মঙ্গলবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১১

নাহিয়ান, বেঁচে ফিরতে পারলে পালিয়ে যেও!

আমি তোমার বয়সী বলেই তুমি করে বলছি। তোমার মিউজিক আমার পছন্দ। আমি হার্ড মেটাল মিউজিক দারুণ পছন্দ করি। তুমি হার্ড মেটাল মিউজিকের ছেলে। আমি জানি। পাওয়ারসার্জ নামের তোমার ব্যান্ডটি খুব কম বয়সী কিছু ছেলের হাতে গড়া। প্রতিভা কম বয়সেই প্রকাশ পায়। আমি তোমাদের মিউজিকে মুগ্ধ। মুগ্ধ আরো অনেকেই। আমি তোমাদের কনসার্টে হাজারে হাজার তারুণ্যকে নাচতে দেখেছি তোমার বাজনাদের তালে।


তুমি মিউজিক ভালোবাসো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দিনভর তুমি মিউজিক নিয়ে পড়ে থাকো সে কারো অজানা নয়। তোমার ধ্যান জ্ঞান মিউজিক। আমি জানি।

কিন্তু তুমি বোধহয় ভুলে গেছিলে, তুমি উদ্ভট এক দেশে জন্মেছ। আর এইদেশে জন্ম নেয়াটাই এক ভয়াবহ অপরাধ। এখন তুমি রক্তে মজ্জায় বুঝতে পারবে কোন ধরণের শকুন এই দেশ চালায়।

স্পষ্টতই কাগজে কলমে এদের অস্তিত্ব নেই। কাগজে কলমে এই দেশ সম্ভাবনাময়। আবেগী মানুষের আত্মসান্তনায় এই দেশ সকল দেশের সেরা। কিন্তু এই দেশের প্রতিটা মানুষ জানে,

এখানে অর্থ অথবা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী না হলে বাঁচা দায়।
এখানে খুনের আসামী মাফ পেয়ে যায় আর মন্ত্রীসভায় বসে রাজাকার।
এদেশে কারো পরিবারে একজন সন্ত্রাসী থাকা খুব সৌভাগ্যের বিষয়।
এদেশে আইন ভাঙতে পারা কৃতিত্ব।
এই দেশে বস্তুত আইন বলে কিছু নেই। তুমি পুলিশকে টাকা দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে।
এই দেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লতায়পাতায় কোনভাবে যুক্ত হতে পারলেই তুমি ক্ষমতাবান।

এই তালিকা দিয়ে শেষ করা যাবেনা। এই তালিকার প্রতিটি অক্ষর সবাই জানে। কাণ্ডজ্ঞান হবার পরেই সবাই জেনে যায়, এদেশ সব সম্ভবের দেশ। এই দেশে তাই পাড়ার মাস্তান হওয়া ভালো একটা ব্যপার। মাস্তানের বন্ধু হওয়া ভালো একটা ব্যাপার। এই দেশে রাজনীতি একটা পেশা। এদেশের ছেলেরা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেয়।

নাহিয়ান, তোমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে শুনলাম। সবাই জানে এই উদ্ভট দেশের পুলিশ আইন মানে না। তারা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সবচে বড় কথা, এরা পশু শ্রেণীর। এরা হাসতে হাসতে মানুষকে নির্যাতন করতে পারে। সেই নির্যাতন অবর্ণনীয়। এবং সেটা তারা করে অভ্যাসবশতঃ। কারো উপর নির্যাতন করতে এদের কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না। সেই কথাটিও সবাই জানে। এই দেশে তাই কাউকে পুলিশে ধরলে সে অন্যায় করেছে কিনা তা নয়, লোকে আতঙ্কিত হয় পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে।

পুলিশে কাউকে ধরে নিয়ে গেলে কিছু বলা উচিত নয়। তুমি আমার পছন্দের মানুষ মানে এই নয় যে তুমি কোনো অন্যায় করতে পারনা। তুমি অন্যায় করে থাকলে অবশ্যই তোমার নামে মামলা হোক। তোমাকে পুলিশে গ্রেপ্তার করুক এবং আদালতে তোমার বিচার হোক। কিন্তু সেটা হয়নি। পুলিশ তোমাকে গ্রেপ্তার করেছে এবং পিটিয়েছে। তোমাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়েছে দীর্ঘ সময়। আজকে রাত তুমি থানাতেই থাকবে, জানিনা কী হবে! নিশ্চিত করে বলতে পারি খুব সুখে থাকবে না। নির্যাতিত হবেই!

এমনিতেই এদেশের পুলিশ অশিক্ষিত এবং বর্বর। এরা কাণ্ডজ্ঞানহীন মৌলবাদী হয় বলে, তুমি যদি লম্বা চুল রাখো সেটা অপরাধ! তুমি যদি রাতের বেলা হাঁটতে বেরোও সেটা অপরাধ! তুমি যদি তোমার পোশাকে আশাকে অথবা জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আনো সেটাও অপরাধ! এই পুলিশেরা কখনো কারো সঙ্গে ভদ্র ভাষায় কথা বলে না। এদেরকে কোনো প্রশ্ন করা যায়না! সুতরাং তোমার জীবনযাত্রা যে পুলিশের চক্ষুশূল হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনিতে তো নির্যাতিত হতেই, লম্বা চুল রেখেছ বলে আরো নির্যাতিত হবে! গিটার বাজাও অথবা গান করো বলে আরো নির্যাতিত হবে! তুমি এই দেশে জন্মেছ বলে পুলিশ নামের যে রাজনৈতিক বাহীনিটিকে এদেশের সাধারণ মানুষ সবচে বেশী ভয় পায় তাদের হাতে তুমি নির্যাতিত হবে!

এদেশের সবাই জানে, এখান থেকে পালিয়ে "বিদেশ" যেতে পারা খুব সৌভাগ্যের বিষয়। সেই বিদেশ কোন দেশ তাতে কিছু যায় আসে না, সেই বিদেশে গিয়ে কী করবে তাতে কিছু যায় আসেনা। এদেশ ছেড়ে যেতে পারলেই এদেশের লোকেরা নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করে! অথচ তুমি এই উদ্ভট দেশে মিউজিকের সঙ্গে জীবন কাটাবার চিন্তা করছিলে! তুমি বোধহয় খানিকটা ছেলেমানুষ! বোধহয় অনেকটা আবেগী! সঙ্গীতের সঙ্গে থাকো বলে তুমি ভুলে যাও পৃথিবীতে শ্বাপদই বেশী!

যদি বেঁচে ফিরতে পারো তো ভালোবাসার মতো ছেলেমানুষী বাদ দিয়ে বরং ঘেন্না করতে শিখো। যে শ্বাপদ মানুষ পেটায় তাকে ঘেন্না করো। ক্ষমতাবান মাস্তান দেখলে ঘেন্না করো। আইন ভাঙতে পারা বীর ঘেন্না করো। রাজনীতিক ঘেন্না করো। আর যতো দ্রুত সম্ভব পালিও। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের যে ভুখণ্ডটিকে ৩০ লাখ পবিত্র প্রাণ তাঁদের রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছিলেন, সেই ভুখণ্ডটি এখন শকুনের আবাস। সেখানে ভালোবাসার মতো ব্যপার খুব হাস্যকর একটা আবেগ! এখানে বেঁচে থাকতে পারাটাই আনন্দের সংবাদ!

এই লেখাটি খুব তাড়াহুড়া করে লেখা! অনেকখানি কষ্ট জমে আছে বলে, লেখাটিও হয়েছে অগোছালো। তোমার খবরটি জানার পর থেকেই একটা দায় বোধ করছি! এই লেখাটি লেখা খানিকটা সেই দায় পূরণের তাড়না থেকেই! তোমার প্রতি দায়বদ্ধ এই দেশের সবকটি মানুষও! এই দেশটা এদেশের মানুষের। কাঁটাতারে একটা ভূখণ্ড ঘিরে ফেললেই সেটি একটি দেশ হয়ে যায় না! দেশের দায় তাই তার মানুষকেই নিতে হয়! আমি নিজে পালিয়েছি বলে নিজের দায় মেটাতে অন্তত প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও পারছি না! বলতে কষ্ট হয়, ছোট লাগে, মাথা নিচু হয়ে আসে। তারপরও বলছি, যতো দ্রুত সম্ভব পালাও। কষ্ট হবে, খুব কষ্ট হবে জানি। তবুও, তুমি তো অন্তত বাঁচতে চাও তাইনা?

সম্পাদনা বিষয়ে: এই লেখাটিতে আরেকটি নাম ছিল। কিন্তু সচলায়তনে প্রকাশিত এই লেখাটির মন্তব্যে আকতার আহমেদের দেয়া লিঙ্কটি পড়ে সেটি মুছে দিয়েছি। এমনিতে এদেশে কেউই বিচারবহির্ভূতভাবে নির্যাতিত হোক সেটি আমার কাম্য নয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্কিত কেউ যদি তার যুদ্ধাপরাধী বিরোধী অবস্থানকে স্পষ্ট না করে তাহলে তার কোনো ব্যপারে আমি সহানুভূতি বোধ করিনা। এই লেখাটি তাই শুধুমাত্র নাহিয়ানের জন্যই।


সচলায়তনে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই: