শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১১

কথা বলুন সুহৃদ! এখনই!


মুক্ত মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কুৎসিত আভিলাসটি নানামহল থেকে বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের সামনে আসছিল। এলজিআরডি মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য আমরা পড়েছি। তিনি বলেছেন নিজেদের ক্রেডিবিলিটি ধরে রাখতে ব্লগগুলো মনিটর করুন। এটা যে শুরুর ইঙ্গিত ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই শুরুটাকে আরো অনেকেই যুক্তি(!) এবং উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে নিতে চাইছেন। কেন চাইছেন সে বিষয়টি ব্লগেই স্পষ্ট করেছেন সচলায়তনের সহব্লগার হিমু ভাই।

সম্প্রতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর প্রধান সম্পাদক জনাব তৌফিক ইমরোজ খালিদী'র দেয়া বক্তব্য থেকে তাঁর ডিজিটাল সেনাশাসনের স্বপ্নটি সর্ম্পকে জানতে পারি আমরা। এই ব্যক্তিটি ব্লগ এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্টা করতে চান। তাতে তার মতো খবর ব্যাবসায়ী এবং রাজনীতিবিদ দুপক্ষেরই লাভ। যে অনুষ্ঠানে তিনি কথা বলছিলেন সেখানে সরকার বিরোধীদল দুপক্ষেরই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আমরা নিশ্চিত, সবমহলেই ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আমরা এক শ্রেনীর সামাজিক সাইট, ব্লগ ব্যাবসায়ীকেও দেখছি সাইবার আইন বিষয়ে কথা বলতে। সকল অনলাইন মাধ্যম নিয়ন্ত্রনের একটি কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করা দরকার বলেও অনেকে মন্তব্য করছেন। বুঝতে অসুবিধা হয়না এদের উদ্দেশ্য! অনলাইন মাধ্যমের হেডমাস্টার হওয়ার স্বপ্ন জেগেছে এইসব কীটপতঙ্গের!

আমরা একটি অদ্ভুত সময়ে বাস করি। এই সময়ে আমরা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস করিনা। তাঁরা মূলত দেশ এবং মানুষের জন্য কল্যাণকর নিয়মের বদলে তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থ বাঁচাতে আইন করেন। উদাহরণ হিসেবে কেবল একটি নাম নেই, ব্লগের জন্য আইন/নিয়ম করা হলে আমার প্রিয় একটি মাধ্যম সচলায়তন খুব সম্ভবত নিয়মের গলি পার হয়ে বের হতে পারবেনা। সচলায়তনে স্পষ্টতই সরকার বিরোধীদল নেতা চামচা ক্যাডারের পরোয়া না করে কথা বলা হয়, কথা বলা যায়। বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী ২ বছরের সেনাশাসনের সময়ে এই সচলায়তনকেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সচলায়তনের অপরাধ ছিল এখানে সেনাশাসন বিরোধী কথা বলা যেত! প্রতিবাদ করা যেত! সচলায়তন একা নয়। সচলায়তনের মতো মুক্তকণ্ঠ, উচ্চকণ্ঠ মাধ্যম রয়েছে আরো অনেক।

ইদানিংকালে ব্লগাররা এমনিতেও যথেষ্ট হুমকি ধামকি মামলার স্বীকার হয়েছেন, হচ্ছেন।  নানা সময়ে পুলিশ/গোয়েন্দারা ব্লগারদের ধরে নিয়ে গিয়ে কখন কীভাবে কী লেখা উচিত এবং কী লেখা উচিত নয় সে বিষয়ে পরামর্শ আদেশ উপদেশ দিয়েছে, দিচ্ছে! বাক স্বাধীনতা আমাদের দেশে কেবল নেতারাই ভোগ করেন। তারা স্বাধীনভাবে মাইকে-গণমাধ্যমে-সংসদে মিথ্যা-কুৎসা বলতে থাকেন। এবং মুর্খের মতো ভাবতে থাকেন যে মানুষ বোকা, তারা এইসব মিথ্যা ধরতে পারছে না! আমাদের মতো সাধারণরা কেবলই গলার উপর দা ছুরি কাঁচি নিয়ে দাঁড়ানো ধর্মীয় মৌলবাদী কুকুর, শ্বাপদ শ্রেণীর পুলিশ গোয়েন্দার কাঁধে ভর করে সরকারী দলের সম্পত্তি হয়ে যাওয়া রাষ্ট্র, ক্যাডারের শক্তিতে শক্তিশালী বিরোধীদল এবং সময়ে সময়ে (স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেকটা সময় ধরে) ব্যারাকে সন্তুষ্ট না থেকে দেশ শাসনে বের হয়ে পড়া জলপাই রঙের হায়েনা বাহিনীর বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে থাকি। বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে করতেই আমরা মরে যাই।

কয়েক বছর হলো ব্লগ আর অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে আমরা আমাদের ক্ষোভকে খানিকটা হলেও প্রকাশ করার সুযোগ পাই। খবরের কাগজের যে সীমাবদ্ধতা এবং যে ব্যাবসায়ী মনোভাব রয়েছে তা ব্লগের নেই। ব্লগ সবার। এখানে সবাই কথা বলেন। প্রতিবাদ করেন। অন্তত চিৎকার করেন। সাধারণের চিৎকার করার, গলার উপর থেকে বন্দুকের নল সরিয়ে একটুখানি বেঁচে ওঠার মাধ্যম হয়ে উঠেছে, উঠছে ব্লগ। এইক্ষেত্রে শাসকদের মুর্খতা অনেকখানি আশীর্বাদ হয়েছে আমাদের জন্য। ব্লগের/সামাজিক সাইটের ক্ষমতা কতখানি, তা প্রযুক্তিমূর্খ এই শ্রেণী বুঝে উঠতে উঠতেই এসব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। প্রতিমুহূর্তেই আরো আরো মানুষের নাগালে আসছে আন্তর্জালের বিস্তীর্ণ এই জগৎ।

কিন্তু কথা বলার শক্তিটি সাধারণের থাকলে শাসক শ্রেণীর দারুণ বিপদ। এটি আর নতুন করে ব্যাখ্যা করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে বিপদ খবর ব্যাবসায়ী গোষ্ঠীরও। কেবল তাদের পরিবেশন করা রং চড়ানো খবরের দৃষ্টি দিয়ে মানুষ সময়কে দেখবে না, সেটা তারা মেনে নিতে চায়না। মানুষ জানতে পারছে, বুঝতে পারছে, কথা বলতে পারছে, এবং একজোট হতে পারছে সেটি শাসক শ্রেণীর জন্য সুখের নয়! একটি দেশে যখন অন্যায় করার প্রয়োজন হয় তখন সবার আগে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয় সংবাদ মাধ্যমের। বোবা সংবাদ মাধ্যম দেখার দুঃসহ অনুভূতি দীর্ঘ সেনাশাসনের অভিজ্ঞতায় এ দেশের বিস্তীর্ণ মানুষের রয়েছে!

আজকে যখন, ট্রানজিটের নামে মাতৃভূমি বিপন্ন হয় তখন ব্লগে-ফেসবুকে মানুষ কথা বলে! সংবাদ মাধ্যমে নয়, সামাজিক সাইটে মানুষ জেনে যায় সত্যাসত্য! আজকে যখন রাজাকারের দ্রুত বিচারের দাবী করা হয় তখন সামাজিক সাইটে- ব্লগে মানুষ সহমত প্রকাশ করে! আজকে যখন মন্ত্রী দূর্ণীতি করে, রাজনীতিবিদ মিথ্যে বলে তখন মানুষ সোচ্চার হয় সামাজিক সাইটগুলোতেই! এই সময়ের প্রতিটি টুকরো ঘটনার স্বাক্ষর বয়ে চলে ব্লগ আর সামাজিক সাইট।

ব্লগ এবং অন্য সব সামাজিক সাইট সন্দেহাতীত ভাবেই সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর! সাধারণের কণ্ঠস্বর ধারণ করার দায় এবং ক্ষমতা অন্য কোনো মাধ্যমের নেই। ছিলওনা কখনো!

সমস্যা হচ্ছে, সাধারণের কণ্ঠস্বর শাসকদের জন্য সবসময় সুখকর নয়। এবং যেসব প্রচলিত মিডিয়াকে আমরা সাধারণের পক্ষে কথা বলতে দেখি তারাও কথা বলে নিজেদের লাভ ক্ষতির হিসেব মাথায় রেখেই! সুতরাং সাধারণে যদি নিঃশঙ্কোচে কথা বলে তাহলে এসব ব্যাবসায়ী মাধ্যমগুলোর ব্যাবসা রক্ষা হয়না! মানুষের বোধকে এরা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সেটা তারা করতে পারেনা! গনজাগরণের একচেটিয়া দিকনির্দেশক হয়ে রাজত্ব করাও আর এদের হয়ে ওঠে না!

সেজন্য আমরা কিছুদিন থেকেই শুনছি, অশ্লীলতা এবং স্বেচ্ছাচারীতার জুজু ঠেকানোর নাম করে মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, সংবাদ ব্যাবসায়ী, এবং বিভিন্ন মাধ্যম/সংস্থা/সংগঠনের কাছে বিক্রী হয়ে যাওয়া বুদ্ধিবেশ্যারা নানাভাবে সাইবার আইন করে অনলাইন গণকণ্ঠ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার কথা বলছেন! আমি খুব আশংকা নিয়ে বসে আছি, একদিন আচমকা শুনব একটা আইন হয়ে গেছে! কারো আর কিছু করার নেই! হয় চুপ করে থাকো, নয় মরো! মরছি আমরা এমনিতেও, এরপর থেকে আমাদেরকে নিঃশব্দে মরতে হবে!

প্রিয় সুহৃদ, আপনি যখন ফেসবুকে একটা লাইনে বলেন, ট্রানজিটের নামে দেশের সর্বনাশ আপনি মানতে পারছেন না! বাঁধ দিয়ে ্আপনার দেশের সর্বনাশ আপনি মানবেন না! তখন সেটি আসলে আপনি একা বলেন না। লাখে হাজারে মানুষ আপনার সঙ্গে যার যার অবস্থান থেকে কণ্ঠ মেলায়! মেধা নয় বরং কেবলমাত্র সাংসদের সন্তান হবার জন্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আপনার সন্তানের চাইতে বেশী সুযোগ পাবে অন্য কেউ, এই নোংরা বাস্তবতাটি ব্যঙ্গ করে আপনার একান্ত ব্লগটিতে আপনি যখন আপনি আপনার ক্ষোভ এবং ঘৃণার কথাটা লিখে ফেলেন, এঁকে ফেলেন, তখন আপনার হাজার হাজার পাঠক সেটি জানতে পারেন! বুঝতে পারেন, একমত হতে পারেন! ঘৃণা জানাতে পারেন! অনলাইনের একটি কণ্ঠ যাদুবলে সহস্র কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে!

প্রিয় সুহৃদ, আপনি একজন পূর্ণ মানুষ।  আপনার ভাষা এবং চিন্তা স্বাধীন এবং মুক্ত। এখনই কথা বলুন। যেখানে যে মাধ্যমে আপনি স্বচ্ছন্দ্য সেখানেই কথা বলুন। সাইবার আইনের নামে আপনার কণ্ঠরোধ করার বিরুদ্ধে কথা বলুন। আপনার একান্ত ফেসবুকে, ব্যক্তিগত ব্লগে, কমিউনিটি ব্লগে, গ্রুপে, আড্ডায়, ওয়েবসাইটে আপনি বলে দিন, ডিজিটাল সেনাশাসনের স্বপ্নে মাতোয়ারা রাজনীতিবিদ, ব্যাবসায়ী এবং বুদ্ধিবেশ্যাদের নোংরা চিন্তাধারা সর্ম্পকে আপনি জ্ঞাত আছেন। এবং আপনি আপনার ভাষার পরাধীনতা, তাকে সে যে নামেই ডাকা হোক, মেনে নেবেন না!

কথা বলুন সুহৃদ! এখনই!

কৃতজ্ঞতা: এই লেখাটির বক্তব্য, সংযুক্তি এবং অন্যান্য অংশের জন্য সচলায়তনের সহব্লগারদের প্রতি আমি ঋণী।
সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: