঙালীরা নিজেদের শুদ্ধ না করে পাকিস্তানকে ঘৃণা করা নিয়ে ফালাফালি করি...
কষ্ট হলেও আমি কথা বলতেই থাকলাম। বললাম,
যে জাতি আমার লক্ষ ভাইকে খুন করেছে আর লক্ষ বোনকে নির্যাতন করেছে তাদেরকে ঘৃণা করার জন্য কী কী শোধরাতে হবে আগে?
ছেলেটা বলল,
ব্রাদার, আপনার পাকিস্তানকে ঘৃণা করা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। আমরা বলছি আপনার ঘৃণা করার স্টাইল নিয়ে...
ডুবন্ত কেউ খড়কুটো আকড়ে ধরার চেষ্টা করে। ছেলেটাকেও আমার ডুবন্ত মনে হল। ভাবলাম বেশ বেশ, ঘৃণা করা যাবে কিন্তু সেটার নির্দিষ্ট স্টাইল থাকতে হবে! বললাম,
প্রথমে ঘৃণা পছন্দ হয়নি, এবার ঘৃণার স্টাইল পছন্দ হলনা?

আমি মোটেও দুঃখিত নই। আমার পূর্বপুরুষের উপর যারা নির্যাতন করেছে তাদেরকে 'সুন্দরভাবে' ঘৃণা করতে জানিনা আমি। জানলেও তা করতাম না।

'আমরা' বলতে তুমি ছাড়া আর কে কে পাকিদের ঘৃণা করাটা পছন্দ করছ না? জলদি জানাও, পাকিপ্রেমিদের আমি আমার বন্ধুতালিকায় রাখতে আগ্রহী নই!
ছেলেটা বলল,
আপনার ঘৃণা প্রকাশ করার স্টাইল পুরাই অশ্লীল৭১ এ যদিও আমরা নির্যাতিত ছিলাম তবুও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা জার্মানদের প্রতি আপনার এত ভালোবাসা কেন! এজন্যই বললাম, আগে আত্মশুদ্ধি দরকার...
আমার এখন পর্যন্ত স্ট্যাটাস মন্তব্যে কোথায় অশ্লীলতা করেছি খুঁজে দেখলাম। সেরকম কিছু পেলাম না। বুঝলাম সরাসরি বলতে না পারলেও পাকিদের ঘৃণা করাটা সহ্য করতে পারছে না সে। ঘৃণাটা তার গায়েও পড়ছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, শিক্ষাসূত্রে আমি জার্মান প্রবাসী। ছেলেটাকে বললাম,

তুমি নতুন নও। তোমার যুক্তির মত চানাচুর মার্কা যুক্তি আমি আগেও শুনেছি। জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত লাগে এখন!

প্রথম কথা, "তুমি 'ক' কে খারাপ বলোনা তাহলে 'খ' কে কেন খারাপ বলতেছো!" এইটা কোনো যুক্তি না। আমি যদি নাজিদের ঘৃণা না করি সেটা আমার অপরাধ হতে পরে কিন্তু তারমানে এই নয় যে আমি পাকিদেরও ঘৃণা করতে পারবো না!

এবার আসি নাজি প্রসঙ্গে। তুমি কি 'নুরেনবার্গ ট্রায়ালের নাম শুনেছ? তুমি কি জানো ৭০ বছর পরেও জার্মানিতে যেকোনোভাবেই নাজিদের/হিটলারের সমর্থন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ? আজকের জার্মানি নাজিদের তো সমর্থন করেই না বরং এখনো তারা নাজিদের ঘৃণা করে। বলে রাখি, পুরো জার্মান জাতি কিন্তু নাজি নয়। বরং নাজিরা তাদের দেশেরই মানুষকে মেরে যুদ্ধ শুরু করেছিল। জার্মানরা নাজি নয়, তবে জার্মানি থেকেউ তাদের উত্থান। হিটলার কিন্তু জার্মান ছিলনা! আগে জানতে চেষ্টা করো, তারপর কথা বলো!

তোমার কেনো মনে হল আমি নাজিদের ভালোবাসি? তুমি কি আমাকে জিজ্ঞাসা করে দেখেছো? নিচের লেখাটা পড়ো। এটা আমি লিখেছিলাম আইখমানের (এবং অন্যসব নাজিদের) প্রতি ঘৃণা দেখিয়ে। আইখমান কে ছিল জানতো? নাকি সেটাও জাননা?!
প্রথম থেকেই বুঝতে পারছিলাম ছেলেটার পাকিস্তান প্রেম তার অন্তর থেকে এসেছে। তাতে তার নিজের কোনো যুক্তি নেই। তর্কে টেকার জন্যে তাই সে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে আমি লোকটি নিন্মমানের। সে বলল,
আপনি আমার লেখায় কোথায় খুঁজে পেয়েছেন পাকি সমর্থন? আমাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ মার্জিত হওয়া উচিত। আমি আপনাকে বোঝানোর অপচেষ্টা করছি। আত্মশুদ্ধি দরকার। পাকিস্তান অনেক জাতি মিলে একটা দেশ। পাঞ্জাবি ছাড়াও অনেক জাতি ওখানে আছে। জার্মানিতে যেমন নাজি ছাড়াও অনেক জাতি আছে। বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস আমি আপনার চাইতে কম জানিনা। আসলে শাহবাগ আজিজ মার্কেটে আড্ডা মারলে আর চারুকলায় রাতের অনুষ্ঠান দেখলে আর নাস্তিক হলে বিশ্বযুদ্ধের সবকিছু জেনে একমাত্র আবেগপ্রবণ মহাজ্ঞানী হওয়া যাবে তা জানতাম না! জ্ঞানী হতে আত্মশুদ্ধি দরকার।
আমি চেষ্টা করতে লাগলাম ছেলেটিকে যুক্তিতে ধরে রাখার। আমি লোকটা মন্দ হলেও পাকিদের ঘৃণা করা যাবেনা তা নয়! ছেলেটার যুক্তিগুলো পুরাতন। এগুলো আসলে যুক্তির চাইতে বেশি আক্ষেপ! ব্যপারটা অনেকটা এরকম, ''ওই লোকটা খুন করেছে তা তুই বলার কে? তুই যে ঘুমিয়ে নাক ডাকাস, তখন!?" আমি বললাম,
১. তোমার কথার ভেতরে বাইরে পাকিস্তান প্রেম। তুমি পাকিস্তানিদের ঘৃণা করার বিরোধী। ঘৃণা করা গেলেও 'সুন্দরভাবে' করতে হবে। তা করার আগে আবার নিজেকে শুদ্ধ হতে হবে! তুমি যদি পাকি প্রেমি না-ই হবে তাহলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তোমার আত্মশুদ্ধির বোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো কেনো?

২. পাকিস্তান মিশ্র জাতি, তাতে কী হয়েছে? ৩০ লাখ খুন মাফ? পাঞ্জাবি ছাড়া সেখানে অন্য জাতি আছে, তাতে কী প্রমাণিত হয়? জার্মানির সঙ্গে পাকিস্তানের তুলনা কেন? পাকিস্তান কি জার্মানির মতো অপরাধীদের সাজা দিয়েছে? পাকিস্তান কি দুঃখপ্রকাশ করেছে? ধরলাম জার্মানিও খারাপ। দুনিয়ার সব দেশ খারাপ। তাতে কী প্রমানিত হয় যে পাকিস্তান ভালো? ধরলাম, জার্মানি খুন করেছে, তাতে কী পাকিস্তানের খুনগুলো বৈধ? তাদেরকে নিয়ে কথা বলা যাবেনা?

৩. বিশ্বযুদ্ধের কাহিনী যদি তুমি জানই তাহলে জার্মানির সঙ্গে পাকিস্তানকে মেলাও কেন? জার্মানির কথা কে তুলেছে, বিশ্বযুদ্ধের কথা কে তুলেছে, আমি নাকি তুমি?

৪. যুক্তিতে থাকো। তোমাকে যে পয়েন্টেই ধরি তুমি সেটা ছেড়ে আরেকটা কিছু হাজির করো। কোথাও টিকতে না পেরে তুমি এখন তুলছ, কে আজিজে যায়, কে শাহবাগ যায়, কে আস্তিক নাকি নাস্তিক, কে আবেগপ্রবণ, কে মহাজ্ঞানী, এসব! পাকিস্তানকে ঘৃণা করার মধ্যে এসব আসছে কেন?! তোমার যুক্তি কই? একেকটা পয়েন্ট ধরে যুক্তি দেখাও। যুক্তি না থাকলে একশ্রেণির লোক, "তুই বেশী বুঝস", "তোর লগে কথায় পারা যাবে না", "তুই মহাজ্ঞানী", "তুই সব জানস, আর কেউ কিছু জানেনা" এইসব কথা বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। এরকম দীর্ঘদিন থেকেই দেখে আসছি। নতুন নয় আমার কাছে।

তোমার পাকিপ্রেম নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। পাকিস্তানকে ঘৃণা করে কিছু লিখলে সেটাকে তোমার পাবলিসিটি স্ট্যান্ট মনে হয়। তুমি এখনো আমার বন্ধুতালিকায় আছো কারণ আমি চাই আমার আশেপাশে তোমার মতো আর কেউ থাকলে তারা দেখুক এই মন্তব্যগুলো। আমার স্ট্যাটাস কোনো পাবলিসিটি স্ট্যান্ট ছিল না। যারাই তার পাকিপ্রেম প্রকাশ করেছে সবাইকেই আমি আলবিদা বলে রেখেছি।

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের খেলার দিন স্টেডিয়ামে গিয়েছিলে শুনলাম। কোন দলের সাপোর্ট করলে?
আমার কমেন্টগুলো পছন্দ করেছিল কয়েকজন। তাদের মধ্যে দুজন নারী। একজন আমার ছোটবোন, আরেকজন বন্ধু। ছেলেটা এবার তাদের উপর ক্ষেপে উঠল। তার কথাগুলো নোংরা বলে উল্লেখ করছি না। তবে তার আক্রমণের যুক্তি ছিল, এরা দুজন নারী। প্রথমে মনে হওয়া আশঙ্কাটা আমার এইখানে সত্যি বলে মনে হল। ছেলেটি তীব্রভাবে লিঙ্গবৈষম্য করে। নারীকে সে কেবল নারী বলেই উপহাসের বস্তু বলে মনে করে। এইখানে ছেলেটির মায়ের জন্য আমার মায়া হতে লাগল। ছেলেটির আশেপাশের সব নারীর জন্য আমার মায়া হতে লাগল। এই ছেলেটির মা কি জানতেন, তিনি এমন একটা প্রাণি জন্ম দিচ্ছেন...! ছেলেটি তার পরের কথাগুলো বলল পয়েন্ট করে (আমি মুল অংশটা লিখছি শুধু। রোমান অক্ষরে লেখা বাংলা পড়তেও আমার কষ্ট হয়!),
১. পাকিদের ঘৃণা করা ঠিক আছে কিন্তু পাকি ক্রিকেটকে ঘৃণা করা ছেলেমানুষি। নিজ দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে ওদেরকে ঘৃণা করা উচিত না। আমি নিজেই জানিনা আমার প্রেম কিসের উপর আর আপনি বের করে ফেললেন পাকিপ্রেমি আমি! দেখি 'তমুক' (আমাদের ডিপার্টমেন্টের একটি মেয়ের নাম) কে দিয়ে পরীক্ষা করাবো আমার প্রেম কার উপর!
২. নিজের দেশকে পারফেক্ট না করে আমরা কিভাবে অন্যকে ঘৃণা করি! রাজাকাররা তো বাঙালী ছিল, তারমানে সব বাঙালী রাজাকার! আপনিও...!
৩. পাকিদের সঙ্গে তাদের ক্রিকেটারদের যদি মিল থাকে তাহলে জার্মানরাও সবাই নাজি।
৪. আপনাকে যুক্তি দেখানোর আগে আপনার অরিজিনটা বোঝালাম।

৫. আমি বাংলাদেশ সঙ্গে আয়ারল্যান্ড, ওয়েস্টইন্ডিজ, ইন্ডিয়ার খেলা দেখেছি আর পাকিস্তান ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা দেখেছি। আপনিই বলুন আমি কোন দলের সমর্থক! আন্দাজে ঢিল ছোঁড়েন কেন?
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বিতর্ক করেছি। ছেলেটির কথা থেকে তার অক্ষম আক্রোশের চিৎকারগুলো সরিয়ে মুল বক্তব্যটা বের করতে আমার কষ্ট হয়েছে। তারপরও অবশ্য তার কথায় "পাকিদের কেন ঘৃণা করা যাবে না" সেই যুক্তি পাওয়া মুস্কিল! আমি তাই তার সব যুক্তিই খন্ডানোর চেষ্টা করলাম। বললাম,
তুমি বলছ, পাক কে ঘৃণা করা যাবে কিন্তু পাকি ক্রিকেট কে ঘৃণা করা যাবেনা! বেশ বেশ! তারমানে পাকি ফুটবলারদের ঘৃণা করা যাবেনা, পাকি হকি খেলোয়াড়দের ঘৃণা করা যাবেনা, পাকি ব্যাবসায়ীদের ঘৃণা করা যাবেনা, পাকি ছাত্রদের ঘৃণা করা যাবেনা, পাকি শিক্ষকদের ঘৃণা করা যাবেনা, পাকি কৃষক, শ্রমিকদের ঘৃণা করা যাবেনা! পাকিস্তানকে ঘৃণা করা মানে তাহলে কাকে ঘৃণা করা? মানচিত্রকে ঘৃণা করা? পাকিস্তান দল কাদের প্রতিনিধি? বুঝতে পারছ না নাকি বুঝতে চাইছ না?

শোষনকারীদের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নিজেদেরকে আগে পারফেক্ট করতে হবে মানে কী? তোমার পরিবারের কেউ নির্যাতিত হলে তুমি নিজে পারফেক্ট হওয়ার আগে তাকে কিছু বলবে না?

এই দেশে রাজাকার ছিলো আমি জানি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং নির্যাতিত তারচাইতে কতগুণ বেশি ছিল? ৭১ এ এইদেশের যেগুলো পাকজারজ ধর্মব্যাবসায়ী রাজাকারকে ছিলো ওইগুলাকে কি এদেশের সাধারণ মানুষ সমর্থন দিয়েছিল? অন্যদিকে, পাকিস্তানি সেনারা এই দেশে যখন এসেছিল তখন কয়জন পাকিস্তানি নাগরিক তার বিরোধিতা করেছিল? গত ৪০ বছরে কতজন পাকিস্তানি দুঃখপ্রকাশ করেছে? এই জাতি এখনো এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের গাদ্দার বলে ডাকে, খোঁজ রাখো?

পাকিদের আর জার্মানদের পার্থক্য তোমাকে আগেও বলেছি, আবার বলি, জার্মানরা নাজি নয়। এই জার্মানিতেই নাজিদের বিচার হয়েছে! (তোমার তো জানার কথা! তুমি তো ইতিহাস জানো!) পাকিরা কি বিচার করেছে খুনিদের? অন্তত ক্ষমা চেয়েছে? জার্মান আর পাকি তুমি কিভাবে মেলাও! ধরলাম জার্মানরাও পাকিদের মতই, কিন্তু তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিলে না কেন? জার্মানরা খারাপ হলে পাকিদের ঘৃণা করা যাবেনা?

তোমার যুক্তির সঙ্গে আমার অরিজিনের কী সম্পর্ক? তোমাকে একেকটা প্রশ্ন করলেই তুমি সেটা ছেড়ে দুরে গিয়ে ঘুরপাক খেতে থাকো কেনো? যার অরিজিন যা ইচ্ছা হোক, সে শাহবাগ থাকুক আর লন্ডন থাকুক, নাস্তিক হোক আর মৌলবাদী হোক, তাতে কী পাকিস্তানের অপরাধ মাফ হয়ে যাবে? পাকিস্তানকে ঘৃণা করার আগে কী কাউকে বিশেষ কোনো যোগ্যতা অর্জন করতে হবে?

বাংলাদেশের খেলাগুলোতে বাংলাদেশকে সাপোর্ট করেছিলে বলে ধরে নিলাম। পাকিস্তানের খেলায় কাকে সমর্থন দিয়েছিলে তাই জানতে চাইলাম। এটা তো কেবল একটা প্রশ্ন ছিল কেবল, আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া হল কই? আমি কি বলেছি তুমি পাকিস্তানের সাপোর্ট করেছ কিনা! ক্ষেপে ওঠার কারণ কী! :D
একটা জিনিস বুঝলাম না, তোমার মন্তব্যে 'বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী', তমুক, 'অবুঝ নারী' টাইপ কথা আসছে কেনো? ডিপার্টমেন্টের আরেকটি মেয়ের নাম নিয়ে নোংরা ইঙ্গিত করার মানে কী? যুক্তিতে টিকতে পারছো না ভাইয়া? আমার আগের কমেন্টটা মনে আছে কী বলেছিলাম? বলেছিলাম যুক্তিতে না পারলে লজ্জা সইতে না পেরে কিছু লোকে গালিগালাজ দিয়ে শুরু করে শেষমেশ খামচি মারার চেষ্ট করে!

তোমাকে আমি অবশ্যই ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বিদায় করব। তবে তার আগে দেখতে চাচ্ছি পাকিস্তানকে ঘৃণা করার কথা বলায় তোমার মনে আসলে কতটা আঘাত লেগেছে! কতক্ষণ তুমি পাকিস্তানি দলকে আমার ঘৃণার হাত থেকে বাঁচাতে যুক্তি হাতড়ে বেড়াও!

তুমি কিভাবে কথা শুরু করেছিলে মনে আছে তো? তোমার মন্তব্য তুলে দেই, "Apnar last 2 diner status pore ami khub utfollo cilam.... bt apnar frd list a dekhe mone holo apni last 2days ja korsen ta nitan-to publicity chara kisu na..." যার কথা বলেছ সে কিন্তু তখন থেকেই আমার ফ্রেন্ড লিস্টে নেই। এখন তোমার সেই উৎফুল্ল ভাব তো আবার ফিরে আসার কথা, আসেনি?

এই তুমিই বলেছিলে, "Ami cricketer der khelar passion ar supporter..... she Abdur razzak or abdul razzak jai hok na kn............" ভুলে গেছ নাকি? এই প্যাশনেবল পাকি ক্রিকেটারদের বাপ দাদারা তোমার আমার মাবোনদের রেপ করেছিল মনে আছে? এবং এই ক্রিকেটাররা তাদের বাপদাদার কাজে লজ্জিত নয়! অবশ্য তাতে তোমার কী! তোমার বাপভাইকে খুন করলে আর তোমার মাবোনকে রেপ করলেও তো তোমার কিছু যাবে আসবে না, তুমি সেই খুনি-রেপিস্টদের ছেলেপেলেকে ঘৃণা করার বিরোধী!

আমাদের খুব সৌভাগ্য তোমার মত ছেলেপেলেরা ৭১ এ এদেশে জন্মায়নি। তাহলে এদেশে মুক্তিযোদ্ধার চাইতে রাজাকার বেশি হত আর এই দেশে কখনো স্বাধীন হতোনা! মাঝখান দিয়ে খুন হয়ে যেতেন এদেশের সব ছেলে বুড়ো আর গনিমতের মাল হয়ে যেতেন আমাদের মায়েরা...
এর পরে ছেলেটির বক্তব্যগুলো অকথ্য। অনেকটা ব্যক্তিগত আক্রমণ। আমার একটি বন্ধু আমার যুক্তির পক্ষে কথা বলেছিল, তাকেও অনেকগুলো কথা শুনতে হলো। সবই লিঙ্গ বৈষম্য করে বলা। নোংরা বলে সেগুলো লিখছি না এখানে। তার বাকি মন্তব্যগুলোর একটুখানি আভাস দেয়ার চেষ্টা করি। তার শেষ কথাগুলোতে অনেকখানিই সে পূর্বের কথা আবার বলেছে। সেই অংশটুকু এড়িয়ে গেলাম। ছেলেটি বলছে,
অন্য যেকোন দেশের খেলা আমি কেবল বিনোদনের জন্য দেখি। টাকা দিয়ে বারে নাচ দেখা যেরকম, সেরকম। এখন 'বার ড্যান্সার' আমাকে নিয়ে কী ভাবছে তাতে আমার যায় আসে না। আমার আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। আপনার কাজ নেই বলে কে কী ভাবছে সেটা নিযে আপনার মাথা ব্যাথা...
অন্য যে কোন দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের পার্থক্য কোথায় সেটি এই ছেলেটি বুঝতে চায় না। ৩০ লক্ষ পূর্বপুরুষের রক্ত আর ২ লক্ষেরও বেশি মায়ের সম্মানের কথা এই ছেলেটি ভুলে বসে আছে। পাকিস্তানিরা এই দেশকে নিয়ে কী ভাবছে তাতে তার মাথা ব্যাথা নেই। সে মনে করে যাদের কাজ নেই তারাই এসব নিয়ে ভাবে। এই কথাটি শুনে আমার মনে হয় ৭১ এর শহীদেরা কবরের ভেতর নড়েচড়ে উঠলেন। পাকিস্তানিরা তাঁদেরকে গাদ্দার বললে, এই ছেলেটির তাতে কিছু যায় আসে না!

ছেলেটি বলে চলে,
আপনি যদি রাজনীতিতে নামতেন, আর্মিতে নাম লেখাতেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কিছু বলতেন তাহলে আপনার কথা মুখে এসব কথা মানাতো।
ছেলেটি তার চিন্তার সীমাবদ্ধতায় অবাক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। দুঃখ লাগে তাকে আমি বোঝাতে পারলাম না যে, কারো মুখে কোনো কথা মানায় কিনা সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু তাতে পাকিস্তানিদের ঘৃণা করা যাবেনা তা প্রমাণিত হয় না।
নিজে বাঙালী বলে তার কষ্টটা ফুটে ওঠে তার মন্তব্যে,

যে বাঙালীরা নিজের মায়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত গাদ্দারী করছ, নিজের মাকে পদে পদে রেপ করছে, তারা এইসব ব্যাপার না ভেবে কে তাদের বোনকে রেপ করেছিল, ভাইকে খুন করেছিল, তাদের বিচার করতে চায়...
আমি বুঝতে পারি ছেলেটি স্পষ্টতই বাঙালী হওয়ার জন্য আফসোস করে। অন্যদেশে জন্মাতে পারলে সে খুশি হত। সম্ভবত পাকিস্তানই তার প্রিয় দেশ।


তার কথায় বারবার বের হয়ে আসে আমি বিদেশে এসেছি তার ক্ষোভ। অথচ আমার মনে পড়ে আমি আসার আগে সে নিজে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিভাবে কী করে সে আমার এখানে আসতে পারে সেই পরামর্শও চেয়েছিল। কেউ প্রবাসী হলে সমস্যা কোথায় আমি বুঝতে পারি না! তর্ক করার যুক্তি খুঁজে না পেয়ে তার এসব কথা তুলতে হয়েছে বলে মনে হয়। আমি নিজে দেশের বাইরে এসেছি পড়াশোনার জন্যে। কিন্তু যাঁরা কাজ করেন দেশের বাইরে, তাঁদের দেয়া বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের আয়ের সবচে বড় উৎসগুলোর একটি। এই ছেলে সেটি জানে না। এই ছেলে বাংলাদেশ সম্পর্কে আর তার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চায়ও না। 

ছেলেটির কথায় কথায় ব্যক্তি আক্রমণ। কেউ বিদেশে কেন গেল, কেউ বন্ধুদের (সেই বন্ধুদের কেউ মেয়ে হলে) সঙ্গে ছবি কেন তুলল, মেয়েরা কেন স্কার্ট পরবে... সব মন্তব্য লেখাও সম্ভব নয়। আমি এসব কথা এড়িয়ে যেতে চাই। আমি বলতে চাই, আমি ভালো লোক কিনা সেটা নিয়ে কথা বলছি না। আমি খারাপ হতে পারি। আমি অনেক অপরাধ করে থাকতে পারি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার পূর্বপুরুষের উপর যে নির্যাতন করেছে তাকে আমি ঘৃণা করতে পারব না। বাংলাদেশের কারো কোনো কাজেই আমার তিরিশ লক্ষ স্বজন হত্যার অপরাধ মাফ হয়ে যায় না। তবে আমার চেষ্টায় লাভ হয় না শেষ পর্যস্ত। আমি বুঝে যাই ছেলেটির মধ্যে তীব্র কুসংস্কার। নারী স্বাধীনতায় সে বিশ্বাস করে না। লিঙ্গবৈষম্য তার রক্তে মজ্জায়। নব্যরাজাকারের সে স্পষ্ট প্রতিমূর্তি।


আমি বুঝতে পারি, আমি একজন বাংলাদেশে জন্মানো পাকিস্তানির সঙ্গে কথা বলেছি এতক্ষণ। ঘৃণায় আমার শরীর শিউরে ওঠে। আমার বন্ধু প্রশ্ন করেন, এতক্ষণ ধৈর্য ধরে এর সঙ্গে কথা বললেন কী করে? আমি বলি, জানিনা। আমার মনে বোধহয় একটুখানি বিশ্বাস ছিল ৩০ লক্ষ শহীদের এই দেশে এতবড় বেঈমান জন্মাতে পারে না...


প্রসঙ্গত: নব্যরাজাকারদের নাম/পরিচয় প্রকাশে আমার কোনো দ্বিধা নেই। সবার চিনে রাখা উচিত এইগুলোকে। কিন্তু কথা হয়েছিল আমার ফেসবুকে। সামাজিক যোগাযোগ সাইটের ব্যাক্তিগত ক্ষেত্রের কোনো বক্তব্য/মন্তব্য নাম সহ প্রকাশ করাটাকে সমীচিন মনে হল না বলে প্রকাশ্যে ছেলেটির পরিচয় দিলাম না।

২টি মন্তব্য:

সাইফুল আকবর খান বলেছেন...

কিছুটা না রে ভাই! আমি তো দেখছি- ওই জুনিয়র প্রাণীটার সাথে কথা বলে আর এটা এমন সবিস্তারে লিখে তুই অনেেএএএএএকটাই সময় নষ্ট করেছিস। এইভাবে শুধরায় না এমন কেউ। নিজের শক্তিক্ষয় আর বিবমিষা-বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো ফল নাই এমন সংলাপের। স্যরি, আমি এক-পঞ্চমাংশের পর পুরোটা আর পড়লাম না। সময়ের দামের কথা চিন্তা করে না, নিজের সীমাবদ্ধ মানুষ-স্নায়ুর প্রতি মায়া করে।
:-(

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

আমি শুধুই গোঁয়ারের মত চেষ্টা করে দেখতে চাই... :(