শনিবার, ২ জুলাই, ২০১১

টুকরো টুকরো দিন: ল্যাবের দিনপঞ্জি

অনেকদিন না লিখলে হাতে মরচে ধরে। লিখতে থাকলেই লেখা আসে। লেখার তোড়ে ভেসে যেতে চায় মাথা-কিবোর্ড। কিন্তু সেসব জেনেও কিছু করার থাকে না। প্রথমত আমার বিখ্যাত অলসতা আমার সঙ্গ ছাড়ে না। মাঝে মাঝে মারাত্মক রাগ লাগে। গুণে দেখেছি, দস্তুরমতো বেঈমানী করতে দিন তিনেকের বেশি সময় লাগেনা! অথচ বছরের পর বছরেও আমার অলসতা সেটা শিখে উঠতে পারে না। প্রেমের পয়গম্বর হয়ছে ব্যাটা। বেঈমানী করবে না! অলসতার পরে থাকে ব্যস্ততা। অলসতা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আগে লিখতে বসতাম। এখন ব্যস্ত থাকতে থাকতে অলসতার সময় পাইনা। যাও খানিকটা পাই তাতে ক্লান্ত হবার আগেই আবার ব্যস্ত দিন চলে আসে।

ন'টায় ল্যাবে পৌঁছতে হলে অন্তত ৮ টায় উঠতে হয়। দুরত্ব এবাড়ি ওবাড়ি হলেও ঘুম থেকে উঠেই তো আর লাফ দিয়ে ল্যাবে চলে যাওয়া যায় না। আমার সামাজিক পাকস্থলির গ্রহন বর্জনের প্রয়োজন মিটিয়ে, প্রাণপণ ঝিমোতে থাকা চামড়া জলে ধুয়ে তরতাজা করে তারপর ল্যাবের রাস্তায় পা বাড়ানো চলে। ল্যাবে গিয়ে খানিকটা ঘুমের ঘোরেই কয়েকটা কাজ করা রোজকার রুটিন হয়ে গেছে। দরোজার পাশের হ্যাঙ্গার থেকে ঝুলতে থাকা ল্যাবকোটটা উঠিয়ে নিয়ে সেটা গায়ে জড়াতে জড়াতেই ডেস্কের নিচে ব্যাগটা ঠেলে দিয়ে কম্পিউটারের সুইচ টেপা। ল্যাব নোটবুকটাতে চোখ বুলিয়ে হিসেব করে নেয়া কী কী করতে হবে সারাদিন। তারপর যদি মিনিট কয়েক খেটেখুটে কিছু একটা "চলতে" দিয়ে মিনিট পনেরো সময় পাওয়া যায় তো বেশ। তা না হয়ে যদি দেখি টানা কাজ করে যেতে হবে আজকে, তাহলে কাজ শুরুর আগেই ল্যাবকোটটা আবার হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে কিচেনের দিকে পা বাড়ানো। কফি মেশিনটাকে হ্যালো বলে সেটার সুইচ টেপা। পরের মিনিটখানেক হুড়মুড় করে সেটা যখন কফির দানা গুঁড়ো করতে থাকে তখন সেই শব্দটাকে খানিকটা আমার ততক্ষণেও ঠিকঠাক জেগে না ওঠা নিউরণগুলোর প্রতি হুমকি বলে মনে হয়। কফির মগ হাতে আমি মনে মনে একটা কুচক্রী ধরনের হাসি দেই। যাবি কোথায় বাছা এবার! কাজের সময় প্যানপ্যানানি! বের করছি!

ঠিক সাড়ে বারোটায় বেশিরভাগে খেতে যায়। আমিও যাই সবার সঙ্গে প্রায়শই। নির্ভর করে কাজ থামিয়ে মিনিট চল্লিশেক সময় বের করতে পারবো কিনা তার উপর! তা না হলে সেই কিচেনেই কিছু মিছু গিলতে হয়। ভার্সিটির ক্যান্টিন পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠে না। দুপুরের খাওয়াটা কখনো কখনো মাঠে মারা যায়। সে অবশ্য কালে ভদ্রে এক্সপেরিমেন্ট ছেড়ে একেবারেই ওঠার সুযোগ না হলে। এমনিতে ল্যাবে খাওয়ার গল্প বেশ লম্বা। প্রায়শই এ সে কেক বানিয়ে নিয়ে আসে। কিচেনে ভিড় জমে যায়। গাছের চেরি পেড়ে ঝুড়ি ভরে ডাইনিং টেবিলে রেখে দেয় কেউ কেউ। চাইলে বৈকালিক কফির আগে তার কয়েকটা মুখে পোরা যায়। কখনো কখনো ভার্সিটির ক্যান্টিনের খাবারে রুচি উঠে গেলে সবাই মিলে রুচি পরিবর্তনের আয়োজন হয়। খাবার আসে কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে।

বাকিটা সময় কেবল ভাবতে থাকি। ক্যানডিডা অ্যালবিকানস ছত্রাকের একটা প্রোটিন নিয়ে কাজ করছি এখন। ব্যাটারা ওই প্রোটিনটা ব্যাবহার করে মানুষকে বেশ নাজেহাল করে বলে হাইপোথেসিস আছে। আমি দেখার চেষ্টা করছি আসলেই সেটা মানুষের শরীরে গন্ডগোল বাধানোয় কোনোভাবে দায়ী কিনা! ল্যাবে যতক্ষণ কম্পিউটারে থাকি, বেশিরভাগ সময় তাই এটা নিয়ে পড়াশোনা করতে করতে যায়। কেউ কোথাও আর কোনো গবেষণা করছেন কিনা, নতুন কী গবেষণা প্রবন্ধ বের হলো, কে কোথায় কী কাজ করছে এই প্রোটিনের উপর। হ্যানোত্যানোর শেষ নেই। আমার খোঁজেরও তাই শেষ হয় না।

এখানকার ল্যাবের একেকটা বিষয় দেখি আর হিংসে করি আমি। আমি ঠিক জাতীয়তাবাদী নই। মাটি প্রেম আমার মধ্যে কমই। তারপরও আমার হিংসা লাগে। এতো প্রাচুর্য কেনো এদের। এতো খরচ করে এতো এতো আয়োজন এরা কিভাবে করে গবেষণার জন্য! এর খানিকটাও কি আমার দেশে থাকতে পারতো না! আহা, কোন পাপে আমরা এতোটা পেছনে পড়ে আছি!

ল্যাব থেকে কখন ফিরি তার কোনো ঠিক নেই। কখনো কখনো কোনো এক্সপেরিমেন্ট শেষ করতে সন্ধ্যা গড়ায়। কখনো কখনো খানিকটা আগেই বেরিয়ে পড়ি। ল্যাব থেকে বাসায় হেঁটেই ফেরা যায়। আমি অবশ্য বাসেই চড়ি। সারাদিন টের না পাওয়া টানটান সময় খানিকটা হলেও ক্লান্ত করে তোলে। বাসের সিটে হেলান দিলে তাই এলোমেলো ভাবনা ঘুরতে শুরু করে মাথায়। কখনো সেসব আগামী কালের, কখনো আগামী দিনের, কখনো আজকের দিনের, কখনো কেবল কল্পনার।

বিরক্ত করে কেবল অতীত। যে অতীত ভাবনায় একই সঙ্গে অন্ধকার আর আলো হয়ে মিশে যেতে থাকে। বিরক্তিটুকু ছাপিয়ে হঠাৎ হঠাৎ আমি হেসে ফেলি। আমার চোখ মুখে অদ্ভুত কৌতুহল খেলা করে। সেই কৌতুহলের জবাব অবশ্য আমার কাছে আছে দীর্ঘদিন। সবকিছুর পরেও অবাক হই। অবাক হই আর হাসতে থাকি। আচমকা টের পাই বাসে বসে আছি আমি। কৌতুহলী চোখ নিজের দিকে টেনে আনার কোনো মানে হয়না। ততক্ষণে আমার নামার জায়গা চলে এসেছে। হাসিমুখেই ব্যাগটা কাঁধে তুলে গেটের দিকে এগোতে থাকি আমি...

কোন মন্তব্য নেই: