রবিবার, ১২ জুন, ২০১১

হঠাৎ শব্দেরা: আজ ১২ই জুন

মানুষের জন্মদিন আমার মনে থাকে না। নিজের খুব আপনজনদের জন্মদিনও নয়! যখন দেশে ছিলাম, তখন বন্ধুদের আর কাছের মানুষদের জন্মদিন ঠিক সময়ে মনে করিয়ে দেয়ার কাজটি খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করত আমার বন্ধু সুচিত্রা। আমি দেশ থেকে চলে এসেছি। সুচিত্রাও তার দায় থেকে বেঁচেছে! প্রয়োজনটি অবশ্য ফুরায়নি। সেই দায়টি এখন বয়ে বেড়ায় ফেসবুক। নিয়ম করে সে আমাকে মনে করিয়ে দেয় প্রিয়জনদের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর কথা। ফেসবুক থেকেই গতকাল রাতে যেমন আচমকা আবিষ্কার করলাম আকতার ভাইয়ের জন্মদিন! আকতার আহমেদ, আমার অতিপ্রিয় ছড়াকারদের একজন। সেনা শাসনকালে যখন দেশে "একুশে আইন" তখন তার ছড়ার বারুদ দেখেছি, বুক ভরে নিয়েছি সেই বারুদের ঘ্রাণ।

দিন বদলের হুজুগ তুলে
যা খুশি তা "ব্যান" করেছেন
সবকিছুকে তুচ্ছ করে
নিজকে "সুপারম্যান" করেছেন

হ্যান করেছেন ত্যান করেছেন
এক এগারোর ধ্যান করেছেন

আটকে রেখে "তাদের" আবার
মুক্তি দিয়ে "ফ্যান" করেছেন
সত্যি করে কনতো এ'সব
কার হুকুমে, ক্যান করেছেন?
আকতার আহমেদ; কনতো এ'সব ক্যান করেছেন
অথবা তাঁর রাজাকার বিরোধী ছড়া। মাত্র তিনলাইনের বারুদ এখানে তুলে দেই,
রাজাকার ইস্যুতে
'মানবতা' মুছে ফেল
টয়লেট টিস্যুতে
আকতার আহমেদ; মেরে দাও জামাতে
এই বর্ণনা শেষ হবার নয়। তাঁর ছড়ার উদাহরণ টানতে গেলে ব্লগ কেবল দীর্ঘই হতে থাকবে। গতকাল রাতে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে আচমকা খানিক শব্দ জুড়ে গিয়েছিল মনে মনে। কী ভেবে সেটা সচলায়তনে তুলে দিয়েছিলাম। এখানে আরেকবার লিখে রাখি,
শুনশান চুপচাপ নেই কোনো শব্দ
কতদিন হয়ে গেল আকতার স্তব্ধ
শব্দের ভাঁজে ভাঁজে বারুদের হুঙ্কার
বহুদিন হয়ে গেল, শুনিনা তো, আকতার

সরষেতে রাজ করে ভূত সব হরষে
আর কতো ঘুম ঝুম নাকে দিয়ে সরষে
শুরু হোক আরবার, হেঁইও বলে জোরসে
ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে কলমের মরচে
ছড়া আর শব্দের যুদ্ধের বাজুনি
হৃদয়ের ছন্দের শপথের সাজুনি

রাজাকার, ছাগু, কাগু ও বেয়াড়া জলপাই
বুঝে যাক সস্তায় আর কোনো ছাড় নাই
আকতার জেগে আছে, আছে তার ছন্দ
একুশে আইন এই বাংলায় বন্ধ!
জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে আচমকা এই লেখা অনেকদিন পর আবার আমাকে আকতার ভাইয়ের ব্লগ ঘুরিয়ে আনে। এসবের মাঝেই হঠাৎ মনে পড়ে আজ ১২ই জুন। কল্পনা চাকমার অপহরণ দিবস।
এইভাবে মিছে বলে
আর কতো... থাক মা
জানি ফিরে আসবে না
কল্পনা চাকমা!

ফিরে আসে বার বার
শকুনের শাসনই
বোকা মেয়ে তুমি বুঝি
তাই ফিরে আসনি?
আকতার আহমেদ; কল্পনা চাকমা
এক যুগেরও বেশি আগে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো ফেরদৌস নামের একটি প্রাণি! কী হয়েছিল আমার বোনের তারপর? কেমন ছিল সে? কী করেছিলে তুমি ফেরদৌস? তোমার কি কল্পনার মতো একটি মেয়ে আছে এখন? তোমার স্ত্রী, তোমার মা'কে কী সত্যি শ্রদ্ধা করেছো কখনো? তুমি কী বুঝতে পারো, মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয়? তুমি কি মানুষের শ্রদ্ধা আর ঘৃণা বুঝতে পারো? শুনেছি আমার অল্প বয়সী বোনকে অপহরণের জন্য তুমি দারুণভাবে পুরষ্কৃত হয়েছিলে। শুনেছি জাতিসংঘের মিশনে ছিলে, আমার বোনকে স্তব্ধ করে শান্তি আনতে গিয়েছিলে অন্য কোনো দেশে! অভিনন্দন তোমাকে!

কেমন থাকো তুমি ফেরদৌস? কেমন থাকো তোমরা? স্ত্রীর কপোল ছুঁতে গেলে কখনো কি কল্পনাদের কথা মনে হয় তোমাদের? তোমার ঘরে যে শিশুরা বেড়ে উঠছে তাদের জন্য কল্পনার সহ্য করে যাওয়া একটি মুহুর্তও কী ভাবতে পারো তোমরা? তোমাদের মায়েরা কী জানেন তোমরা কী করো? তাঁরা কি জানেন তাঁরা কী ধরেছিলেন গর্ভে?

ফেরদৌস, তোমরা কী ঘৃণা টের পাও? তোমরা কী বুঝতে পারো মানুষের স্মরণের প্রতিটি মুহুর্তে কী অসীম ঘৃণায় তোমরা ডুবে আছো, থাকবে?

তোমাদের কী তাতে কিছু যায় আসে! তোমরা কী ভাবতে পারো?

[এই লেখাটির একটি অংশ সচলায়তনে প্রকাশিত। আকতার আহমেদের ছড়াগুলো সচলায়তন এবং তাঁর বইয়ে পূর্ব প্রকাশিত]
এ বিষয়ে বিপ্লব রহমানের ব্লগ:কল্পনা চাকমা: পাপ মোচনের দায়

1 টি মন্তব্য:

Fahim বলেছেন...

কল্পনা চাকমার প্রতি শ্রদ্ধা। তোমাকে ভুলিনি বোন।ভুলতে দেব না।