শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১১

বিদায় স্টিভ, আমার অক্ষরেরা তোমার কাছে ঋণী...

পড়াশোনা শেষ পর্যন্ত করা হয়ে ওঠেনি স্টিভের। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে গ্রাজুয়েট হতে পারেন নি। এই গল্পটা অবশ্য সবার জানা। আমি আরেকবার বলছি। স্টিভের গল্প বারবার বলা যায়।

স্টিভের জন্মদাত্রী মা ছিলেন অবিবাহিত একজন তরুণী ছাত্রী। স্টিভের জন্মের আগেই তিনি তাকে দত্তক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন। কেবল ভেবেছিলেন, তাঁর সন্তানটি যেন শিক্ষিত হয়। চেয়েছিলেন, তার সন্তানকে কোনো শিক্ষিত পরিবারে দত্তক দিতে। সেরকম একটি পরিবারের সঙ্গে কথাও হয়েছিল। কথা হয়েছিল, একটি আইনজীবি পরিবার তাকে দত্তক নেবে।


সেটা অবশ্য হয়নি। সেই আইনজীবি দম্পতি স্টিভের জন্মের পর শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলায়।

স্টিভকে দত্তক নেয় অন্য একটি পরিবার। সেটিও অবশ্য খুব স্বাচ্ছন্দে হয়নি। স্টিভের মা শেষ মুহূর্তে জানতে পারেন, স্টিভকে দত্তক নিতে চাওয়া দম্পতিটি শিক্ষিত ছিলনা। তিনি তাই তাকে দত্তক দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে অবশ্য স্টিভ ওই পরিবারেই যায়। ওই দম্পতি কথা দিয়েছিলেন, স্টিভ পড়াশোনা করবে।

পড়াশোনা স্টিভ করছিলও। সমস্যা হচ্ছে, স্টিভ ভর্তি হয়েছিলেন একটি ব্যয়বহুল কলেজে। তার কর্মজীবি বাবা-মা'র সবটুকু সঞ্চয় তার পড়াশোনার পেছনেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছিল। ছ'মাসের মাথায় ওরকম খরচ করে ওই কলেজে পড়াশোনা স্টিভের কাছে অর্থহীন মনে হতে থাকে। তাছাড়া ওই পড়াশোনাও তার কাছে আনন্দের কিছু ছিলনা। স্টিভ তাই কলেজ ছেড়ে দেন। তাঁর ভাষ্যমতে সেটা ছিল তার জীবনের অন্যতম সেরা একটি সিদ্ধান্ত।

কলেজ ছেড়ে দেয়ায় তার দুটি লাভ হয়। প্রথমত, বিরক্তিকর ক্লাসগুলো আর করতে হতোনা। দ্বিতীয়ত, নিজের পছন্দের ক্লাসগুলো যেখানেই হোক সেগুলো বেছে বেছে তিনি করতে পারতেন।

সেটাও অবশ্য খুব স্বপ্নের মতো ব্যপার ছিলনা। নিজের থাকার জায়গা না থাকায় তাঁকে থাকতে হতো বন্ধুদের ঘরের মেঝেতে। কোকের খালি বোতল কুড়িয়ে দোকানে ফেরত দিয়ে যে কয়েক সেন্ট পাওয়া যেত তা জমিয়ে খাবার কিনতে হতো।

সেই সময়ে স্টিভ প্রতি রবিবার রাতে হেঁটে হেঁটে শহরের অন্যপ্রান্তের হরিকৃষ্ণ মন্দিরে যেতেন বিনামূল্যে একবেলা ভালো খাবার জন্য।

নিজের কৌতুহল মেটাতে যেসব কিছু করতেন তিনি সেসময়, সেসব আপাত দৃষ্টিতে অর্থহীন ছিল। অন্তত সেসবের কোনো ব্যাবসায়িক মূল্য ছিলনা। কিন্তু নিজের হৃদয়কে অগ্রাহ্য না করে স্টিভ আসলে নিজের উপকারই করেছিলেন। আর কে না জানে স্টিভ আসলে উপকার করেছিলেন সভ্যতার, মানুষের, মানুষের সৃষ্টিতে চমকানো এই গ্রহটির!

যেমন তাঁর ক্যালিগ্রাফি শেখা। কৌতুহলের বশে ক্যালিগ্রাফির ক্লাসে যেতেন তিনি। সেখানেই শিখেছিলেন অক্ষরের শিল্প। সেই সময়ে ওই শিক্ষার কোনো মূল্য ছিলনা। কিন্তু সেটির ফল পেয়েছিলেন তিনি ১০ বছর পর যখন প্রথম ম্যাকিনটশ কম্পিউটার ডিজাইন করছেন তখন। ম্যাকিনটশের ডিজাইনে অক্ষরের যে সৌন্দর্য, যে শিল্প যুক্ত হয়েিছল, সে স্টিভের শখের বশে শেখা সেই ক্যালিগ্রাফিরই অবদান। উইন্ডোজ তার অক্ষর কপি করেছে ওই ম্যাক থেকেই। আজকের পৃথিবীর অক্ষরেরা তাই স্টিভের কাছে ঋণী।

২০ বছর বয়সে বাড়ির গ্যারেজে অ্যাপল কম্পিউটারের যাত্রা শুরু করেছিলেন স্টিভ। এক দশকেরও কম সময়ে সেই অ্যাপল শতকোটি ডলারের মালিক হয়ে উঠেছিল। দু'জনের শুরু করা অ্যাপল এক দশকে ৪ হাজার লোকের কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। আজকের অ্যাপল লভ্যাংশের হিসেবে পৃথিবীর সবচে বড় কম্পানি। অ্যাপলে কাজ করে প্রায় ৫০ হাজার লোক। আর অ্যাপল বছরে ৬৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য বিক্রী করে।

স্টিভের বয়স যখন ২৯ তখন প্রথম ম্যাকিনটশ কম্পিউটার বাজারে আসে। তার ঠিক একবছর পর স্টিভ সেই অ্যপল থেকেই বহিস্কুত হন। নিজের প্রতিষ্ঠা করা কম্পানি থেকে কেউ কীভাবে বহিস্কৃত হয়?

সেই ইতিহাসটা খুব সুন্দর নয়। সেটা স্টিভের সবচে খারাপ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। অথচ স্টিভ মানেন, অ্যাপল থেকে বহিস্কৃত হওয়া তার জীবনের সবচে ভালো ঘটনা! সেই ঘটনাটি তাকে নতুন করে শুরু করতে দেয় আবার। সাফল্য জিনিসটি নতুন করে শুরু করার দরোজাটা তার জন্য বন্ধ করে রেখেছিল, চাকরি হারানোর পর সেই দরোজাটা তার জন্য খুলে যায়। স্টিভ জানতেন তিনি যা করেছেন, তা তিনি ভালোবেসেই করেছেন। সেটার ফলাফল সেই মুহূর্তে খুব ভালো না হলেও।

চাকরি হারানোর পরবর্তী ৫ বছর, স্টিভ মনে করেন তার জীবনের সবচে সৃষ্টিশীল সময় ছিল। সেই সময়ে তিনি নেক্সট নামের একটি কম্পিউটার কম্পানি শুরু করেন। শুরু করেন পিক্সার নামের অ্যানিমেশন ফার্ম। পিক্সারের নাম শোনেনি এরকম সিনেমা প্রেমিক পাওয়া যাবেনা। এই ফার্ম থেকে তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। এটি এখনও পৃথিবীর সবচে সফল অ্যানিমেশন ফার্ম।

নেক্সট কম্পানিকে কয়েক বছর পর সেই অ্যাপলই কিনে নেয়। স্টিভ আবার ফেরেন অ্যাপলে। অ্যাপল আজকে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভিত্তিটি সত্যিকার অর্থে নেক্সটে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির।

২০০৪ এ স্টিভের অগ্নাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। ডাক্তার বলেছিলেন তিনি ৩ থেকে ৬ মাস বাঁচবেন। পরে জানা যায় স্টিভের অগ্নাশয়ের ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য ছিল। স্টিভ সেরে ওঠেন...

এই গল্পগুলো আমার জানার কথা নয়। আমি কম্পিউটার আর তথ্যপ্রযুক্তির সামান্যই জানি। ২০০৫ এ স্টিভ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে যান। ইউটিউবের কল্যাণে সেই বক্তৃতাটি আমার শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। উপরের লেখাটি প্রায় পুরোটাই সেই বক্তৃতার সারাংশ।

একটা বক্তৃতা শুনেই সেটা লিখে ফেলার কথাও নয় আমার। আমাকে দিয়ে এই লেখাটি লিখিয়ে নেয়া স্টিভের কৃতিত্ব। দারুণভাবে কম্পুকানা মানুষ হয়েও, প্রযুক্তির বিন্দুবিসর্গ না জেনেও আমি আমার চারপাশে স্টিভের অস্তিত্ব টের পাই। স্টিভের প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাকে প্রতি মুহূর্তেই স্বীকার করতে হয়। সে কেবল তিনি যে পৃথিবীকে ব্যক্তিগত কম্পিউটার দিয়েছেন সেজন্য নয়। তিনি যে আইফোন, আইপ্যাড, আইপ্যাড, ম্যাকবুক, নেক্সট, পিক্সার দিয়েছেন সেজন্য নয়। বরং এই মানুষটি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন বলেও। এই মানুষটি আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছেন বলেও।

স্টিভ জবস সম্পর্কে সবকিছু বলে ওঠা সম্ভব নয়। তার প্রয়োজনও নেই। তাঁকে জানেনা এমন আধুনিক মানুষ পাওয়া যাবেনা বোধহয়। আমি কেবল এই লেখাটা লিখছি তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে। মানুষ হতে গেলে অকৃতজ্ঞ হওয়া যায় না। স্টিভের কাছে আমি ঋনী, সেই ঋণ স্বীকার করার জন্যেই এই লেখা।

স্টিভ আরো অনেকদিন বাঁচতে চেয়েছিলেন। ক্যান্সার বিষয়ক জটিলতার জন্যে তা হয়ে ওঠেনি। তবে তাতে ক্ষতি কেবল আমাদেরই হয়েছে। স্টিভ তো জীবনের প্রতিটি দিন বেঁচেছেন নিজের শেষ দিন হিসেবে। নিজের সীমিত জীবনটি তিনি নিজের আনন্দে, নিজের ভালোবাসায় ডুবে থেকে বেঁচেছেন। অন্যের জীবন তিনি বাঁচেন নি। বেঁচেছেন একশোভাগ নিজের জীবন। নিজের পছন্দে।

আর সেই সঙ্গে আমার মতো বোকাদের শিখিয়ে গিয়েছেন ভালোবাসার জন্যে বাঁচতে। ভালোবেসে বাঁচতে। যেটুকু জীবন সেটুকু নিজের করে বাঁচতে। বলে গিয়েছেন, মৃত্যুর পর আর হারাবার কিছু নেই। অন্যের জীবন তাই বাঁচার কোনো অর্থ নেই। বলে গিয়েছেন, তোমার ভালোবাসাকে খুঁজতে থাকো শেষ পর্যন্ত। বিশ্বাস রাখো, থেমে যেয়না। ভালোবাসাহীনতার সঙ্গে সমঝোতা করো না।

বলে গিয়েছেন, বোকা থাকো, চিরতৃষ্ণার্ত থাকো!

বিদায় স্টিভ। নিশ্চয়ই দেখা হবে কখনো। সময়ে এবং শূন্যতায়।

সচলায়তনে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই: