রবিবার, ২৮ আগস্ট, ২০১১

ডেঙ্গু: ভাইরাসের চিঠি আর পত্রলেখক কোষ!

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ। শুনলাম, মশায় কামড়ালে ডেঙ্গু হয়! ঠিক বুঝলাম না। বাঘে কামড়ালে ডেঙ্গু হয়না কেন?!

জানলাম, মশার কামড়ে রক্তে ভাইরাস ঢুকে পড়ে, তাই ডেঙ্গু হয়। সেও ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না! প্রোটিনে মোড়া গোটাকতক জিন (gene) রক্তে ঢুকলেই ডেঙ্গু হতে হবে? আরো কতকিছু যে রক্তে ঢুকছে, তাতে ডেঙ্গু হয়না কেন? সাপ-ব্যাঙ যা আমরা খাই সবই তো ভেঙেচুরে সেই রক্তে ঢুকে পড়ে। অথবা সেকেন্ডে সেকেন্ডে যে অক্সিজেন ঢুকছে, তারবেলা? সিগারেট খেলেই যে দুম করে গণ্ডা গণ্ডা বিশ্রী বিশ্রী রাসায়নিক দুম করে রক্তে ঢুকে যাচ্ছে তাতে ডেঙ্গু হতে পারেনা?
জানলাম, ভাইরাস জিনিসটা কবিতার মতো। দুচার লাইনেই শেষ হয়ে যায়। তাই সে পড়ে ফেলা জটিল কিছু না। জটিল হচ্ছে সেটা বুঝতে পারা! তার দুচার লাইনেরই নানা মানে হয়। বুঝে ওঠা মুস্কিল! বুঝে ওঠার এই জটিলতা নিয়ে সাত পাঁচ ভাবছি, তখন পেলাম একটা চিঠি। সিটি সেন্টার থেকে পাঠিয়েছে। শহর চালানোর যে টাকা, সেটা কীভাবে খরচ করা উচিত বলে আমার মনে হয় তাই জানতে চেয়েছে। সঙ্গে পাঠিয়েছে ফর্ম, অব্যবহৃত খাম, আর একটা বুকলেট। বলে দিয়েছে আমি যেন আমার বন্ধুদেরও বলি এই ব্যপারে পরামর্শ দিতে। বেশ উৎসাহ পেলাম। ভাবলাম বন্ধুদেরও জানানো উচিত! তাতে সবাই মিলে এক বিরাট বিপ্লব করে ফেলা যায়!

দুম করে মনে হল, চিঠিটা তো ডেঙ্গু ভাইরাসের মতও হতে পারে! শহরটা যদি একটা প্রাণ হয়, আমি তাহলে তার একটা কোষ। ওই চিঠিটা একটা ভাইরাস। তাহলে?

ওই চিঠির ভাষা এরকম শক্তিশালী যে, সেটা আমার মাথার ভেতর ঢুকে গেছে। আমি তাই ওই চিঠিতে যা লেখা আছে সেইমতো কাজ করতে চাই। আর তা করতে চাই একেবারে জেহাদী জোশে! চিঠিতে লেখা আছে, আমি যেন ওটার কথা আমার বন্ধুদের জানাই। তারমানে এখন আমি নাওয়া খাওয়া ভুলে, প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে, আর বাজার করার পয়সা খরচ করে কাগজ, কলম কিনে আনব। আর ওই চিঠির কপি বানিয়ে বানিয়ে বন্ধুদের পাঠাতে থাকব যতক্ষণ একেবারে দেউলিয়া না হয়ে যাই! আমার বন্ধুরাও চিঠি পেয়ে আমার মত আরো চিঠি বানিয়ে বিলিয়ে বেড়াবে। তাতে একে একে শহরটাই সব কাজ ফেলে একটা চিঠি লেখার কারখানা হয়ে উঠবে!

তাছাড়া ওই চিঠি আমার নিজের হাতে লেখা, তাতে আমার স্বাক্ষর আছে। তাই নগররক্ষীরা ভাববে ওই চিঠি নির্দোষ প্রয়োজনীয় চিঠি। তারাও আর চিঠির বিস্তার থামাতে দৌড়ঝাঁপ করবে না!

ডেঙ্গু ভাইরাস আসলেও এরকম চিঠি। এডিস নামের মশারা ওই চিঠি এক জনের শরীর থেকে বয়ে এনে রক্তের কোষের কাছে পৌঁছে দিয়ে যায়। আর তাতেই কোষেরা উন্মাদ হয়ে ওঠে! কেন উন্মাদ হয়ে ওঠে? মানুষকে না হয় উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে ব্রেইন ওয়াশ করে ফেলা যায়, কিন্তু কোষকে?

কোষের ব্রেইন ওয়াশ করা খুব সহজ। কোষের ভেতর থাকে জিন। জিন হচ্ছে সৃষ্টির সবচে চমকপ্রদ ভাষায় লেখা এক ধরনের নীতিমালা। অনেকগুলো জিন মিলে হয় ডিএনএ। অনেক বিষয়ে লেখা ভিন্ন ভিন্ন চ্যাপ্টারের একটা বইয়ের মতো। ডিএনএ একটা বই হলে, একেকটা জিন একেকটা অর্থবোধক পাতা। সব প্রাণির, সব প্রাণের, সব কোষের* ওই নীতিমালার, অর্থাৎ ডিএনএর বই থাকে। কোষেরা রোবটের মতো ওই বই পড়ে পড়ে কাজ করে। মলাটে মোড়ানো ডিএনএ'র বইকে বলে ক্রোমোজোম। সবগুলো ক্রোমোজম নিয়ে কোষের যে লাইব্রেরি, সেটা হচ্ছে কোষের নিউক্লিয়াস। মানুষের কোষের লাইব্রেরীতে বই আছে মোট ২৩ রকমের। প্রতিটার দুটো করে কপি। সবমিলিয়ে ৪৬ টা বই। মানুষ নামের প্রাণিটার সবকিছু ওই বইগুলোতে লেখা। (*কিছু কিছু কোষে ডিএনএ থাকে না)

সে যাই হোক, ভাইরাস হচ্ছে প্রোটিনের খামে মোড়া কয়েকটা নীতিমালা। ওই খামটার বিশেষ গুণ হচ্ছে সেটা ভেতরের নীতিমালাগুলোকে কোষের নীতিমালায় জুড়ে দিতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে যা হয়, ডেঙ্গুর নীতিমালার কয়েকটা পাতা যখন মানুষের কোষের নীতিমালার বইয়ের মধ্যে জুড়ে যায় তখন আমাদের কোষও নিজের বইয়ের অংশ মনে করে ওই পাতাগুলোতে যা লেখা তা মেনে চলে! আর আমরা তো জানিই ডেঙ্গুর নীতিমালার ওই পাতাগুলোতে কোনো ভালো ভালো কথা লেখা নেই!

ওই পাতাতে লেখা থাকে যেন ওটার ফটোকপি করে ঠিক আগের মতো খামে ভরে বিলি করে বেড়ানো হয়। কোষেরাও বোকার মত তাই করতে থাকে।

কোষের নীতিমালায় ভাইরাসের নীতিমালা যোগ হয়ে গেলে নানারকম ক্ষতি হতে পারে। কখনো কখনো ওই নীতিমালায় লেখা থাকে যেন কোষের মালমশলা সব ক্ষয় করে হলেও নতুন চিঠি লিখে বিলি করা হয়। আর তা করতে গেলে কোষটাই মরে যায়! একেক ভাইরাসের চিঠি একেক রকমভাবে ক্ষতি করে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে যেভাবে ক্ষতি হয় সেটা বেশ চমকপ্রদ!

হয়েছে কী, শহরে অর্থাৎ শরীরে থাকে স্পেশাল ফোর্স। তারা এরকম চিঠির ছড়িয়ে পড়া বন্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু তাদের কাজ খুব আরামের নয়। ভাইরাসের খোঁজ পেলেই তারা সাইরেন বাজিয়ে দেয়, আর তাতে সারা শরীরের রক্ষী কোষদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। আর এসব সংকেতের ফেলে ভাইরাসের বিস্তারও নানাভাবে কমে যায়। কিন্তু এরকম সংকেতে শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে। জরুরি অবস্থার মতো অনেকটা। অথবা ফায়ার ব্রিগেডের মতো। হয়তো কোথাও একটুখানি আগুন লেগেছে আর তা হয়তো এমনিতেই নিভে যেত। কিন্তু ফারব্রিগেড খোঁজপেলেই বিরাট হোস পাইপ দিয়ে পানি ছিটিয়ে একেবারে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দেয়। তাতে আগুন নেভে হয়তো কিন্তু ঘরেরও বেশ ক্ষতি হয়ে যায়। দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যায় না। রক্ষণের মতো ভালো ব্যাপারেরও তাই সীমা থাকা দরকার। সীমা ছাড়ালেই সে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

ডেঙ্গুতে রক্ষীকোষেরা সংকেতের সীমা ছাড়িয়ে ফেলে! সীমাছাড়া সংকেতের ফলে যে শারিরিক অবস্থা হয় সেটা বলে ডেঙ্গু জ্বর। সংকেতের সীমা ছাড়ায় তখন যখন বেশী বেশী রক্ষী কোষ বেশী বেশী সংকেত দেয়া শুরু করে। রক্ষীকোষেরা সংকেত তখনই দেয় যখন তারা টের পায় শরীরে ভাইরাস ঢুকেছে। তারমানে রক্ষীকোষের সংগে ভাইরাসের যতবেশী যোগাযোগ, ততবেশী সংকেত।

কে না জানে, অ্যান্টিবডি হচ্ছে ছোট ছোট আংটার মতো। গিলেখাদকেরা, মানে যারা সব খারাপ খারাপ ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে গিলে খেয়ে ফেলে তাদের কাজে লাগে এই অ্যান্টিবডি। অ্যান্টিবডি বানায় আরেক ধরনের কোষ। আর অ্যান্টিবডির কাজও অনেক রকমের। সেসব নিয়ে আগে কখনো কখনো বলেছি। আজকে কেবল বলে রাখি, অ্যান্টিবডি ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়ার গায়ে লেগে থাকলে তাদেরকে গিলেখাদকের মতো রক্ষী কোষেরা খুব সহজে গিলে খেয়ে ফেলতে পারে। আর এসব কোষ, ইংরেজিতে যাদের বলে ফ্যাগোসাইট, এদের পেটে থাকে বিষ পোরা থলি। ওই বিষ পোরা পেটে পৌঁছালেই ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া সব মরে যায়!

কিন্তু হয়েছে কী, এইসব রক্ষীকোষেরাই আবার ডেঙ্গু ভাইরাসের শিকার হয়। ভাইরাসের নিয়ম হচ্ছে, তা সব কোষে সংক্রামিত হয়না। মানে ভাইরাসের চিঠি সব কোষ পড়তেই পারেনা। ডেঙ্গু ভাইরাসের চিঠি যেসব কোষ পড়তে পারে তাদের মধ্যে তালিকায় প্রথমে আছে শরীরের রক্ষী এসব গিলেখাদক।

দারুণ বিপদ! চোরেরা যদি পুলিশের ব্রেইন ওয়াশ করে ফেলে তাহলে যেরকম হয়! রাজনীতিবিদেরা যদি সব দেশকে পণ্য মনে করে তাহলে যেরকম হয়! তখন আমরা খুব অসহায় হয়ে যাই!

অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় লাগে। শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস ঢোকার ৬ দিনের মাথায় এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। অ্যান্টিবডি এই ভাইরাসের ফ্যাগোসাইটোসিসে (রক্তের এক ধরনের শ্বেত কণিকার জীবাণু খেয়ে ফেলার প্রকৃয়া) সাহায্য করে। কিন্তু একই সঙ্গে অ্যান্টবডি জুড়ে থাকায় এই ভাইরাস সহজে এসব রক্ষী কোষের পেটে পৌঁছে তাদেরকে সংক্রামিত করতে পারে। মানে, যে দড়িটা চোরকে বাঁধে সেটা গৃহস্থকেও বাঁধে। যে অ্যান্টিবডি ভাইরাস মারতে সাহায্য করে সেটা ব্যাবহার করেই ভাইরাসেরা ছড়িয়ে পড়ে! এই অদ্ভুত প্রকৃয়াটি এখনও ঠিক পরিষ্কার নয়। কীভাবে আর কেনইবা এরকম হয় তা এখনো** জানা যায়নি। (**জানুয়ারি ২০১০ পর্যন্ত)। 

শরীরে ডেঙ্গুর অ্যান্টিবডি থাকলে তাই পরবর্তী সংক্রমণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশুরা মায়ের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি পায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠেছেন এরকম মায়েদের সন্তানেরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাই তার প্রকোপ খুব বেশী হতে পারে। আবার দেখা যায় ডেঙ্গুর ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শরীরে সেই  'ধরনে'র*** ভাইরাসটির জন্য স্থায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায় যা পরবর্তীতে এর বিরুদ্ধে ভালো সুরক্ষা দিতে পারে (***ডেঙ্গু ভাইরাসের অনেকগুলো 'ধরন' রয়েছে)। এই ব্যপারটি খুব অদ্ভুত, যেটা আগের প্যারাতেই বললাম। আমি অবশ্য ভরসা হারাচ্ছি না। পৃথিবীর অনেক বুদ্ধিমান মানুষেরা (ডেঙ্গু) ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই এর কলকব্জা-নাড়িনক্ষত্র জেরে ফেলবেন খুব তাড়াতাড়ি।

কিন্তু যতদিন তাঁরা সফল না হচ্ছেন, ততদিন আমাদের আসলে কিছু করার নেই। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে এমনিতে শরীরের রক্ষী কোষদের সহযোগীতা অথবা সরাসরি ওই ভাইরাসকে ধ্বংস করার উপায় আমাদের হাতে নেই। তাই আপাতত ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে আমরা শরীরটাকে সবরকম সহায়তা দিয়ে যুদ্ধের ধকল সহ্য করতে সাহায্য করি। শরীরের রক্ষী কোষেরা ঠিকই এই এই ভাইরাসের বিস্তার বন্ধ করে ফেলে। আর তাছাড়া ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ এমনিতেও দীর্ঘস্থায়ী নয়।

আমরা তাই আস্থা রাখি। আমাদের আস্থা রাখতে হয়। বিশ্বাস না রাখলে মানুষেরা বাঁচে না। মানুষের সঙ্গে আর সব ইতর প্রাণির পার্থক্য কেবল বিশ্বাসে, কেবল বোধে...

কোন মন্তব্য নেই: