বুধবার, ১ জুন, ২০১১

টুকরো টুকরো দিন: হাতুড়িবাজ মেয়ে

কত দীর্ঘ কাল হয়ে গেল ব্লগ লিখি না। নিজের ব্লগে নিজেকেই অতিথি মনে হচ্ছে। এতো ভয়ঙ্কর ব্যস্ততা আমার! অথচ ঠিক এক বছর আগে এই সময়ে আমি নিতান্ত উল্টো পরিস্থিতিতে ছিলাম। ব্যস্ততার জন্য অপেক্ষা করছিলাম! নেটের আঁতিপাতি হাতড়ে খুঁজে মরছিলাম পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়! সেই খোঁজা শেষ হয়েছে। ব্যস্ততা খুঁজছিলাম, যথেষ্ট পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টাও পছন্দের। এই ক'দিন আগেও একটা ল্যাব খুঁজছিলাম। একজন পছন্দের প্রফেসর খুঁজছিলাম। খুঁজছিলাম মাস্টার্স থিসিসের একটা পছন্দমতো সুযোগ...

ব্যস্ততা অবশ্য শেষ হয় না। সকালে উঠে দেখলাম মেঘলা আকাশ। গত রাতে ঝড়ের আভাস ছিল। শেষরাতে বৃষ্টিও হয়েছে বোধহয় খানিকটা । এখানকার আবহাওয়া বেশ আইন মেনে চলে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অমান্য করেনা । সাধারণত সকাল বেলার রোদ্দুর আমাকে ধরে বেঁধে ঘুম থেকে তুলে দেয়। আজকে আকাশে মেঘের ভিড় ঠেলে সে আমার বিছানা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। খানিকটা দেরিতে উঠে ফ্রেশ হয়ে আসতে আসতে দেখি ঘড়ি খুব সুবিধাজনক সময় দেখাচ্ছে না। ইমিউনোলজি ক্লাস ছিলো। দৌড়লাম। বাসস্টপ থেকে কফির মগে ঘুম তাড়ানো সিরাপ নিয়ে ক্লাস পর্যন্ত যেতে যেতে আশঙ্কা করছিলাম দেরি হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য হল না। ক্লাস শুরুর মিনিট খানেক আগে দরোজা ঠেলে ঢুকলাম।

ক্লাস শেষে ঠিক ঠিক ৪৫ মিনিট সময় হাতে ছিল ল্যাব শুরুর। দুজন বন্ধু ছিলো সঙ্গে। তাদেরকে নিয়ে ঘড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেতে হলো। দুদ্দাড় করে খেয়ে জোর পায়ে হেঁটে যখন ল্যাবের দরোজায় পৌঁছেছি তখন ঠিক ঠিক বারোটা সাতাশ। ভাবলাম, বেশ, তিন মিনিটে কয়েকবার শ্বাস নেয়া যাবে অন্তত।

এই ল্যাবটা খানিকটা 'বেসিক' বিষয়ে। ব্যাকটেরিয়াল আইডেন্টিফিকেশন এন্ড ক্লাসিফিকেশন। আন্ডারগ্রাজুয়েট ছেলেপেলেরাই সাধারণত এই ল্যাবটা করে। মাস্টার্সের আমরা করছি খুঁটির গোড়ার মাটি আরো খানিকটা শক্ত করার জন্য। পার্ক থেকে মাটি আর নদী থেকে পানি এনেছি আমার টিমের আমরা দুজন। সেখান থেকে ব্যাকটেরিয়া ধরে ধরে নাম ঠিকানা বের করছি। মানুষের মতো দেখতে কিছু প্রাণির ক্লাসিফিকেশন করতে ইচ্ছে করে মাঝে মধ্যে আমার। ধরে ধরে বায়োকেমিকাল টেস্ট করে দেখলাম কতটুক ডুব দিয়ে কতটুকু জল খায় এরা! আর শেষমেশ ডিএনএ'র ঠিকুজি মিলিয়ে বলে দিলাম, কার ভেতর কতটুকু মানুষের বীজ, কতখানি পোকা!

রোজ রোজ ঘরে ফিরে পরের দিনের ল্যাবের প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রস্তুতি নিতে হয় সেমিনারের। আলসেমি করার জন্য একটুখানি সময় বাঁচিয়ে নিতে হয় এসবের ফাঁকে। সে সুযোগ অবশ্য রোজ রোজ মেলে না। কাল ছুটি বলে আজকে খানিকটা বেশি সময় পাওয়া গেলো। যে লাখখানেক লেখা মাথার ভেতর বেরোবার পথ হাতড়ে মরছে তাদের কয়েকটাকে মুক্তি দিতে হবে আজ। আমার প্রকাশক টুটল ভাই একটা ছবি চেয়েছেন। সেটা খুঁজতে গিয়ে হার্ডডিস্কের এখানে ওখানে বেশ কিছু 'আধা-নির্বান পাওয়া' লেখা পেলাম। প্রায় হারানো অনেকগুলো ছবিও। এইসব লেখা আর ছবি মিলে আমার দম বন্ধ করে ফেলার আগেই মুক্তি দিতে হবে এগুলোকে।

কত কত কাজ জমে আছে। সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরি তখন আলসেমি চেপে বসতে চায়। আমি নির্লজ্জটাকে কফি দিয়ে তাড়াই। গুনগুন করা গান ছেড়ে দেই। হালকা চালে নিজেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কাজে ভেড়াই। মাঝে মধ্যে অবশ্য তা খুব সহজে পারা যায় না। বেকায়দায় পড়লে একে ওকে ডেকে সাহায্য চাই। কেউ কেউ নরম গলায় সাহায্য করে। কেউ কেউ দুম করে মাথায় হাতুড়ি ঠুকে দেয়। আজকে কী মনে করে অাঙ্গেলা'কে ডাকলাম। কে না জানে, এই মেয়ে ঝানু হাতুড়িবাজ। আজ সন্ধ্যায় সে কোনো দয়ামায়া না করে বলে উঠল,
আজকে হিসেব-নিকেশের দিন
'গতকাল' মরে গেছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে জাহান্নামে...

"Yesterday is dead and gone" by Arch Enemy

 যাই, গোটাকয়েক ব্লগ লিখে কাজ করিগে...

কোন মন্তব্য নেই: