শনিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১১

চিকিৎসাশাস্ত্রে এবারের নোবেল পুরষ্কার: কলিযুগে হয় মানুষ অবতার

প্রফেসর ব্রুস বয়েটলার মেইলটা পান প্রায় মাঝরাতে। বিছানায় ছিলেন তিনি। কেন জেগে উঠেছিলেন কে জানে! হাত বাড়িয়ে মোবাইল ফোনটা নিয়ে দেখেন সেখানে একটি নতুন ইমেইলের নোটিশ। ইমেইলেটি খানিকটা অবিশ্বাস্য লাগে তাঁর কাছে! তবে সেই অবিশ্বাস্য খবরটিই তার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বিছানা ছেড়ে তিনি নিচে নামেন। তাঁর কম্পিউটারটি নিচতলায়। সিঁড়ি ভেঙে নেমে সেটিতে মোবাইল ফোনে পাওয়া খবরটির সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করেন তিনি! যে সাইটটিতে প্রবেশ করতে চাইছিলেন সেটি আটকে থাকে! হতাশ হয়ে তিনি গুগল নিউজের সাহায্য নেন। সেখানের একটি সংবাদ তাঁকে নিশ্চিত করে! মোবাইলে পাওয়া তথ্যটি ভ্রান্ত নয়!


এই সংবাদটিই প্রফেসর জুলস হফম্যানের কাছে এতটা সহজে পৌঁছে না। তিনি তখন সাংহাইতে। একজন বন্ধুর সঙ্গে মিউজিয়াম ঘুরে এসে রাতের খাওয়াটা সেরেছেন কেবল। হোটেলে ফিরবার চিন্তা করছেন। কিন্তু সেদিন আবার বিরাট আতশবাজির উৎসব। অনেক লোকের ভীড়। যাত্রাপথ নির্বিঘ্ন নয়! ফোনটা পেেলন তাঁর বন্ধু। তাঁকে জানানো হল সাংবাদিকরা অপেক্ষা করছেন তাঁদের হোটেলে। জরুরী ফেরা প্রয়োজন। ভীড় এড়াতে মেট্রো রেলে ফিরতে হল। সেখানে যে খবরটি হফম্যান পেলেন সেটি প্রফেসর বয়েটলারের মতো তিনিও প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইলেন না। তবে তাঁকে জানানো হল আরো দুটো নাম, একটি প্রফেসর বয়েটলারের, আরেকটি প্রফেসর রাল্ফ স্টাইনম্যানের। খানিকটা বিশ্বাস হলো। তাঁদের তিনজনেরই কাজের ক্ষেত্র অনেকটা এক। রোগপ্রতিরোধ। এই বিষয়ে অবদানের জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রে ২০১১ সালের নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছেন তাঁরা।


প্রফেসর ব্রুস বয়েটলার এবং প্রফেসর জুলস হফম্যানের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হয়ে গেছে নোবেল পুরস্কারের অর্ধেকটা। এই দুজনেই অবদান রেখেছেন প্রাণীর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ (innate immunity) বিষয়ক গবেষণায়। প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ ব্যপারটা কী?


প্রাণীর রোগ প্রতিরোধের দুটো পর্যায়। বিবর্তনের হিসেবে উঁচু স্তরের প্রাণীর কথা বলছি। মানুষের উদাহরণ দিয়ে খুব সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করি।


ধরা যাক একটা জীবাণু মানুষের শরীরে বাসা বাঁধতে চায়। সবার আগে তার কাছে বাধা মানুষের ত্বক। ত্বকের উপরের অংশ তুলনামূলক শুষ্ক, সেখানে প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান নেই, চাইলেই সেটা ভেদ করে প্রবেশ করা যায়না। বরং সেখানে খানিক তৈলাক্ত পদার্থ বের হয় যেটা ওই জীবাণুর জন্য সুবিধার নয়। ত্বকের মৃত কোষ ঝরে পড়ে যায়, জীবাণুটা যদি ওরকম মরে যাওয় কোষ আঁকড়ে ধরে থেকে থাকে তাহলে তার আর শেষ রক্ষা হয়না!


ত্বক কিন্তু জীবাণু চেনে না। তার পরিবেশটাই এরকম জীবাণুরোধী। ত্বক শরীরের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধের একটা মাধ্যম। তবে এখানেই শেষ নয়। বাতাসের সঙ্গে যদি জীবাণুটা ফুসফুসে ঢোকে? অথবা খাবারের সঙ্গে পেটে যায়? অথবা কোথাও কেটে গেলে সেখান দিয়ে ত্বকের বাধা টপকে জীবাণু প্রবেশ করলে?


সেখানে আছে নানারকম রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা। পাকস্থলীতে যেমন জীবাণুর জন্য বৈরি পরিবেশ! সেরকম বৈরি পরিবেশ ছাড়া নানারকম কোষেরাও রোগ প্রতিরোধে অংশ নেয়। একরকমের কোষ জীবাণু খেয়ে ফেলে, একরকমের কোষ জীবাণুর গায়ে বিষ ছিটিয়ে দেয়, একরকমের কোষ নিজে আত্মহত্যা করে নিজের শরীরের মালমসলা দিয়ে "জাল' বানিয়ে জীবাণুকে আটকে রাখে অথবা মেরে ফেলে, বিশেষ ধরণের প্রোটিনের দল আছে যারা হিসেব করে করে জীবাণুর গায়ে ছুরির মতো গেঁথে গিয়ে জীবাণুর শরীর ফুটো করে দেয়...! এই তালিকা লম্বা। তবে মূল ব্যপারটা হলো, এরা কেউই আলাদা করে ভিন্ন ভিন্ন জীবাণুদের চেনে না। তার মানে যেকোনো জীবাণু পেলেই হলো, এরা তাকে মারতে যায়। এরা সবাই শরীরে প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ। যে ব্যবস্থাটি সবসময় প্রস্তুত থাকে সবরকমের জীবাণুর জন্য।


অনেকটা একটা গ্রামের সাধারন মানুষ অথবা নৈশপ্রহরীর মতো। তারা কেউ চোরের জাত বিচার করে না। গ্রামবাসী তাদের বাড়ির চারধারে পাঁচিল দেয়, ঘরে শক্ত দরোজা লাগায়, হয়তো কুকুর পোষে, আর কখনো চোর ডাকাত যাই আসুক ধরে বাঁধতে চায়। এর বেশি হিসেব নিকেশে তারা যায় না।


এর বেশী হিসেব নিকেশে যায় গোয়েন্দা অথবা পুলিশের মতো বিশেষ বাহিনী। তারা একটা চোর পেলে হিসেব করতে বসে, একী সাধারণ চোর! নাকি অন্য দেশের স্পাই এসেছে চোেরর ভেক ধরে! এই চোরের বািড় কোথায়! একা এসেছে নাকি আরো কেউ আছে! এরা কী কোনো অস্ত্র ব্যাবহার করে! এতসব হিসেব করে তখন পুলিশেরা চিনে রাখে ওই চোরের আচরণ! তারপর সভা করে, বার্তা পাঠিয়ে সব পুলিশকে জানিয়ে দেয়, হয়তো নাক উঁচু আর আবুলের মতো স্বভাবের এক রকমের নতুন চোর পাওয়া গেছে! আবুলের মতো কাউকে দেখলেই ধরে বাঁধতে হবে। কোনো এক গোষ্ঠীর চোরদের সম্পর্কে একবার খোঁজ খবর নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলে সেই চোর গোষ্ঠী একেবারে নাজেহাল হয়ে যায়। সহজে আর মানুষের ক্ষতি করতে পারেনা।


শরীরে যেসব রোগ প্রতিরোধী কোষ জীবাণুদের এরকম চিনে রাখে তারা শরীরের দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ (adaptive immunity)। একবার শত্রু চিনতে পারলে তারা খুব কার্যকর! তারা যে জীবাণুকে ঠিকমতো চিনে রেখেছে সেসব জীবাণু শরীরে সুবিধা করতে পারে না। সমস্যা কেবল তারা চিনতে বুঝতে খানিকটা সময় নেয়। নানারকম পদ্ধতি আছে এই চেনা জানার। তারমধ্যে একটা হল, শরীরের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধী কোষদের সাহায্য নেয়া। চোর ধরে গ্রামবাসী যেমন পুলিশের হাতে তুলে দেয়, সেরকম!


শরীরের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধী কোষেরা জীবাণুদের চেনে কীভাবে?


সেটারো অনেকগুলো মাধ্যম আছে। সেই মাধ্যমগুলোর একটি সম্পর্কে খুব ভালোমতো গবেষণার জন্য জুলস হফম্যান আর ব্রুস বয়েটলার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এবার।


ছবি: ব্রুস বয়েটলার। সূত্র: নোবেলপ্রাইজ.অর্গ
জুলস হফম্যান মাছি'র উপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন, "টল' নামের একটা জিন ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মাছিকে সাহায্য করে। "টল' নামের জিনটা থেকে যে প্রোটিন তৈরি হয় সেটা ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে পারে। মানে যাকে বলে সংকেত দিতে পারে। শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষদের তো আর চোখ নেই, তারা জীবাণূর উপস্থিতি টের পায় নানারকম সংকেতের মাধ্যমে। "টল' জিনটা সেরকম সংকেত দেয়ার জন্য খুব জরুরী! কোনো মাছির যদি ওই জিনটা বিগড়ে যায় তাহলে ছত্রাকের আক্রমণে সে একেবারে বিধ্বস্ত হয় পড়ে!


মাছির যেমন "টল' জিন, সেরকম স্তন্যপায়ী প্রাণির আছে "টলের মতো' জিন (বিবর্তনের লক্ষ বছর পরেও এই দুটিতে খুব মিল!)। এই জিনটি স্তন্যপায়ী প্রাণিদেরকে জীবাণূর হাত থেকে বাঁচতে সংকেত দেয়। ইঁদুরের উপর গবেষণা করে ব্রুস বয়েটলার সেটি দেখিয়েছেন।


শুনতে সাধারণ শোনাচ্ছে কীনা জানিনা, কিন্তু এটি মোটেই সাধারণ কিছু নয়। এই আবিষ্কার শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষেরা কীভাবে সংকেত পায় সেটার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে! এই আবিষ্কারের পর থেকে যে কতো কতো গবেষণা হচ্ছে এগুলোর উপর সে কে বলবে! কেবল টলের উপরেই হাজার পাতার বই লিখে ফেলা যায়! টল জিন থেকে তৈরি হয় "টলের মতো রিসেপ্টর' (toll like receptors) নামের একধরণের প্রোটিন। এই প্রোটিন জীবাণুর সংকেত দিতে পারে কোষকে। জীবাণু আসলে কোষেরা এই প্রোটিনের মাধ্যমে টের পায়। এই কথাগুলো এভাবে বললে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খানিকটা হালকা শোনায়, কিন্তু মূল ব্যপারটা এরকমই। আগ্রহীরা নিশ্চয়ই আরো বিস্তারিত পড়ে নেবেন।


ছবি: জুলস হফম্যান। সূত্র: নোবেলপ্রাইজ.অর্গ
টল জিনটি প্রথম আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান নূসলাইন-ফলহার্ড। তিনিও ১৯৯৫ সালে শরীরতত্ত্বে নোবেল বিজয়ী। জার্মান "টল' শব্দটির অর্থ অসাধারণ/অনন্য। কিন্তু এই বিষয়টি যে আসলে কতোটা অনন্য তা বুঝে ওঠা সহজ নয়! এবারের নোবেল পুরষ্কার তাই অসাধারণ এক গবেষণা কাজের জন্যই পেয়েছেন ব্রুস বয়েটলার এবং জুলস হফম্যান। ব্রুস বয়েটলার অবশ্য তাঁর টিউমার নেক্রসিস ফ্যাক্টর (TNF-α) আইসোলেশনের জন্যেও নোবেল পুরষ্কার পেতে পারতেন। এক কথাতে শুনতে খটমট লাগছে হয়তো, কিন্তু আজকে আর ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কেবল বলে রাখি, টিউমার নেক্রসিস ফ্যাক্টরের জন্য গোটাদশেক নোবেল পুরষ্কার দেয়া যেতে পারে।


ছবি: ক্রিস্টিয়ান নূসলাইন-ফলহার্ড। সূত্র: উইকিপিডিয়া।
এবারের নোবেল পুরষ্কার ভাগ হয়েছে তিন ভাগে। অর্ধেকটা পেয়েছেন যে দুজনের কথা বললাম, তাঁরা। বাকি অর্ধেকটা পেয়েছেন রাল্ফ স্টাইনম্যান।


রাল্ফ স্টাইনম্যান ইঁদুরের উপর গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখার চেষ্টা করেছিলেন কীভাবে শরীরে দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগ প্রতিরোধী কোষেরা জীবাণুর সংকেত পায়। সংকেত না পেলে তারা সতর্ক হতে পারেনা, কোনো কাজও করতে পারেনা। তাই তাদের সংকেত পাওয়াটা সবার আগে জরুরী। স্টাইনম্যান দেখেন, একরকমের ডালপালাওয়ালা কোষ আছে ইঁদুরের শরীরে। অক্টোপাস কোষ বলে চালিয়ে দেয়া যায়। সেই কোষেরা শরীরে "টি' কোষ (T-cells) নামের যে বিশেষ রোগপ্রতিরোধী কোষ আছে তাদের সংকেত দিয়ে জীবাণুর জন্য প্রস্তুত করতে পারে। "টি' কোষেরা কতটা গুরুত্বপূর্ন সেটা বোঝাতে একটা বাক্য বললেই চলে: ""এইডসের ভাইরাস একপ্রকার টি কোষকে আক্রমণ করে বলেই মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে মানুষ মারা যায়!''


স্টাইনম্যান ডালপালাওয়ালা এই কোষের নাম দেন "ডেনড্রিটিক কোষ' (dendritic cell)। এই কোষটির আবিষ্কারক পল ল্যাঙ্গারহ্যানস। আবিষ্কারকের নামানুসারে প্রথমে এটি ল্যাঙ্গারহ্যানস কোষ নামে পরিচিত ছিল। তবে এটি কী কাজ করে সেটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্টাইনম্যান। তাঁর আবিষ্কারের পর থেকে এই কোষ নিয়ে হাজারে হাজার গবেষণা হয়েছে। স্টাইনম্যান নিজেও পুরোটা সময় এটা নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই কোষটি শরীরের প্রাথমিক আর দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থার একটা যোগসূত্র তৈরি করে।


শরীরের এখানে সেখানে জীবাণু পেলে এই কোষেরা শরীরের দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগপ্রতিরোধী কোষদেরকে সেই জীবাণু সম্পর্কে সংকেত দিতে পারে। এদের সংকেত দেয়ার এই ক্ষমতাটিকে ব্যবহার করে ক্যান্সারের টিকা তৈরি হয়েছে। চলছে সেটার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ।


ক্যান্সার কীভাবে হয় সেটা একটুখানি বলেছিলাম একবার। শরীরের কোনো কোষ যদি বিগড়ে গিয়ে সংখ্যায় কেবল বাড়তেই থাকে তাহলে সেটা ক্যান্সার। এরকম বিগড়ে যাওয়া কোষকে শরীরের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধী কোষেরা কিছু করতে পারেনা। এসব বিগড়ে যাওয়া কোষকে মারতে পারে শরীরের বিশেষ প্রতিরক্ষা কোষেরা। সমস্যা হচ্ছে, নানা কারণে সেই প্রতিরোধ তারা সবসময় ঠিকভাবে করতে পারেনা। ঠিকমতো সংকেত না পাওয়া হতে পারে একটা কারণ! ঠিক যেমন, ঘরশত্রু বিভীষণ চেনা সহজ নয়। যাকে মানুষ আপনজন ভেবে বিশ্বাস করে তার হাতে লুকোনো ছুরি থাকবে তা কেউ সন্দেহ করেনা!


শরীরের বিগড়ে যাওয়া কোষকে যাতে ঠিকঠাক চিনতে পেরে শরীরের প্রতিরক্ষা কোষেরা মারতে পারে সেজন্য যাঁরা ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করেন তাঁরা এক দারুণ পদ্ধতি বের করেছেন। যদি এমন হয় যে, বদ ক্যান্সার কোষেদের ঠোঁটের উপর তিল থাকে, তাহলে যে ডেনড্রিটিক কোষের কথা বলছিলাম সেগুলোকে ধরে ধরে চিনিয়ে দেয়া/বলে দেয়া যায়, ঠোঁটের উপর তিল দেখলেই মোটে তার মিথ্যে কথায় ভুলবি না! ওটা ভয়ঙ্কর! যতই ভাব দেখাক, আসলে সে ক্যান্সার কোষ! সে কেবল বাচ্চা দিয়ে দিয়ে সর্বনাশ করে ফেলবে সব! তখন ক্যান্সার চিনতে শিখে যাওয়া ওইসব ডেনড্রিটিক কোষ গিয়ে টি কোষদের সংকেত দেয়। তারা তখন প্রাণ বাঁচাতে ক্যান্সার কোষ মেরে ফেলে!


ডেনড্রিটিক কোষ তাই ক্যান্সার গবেষণায় এই সময়ের অনন্য এক অস্ত্র। এ আমি কেবল একটুখানি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। আসল ব্যপারটা খুব বিস্তৃত আর ব্যাপক। আমি নিজে নিতান্তই কম জানি। আপনারা নিশ্চয়ই আরো খানিটকটা পড়ে জেনে নেবেন।


ছবি: রাল্ফ স্টাইনম্যান। সূত্র: নোবেলপ্রাইজ.অর্গ
রাল্ফ স্টাইনম্যান কীভাবে নোবেল পুরষ্কারের খবরটি পেয়েছেন এই লেখাটার শুরুতে সেটি লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটি কখনো সম্ভব হবে না। এই খবরটি তিনি কখনোই পাননি। গত তিরিশ বছরে তিরিশবার নোবেল পুরষ্কার দিলেও মানুষ তাঁর ঋণ শোধ করতে পারত না। হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচাতে তাঁর প্রত্যক্ষ অবদান।  নিশ্চিত, আসছে সময়ে লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচবে তাঁর গবেষণার কল্যাণেই। অথচ সারা পৃথিবীর কম লোকেই তাঁর কথা জানে। খুব নিভৃতেই মারা গেছেন তিনি। মারা গেছেন প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সারে। নিজের ক্যান্সার নিয়েই শেষ সময়ে গবেষণা করতেন। নিজের ক্যান্সারের চিকিৎসার চেষ্টা নিজেই করেছিলেন। সেই চেষ্টার সফলতা নিয়ে তর্ক হতে পারে (যদিও তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ার পরও তিনি স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি সময় বেঁচেছিলেন)। এতো কম সময়ে আসলে এরকম জটিল গবেষণা সম্ভব নয়। যেটুকু সম্ভব হয়েছে তা তিনি স্টাইনম্যান বলেই হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, কেবল স্টাইনম্যানের গবেষণার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকবে চিকিৎসা শাস্ত্রের নতুন একটি ক্ষেত্র! সেই ক্ষেত্রটির সবচে বড় ভূমিকা থাকবে ক্যান্সারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসায়। মানুষের প্রাণ বাঁচানোয়।


মানুষ তাঁর কথা জানেনা। তাঁর মৃত্যুতে সামাজিক সাইটগুলোর পাতা ভরে ওঠেনি দুঃখের পংক্তিতে। তবে তাতে কিছু যায় আসেনা। তিনি যতোটা আগ্রহ আর ভালোবাসা নিয়ে মানুষের কল্যাণে গবেষণা করেছেন সেই ঋণ কী মানুষ চাইলেই শোধ করতে পারত! কখনো পারবেও না! অথচ কীরকম ছেলেমানুষের মতো তিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতে অপেক্ষা করেছিলেন নোবেল পুরষ্কারের পাওয়ার। অনেক মহান মানুষেরাও হয়তো কখনো ছেলেমানুষের মতো আচরণ করেন। সেই ছেলেমানুষি চাওয়াটা তাঁর পূরণ হতো আর মাত্র তিনটি দিন বাঁচলে!


না চাইলেও তো কতো অতৃপ্তি, কতো অকৃতজ্ঞতার, কতো না পাওয়ার বেদনা মানুষকে শূণ্য করে তোলে। প্রিয় স্টাইনম্যান, মানুষ স্বীকার করুক আর না করুক, আপনার কাছে আমরা আমাদের প্রিয়জনের প্রাণের জন্য ঋণী। আমরা অনেকেই আপনার স্মরণে শ্রদ্ধায় নত হই!


এই লেখাটা পাণ্ডব'দার জন্য। কোনো যোগ্যতাই ছাড়াই আমি তাঁর স্নেহধন্য। শুভ জন্মদিন পাণ্ডব'দা হাসি


সচলায়তনে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই: