মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১১

উটকো ব্লগ: ক্যান্সার

এই লেখাটি ঠিক বিজ্ঞানের নয়। প্রথমত বিজ্ঞান লিখতে গেলে খানিকটা জানতে হয়। ক্যান্সার সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। খানিকটা পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করা যেত, সময় নেই! এই লেখাটা ফাঁকতালে শ্বাস নেয়ার মতো। ভয়াবহ ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কয়েকদিন বিষয়টা খুব ভাবাচ্ছে। একটা অস্বস্থি ভর করে আছে মাথায়। ভাবতে ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ হয়ে না জন্মালেই ভালো হতো। মানুষ সভ্য প্রাণী নয়। বুদ্ধিমান হয়েও সে সভ্য নয়, এই অপরাধের দায় সে অস্বীকার করতে পারেনা! বলে রাখা ভালো, এই লেখাটি অগোছালো। ঝট করে লিখে ডুব দেবো। বিজ্ঞান পড়ার আশা করে কেউ পড়তে শুরু করলে হতাশ হবেন। কোনোকিছু আশা করলেই হতাশ হবেন।

ক্যান্সার ব্যপারটা নিশ্চয়ই কারো জানতে বাকি নেই। আরেকবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। সবপ্রাণির শরীরের সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় খুব কড়াভাবে নিয়ন্ত্রিত। সবখানেই একটা সাম্যবস্থা থাকে। সেই সাম্যবস্থায় গণ্ডগোল হলে বিপদ। ভয়াবহ বিপদ। মানুষের কথা বলি,

মানুষের কোষের নিজস্বতা আছে। শরীরের বাইরেও কোষকে খাবার দিয়ে পালা/পোষা যায়। কেউ চাইলে নিজের খানিকটা কোষ নিয়ে বোতলে পালতে পারে। আরামদায়ক তাপমাত্রায় রেখে নিয়ম করে খাবার দিতে হয়। আর দেখতে হয় যেন ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস কোষ মেরে না ফেলে।

কোষেরা বৃদ্ধিপায় নিজেরা ভাগ হয়ে। একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে চারটে এভাবে। শরীরে কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত। কোষের সবকিছু যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করে তার ডিএনএ। তাই তার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রন করার দ্বায়িত্বও থাকে ওই ডিএনএ'র উপর। ডিএনএ হচ্ছে কোষের সংবিধান। কোষের ভালোমন্দ বিচারের ক্ষমতা নেই। সংবিধানে যা লেখা থাকে সে সেই মত কাজ করে। সংবিধানের অর্থবোধক একেকটা অংশকে বলে জিন। যে অংশে কোষের খাওয়া দাওয়া কীভাবে হবে লেখা থাকে সেটা তার খাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী জিন। যেটাতে বৃদ্ধি পাওয়ার নিয়মকানুন লেখা থাকে সেটা তার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী জিন।

কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী জিনটা নষ্ট হয়ে গেলে সে আর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সমানে বাড়তে থাকে।

শরীরের কিছু রক্ষী কোষ আছে যারা এরকম বিগড়ে যাওয়া কোষ মেরে ফেলে। কিন্তু শরীরের রক্ষী কোষেরা যদি এরকম বিগড়ে যাওয়া কোষকে মেরে ফেলতে না পারে, তখন?

তখন সেটা ক্যান্সার।

ওই বিগড়ে যাওয়া কোষ উপযুক্ত পরিবেশে অনন্তকাল বাড়তে পারে। কিন্তু অনন্তকাল সে উপযুক্ত পরিবেশ পায়না। তার আগেই সে বাড়তে বাড়তে শরীরের অন্য কোষের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। তারপর যে শরীরের সে অংশ ছিল সেটাকেই মেরে ফেলে। ব্যপারটা আত্মহত্যার মতো। কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু সেটাই হয়। ২০০৮ সালে পৃথিবীর প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে মেরে ফেলেছে তাদেরই একম বিগড়ে যাওয়া কোষ। মৃত্যুর এই হার বাড়ছে। বিশ্বাস করুন, ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে। আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। সত্যি সত্যি বলছি।

ক্যান্সার শুরু হয় একটি কোষ থেকে। ওই একটি কোষ কীভাবে বিগড়ায়?

না জানা অনেক কারণে বিগড়াতে পারে। হয়তো একা একাও। এমনিতে কারসিনোজেনের প্রভাবে বিগড়ায়। কার্সিনোজেন বলে সেইসব জিনিসকে যা কোষের জেনেটিক গঠন বিগড়ে দিয়ে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। আফলাটক্সিন বলে একরম ছত্রাকের বিষ একটা কার্সিনোজেন। 'এসবেস্টস' কার্সিনোজেন। এই জিনিসটি আমাদের দেশে ঘরের চালে ব্যাবহৃত হত বলে জানি! অন্তত সেটার নাম ছিল এসবেস্টস। সূর্যের আলট্রাভায়োলেট রশ্মি কার্সিনোজেন। আমরা সবাই মিলে বাতাসের ওজন স্তর নষ্ট করে ফেলেছি যেটা আমাদের এই রশ্মি থেকে বাঁচাতো। এখন অতি বেগুনি রশ্মি নির্বিবাদে আমাদের গায়ে এসে লাগে। আয়োনাইজিং রেডিয়েশন (বাংলা জানি না) একপ্রকার কার্সিনোজেন। আমার ভাগ্নের খেলনা দেখেছিলাম অন্ধকারে জ্বলে। তাতে কী দেয়া ছিল কে জানে! হয়তো ক্ষতিকর কিছু নয় কিন্তু আমি খুব ভীতু বলে সেই খেলনা বাতিল করে এসেছি! আরসেনিক একটা কার্সিনোজেন। কিছু ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবিও কারসিনোজেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় একটা কার্সিনোজেনের ককটেল থাকে। অনেক রকম কার্সিনোজেনের মিশেল। যিনি সিগারেট খান তার হাতে পায়ে চুলে জামায় সবখানে ওই কারসিনোজেন লেগে থাকে। তার পরিবারের সবাই সেটার ভাগ পায়।

ঢাকায় আমরা মোটামুটি কারসিনোজেনে ডুবে থাকি। বাতাসে বিষ, খাবারে বিষ, পানিতে বিষ! ২০৩০ সালে অন্তত ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ক্যান্সারে মারা যাবে। এদের বেশিরভাগই মারা যাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে।

সম্প্রতি সংক্রামক ক্যান্সারের কথা জানলাম। অনেক দেরিতেই জানলাম। Elizabeth Murchison-এর দেয়া একটি বক্তৃতা থেকে জানলাম। উনি বললেন কীভাবে তাসমানিয়ান ডেভিল নামের একটা প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই সংক্রামক ক্যান্সারের কারণে! আমি খুব ভয় পেয়েছি। ভাবতেই ভয় লাগছে।

আমাদের এই শহরে আমরা এখন মোটে তিনজন বাংলাদেশি। একজন আমার বড়, আরেকজন ছোট। আমার ছোট ভাইটির ছোটবোন, বাচ্চা একটা মেয়ে। সেদিন শুনলাম তার ক্যান্সার হয়েছে। বাচ্চা একটা মেয়ে! এতো অসহায় লাগে! মেয়েটির কীরকম লাগছে! এতো কষ্ট কীভাবে সহ্য করছে সে! অসহায়ত্বের অসহ্য কষ্টটা কী তার না পেলেই হতনা! ঈশ্বর কী করেন! কোথায় তিনি!

আমি ইনফেকশন বায়োলজি সংশ্লিষ্ট বলে খবরগুলো চোখে পড়ে। রোজ রোজ নতুর রোগ বের হচ্ছে। রোজ রোজ তাকিয়ে দেখছি মানুষের অসহায়ত্ব। সেটা অবশ্য বেশিরভাগেই দেখছে না। সে বরং ভালোই। কী দরকার আতঙ্কে থেকে! অথচ একই সঙ্গে আমি বিজ্ঞানের বিস্ফোরণও দেখছি। মানুষের ক্ষমতা এখন আকাশ ছোঁয়া। মানুষ যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। বিশ্বাস হওয়ার কথা নয়, সন্দেহ হওয়ার কথা। আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র না হলে আমারো বিশ্বাস হতো না। কীভাবে বিশ্বাস করাবো জানিনা। কথাটা আরেকবার বলি বরং, জীববিজ্ঞানীরা এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। আবার বলি, যা ইচ্ছে তাই।

ক্যান্সার সারাতে পারেন না? আরো যে এত এত রোগ?

পারেন। কিন্তু সেটার জন্য কাজ তো করতে হবে। ক্যান্সার নিয়ে হাজারো প্রশ্ন। উত্তর পেলেই ক্যান্সার থেকে মুক্তি। উত্তর পেতে সেই চেষ্টাটা কে করছে? গুটিকয়েক মানুষ করছেন। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা গুটিকয়েক! বাংলাদেশে ক্যান্সার গবেষণার কী আছে? সারা পৃথিবীতেই তো কতো সামান্য আয়োজন! আহারে, আমরা ভাবতে কষ্ট হয়। এটা এমন কিছু না! সবই তো দেখা যায়, জানা যায়! আমরা চাইলেই পারতাম!

এমনিতে কিছু রাষ্ট্রের টাকা নেতারা খায় আর কিছু রাষ্ট্রের টাকা তারা আরেক রাষ্ট্রের মানুষেকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিয়ে শেষ করে। সব রাষ্ট্র কুকুর পোষে। তারা খানিক করে মানুষ মারে আর বিবৃতি দেয়। শুওরেরবাচ্চারা খালি বিবৃতি দেয় আর বাচ্চা দেয়। একটা মানুষ বাঁচিয়ে দেখাক কতো ক্ষমতা! তাতে নেই। এরা খালি সংখ্যায় বাড়ে। অনবরত বাড়ে।

আমার খুব অসহায় লাগে। আমরা চাইলেই পারতাম। আমরা মানুষ। চাইলেই হেরে যাওয়া ক্যান্সারের দিকে তাকিয়ে খ্যা খ্যা করে হাসতে পারতাম, কিন্তু তা পারিনা। আমরা হেরে যাই। ক্যান্সারের কাছে হেরে যাই। আমি আমার চারপাশে তাকিয়ে দেখি। আমার মা, আমার বোন, আমার বাবা, আমার বন্ধু, আমার একরত্তি ভাগ্নে, আমার সুহৃদ, আমার স্বজন। আমাদের অনেকেরই ক্যান্সার হবে। তারপর আমরা হারানোর বেদনায় নীল হয়ে থাকবো। আমাদের শান্তনা দেয়ার কোনো ভাষা থাকবে না। আমরা কেবল কিছুই হয়নি, কিচ্ছু হবেনা, এরকম ভান করতে থাকবো।

আমার মতো কেউ কেউ হয়তো তীব্র ঘৃণা পুষে পুষে ক্লান্ত হয়ে যাবে। বুঝে যাবে পৃথিবী মানুষের নয়। অথবা অকথ্য ব্যাথায় স্থবির হয়ে থাকবে। তবে তাতে কিছু এসে যাবে না। ঘৃণা বস্তুত অর্থহীন আবেগ! তাতে কারো কিছু এসে যায় না! এই গ্রহের অনেকেই মৃত্যু দেখে হাসতে পারে। সুখে থাকতে পারে।

পুনশ্চ: এরকম অগোছালো উটকো লেখা কে পড়বেন জানিনা। খানিকটা অস্বস্থি উগরে দিয়ে সুস্থির হওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই লিখলাম। আরেকবার পড়ে দেখাও হচ্ছে না। অসংখ্য ভুল হয়েছে নিশ্চয়ই। সেসবের জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি। কেউ যদি মন্তব্য করেন, সেটার জবাব দিতেও দেরী হবে। সচলায়তনে আমি ব্যক্তিগত ধরনের লেখা সাধারণত লিখিনা। এটা লিখলাম খানিকটা অস্বস্থি আর ঘৃণা ভাগ করে নেয়ার জন্যে। কোনো যোগ্যতা ছাড়াই এখানে আমার অনেক স্বজন।


Elizabeth Murchison-এর বক্তৃতার ভিডিওটা দিয়ে দিলাম। চাইলে দেখতে পারেন।


সচলায়তনে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই: