বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১১

অগোছালো শব্দমালা: ব্যাকটেরিয়া নাকি ছত্রাক!

কয়েক মাস আগে এক সদ্য পরিচিতের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। যেচে পড়ে ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করায় তার উপর যথেষ্ট বিরক্ত ছিলাম! "কী হে! কী অবস্থা! এখন তো একটু ব্যস্ত আছি, পরে কথা হবে..." টাইপ কথা বলে কেটে পড়ার তাল করছি, আচমকা লোকটি একেবারে আমার হৃদয়ের দুর্বলতম কোনে ঘাই মেরে বসল! যে কথা থামাতে চাইছিলাম, সে থামলো না। আরো বেশ কিছুক্ষণ কথা চলল। তার এ প্রশ্নে সে প্রশ্নে আমার পক্ষের বেশিরভাগ জবাবই অবশ্য 'জানিনা'-গোত্রের ছিলো। বিরক্তি, ব্যস্ততা এসবের উর্ধে সেটা একেবারেই সত্যি কথা। আমি আসলেই জানিনা। তবে সেদিনের পরে এই বিষয়ে লেখার কথা মাথায় ঢুকে গেলো। কিন্তু মাথায় ঢুকলেই তো আর হবে না। কত জঞ্জাল যে মাথায় ঢুকে মাথা ঠুকে মরছে তার হিসেব কে করবে! আজকাল যেসব নতুন চিন্তা মাথায় ঢোকে সেসব ওই জঞ্জালে পড়ে টুপ করে তলিয়ে যায়। আলোর মুখ দেখে না। সম্প্রতি ভেবে দেখলাম, হিসেব করে গুছিয়ে লিখতে গেলে আর লেখা হয়ে উঠবে না। খাপছাড়া-গোলমেলে হলেও যতদূর পারা যায় এখনই লিখে ফেলা ভালো।

তো যে লোকটির কথা বলছিলাম, সে জিজ্ঞেস করেছিলো, "ব্যাকটেরিয়া খারাপ নাকি ছত্রাক খারাপ?" উল্টো করে বললে, "ব্যাকটেরিয়া ভালো নাকি ছত্রাক ভালো?"। আমার হিসেবে ভালোর দিক থেকে এই দু'দল পরস্পরকে হরহামেশা টেক্কা দেয়। সহজে শ্রেষ্ঠত্ব হিসেব করা সম্ভব নয়। তবে কিনা লোকটি দীর্ঘদিন ধরে পায়ের সমস্যায় ভুগছে। তার ডাক্তার বলেছে সেটা "ফুট রট"। যে ব্যক্তি নিজে রোগে ভুগছে সে ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাকের মধ্যে কে কতটা খারাপ তা জানতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক।

যতদূর জানি বাংলায় 'ফুট রট'কে বলে ক্ষুরা রোগ। গবাদিপশুর ক্ষুরে এই রোগ হয়ে বলে এরকম নাম। প্রধাণত দুটি 'এনারোবিক' ব্যাকটেরিয়ার কারণে এটা হয়। এনারোবিক ব্যাকটেরিয়া হলো তারা যারা অক্সিজেন মুক্ত পরিবেশে থাকতে চায়। বাতাসের স্বাভাবিক অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে এদের কেষ্ট প্রাপ্তি হয়। ক্ষুরা রোগের জীবাণুগুলো সুস্থ সবল কোষে সংক্রমণ ঘটায় না। কেটে গেলে অথবা আঘাত পেয়ে যখন কোষ আর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না তখন এই জীবাণুগুলো সংক্রমণ ঘটায়। গরু-ছাগল দীর্ঘ সময় পায়ে কাদা-মাটি-পানি মেখে থাকে বলে এদের ক্ষুরের আশেপাশের সুস্থ কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এরকম অবস্থায়ও ক্ষুরারোগের জীবাণু রোগ বাধানোর সুযোগ পায়।

তবে কিনা, আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি বলব না মানুষের ক্ষুরা রোগ হওয়া খুব স্বাভাবিক। বরং আমার সবার আগে মনে পড়বে অন্য দুটি রোগের কথা। যদি এনারোবিক ব্যাকটেরিয়া থেকে রোগটি হয় তাহলে গ্যাংগ্রিন, আর যদি ছত্রাকের কারণে রোগটি হয় তাহলে "এথলেট'স ফুট"। গ্যাংগ্রিনের সম্ভাবনা প্রথমেই বাদ দিচ্ছি। এই রোগটি ভয়ঙ্কর, প্রায় চিকিৎসা নেই। আর এই রোগ বাধিয়ে কারো পক্ষে দুলকি চালে সেটা নিয়ে আলোচনায় বসা সম্ভব নয়। পায়ের যন্ত্রণায় যার "শ্যাম রাখি না কুল রাখি" অবস্থা সে খুব হালকা মানসিকতায় থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক। বরং সম্ভাবনা থাকতে পারে "অ্যাথলেট'স ফুট" হওয়ার। এই রোগটি খুব বেশী যন্ত্রণা না করেই বছরের পর বছর থাকতে পারে। পায়ের মৃত চামড়া উঠে যাওয়া খুব স্বভাবিক ধরে নিয়ে আক্রান্ত লোকেরাও চিকিৎসা নিয়ে খুব মাথা ঘামায় না এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে পরিবার পরিজনের মধ্যে যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা খানিকটা দুর্বল তাদের মধ্যে রোগটি বিলিয়ে বেড়ায়।

অ্যাথলেটস ফুট পায়ে হয়। শরীরের অন্য কোথাও হলে একই রোগের নাম বদলে হয়ে যায় রিং ওয়ার্ম। আগে মানুষের ধারণা ছিল কৃমি জাতীয় পরজীবি থেকে এটি হয়। আসলে তা নয়। রোগটি হয় ছত্রাক থেকে। খুব পরিচিত রোগ। রাস্তায় এই রোগের আশ্চর্য ওষুধ বেচে বহু লোকে করে-কেটে খাচ্ছে। বাংলায় একে "দাদ" অথবা "দদ্রু" বলে। এটি পায়ে হলে প্রথম দিকে টের পাওয়ার কথা নয়। পায়ের শুকনো মৃত চামড়া উঠে যেতে দেখা যায়। আঙুলের ভেতর দিক হালকা লাল হয়ে যেতে পারে। চুলকানি হতে পারে। রোগমুক্ত হওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজনীয় সতর্ক পরিচ্ছন্নতা এবং ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ দুটোই উপকারি। এই আলোচনায় বেশিদূর যেতে চাচ্ছি না। শুরু করেছিলাম, ছত্রাক আর ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কে বেশি মন্দ সেটা নিয়ে কথা বলতে। টুপ করে সেই আলোচনায় চলে যাই।

সরল ভাবে বললে, ব্যাকটেরিয়া বেশি খারাপ। কারণ এরা হরহামেশা মারাত্মক সব রোগ বাধিয়ে মানুষ মরে ফেলে। ছত্রাক সেই তুলনায় কম মানুষ মারে। সমস্যা হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়া রোগ বাধালে চিকিৎসা করা সহজ, ছত্রাকে বাধালে খুব সহজ নয়। এক কথায় এর কারণ বলে দেয়া সম্ভব নয়। তবে সরল করে কারণ হিসেবে বলা যায়, ছত্রাকেরা ইউক্যারিওট। আর ব্যাকটেরিয়ারা প্রোক্যারিওট।

তাতে হলোটা কী?

ইউক্যারিওট হচ্ছে যাদের কোষে দারুণ একটা গোছানো নিউক্লিয়াস আছে। নিউক্লিয়াসের যেসব বস্তু থাকার কথা প্রোক্যারিওটদের সেসব সারা কোষে ছড়ানো। মানুষ হচ্ছে ইউক্যারিওট। গাছেরাও ইউক্যারিওট। ফুল, পাখি, সজারু, হনুমান, টিকটিকি, কাক, কবুতর এমনকি পাহাড়ে আমার আদিবাসী ভাই বোনদেরকে নির্যাতনকারী নোংরা আর কুৎসিত প্রাণিগুলোও ইউক্যারিওট।

ইউক্যারিওট হলে সমস্যা কোথায়?

আমি আসলে খুব ভালো জানিনা। একটুখানি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করতে পারি। একটা ব্যাকটেরিয়া মারতে গেলে আমাদের আগে বসে হিসেব করতে হয় সে কী খায়, কী পরে, কিভাবে ঘুমায়, কীভাবে কাপড় কাচে, পরকীয়া করে কিনা, ফেসবুকে 'ফেইক একাউন্ট' আছে কিনা সেসব। যদি জানা যায় একটি ব্যাকটেরিয়া জিলাপি খেতে পছন্দ করে তাহলে চিনির সিরার বদলে বিষের সিরা দিয়ে জিলাপি বানিয়ে তাকে খেতে দিলেই কেল্লা ফতে। পেনিসিলিন নামক ব্যাকটেরিয়া মারার ওষুধটার কথা বলি। পেনিসিলিয়াম নামের এক ছত্রাক এই জিনিসটা বানায়। পেনিসিলিন ব্যাকটেরিয়াকে তার কোষ প্রাচীর (মানে চামড়া) বানাতে দেয়া না। পেনিসিলিন খেলে মানুষের শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়ারা তাই পটল তোলে। কিন্তু যে মানুষটি এই ওষুধ খেলো তার কিছু হয় না। সরল কারণটা ওই। মানুষ ইউক্যারিওট আর ব্যাকটেরিয়া প্রোক্যারিওট। মানুষের কোষ আর ব্যাকটেরিয়ার কোষ আলাদা। তাদের অনেক কাজ কারবার আলাদা।

ছত্রাকের ক্ষেত্রে এই থিওরি খুব সহজে কাজে লাগে না। কারণ ছত্রাক আর মানুষ দুজনেই ইউক্যারিওট। তাদের কোষের গঠনে আছে মেলা মিল। তাদের কোষের কাজকর্মে আছে অদ্ভুত সামঞ্জস্য। ছত্রাকের জন্য মারাত্মক কোনো বিষ পাওয়া গেলে তা মানুষের জন্যেও মারাত্মক বিষাক্ত হবার সম্ভাবনা থাকে! ছত্রাক যেসব রোগ সৃষ্টি করে সেসবের চিকিৎসা করতে গেলে সবার আগের বিপদটা এখানে। আর তাছাড়া, ইউক্যারিওটরা প্রোক্যারিওটদের চাইতে উন্নত প্রাণি। ইউক্যারিওটরা যতটা বিবর্তিত প্রোক্যারিওটরা ততটা নয়। বব ডিলানের "Blowing in the wind" অথবা ওই গানটার অনুবাদ কবির সুমনের "কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়" গানটা যারা শুনেছেন তারা খানিকটা বুঝবেন। মানুষের মতই ছত্রাককেও বুঝে ওঠা খুব সহজ নয়। অনেক খানি অপচয় করতে হয়!

ছত্রাকের ক্ষেত্রে এটা ঠিক অপচয় নয় অবশ্য। অসংখ্য গবেষক খুব আগ্রহ নিয়েই ছত্রাককে জানতে চেষ্টা করেন। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়ি সেখানে বেশীরভাগ কাজই হয় ছত্রাকের উপর। এই শহরটাই ছত্রাকের উপর গবেষণার জন্য বিখ্যাত। এখানে ছত্রাক কোষের একেকটা ইট খুলে নিয়ে দেখা হয় কোনটি ঠিক কিভাবে কাজ করে। মানুষের "ইমিউন সিস্টেমে" কোনটা কিভাবে সংকেত দেয়। আর মানুষের শরীরের রক্ষী কোষেরা তাদের সঙ্গে কিভাবে লড়ে। সে এক কুরুক্ষেত্রের ইতিহাস। মাথার ভেতর জমে ওঠা জঞ্জাল কমানোর তাগিদে সেসব নিয়েও কখনো লিখব আশা করি।
সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: