সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১১

অলৌকিক বৃষ্টি

আমি বৃষ্টি নিয়ে কখনো আদিখ্যেতা করেছি বলে মনে করতে পারছি না। আমার উড়নচণ্ডী বন্ধুমহলে আমিই সবচে বৃষ্টি এড়িয়ে চলেছি বলে মনে হয়! ঝুম বৃষ্টিতে বন্ধুরা ভিজতে নামেনি এরকম কমই হয়েছে! আমি নিজে বেশিরভাগ সময়েই পানির ছিটে থেকে গা বাঁচিয়ে বন্ধুদের সেলফোন বয়ে বেড়িয়েছি! সেইসব বৃষ্টির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে ভিজিনি বলে আমার কখনো আফসোস হয়নি। এখনো হয় না। বরং এখন সেই দিনে ফেরত গেলে আমি এখনো টং দোকানের বেঞ্চে পা উঠিয়ে গরম চায়ের কাপ হাতে বসে থাকব। বৃষ্টিতে ভিজব না। খুব পাত্তা দেইনা বলে বৃষ্টি নিয়ে ছটফট করে লিখতে বসারও মানে হয়না। কিন্তু আমি লিখছি। লিখছি কারণ, কয়েকদিন আগে থেকে বৃষ্টিকে অলৌকিক কিছু ভেবে নিতে আমার কষ্ট হচ্ছেনা!

ভূমিকা করি আগে। বছর দেড়েক আগের কথা। আমি ভয়াবহ অসুস্থ। অনুভূতিগুলো থাকলেও সেই সময়ের কবে কী হয়েছিল কিছু মনে করতে পারিনা। এমনিতে অনেক বছর আগের কোনো দিনের কথাও মনে করতে পারি। সবাই পারে। মানুষের স্মরণশক্তি ভয়াবহ। তার অবচেতন মনে সবই থাকে, কেবল সময় চেতন আর অবচেতন মনের ভেতর দেয়াল তুলে দেয় বলে তার বিশেষ কিছু মনে পড়ে না। সবাই এই ব্যপারটাকে পাত্তাও দেয়না। স্মরণের দায় এড়িয়ে হেসে-খেয়ে সুখে মরতে চায় অনেকেই। তবে আমি সবকিছু মনে করতে চাই। আর সেজন্য কখনো কখনো হাস্যকর নানা চেষ্টাও করি।

পুরনো ঘটনা একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে থাকে মানুষের মাথায়। একটা সুতোয় টান পড়লে অনেককিছুই নড়ে ওঠে! এই ব্যপারটাকেই অস্ত্র বানিয়ে চেষ্টা করি আমি। সেই ভুলে যাওয়া সময়ে কম্পিউটারে আমি কী করতাম! ফোনের মেমরিতে কোথায় কী আছে! কোনো ছবি কি আছে! কোন গানগুলো শুনতাম! কোন বইগুলো পড়েছি! কোন সিনেমাটা দেখেছি! কোথায় বসে থাকতাম! আমার চারপাশে কী থাকতো! কিছু কি লিখতাম! কোন কোন গন্ধ পেতাম! কোন সুগন্ধী ব্যাবহার করতাম! কী খেতাম বেশি! শখের বশে আমি মনোবিজ্ঞানের খানিক বই পড়ে দেখেছি। বই বেঈমানী করেনা। নানা উপায় বাতলায়। আর আমিও সেসব টোটকা মেনে আঁতিপাতি করে নেড়ে দেখি নিজের মস্তিস্ক! একটা একটা সুতো খুঁজে বের করতে চেষ্টা করি খুব সাবধানে! কালেভদ্রে সেই সময়ের আবছা খানিকটা ঝলক মনে পড়ে, তাতেই আমার আত্মা কেঁপে যায়। কিন্তু বাস্তবে আমি আমার অতীত উদ্ধারে প্রায় বিফল থেকে যাই!

ব্যার্থতার দায়টা সময়ের ঘাড়েই চাপাই! সেই সময়ে আমি কম্পিউটারে বিশেষ বসতাম না। কোনো গান শুনতাম না। সিনেমাও বিশেষ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে কয়েকটা বই পড়েছি। সেসবের মধ্যে শাহাদুজ্জামানের কয়েকটি বিহ্বল গল্প, পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ, আবুল হোসেনের কাব্যসমগ্র, আর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ'র দুইখণ্ড কাব্যসমগ্র। আর কিছু নেই। থাকার কথাও নয়। সেসময় সজ্ঞানে স্বাভাবিক সময় আমি প্রায় কাটাইনি। প্রায় পুরোটা সময় অসুস্থতা আমাকে চেপে ধরে রেখেছিল বিছানায়।

আমি অবশ্য চেষ্টা থামাই না। দেশ ছেড়ে আসার সময় কবিতার বই নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। কিন্তু আসার মাস তিনেকের মধ্যেই ডাকযোগে আমি হাতে পেয়েছি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ'র কবিতার সমগ্র দুটো। তার পাতায় পাতায় এখানে ওখানে আমার কলমের রেখা, ছোটো ছোটো শব্দ লেখা কোথাও কোথাও! কোথাও মার্কারের নীল দাগ কবিতার একেকটা লাইনকে নীল করে তুলেছে! বইদুটো আমি হাতে নেই, নেড়ে চেড়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি, সময় হারায় না। সময় এক অলৌকিক শিল্পী, জীবনের কোনায় কোনায় সে নিজের ছবি এঁকে রাখে! বিস্মরণ থাকে ঠিক, কিন্তু তার বিনাশ নেই!

আবুল হাসানের কবিতার বইটা হাতে পাইনি। চেষ্টা করেও পাঠাতে পারেনি আপু। ঠিক সপ্তাহখানেক পর হাতে পাব বলে আশা করে আছি। ততক্ষণ কবির কথা মেনেই মুখ বুজে আছি। মুক্তো ফুটবে কিনা কে জানে!

ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!
[আবুল হাসান]
তবে শেষ পর্যন্ত কবিতা সব ফিরিয়ে আনতে পারেনা। একটুখানি ফিরে আসে। টুকরো টুকরো সময়। টুকরো টুকরো অতীত। সুতোগুলো হাতের নাগালে নেই বলে আমি ঠিকঠাক চেষ্টাও করতে পারিনা। অবাক কাণ্ড, চেষ্টা ছাড়াই আমি অনেকখানি অতীত ফিরে পাই একদিন! অলৌকিক বৃষ্টির প্রসঙ্গটা এখানেই।

এমনিতে জার্মানির বৃষ্টিকে পাত্তা দেয়ার মতো কিছু নেই। সাধারণত যা হয়, তা কখন হলো, কখন গেলো টের পাওয়া যায় না। টিভি সংবাদের জনজীবনে দুর্ভোগ অথবা কাদাপানি জাতীয় কোনোকিছু কখনো নজরে আসে না। তাই বৃষ্টি থেমে গেলে তার কার্যকারিতাও শেষ। আফটার ইফেক্ট বলে কিছু নেই! এই বৃষ্টি খানিকটা গায়ে পড়লেও ছোটাছুটি করতে হয় না। এখানে বাতাসের আর্দ্রতা খুব কম বলে, নিমেষে সব পোশাক-আশাক শুকিয়ে যায়। গায়ে পানি পড়লে ঠাণ্ডা লাগে কেবল। ঝুম বৃষ্টির কাছাকাছি যে জিনিসটা এখানে কখনো কখনো হয় সেটাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলে বস্তুত টেরও পাওয়া যায় না তার উপস্থিতি। এরকম নির্বিষ নিরামিশ জার্মানির বৃষ্টি আমাকে তার উপস্থিতি আর ক্ষমতা জানান দিল কয়েকদিন আগে। বলা যায়, নাড়িয়ে দিল। সেই ঘটনা বলি।

ছুটির দিন। নিজেকে খানিকটা ছুটি দেয়ার মতো করে এলিয়ে ছড়িয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গেছি দুপুরের পর। ঘুমিয়ে সন্ধ্যা পার করে ফেলেছি! দেশের হিসেবে যখন সন্ধ্যা হয় এখানে তখনও অবশ্য স্পষ্ট আলো থাকে। কিন্তু সেদিন ছিলনা। আমার ঘুম ভেঙেছে ঠাণ্ডা বাতাসে! উঠে দেখি আকাশ অন্ধকার করে ফেলেছে মেঘ! ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে। আমার ঘরের অন্য পাশের জানালাটা খোলা। আমি ঘুম চোখে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে কেন জানিনা, জানালায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়েছি। তক্ষুণি এক ঝটকায় আমার ঘুম কেটে গেল। আমার মনে পড়ে গেল আমার হারানো অতীতের অনেকখানি সময়। আমি স্পষ্ট স্থবির হয়ে গেলাম। স্থবির হয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকলাম।

স্পষ্ট দেখলাম, গভীর রাত। খুব ধীর পায়ে হেঁটে ঘরের বাইরে বেরিয়েছি। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে মৃদু। ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। পার্কিং স্পেস পার হয়ে গেটের কাছটায় চারকোনা পিলার। বোধহয় যুগ পার হয়ে গেছে হেঁটে হেঁটে আমার সেখানে পৌঁছুতে। পৌঁছে যেন আমি বেঁচেছি হাঁফ ছেড়ে। পিলারটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে খানিক নির্ভার হয়েছি। হালকা বৃষ্টির ছিটে লাগছে গায়ে। আর আমি নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। সেখানে কিছু দেখা যাচ্ছে না। দূরের ল্যাম্পপোস্টের খানিক আলো, আর এবাড়ি ওবাড়ির দুয়েকটা বাতি অন্ধকারকে ঝাপসা করে ফেলেছে। আমি সেই অন্ধকারেই তাকিয়ে আছি। আমার খুব কষ্ট হওয়ার কথা সেই ভয়াবহ শূন্যতায়। কিন্তু আমি নির্বিকার হয়ে আছি। আমি কেবল অপেক্ষা করছি। কষ্ট অন্ধকার শূন্যতা কোনোকিছুই গায়ে না মেখে আমি দীর্ঘ অপেক্ষা করছি।

আমার মিলিয়ে নিতে সমস্যা হয়না। সেসময় আমি ভালোরকমের অসুস্থ। বাসায় থাকি সারাদিন। ডাক্তার কীসব ওষুধ দিয়েছে, খেলেই শরীরের কলকব্জা সব স্থবির হয়ে যায়। কখন ঘুমাই কখন জাগি তার কোনো ঠিক নেই। বস্তুত আমার সেসব কিছু মনেও নেই। আমার কেবল মনে পড়ে যায়, কখনো কখনো আমি অনেক রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠতাম। কখনো কখনো স্থবির হয়ে শুয়ে থাকলেও ঘুমাতাম অনেক দেরিতে। ঢাকা শহরের আধুনিক বস্তিবাড়ি। জানালা খুললে সে পাশের বাড়ির দেয়ালে গিয়ে লাগে খায় প্রায়। জানালা আমি কখনো খুলতামও না। কেবল জেগে থাকা কোনো কোনো রাতে আমি দরোজা খুলে বেরোতাম। ছোট্ট পার্কিংস্পেসটা পার হলেই গেট। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে সামনের ফাঁকা রাস্তার উপরে আকাশের একটুখানি দেখা যেত। জুন-জুলাই মাস। তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি হতো কখনো কখনো। গেটের পাশে দাঁড়ালে বৃষ্টির ছিটে গায়ে লাগতো। আমি তবু সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। খুব বেশিক্ষণ নয়, খানিকটা সময়। তারপর হাঁপিয়ে উঠে টলমল করে বিছানায় গিয়ে পড়তাম আবার। তবে সেটুকু সময়েই বৃষ্টি একটা সুতো হয়ে গেঁথে যেত আমার সেই সময়ে।

গেঁথে যাওয়া সেই সুতোয় টান পড়ে আজকে এতদিন পর জার্মানির অচেনা এই বৃষ্টিতে। আমি সেই সময় মনে করতে পেরে বিহ্বল হয়ে যাই। আমি হতবাক হয়ে থাকি। অথচ অদ্ভুত এক শান্তি পাই। ব্রত পালনের মতো একটু একটু করে লিখে ফেলতে থাকি সেইসব দিন। আর আমার শব্দরোধী, তাপরোধী জানালার কাঁচ ভেঙে আকাশের দিকে নজর রাখতে চেষ্টা করি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করি। মেঘ জমতে শুরু করলেই চা বানিয়ে ফেলি। যখন জল ঝরতে শুরু করে আকাশ চুঁইয়ে, তখন জানালায় কনুই রেখে আকাশে চোখ রাখি। বৃষ্টি আমার চেতন আর অবচেতন মনের ভেতরের দেয়াল ধুয়ে দেয়। আমি তাকিয়ে দেখি আমার অতীত। সেই বিহ্বল সময়ের একটা একটা শব্দ পড়তে চেষ্টা করি। আর বৃষ্টিকে ধন্যবাদ দেই। ব্যপারটা উদ্ভট আদিখ্যেতার মতো দেখাতে পারে। তবে বিশ্বাস করি, যে দায় আমার নিজের কাছে, সেই দায় মেটানোর জন্য পরবাসের একান্ত নির্জনে খানিকটা আদিখ্যেতা করাই যায়...

একটা বৃষ্টির ছবি। রাত ৯'টা। দূরের পাহাড়ে এখনো ঝলমলে আলো। আকাশ জুড়ে জোড়া রঙধনু। আমার ক্যামেরায় আঁটেনি।

৪টি মন্তব্য:

cookingsherrydilemma বলেছেন...

সুন্দর লেখা, পড়তে খুব ভালো লাগলো।

সাকিব জাওহার ব্রত বলেছেন...

অনেক দিন পরে আপনার লেখা পড়লাম দাদা... সেই পুরনো মুগ্ধতার অনুভুতিটা আবার ফিরে পেলাম...ঃ)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

খুকি, তুমি পড়েছ জেনেও ভালো লাগল :) তোমার লেখা পড়িনা অনেকদিন।

সাকিব, পড়েছ আর মন্তব্য করেছ দেখে ভালো লাগল। লেখো না কেন? তুমি ভালো লিখতে।

নীল রোদ্দুর বলেছেন...

http://tuptap.blogspot.com/2011_03_14_archive.html

বৃষ্টিরা ভালো থাকুক, বৃষ্টি এলে ঝিনুক তার খোলসের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে শুদ্ধ করে নেয় বারে বারে...