রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১১

এই লেখাটা লাকীর জন্য

মাঝে মাঝে খুব হতাশ হয়ে যাওয়ার মতো ব্যপার ঘটে। এবং মোটামুটি সয়ংক্রিয়ভাবেই আমি হতাশার গভীরে ডুবতে থাকি। বাজারে হতাশা এবং কষ্টের ব্যাবসায়িক দাম আছে। ফেইসবুক এতদিন খানিকটা একাই রাজত্ব করছিলো। এবার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে গুগল প্লাস। এই দুই সামাজিক সাইটের বদৌলতে আমি বেশ ভালোমতো দেখেছি, একটা শ্রেণী তারা কতো দুঃখী সেটা বলে ঢোল বাজিয়ে বাজার বাজিমাত করার চেষ্টায় চব্বিশ ঘন্টা ব্যস্ত থাকে! দুঃখের বাজার মূল্য এই যে, সেটা যারা দেখে তাদের সহানুভূতি জানাবার সুযোগ থাকে। সুযোগ থাকে সেই দেখনেওয়ালারাও কতোটা দুঃখী সেটা জানিয়ে কাছাকাছি আসার। কে না জানে একজন দুঃখী মানুষই আরেকজন মানুষের দুঃখ বুঝতে পারে! আর এতে তাদের মধ্যে একটা অন্যরকম সুযোগ থাকারও বেশ সুযোগ থাকে। তাছাড়া খুব দুঃখী লোকদের বিচার বুদ্ধি ঠিকমতো কাজ করে না।  আর বিচার বুদ্ধি কাজ না করলে আরো বেশ কিছু কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। কে না জানে, সহানুভূতি ব্যাপারটাই হচ্ছে অনুভূতির সহাবস্থান! বাংলায় যাকে বলে, একত্রে অনুভব করা!

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে এই, দুঃখ একেবারে আয়েশ করে অনেক যাচ্ছেতাই করবার সুযোগ দেয়। আর তাতে যদি কোনো পাপ হয় সেই পাপের ফলও ওই দুঃখই ভোগ করে। দেখাবার মতো দুঃখ বানাতে করতে পারলে, অথবা প্রস্তুত করা দুঃখ ঠিকঠাক বাজারজাত করার যোগ্যতা থাকলে তাই সেটা বেশ ভালো পণ্য হয়ে দাঁড়ায়।

দুঃখব্যাপারীদের দেখে দেখে আমারো যে শখ হয় না তা নয়। সমস্যা হচ্ছে, আমি দুঃখ করবার যথেষ্ট সময় পাই না। দুঃখ পরের ব্যপার। কী কী নিয়ে দুঃখ করা যায়, অথবা আমি কতো দুঃখী সেটা ভেবে বের করার জন্যেও খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হয়। সেই সময়টাও আমি পাই না। যখন খানিকটা অবসর মেলে, তখন হয়তো দুঃখী হতে ইচ্ছে করে না। তবে সবসময় এরকম হয় না। ঠিক দুঃখ কিনা জানিনা, কিন্তু মাঝে সাঁঝে উল্টেপাল্টে দেখার মতো বেশ খানিকটা হতাশা পেয়ে যাই আমি।

হয়তো কখনো ল্যাব থেকে ফিরে জানালায় ঠেস দিয়ে প্রতিবেশি পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে। অথবা হয়তো যখন মাঝরাতে সেই পাহাড় ছুঁই ছুঁই করে ঝুলে থাকা চাঁদ উঁকি দেয় আমার জানালায়। অথবা হয়তো যখন আমার পরিচিত পাহাড়গুলো ছেয়ে ফেলতে চায় জুলাইয়ের মেঘেরা। এরকম কোনো কোনো সময়ে বেশ খানিকটা হতাশ লাগে আমার। সেই হতাশাটুকু ভোগ করা অবশ্য সহজ হয় না। সেটুকু বাঁচিয়ে রাখতে গেলে আমাকে প্রাণপণ তার খাবার সরবরাহ করা লাগে। হতাশা থেকে আড়াল করে রাখা লাগে আমার বাঁকা হাসির নির্দয় ফলা। কারণ আমি জানি, কখনো কখনো খানিকটা হতাশাও উল্টে পাল্টে দেখতে হয়। বিক্রি না হোক, অন্তত নিজের জন্য হলেও।

ব্যবসার কোনোরকম বীজই আমার রক্তেই নেই। বাবা যতবার যতরকম ব্যবসার চেষ্টা করেছেন সবগুলোতেই সফলভাবে ব্যার্থ হয়েছেন। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার প্রায়শই কোনো গান বাজনার আয়োজনে বলতেন, তিনি যতবারই কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখার চেষ্টা করেছেন সব বারই সফলভাবে ব্যার্থ হয়েছেন। বাবার অবস্থা অনেকটা সেরকম)। মলিক্যুলার বায়োলজি পড়তে গিয়ে জেনেছি, সব যোগ্যতাই রক্তে অর্থাৎ জিনে থাকতে হয়। রক্তে না থাকলে ভালো ব্যাবসায়ী অথবা বেঈমান কোনোটাই হওয়া যায় না। সে যাই হোক, ব্যাবসায়ী হবার বেশ ইচ্ছে থাকলেও জীবনে আর আয়নায় নিজের চাঁদমুখখানা দেখতে পারব না বলে হতাশাগুলো দুঃখ বলে বেচে দেবার এমনকি চেষ্টাও করতে পারিনা আমি! আয়না দেখার লোভ থাকা ভয়ঙ্কর একটা ব্যপার। বেশ কিছু যোগ্যতা না থাকলে মানুষেরা আয়না দেখতে পারে না। আমি কতটা মানুষ জানিনা, মানুষ হই আর না হই, আমার পক্ষে আর যাই হোক আয়না দেখার লোভ ছাড়া সম্ভব নয়। দুঃখ বেচার লোভটা এজন্যই আমাকে ছাড়তে হয়!

বেচতে পারি না বলে হতাশাগুলো তাই আমার কাছেই থেকে যায়। আর থেকে যায় বলেই সেগুলোকে খানিকটা সময় দিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে বেশ একটা সময় কাটানোর ব্যবস্থা করা যায়। তবে কিনা এরকম সুখের সময় আমি খুব বেশি পাই না। কারণ ওই, হতাশাকে খাওয়ানোর মতো খাবার আমার খুব বেশি নেই। অতীত নিংড়ে তার খাবার বের করে আনতে হয়। আর তা করতে গেলেই হতাশ হবার বদলে আমি কেবলই হতবাক হয়ে যাই। আমার কেবলই মনে হয়, কিভাবে সম্ভব! এমনও হয়! কিভাবে!!!

আমার হতাশার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ থাকে। আমার দুঃখ কষ্টও আমার দীর্ঘদিনের চেনা। বিক্রি করিনি বলে ঘরে থেকেই বুড়ো হচ্ছে আমার মতো! এগুলো যত্ন করেই পুষি। বিস্মরণের নোংরামি থেকে নিজেকে বাঁচাতেই আমার এগুলো প্রয়োজন। কিন্তু হতবাক হতে আমার ভালো লাগে না। যে বিস্ময়ের কোনো জবাব নেই, সেই বিস্ময় আমার একেবারেই প্রয়োজন নেই। আমি বরং আস্থা রাখতে চাই, বিশ্বাসী হতে চাই। নির্ভর করতে চাই, নির্ভার হতে চাই। আমি নিজেকে সামলে রাখতে চাইনা, আগলে রাখতে চাই না।

আমার অবাক সময়গুলো ব্যস্ততা দিয়েই ধুয়ে দেই সাধারণত। তবে কখনো কখনো অসাধারণ কিছু ব্যপার কিছু মানুষ আমাকে বিহ্বল করে দেয়। আজকে অলস ছুটির দিনে যেরকম আমাকে হাজার মাইল দূরের একটা কণ্ঠ বিহ্বল করে দিল।

***

তোমাকে সম্ভবত আমি আধ যুগেরও বেশি আগে দেখেছি লাকী। তুমি যেখানে জন্মেছো সেখানে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর কোনো ঈশ্বরও কাউকে শিশু হিসেবে পাঠাতে চাইবে না। তুমি সেখান থেকে উঠে এসেছো। উঠে খুব সুখের সময়ে আসোনি, আমি জানি। তুমি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছো, সেখান থেকেও কোথায় কতদূর কীভাবে যেতে পারবে আমি ভাবতে পারি না। অথচ কী স্পষ্ট তোমার শব্দ। কীরকম শুদ্ধ তোমার চিন্তা। তোমাকে খানিকটা হলেও চিনি ভাবতেই আমি খুশি হয়ে যাই!

দুঃখের বিক্রিবাট্টা আমি যথেষ্ট দেখেছি। এবং স্পষ্টতই আমি জানি, সত্যিকারের দুঃখ বিক্রি করার নয়। সে কেউ কিনতেও চায় না। সে দুঃখ বিলাসিতা করবার নয়। সে সহ্য করতে অন্যরকম অলৌকিক মায়ের গর্ভে জন্মাতে হয়!  যে দুঃখ সত্যিকারের, সে কেবল সহানুভূতিতে ধুয়ে যায় না।

তুমি চোখ মেললেই দেখবে, দুঃখের চাইতে বড় পণ্য আর হয় না। দেখবে, লোকে সম্ভাব্য খদ্দেরের খোঁজে চিৎকার করে করে নিজের দুঃখ জানান দিয়ে বেড়াচ্ছে। সহানুভূতির সুখ মিললেই তাদের দুঃখ শেষ হয়ে যায়। বিস্মরণের মহৌষধ তারা পকেটে নিয়ে ঘোরে। তাদের হাস্যকর অপরাধ বোধও দুঃখের বাজারে বিক্রি হয়ে যায়। বিস্মরণের মহৌষধ তাদেরকে তীব্র সুখে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অথবা হয়তো তারা বাজার বদলে চেষ্টা করে দেখে আরো ভালো কোনো খদ্দের ধরার!

অথচ তুমি কখনো দুঃখ বিক্রি করতে চাও নি। সেই চিন্তাও তোমার মাথায় আসেনি। কারণ তোমার দুঃখ বেচে দিলে তোমার জীবনও বিক্রি হয়ে যায়! ভয়ঙ্কর পুড়ে গিয়েও তোমার নিজস্ব আয়নায় নিজের চেহারা দেখার লোভ তুমি ছাড়তে পারো না! তোমাকে অভিনন্দন।

তোমার চিন্তার শুদ্ধতার জন্য তোমাকে অভিনন্দন। দুঃখের ব্যাবসায়ী না হয়ে যাওয়ার জন্য তোমাকে অভিনন্দন। ভুলে যাওয়ার মতো নোংরা পাপ না করার জন্য তোমাকে অভিনন্দন। তোমার সাহসিকতার জন্য তোমাকে অভিনন্দন। মানুষে হয়ে ওঠার, মানুষে হয়ে থাকার জন্য তোমাকে অভিনন্দন।

আমার ভাবতেই ভালো লাগবে তুমি আমার প্রিয় কিছু মানুষের কাছাকাছি আছো। তীব্র ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকার মতো যন্ত্রণা আর হয়না। তোমাকে চিনি, এই ভাবনাটিই আমাকে কখনো কখনো আমার সেই যন্ত্রণা থেকে পালাবার সুযোগ করে দেবে।

কোন মন্তব্য নেই: