শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১১

রাজপুত্তুরের বিয়ে, গোলামীর উৎসব!

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটা গল্প মনে পড়ল,

গ্রামের একটি লোক একদিন হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে মোল্লাকে বলল, "সুখবর আছে মোল্লা সাহেব, আপনার পাশের বাড়িতে পোলাও-মাংস রান্না হচ্ছে"।
- "তাতে আমার কী!" মোল্লার জবাব।
- "আপনাকেও নিশ্চয়ই দাওয়াত করেছে...!"
- "তাতে তোমার কী?"

হাসির গল্প হিসেবে বলা হলেও এই গল্পটা আসলে দারুণ কষ্টের গল্প। ভয়াবহ দৈন্যের গল্প। এই দৈন্যতা মানসিক এবং আর্থিক। আর্থিক এইজন্যে যে, গ্রামের ওই লোকটির ক্ষমতা নেই একবেলা পোলাও-মাংস খাওয়ার। পোলাও-মাংসের সে বোধহয় কেবল নামই শুনেছে জীবনে। ক্ষুধার গ্লানি বলে বেড়ানো তার পাকস্থলি খেতে না পাক আর না পাক পোলাও-মাংসের নাম শুনলেই উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। কোথাও তা রান্না হচ্ছে, কেউ তা খাচ্ছে সেটা সেটা ভেবে ভেবে সে পোলাও-মাংসের স্বাদ অনুমান করার চেষ্টা করে।

তবে এই গল্পে গ্রামের ওই লোকটির মানসিক দৈন্য আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। কারো বাড়িতে পোলাও রান্না হলে তার কিছু যায় আসে না সেটি বুঝবার মতো মানসিক সক্ষমতা গ্রামের ওই লোকটির নেই। যে দৈন্যতা তার আত্মসম্মান বোধ ঢেকে দিয়েছে, সেই চাদর সরিয়ে একটুখানি মানুষ হয়ে ওঠার মানসিক শক্তি সে অর্জন করতে পারেনি।

*** *** ***

গত কয়েকদিনের আমাদের মিডিয়ায় উৎসবের আমেজ আমাকে আমাদের তীব্র মানসিক দৈন্যের কথা মনে করিয়ে দিল। মনে করিয়ে দিল সোভিয়েত ইউনিয়ন সময়ের রাশিয়ান নেতা নিকিতা ক্রুশভ'র একটা উক্তির কথা। তিনি বলেছিলেন, "ঔপনিবেশিক মানসিকতা হচ্ছে পোষা কুকুরের গলার বকলসের মতো। পোষা কুকুরের গলায় দীর্ঘদিন বকলস বেঁধে রাখার পর তা খুলে ফেলা হলেও কুকুর ওই বকলস ছাড়া আর চলাফেরা করতে চায় না"।

ব্রিটিশ রাজপুত্তুরের বিয়ের খবরে আমাদের মিডিয়া উৎফুল্ল। বড় বড় খবর, প্রথম পাতায় খবর, বক্স বানিয়ে খবর, অনলাইনে স্পেশাল ইফেক্ট দিয়ে খবর, বেশিরভাগ তো আমার চোখ এড়িয়ে গেছে বলেই মনে হয়! খবরে রাজপুত্তুর, তার বাগদত্তা এবং তাদের উভয়ের চৌদ্দগোষ্ঠীর সব বিষয় উঠে এসেছে। আমরা জানতে পারিনি কেবল রাজপুত্তুর তার শাহী টয়লেটে (সম্মান দেখিয়ে ল্যাভেটরি অথবা রেস্টরুম বলতে হবে কি?) তার 'শাহী মল' ত্যাগের পর কোন ব্রান্ডের টিস্যু পেপার ব্যাবহার করেন। মিডিয়াকর্মীরা জানার চেষ্টা করেছিল নিশ্চয়ই। তবে কিনা শাহী হাগুখানায় গোলামদের প্রবেশাধিকার নেই বলেই জানি। জানলাম ব্রিটিশ রাজপুত্তুরের বিয়ের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিতও হয়েছে আমাদের মিডিয়ায়। তবে এটা নতুন কিছু নয়। এই রাজপুত্তুরের বাবা মায়ের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছিল আমাদের জাতীয় টিভি চ্যানেল।

আমি অনেক ভেবে বের করার চেষ্টা করলাম এই রাজপুত্তুরের বিয়েতে আমাদের কিছুতে কিছু যায় আসে কিনা! দেখলাম, খোদ ব্রিটিশদেরই বিশেষ কিছু যায় আসে না। এ কেবল নামে রাজপুত্তুর। সাধারণ জনগনকে এরা বিনোদন ছাড়া আর বিশেষ কিছু দেয় না। বিরক্তি লাগে এই দেখে যে, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এরা রাজবংশ আর রাজবংশের নিয়ম টিকিয়ে রেখেছে। শুধু রাজার ঔরসে জন্মেছে বলেই বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী সে। সে নিয়ে অবশ্য আমার মাথা ব্যাথা নেই। ব্রিটিশরা রাজার কুকুরকেও সম্মানের চোখে দেখে। রাজার হাগুকে তারা 'শাহী হাগু' বলে মনে করে। করুক! তাদের রাজা, তাদের হাগু তারা যা ইচ্ছে করুক। কিন্তু তাতে আমাদের কী!

আমাদের মিডিয়া এতো উৎফুল্ল কেনো! আমাদের মিডিয়ায় এতো আয়োজন কেনো? রাজপুত্তুর কী তাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছে বিয়েতে? অথবা এটা কী এমন কোনো বিষয় যা আমাদের জাতীয় অথবা সামাজিক জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে?

তাই বলে রাজপুত্তুরের বিয়ের সংবাদ কি প্রচার হবে না! নিশ্চয়ই হবে। পেরুতে একটা গাধার দুইটা লেজ গজালে সেটা পত্রিকায় আসবে। মানুষ পড়ে আমোদ পাবে, অবাক হবে। কোন মুলুকের রাজা গ্লাসে পানি না খেয়ে বদনায় পানি খায়, এটাও সংবাদে আসবে। পাঠক আমোদিত হবে। কোনো দেশের রাজার বিয়ে হয়ে গেলেও খবর আসবে, ঠিক যেরকম একজন তারকার বিয়ের সংবাদ হয়। কিন্তু আমাদের মিডিয়া যা করছে সেটার কারণ কী! কোনো দেশের 'নামকাওয়াস্তে' রাজপুত্তুরের বিয়েতে আমরা কেনো এতো বেশি উৎফুল্ল! ভিনদেশী রাজপুত্তুরের বিয়েতে আমাদের কী যায় আসে! আমরা তার বিয়েতে কোথায় কী আয়োজন হচ্ছে, কে কী বলল, কে কী করল তা জানতে/দেখতে এতো আগ্রহী কেনো!

মানসিক এই দৈন্যতা আমরা আর কতদিন পুষে চলব? আর কতদিন আমরা প্রমাণ করে চলব, গলার দৃশ্যমান বখলসটা না থাকলেও মনে মনে আমরা ঠিকই বাধা পড়ে আছি গোলামী আর আত্মসম্মানবোধহীনতার এক অদৃশ্য বখলসে!

সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: