রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১১

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা প্রসঙ্গে যে বিষয়গুলোতে দ্বিমত পোষণ করছি স্যার!

২০০৪-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ডেইলি স্টারের "একুশে স্পেশাল' ক্রোড়পত্রে মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটির কিছু অংশের সঙ্গে আমি একমত। আমি যদি ঠিক বুঝে থাকি তাহলে লেখাটির মূলভাবের সঙ্গেও একমত। কিন্তু অনেকখানি জায়গায় আমার দ্বিমত রয়েছে। এতো পুরাতন একটি লেখার ব্যাপারে হঠাৎ করে এই সময়ে কথা বলার কারণ রয়েছে। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে যে ব্যাপারগুলোতে আমার বিশেষ দ্বিমত রয়েছে সেটা বলি।

জাফর ইকবাল স্যার একটা বিজ্ঞানের বই থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে একটি লাইনকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে সেটার বঙ্গানুবাদ করার চেষ্টা করেছেন।রবার্ট রেজনিক এবং ডেভিড হ্যালিডের লেখা "ফিজিক্স' বইটি থেকে উদাহরণটি নেয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স সম্মান পড়ার সময় তিনি এই বইটি পড়েছেন।
লাইনটি এরকম: ""We can show that there are two kinds of charge by rubbing a glass rod with silk and hanging it from a long thread as in fig. 26-1''। স্যার দেখেন, এই লাইনটির অর্থ সবাই খুব সহজেই বুঝতে পারবে। লাইনটি এমনভাবে গঠিত যে তথ্যগুলো উপস্থাপিত হয়েছে একেবারে ঠিকঠিক ভাবে। এখানে মূলত তিনটি তথ্য রয়েছে। প্রথমত, আধান দুই প্রকারের। দ্বিতীয়ত, বর্ণিত পরীক্ষাটি করে যে কেউ সেটি যাচাই করে দেখতে পারে। এবং তৃতীয়ত, একটি চিত্রের সূত্র রয়েছে যেটি দেখা যেতে  পারে যদি পরীক্ষণের বিবরণটি কারো কাছে যথেষ্ট মনে না হয়।

স্যার দেখলেন, এই বাক্যটিকে বাংলায় রূপান্তর করা খুব সহজ নয়। একবাক্যে এটার অনুবাদ করতে গেলে সেটি হতে পারে এরকম: ""একটা কাঁচের ডান্ডাকে সিল্ক দিয়ে ঘষে ২৬-১ ছবিতে দেখানো উপায়ে একটা লম্বা সুতা দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে আমরা দেখাতে পারি যে চার্জ দু'রকমের''। এই বাক্যটি ঠিক আছে। কিন্তু এখানে তথ্যগুলো ঠিক ক্রম অনুসরণ করে দেয়া হয়নি। ঠিক ক্রম মেনে এই তথ্যগুলো দিতে গেলে বাক্যটিকে তিনভাগে ভেঙে ফেলতে হয়। ১. আমরা দেখাতে পারি যে চার্জ দু'রকমের। ২. একটা কাঁচের ডান্ডাকে সিল্ক দিয়ে ঘষে একটা লম্বা সুতা দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে সেটা দেখানো যায়। এবং ৩. ২৬-১ নম্বর ছবিেত সেটা দেখানো হয়েছে। স্যার বলেন, বাক্য ভেঙে ফেলায় এবার বিজ্ঞানের ভাষাটি ঠিকঠাক আছে। কিন্তু একটা ব্যাপার মানতে হবে যে তুলনামূলকভাবে এখানে অনেকখানি বেশি কথা লিখতে হয়েছে।  

স্যার যে প্রথম সমস্যাটির কথা বললেন, সেটি হচ্ছে, একবাক্যে বিজ্ঞানের ইংরেজির অনুবাদ করে ফেলা শক্ত। এই সমস্যাটির কথা আমি আরো অনেকের কাছেই শুনেছি। কিন্তু একটি ব্যাপার আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি যে বিজ্ঞানের ইংরেজিকে কেন বাংলায় "অনুবাদ' করতে হবে! ইংরেজির ঘাড়ে চেপে বিজ্ঞানকে আমরা কেন বাংলায় নিয়ে আসব?!

আমাদের উদ্দেশ্য কি বিজ্ঞান বুঝিয়ে বলা? নাকি ইংরেজি বিজ্ঞান বইয়ের বাংলা অনুবাদ করা! কেউ ইংরেজি বিজ্ঞান বইয়ের বাংলা অনুবাদ করতে চাইলে সেটির সমস্যাগুলো নিয়ে সে ভাবুক। কিন্তু কেউ যদি বিজ্ঞানকে বাংলায় পরিবেশন করতে চায় তাহলে আমি বিশ্বাস করি ভাষা হিসেবে বাংলা অন্য কোনো ভাষার চাইতে কম সক্ষম নয় বরং বাঙালিদের জন্য বাংলায় বিজ্ঞান পাঠ অনেক বেশি সহজ এবং বোধগম্য। ইংরেজি বিজ্ঞানের বাংলা অনুবাদ না করে যদি উদ্ধৃত বাক্যটির "বিজ্ঞান'টিকে আমরা বাংলায় পরিবেশন করতে চাই তাহলে আমার কাঁচা লেখাতেও সেটা বেশ গ্রহনযোগ্য মনে হচ্ছে। পাঠক না বুঝতে পারলে জানাতে পারেন। আমার উপস্থাপনটি এরকম: ""আধান দুই রকমের। একটা কাঁচের দন্ডকে সিল্কের কাপড় দিয়ে ঘষে একটা লম্বা সুতায় ঝুলিয়ে সেটি পরীক্ষা করে দেখা যায়। ২৬-১ নম্বর চিত্রটিতে এই পরীক্ষণটি এঁকে দেখানো হয়েছে''।

বাংলায় বিজ্ঞান লিখতে গেলে যদি বেশি শব্দ খরচ করতে হয়, তবে সেটা কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে কিনা আমার জানা নেই। কেউ যদি সেটাকে সমস্যা মনে করেন তাহলেও তার সঙ্গে তর্ক করা অর্থহীন বলেই এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে। স্যার তাঁর লেখাটির প্রথমভাগে বলেছেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি এই কথাটিকেই বাংলায় নানাভাবে বলা যায়। "তোমাকে আমি ভালোবাসি' অথবা "আমি ভালোবাসি তোমাকে' বললেও মনের ভাবটি ঠিক ঠিক প্রকাশ পেয়ে যায়। ইংরেজিতে এরকম করা যায়না। বাংলার এরকম দারুণ সক্ষমতা কি বিজ্ঞানকে প্রকাশে তার দুর্বলতা? আমার তো মনে হচ্ছে বাংলায় ভাব প্রকাশের এরকম বিস্তৃত ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ইংরেজির চাইতে বরং ভালোভাবেই বিজ্ঞানকে প্রকাশ করা যায়।

স্যার বললেন, পদার্থ বিজ্ঞানের একটি বই লিখতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন বাংলায় বিজ্ঞানের বই লেখা সহজ নয়। বাংলা কবিতা লেখার জন্য দারুণ কিন্তু বিজ্ঞান লেখার জন্য অসুবিধাজনক। সেটি সত্য হলে তা কি এজন্য নয় যে আমাদের বিজ্ঞানের কোনো পরিমণ্ডল নেই? আমারদের শৈশবে কৈশোরে আমাদের বাতাসে সুর-শব্দ খেলেছে ঠিক। কিন্তু সেই শব্দগুলি কেবল কবিতার অথবা গল্পের অথবা রূপকথার। আমারদের শিশুরা বিজ্ঞান নিয়ে ভাবেনি। তাদের ভাষায় ভাবনায় বিজ্ঞানের শব্দমালা, বিজ্ঞানের সত্য কবিতার মতো করে ঢুকে পড়েনি। বাংলায় বিজ্ঞান পড়তে খানিকটা যে অস্বস্থি লেগেছে সেটাও কী এই কারণেই নয়?

যে আপাত প্রতিবন্ধকতাগুলো আমরা দেখি বিজ্ঞানের বাংলায় সেগুলো দূর করার উপায় কী? কেউ কেউ সমাধান দিয়েছেন শিক্ষা অথবা ভাবনার ভাষা হিসেবে বাংলাকেই বাদ দিয়ে দেয়ার। সমাধানটি অভিনব। এই সমাধানটি দেখে আমার মনে হয়েছে, আধুনিক, সভ্য, উন্নত এবং প্রগতিশীল হওয়ার জন্য আমরা কী ঝটপট আমাদের দেশের নাম বদলে, আমারদের পরিচিতি বদলে, আমাদের সংস্কৃতি বদলে অন্য কোনো উন্নত জাতির একজন হয়ে যেতে পারি! সহজ সমাধান! পাসপোর্ট বদলে উন্নত জাতির একজন হওয়ার সুযোগটি হাজার হাজার বাঙালি গ্রহন করেছে, হাজার হাজার গ্রহন করার চেষ্টা করছেন আর লক্ষ লক্ষ বাঙালি গ্রহন করতে চাইছে। এই ব্যাপারটিকেই একটা জাতিগত প্রচেষ্টা হিসেবে নেয়ার ইচ্ছে চমকপ্রদ তাতে সন্দেহ নেই!

জাফর ইকবাল স্যার তাঁর রচনার শেষভাগে যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করছি। তিনি বলেছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই মুহূর্তে বিশৃংখল একটা অবস্থায় আছে। আমােরকেই এটা ঠিক করতে হবে। আশা করি সবাই বুঝতে পারবে যে মৌলিক বিজ্ঞান আমরা কেবল আমাদের মাতৃভাষাতেই শিখতে পারি।

স্যারের সম্পূর্ণ লেখাটির আরো কিছু বিষয়ে আমার স্পষ্ট দ্বিমত রয়েছে। কিন্তু লেখাটি এখনই যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে। সেসব বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশের চাইতে নিজের মতগুলো আরেকটু স্পষ্ট করলে সেটা ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে।

জাফর ইকবাল স্যােরর এই লেখাটি দীর্ঘ পুরোনো। এই সময়ে এটি নিয়ে কথা বলছি আমার সাম্প্রতিক একটি লেখার সূত্রে বিষয়টি সামনে এসেছে বলেই। বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর-এ ""বিজ্ঞানের ভাষা ইংরেজি নয়'' শিরোনামে সম্প্রতি আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। মূল বিতর্কটি অবশ্য তারও কিছু আগে শুরু হয়েছে। বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে পরবর্তীতে এসব লেখা আর বিতর্কের সূত্রে। কয়েকটি বিভ্রান্তি এখানে স্পষ্ট করার চেষ্টা করি।

আমরা যখন বলেছি, আমাদের বিজ্ঞান পড়া, শেখা এবং চর্চা করার জন্য বাংলাই সর্বোত্তম। সর্বক্ষেত্রে বাংলায় বিজ্ঞানকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আরো জোরদার করা উচিত। তখন প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান যুগে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের প্রবেশ/মিথস্ক্রিয়া সম্ভব কিনা!

জবাব হচ্ছে, না। সম্ভব নয়। প্রশ্নের জবাবটি এককথায় দেয়া যায় কিন্তু এই প্রশ্নটি যখন ওঠে তখনই বুঝতে পারি, আমাদের বক্তব্যটি সবার কাছে স্পষ্ট নয়।

একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, আমরা কখনোই ইংরেজি শেখার বিপক্ষে নই। বরং ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভালোমত শেখা দরকার। ১২ বছর ধরে ইংরেজি শিখেও আমাদের ইংরেজির দশা বেহাল কেন সেটা খুঁজে বের করা দরকার এবং সেটার সমাধানও করা দরকার। কিন্তু যদি বিজ্ঞান চর্চার কথা আসে, তখন আমাদের জন্য বাংলাই সেরা। আমরা বলছি, কেবল বাংলায় নয়, "সহজ বাংলায়' বিজ্ঞানকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা। একটি ব্যাপার নিশ্চিত, সবাই বিজ্ঞানে আগ্রহী হবে না। আমাদের শিশুরা বিজ্ঞানে যেমন, তেমনি সঙ্গীত, সাহিত্য অথবা অন্যান্য বিষয়েও আগ্রহী হবে। যার যে বিষয়টিতে আগ্রহ সেটিই তার ভবিষ্যতের বিষয়ে হবে। কিন্তু আগ্রহ তৈরি হওয়ার সময়টি যখন তখন কী আমাদের শিশুরা বিজ্ঞানকে জানে? আমাদের শিশুরা কি আইনস্টাইন হতে চায়? আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং? যে ছেলেটি জানেই না বিজ্ঞানের জগৎটি কীরকম দারুণ, কীরকম চমকপ্রদ তার আগ্রহ কীভাবে বিজ্ঞানে তৈরি হবে!

আমরা একটি বিজ্ঞানের পরিমণ্ডল তৈরির কথা বলি। আমাদের চারপাশে সঙ্গীত যেমন আছে, সাহিত্য আছে থাকবে, থাকবে, তেমনি বিজ্ঞানও থাকুক! আমাদের শিক্ষার ব্যাবস্থাটি আমাদের ভাষা হিসেবে ১২ বছর ধরে ইংরেজি যেমন, তেমনি গণিত, এমনকি বাংলাও ঠিকঠাক শেখাতে পারেনি। আমরা নম্বর পেতে শিখেছি কেবল। আমরা বলছি, আমাদের শিশুরা যেন বিজ্ঞান-গণিতের মতো চমকপ্রদ বিষয়গুলো কৌতুহল নিয়ে চিন্তা করতে শেখে। আমরা প্রতিবছর কত কত সেরা শিক্ষার্থী পাই। পত্রিকায় তাদের চমৎকার সব সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। আমার দূর্ভাগ্য আমি তাদেরকে সবসময় অনূজ শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ হিসেবে কীভাবে ভালো নম্বর পাওয়া যায় সেটা বলতে শুনি! আমি কেবল পড়ি তারা কীভাবে সময়কে ঠিক ঠিক ব্যাবহার করে ভালো নম্বর পেয়েছে! আমার দূর্ভাগ্য আমি আমাদের সেরা শিক্ষার্থীদের কাউকে বলতে শুনিনি, বিজ্ঞানের কোন বিষয়টি তার কাছে কীরকম চমকপ্রদ লেগেছে! আমি শুনিনি সারাদিন কারো ইচ্ছে হয়েছে বিজ্ঞানের কোনো বিষয় পরীক্ষা করে দেখার, কোনোকিছু নিয়ে ভাবার! বিজ্ঞান যে গান গাওয়ার মতো দারুণ আনন্দের একটা বিষয়, একটা সমস্যার সমাধান করা যে  ১০০ মাইল দৌড় প্রতিযোগীতায় ১০০ জনকে পেছনে ফেলে ১০০ বার প্রথম হয়ে যাওয়ার মতো কৃতিত্ব আর আনন্দের বিষয় সেটি কী আমরা বুঝতে শিখেছি! বিজ্ঞান ভালোবাসার এই বোধটি একেবারে কাঁচা বয়সে তৈরি করে দেয়ার জন্যেই আমরা বিজ্ঞানের একটি পরিমণ্ডল তৈরির কথা বলি।

একটি দেশের সবাই বৈজ্ঞানিক হবে না। খুব কম জনই হবে। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণাটি সবার মধ্যেই থাকুক, আমরা সেটা চাই। সবাই যখন বিজ্ঞানকে দেখবে, চিনবে, জানবে, বুঝবে তখন তাদের মধ্যে কারো কারো বিজ্ঞান খুব ভালো লেগে যাবে! ১৬ কোটি মানুষের একটি দেশের থেকে "কেউ কেউ' যখন বিজ্ঞান ভালোবাসবে আর উচ্চতর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কাজ করতে চাইবে তখন সেই সংখ্যাটি একটি বড় সংখ্যা হবে তাতে কী কারো সন্দেহ রয়েছে?

এই সময়ের বিজ্ঞান চর্চায় বাংলার ব্যবহার কীভাবে হতে পারে সেই প্রশ্নটি অনেকেই করেছেন। একটি ব্যাপার মনে রাখা দরকার, বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা করতে বলা মানেই রাতারাতি সবকিছু ঝেড়ে মুছে বাংলা করে ফেলা নয়! আমরা বলছি, বিজ্ঞানকে বাংলায় নিয়ে আসার চর্চাটি ভালোমত শুরু করা প্রয়োজন। এই সময়ের বিজ্ঞানকে বাংলায় চর্চা করায় যে প্রকিবন্ধকতাগুলো রয়েছে সেগুলো দূর করার চেষ্টা করা দরকার। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করিনা, বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা করার সিদ্ধান্ত নিলেই একলাফে আমরা উন্নত বিশ্বের সমকক্ষ হয় যাবো। বরং আমরা যে শত শত বছর ধরে থেমে আছি সেই স্থবির অবস্থাটি থেকে আমাদের উন্মোচন ঘটবে। আমরা একটি জাতি ধীরে ধীরে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠলে আমাদের মধ্য থেকে উচ্চতর বিজ্ঞান চর্চাকারীও উঠে আসবে। বিজ্ঞানের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা আমরা তখনই ভাবতে পারব।  

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের বিজ্ঞানকে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাটিও আমরা নিশ্চয়ই শিখব। আমাদের বিজ্ঞানকে আমরা সেই ভাষাতেই উপস্থাপন করব। ইতিহাস বলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভাষা, সংস্কৃতি, এবং সাহিত্য-সভ্যতা-বিজ্ঞানের কেন্দ্র বদলেছে। ভবিষ্যতেও বদলাবে না কে বলতে পারে! সময়ের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমটি বদলে গেলে কী আমাদের বিজ্ঞানের বোধও বদলে যাবে? আমাদের জাতির একটি সামগ্রিক বিজ্ঞান বোধ চাই আমরা। এবং আমাদের কোনো সন্দেহ নেই একটি জাতির বিজ্ঞান বোধ কেবল সেই জাতির মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করেই গড়ে উঠতে পারে!

কেউ বলতে চেয়েছেন, আমরা নিজেরা যেভাবে ইংরেজি শিখে ইংরেজি মাধ্যমে উন্নত দেশে এসে পড়াশোনা করছি সেই পরামর্শটি কেন সবাইকে দিচ্ছি না?

এরকম মন্তব্যের কারণ সম্ভবত এটা যে, আমি নিজে এবং আমার মতো আরো অনেকেই দেশের বাইরে পড়তে এসেছেন। আমাদের সবাইকেই ইংরেজি শিখতে হয়েছে। নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানিয়ে নেয়ার মতো করে প্রস্তুত করতে হয়েছে। সেটিতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যাঁরা এখন দেশের বাইরে এসেছেন, উচ্চতর শিক্ষা নিচ্ছেন, তাঁরা কেন এসেছেন? বাধ্য হয়ে নয়কি? আমরা কি একটি জাতির সব শিক্ষার্থীকে বিদেশে আসার প্রস্তুতি নিয়ে দেশের বাইরে চলে আসতে বলব? সেটি কী বাস্তব? অন্য কোনো দেশ/জাতি কী আমাদের একটি জাতির সব শিক্ষার্থীর জন্য গবেষণা বা শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে অথবা রাখবে? আমরা যারা দেশের বাইরে এসেছি তারা আসলে অন্য দেশ/জাতির দেয়া একটুখানি সুযোগ অনেক পরিশ্রম করে অর্জন করে এখানে এসেছি! আমি এসেছি ঠিক, কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, আমার চাইতে অনেক বেশি মেধাবী হাজারো ছেলেমেয়ে সেই সুযোগ পায়নি! না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। যারা এই সময়ে বিশ্বের বড় বড় সব ল্যাবে/প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চায় তাদের জন্য শুভকামনা। তারা সুযোগ পাক সেটাই চাই। কিন্তু আমরা সবাই জানি, সেই সুযোগটি পাবেন নিতান্তই অল্প কিছু ভাগ্যবান শিক্ষার্থী! বাকিদের কী হবে?

বলছি না, আজকেই আমাদের দেশটিতে বিরাট পরিবর্তন এসে যাবে! এখনতো এমনকি আমরা প্রতিযোগিতায় নামারও যোগ্য নই! কিন্তু আমরা কি ভবিষ্যতের জন্যেও প্রস্তুতি নেব না? জাতিগত একটি পরিবর্তন কি এক মুহূর্তে সম্ভব! বিজ্ঞানে এই মুহূর্তে আমাদের সত্যিকারের কোনো আশা আমি দেখি না! আগামী দশ কি বিশ বছরেও বিজ্ঞানের বাঙালি জাতির জয়জয়কার পড়ে যাবে সেই আশা করি না। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যতের কথা আমাদেরকে এখনই ভাবা উচিত, যে কথাটি ১০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভাবলে আমরা হয়তো আজকে অন্য অবস্থানে থাকতে পারতাম!

আমরা কি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি পরিকল্পিত অতীত তৈরি করছি? নাকি ১০০ বছর পরে গিয়েও আমাদের উত্তর প্রজন্মকেও একটি বিজ্ঞান বোধসম্পন্ন জাতি হিসেবে বেড়ে ওঠার কথা ভাবতে হবে!

জাফর ইকবাল স্যারের মূল লেখাটি ইংরেজিতে রচিত। আমার দেয়া বাংলা উদ্ধৃতিগুলো ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদে অর্থ বদলে যেতে পারে সেরকম সংশয় থাকলে অথবা মূল লেখাটি বিস্তারিত পড়তে চাইলে সেটি পাওয়া যাবে এখানে: Doing science in Bangla

সচলায়তনে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই: