বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০১১

সুরঞ্জনার জন্য কমপ্লিমেন্ট

জুলস বরডেট পৃথিবীতে এসে আমাদের ধন্য করেন ১৮৭০ সালের ১৩ই জুন। মানুষের ভেতরেও যাঁরা সবার উপরে। ইনি তাঁদের একজন। এই লোকটি রক্ত খুব পছন্দ করতেন। পছন্দ করতেন মানে এই জিনিসটিতে ওনার অপার কৌতুহল ছিল। ওনাকে সালাম দিয়ে একটা গল্প বলি। এটি আসলে একটি ঘটনা। আমি গল্পের মতো করে বলছি।

বরডেট রক্ত নিলেন। আর তা থেকে আলাদা করে ফেললেন রক্তের সব কোষ। রক্ত থেকে কোষ আলাদা করে ফেলা খুব জটিল কিছু নয়। একশো বছর আগেও ছিল না। সবাই জানে, রক্তে থাকে লোহিত কণিকা। বাংলায় যেটাকে বলে লাল কণিকা অথবা লাল কোষ। থাকে অণুচক্রিকা। এটাকে বাংলায় কী বলে তা জানিনা। ছোট ছোট চক্র হবে কি? এরকম দারুণ একটা জিনিসকে এরকম কঠিন নাম দিয়ে মানুষের শত্রু, বিশেষত আমার মতো কমবুদ্ধি ছাত্রদের শত্রু বানিয়ে দেয়ার কৃতিত্বটি কার তা কে জানে! যাকগে, রক্তে তৃতীয়ত থাকে শ্বেত কণিকা, মানে বাংলায় যাকে বলে সাদা কোষ। এরা আদতে কিন্তু ঠিক সাদা নয়। হয়েছে কি, ওই লাল কোষে আটকা থাকে লোহার ছোট ছোট টুকরা। তাই এদের রঙ লাল। সাদা কোষের তো আর লোহা নেই তাই এদের রঙ লাল নয়। লাল নয় বলেই সাদা। সাদা বলতে বিশেষ রঙহীন হবে বোধ হয়! সাদা কোষদের রঙ না থাকলেও বিরাট ভুঁড়ি থাকে। আর ভুঁড়ি থাকে বলে এদের সারাক্ষণ খাই খাই লেগে থাকে। এরা জীবাণু অথবা শরীরের মরা কোষ পেলেই টপাটপ গিলে খেয়ে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে থাকে। এদের আমি নাম দিয়েছি গিলেখাদক :)

রক্তের যে এসব কোষ এগুলো ডুবে থাকে একটা তরল পদার্থে। ইংরেজিতে বলে সেরাম, বাংলায় রক্তরস। তো আমাদের বিজ্ঞানী বরডেট করলেন কি, এই রক্তরস আলাদা করে নিয়ে তাতে খানিকটা ব্যাকটেরিয়া ছেড়ে দিলেন। ব্যাকটেরিয়াদের সাঁতার শেখানোর চেষ্টা করছিলেন বোধ হয়। এমনিতে কিছু ব্যাকটেরিয়া খুব ভালো সাঁতার জানে, কিছু ব্যাকটেরিয়া জানে না। আমি অনেক ভেবে চিন্তেও ওই সাঁতার শেখানো ছাড়া আর কোনো কারণ বের করতে পারলাম না। বরডেটের ব্যাকটেরিয়াগুলো বোধহয় সাঁতার জানতো না! বরডেটের সাঁতার শেখানোর চেষ্টা সফল হলো না। ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে ভুত হয়ে গেলো। আমি হলে ভাবতাম নিশ্চয়ই হতচ্ছাড়াগুলো ডুবে মরেছে। বেশ হয়েছে। কিন্তু বরডেট তা ভাবলেন না। বরং উনি ভাবতে বসলেন।

ভেবে দেখলেন, ওনার ওই রক্তরসে কোনো কোষ নেই, তারমানে ওই খাই খাই স্বভাবের সাদা কোষগুলো নেই যারা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধরে খাবে। তাহলে ব্যাকটেরিয়াগুলো মরল কেনো? আর তাছাড়া ওই মরা ব্যাকটেরিয়াগুলোর শরীরে ফুটো কেনো?

বরডেটের সন্দেহ হলো, উনি করলেন কি, আবার রক্তরস নিয়ে সেটাকে সেদ্ধ করলেন। তারপর ওই রক্তরসে আবার ব্যাকটেরিয়া ছেড়ে দিলেন। এবার ব্যাকটেরিয়াগুলো বেশ চমৎকার হেসে খেলে বেড়াতে লাগলো রক্তরসে। তাদের মধ্যে মরার কোনো ইচ্ছেই আর দেখা গেল না।

বরডেট বললেন, রক্তরসে থাকে একটা জিনিস যেটা ব্যাকটেরিয়া অথবা অন্য কোনো কোষকে ফুটো করে দিতে পারে। তবে ওই জিনিসটা তাপ দিলে নষ্ট হয়ে যায়। উনি ওই জিনিসের নাম দিলেন অ্যালেক্সিন।

এরপর অনেক দিন কেটে গেল। নানা জায়গায় যুদ্ধবাজরা মানুষের রক্ত ঝরিয়ে খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগল। আর একদল বোকা লোক ভাবতে লাগল মানুষকে বাঁচানো দরকার। মানুষ এমনিতেই যথেষ্ট মরে যাচ্ছে। তাকে মারার জন্য কোনো দো'পেয়ে শ্বাপদ বানানোর দরকার নেই। এইসব লোকেরা ওই অ্যালেক্সিন নিয়ে বসে বসে চিন্তা করতে লাগলো আর নানা পরীক্ষা করতে লাগলো। পরীক্ষা করতে করতে তারা বের করে ফেলল, অ্যালেক্সিস আসলে প্রোটিনের একটা দল। সব প্রাণির রক্তে থাকে। তারা এর নাম দিল কমপ্লিমেন্ট প্রোটিন।

এই প্রোটিনেরা কী কী করে?

আলাদীনের প্রদীপের মতো এরা প্রায় সবকিছুই করে। ছোট তালিকা দেই:

সবার আগে এরা জীবাণুর গায়ে আংটা বসায়। ঘুরিয়ে বললে এরা গিলেখাদকদের কাঁটা চামচ হিসেবে কাজ করতে পারে। মানে এমনিতে জীবাণুরা পিছলা। পালিয়ে বেড়ায়। তাদের সহজে ধরা যায় না। কমপ্লিমেন্ট প্রোটিনেরা গিয়ে জীবাণুর গায়ে আংটার মতো লেগে থাকতে পারে। তাতে গিলেখাদকেরা শতগুণ সহজে জীবাণু ধরে গিলতে পারে। এই প্রকৃয়াটিকে বলে অপসোনাইজেশন।

রক্তরসের এই কমপ্লিমেন্ট প্রোটিনেরা কেউ কেউ খুব ভালো বংশীবাদক। বাঁশী মানে হুইসেল। এরা হুইসেল বাজানোর মতো করে শরীরের রক্ষী কোষদের সংকেত দিতে পারে যে শত্রু এসেছে। ঠ্যাং দোলানো বাদ দিয়ে জলদি এসে ঠেকাও!

চেহারার ভুগোল বদলে দেয়ার যে কথাটা বাংলায় প্রচলিত আছে। আমার সন্দেহ হয় সেই কথাটা এসেছে কমপ্লিমেন্ট প্রোটিনদের কাজ দেখে। এরা কিছু কিছু ভাইরাসের চেহারার ভুগোল বদলে দিতে পারে। সাঁপের বিষদাঁত ভেঙে দেয়ার মতো। তাতে ভাইরাসেরা নির্বিষ হয়ে যায়!

কমপ্লিমেন্ট প্রোটিনেরা আরো এটা সেটা অনেক কিছু পারে কিন্তু তারা সবচে চমকপ্রদ যে কাজটি করে সেটি হচ্ছে দশেমিলে করি কাজ পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়া অথবা অন্য জীবাণুর কোষ ফুটো করে দেয়া। প্রোটিনের নিশ্চয়ই বুদ্ধি থাকতে পারে না। কিন্তু এরা এমন দারুণ উপায়ে জীবাণুর কোষ ফুটো করে যে দেখলে সন্দেহ হয় এরা মারাত্মক বুদ্ধিমান। তিনভাবে এরা এই কাজ করতে পারে। সবগুলোর লক্ষ্য একই, জীবাণুর চামড়া ফুটো করে দেয়া। শেষ পর্যায়ের তাই তিনটা পদ্ধতি একইভাবে কাজ করে। পার্থক্য কেবল প্রথমদিকের কয়েকটা ধাপে। আমি সবগুলো মিলিয়ে একটুখানি ধারণা দেই,

কমপ্লিমেন্ট প্রোটিনদের নাম নেই। এদেরকে ডাকা হয় নাম্বার দিয়ে। যেটা সবার আগে আবিষ্কার হয়েছে সেটার নাম কমপ্লিমেন্ট প্রোটিন ১ সংক্ষেপে সি১। ১ নাম্বার, ২ নাম্বার, ৩ নাম্বার এভাবে ডাকলেও এরা কিছু মনে করে না। প্রথমে শরীরে জীবাণু ঢুকলে ৩ নাম্বার টের পেয়ে দুভাগ হয়ে যায়। সি৩ নাম্বার এ' আর সি৩ নাম্বার বি'। সি৩বি গিয়ে ৫ নাম্বার কে দুভাগ করে সি৫ এ' আর সি৫ বি' বানিয়ে দেয়। তারপর ওই সি৩বি+সি৫বি+সি৬+সি৭+সি৮ মিলে গিয়ে জীবাণুর গায়ে লেগে যায়। এটার পাশে এবার সি৯ গিয়ে পর পর জীবাণুর কোষে গেঁথে যেতে থাকে। তাতে জীবাণু কোষটা ফুটো হয়ে যায়। একটা তরমুজে একটা বৃত্ত এঁকে পরিধি বরাবর পরপর অনেকগুলো ছুরি গেঁথে দিলে যেরকম তরমুজটা ফুটো হয়ে যায় সেরকম।

গুগল ডকে একটা ছবিও এঁকে ফেললাম। তা না হলে তানিম্ভায়ের মতো মন্দ লোকে নিন্দা করে।

তো সবমিলিয়ে কমপ্লিমেন্টের ব্যাপার হচ্ছে এই। তবে কিনা কমপ্লিমেন্ট নিয়ে আমাদের এখনো অনেক কিছু জানতে বাকি। আর কেউ কেউ আছেন না জানতে পারলে যাঁদের খুব কষ্ট হয়। জানতে না পারলে যাদের খুব কষ্ট হয় তাদের অনেকেই তাই দিনরাত কমপ্লিমেন্ট নিয়ে বসে বসে ভাবেন আর এটা সেটা পরীক্ষা করে দেখেন। এরকম একজন হচ্ছেন প্রফেসর পিটার সিপ্ফেল। ভাগ্য গুণে এই প্রফেসরের ল্যাবে আমার একটুখানি কাজ দেখার সুযোগ হয়েছে, তাতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! মাথায় কিছু নেই বলে আমি বেশি কিছু ভাবতে পারছি না। তবে খবর সংগ্রহের কাজটি ঠিক ঠিক করে যাচ্ছি। কমপ্লিমেন্ট নিয়ে নতুন কোনো খবর পেলেই আমার হাজির হয়ে যাবো আপনাদের জানাতে।

বলে রাখি,

রক্ত রসে অ্যান্টিবডি নামের একধরনের জীবাণুরোধী প্রোটিনও থাকে। কিন্তু অ্যান্টিবডি থাকবে কেবল সেইসব প্রাণীর রক্তে যারা আগে কখনো ওই বিশেষ জীবাণুর সংস্পর্শে এসেছে। অ্যান্টিবডি জীবাণু চেনে, কমপ্লিমেন্ট প্রোটিন জীবাণু চেনেনা। অনেক আগে এদের নিয়ে লিখেছিলাম। আজকে আর সেদিকে না যাই।

আর,

জুলস বরডেট কেবল কমপ্লিমেন্টেই থেমে থাকেন নি। এটা সেটা আবিষ্কার করে করে জীবাণু আর মানুষের শরীররক্ষা সিস্টেমের একেবারে হেস্তনেস্ত করে ছেড়েছিলেন। অদম্য কৌতুহলের স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি চিকিৎসা ও শরীরবিদ্যায় ১৯১৯ সালে পেয়েছিলেন নোবেল প্রাইজ। হুপিং কাশীর জন্য দায়ী যে ব্যাকটেরিয়া বরডেটেল্লা পারটাসিস, সেটা উনি আর ওনার সহযোগী মিলে প্রথম প্রকৃতি থেকে আলাদা করেছিলেন। বরডেটেল্লা নামের ব্যাকটেরিয়ার যে গোত্রটি, সেটির ওনার নামেই নাম।

[সুরঞ্জনার সঙ্গে কথা হয়েছিল, সেও লিখবে, আমিও লিখব। আমি লিখেছিলাম ঠিকই কিন্তু সেটা ছিল বড্ড মারমার কাটকাট ধরণের একটা পোস্ট। ওরকম লেখায় আমি আরাম পাইনা। আর তাছাড়া ভাবলাম, এতো ভালো একটা মেয়ে, পৃথিবীর সব ভালো ভালো বান্ধবী কিনা যে দখল করে রেখেছে তার জন্য আরেকটা লেখা লেখাই যায়। এই লেখাটি তাই সুরঞ্জনার।]

সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: