রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১২

বিস্রস্ত দিনলিপি ১: অক্ষরপূজা

থাকার হিসেব আজকাল আর খুব সহজে দিতে পারি না। মাঝে মাঝে চিন্তাশক্তিহীন হয়ে যেত ইচ্ছে করে। খাবারের সন্ধান করে করে আর বংশ বাড়িয়ে মরে যাওয়ায় একটা আমোদ আছে বৈকি! তাতে প্রাণের তৃষ্ণা আর পৃথিবীর অন্ধকার অণুক্ষণ অস্থির করে রাখে না! দীর্ঘদিন হয়, আমি কেবল নিজেকে প্রবোধ দিয়ে যাই, আমার অল্পকিছু কাজ রয়েছে বাকি! দায়গুলো ঠিকঠাক মিটলেই আমার ছুটি! দায়গুলো মিটলেই আমি শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বলতে পারব, নিজের কাছে নিজের ঋণ শোধ করেছি। খুব মহান কিছু করেছি কিনা জানিনা, কিন্তু আমি কোনো অপরাধ করিনি! কসম! কারো অশ্রুবিন্দুর পেছনে আমার অন্ধ উল্লাস ছিলনা দায়ী!

পরবাসে আমার কাজগুলো এগিয়ে চলছে ভালই। এতো চমৎকার একটা ল্যাবে কাজ করি, এতো চমৎকার একটা পরিবারের মতো ্আমার প্রফেসর সব আগলে রাখেন, আমি শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসি। ভালো অথবা খারাপ থাকার হিসেব তো আর করা যায় না। আমি আমার কাজগুলো করছি ঠিকঠাক। সব ঠিকঠাক আছে। বরং সব দারুণ চলছে। ক'দিন আগে  আমার সহকর্মী চায়নিজ মেয়েটির (ওর নাম শেন) একটা পেপার প্রকাশিত হলো নিউ ইংলণ্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ। আমি হরহামেশা হা করে চেয়ে থাকি শেনের দিকে। এইটুকু মেয়ে, আর এখনই তার নিউ ইংলণ্ডে পেপার! আহা! এর পায়ের ধুলো নিয়ে তাবিজ বাঁধতে ইচ্ছে হয় গলায়!

আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমি কী চাই? আমি নির্দ্বিধায় বলব, নিউ ইংলণ্ডে নিজের একটা পেপার, অথবা সায়েন্সে, অথবা ন্যাচারে! আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমি আর কী চাই, আমি বলব ওই পত্রিকাগুলোতে নিজের আরেকটা পেপার! মানুষের জ্ঞানের অংশ হয়ে যাওয়ার চাইতে বেশী আর কী চাওয়ার থাকতে পারে আমার! আর নিজের যেসব দায় রয়েছে, সেসব মিটিয়ে ফেলতে চাই। অশ্লীলভাবে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন। অথচ কত কাজ বাকি! সময় নেই একেবারে!

মাঝে মাঝে মনে হয়, এতো বোকা কেন হলাম আমি! জীবনের গোটাদুই বছরে যে বোকামি, যে মূর্খামি করেছি, সে দুই জনমেও পুষিয়ে উঠবে না! বোকা হওয়ার ক্ষোভটা কখনো মেটে না! চোখ লাল হয়ে ওঠে, হাত মুঠো হয়ে যায়, টান টান হয়ে ওঠে শিরা উপশিরা! এত বোকা কেন হলাম! একো বোকা কেন হলাম!

সবকিছুর উপরে নতুন নতুন দুঃসময় এসে ভিড় করে। পুরনোগুলো সামলেই কাজ করতে মুস্কিল হয়ে যায়! আমার কাজ অখণ্ড মনোযোগ দাবী করে! অথচ অস্থিরতা এড়িয়ে প্রায়শই অসম্ভব হয়ে পড়ে মনোসংযোগ করা!  বারবার আমি হেরে যেতে থাকি দুঃসময়ের কাছে! দুঃসময়ে কেবল কেউ অভ্যস্থ হয়ে ওঠে না! বিস্মরণের মহৌষধ আমার পকেটে নেই! আমাকে নিজের সামনে দাঁড়াতে হয়! প্রতিমুহূর্তে আমার মায়ের মুখ ভাসে চোখের পাতায়! কী অপূর্ব নিষ্কলুষ সেই মুখ! কী সরল স্বচ্ছ আর পবিত্র সেই মুখ! সেই মুখের আপমান করতে পারিনা বলে, বিস্মরণের মহৌষধ তুলতে পারিনা হাতে!

এতসব পুরনো যন্ত্রণার মাঝে, আপনজনের মারাত্মক দূর্ঘটনার খবর পাই। পঙ্গু হয়ে গেছেন সাংবাদিক নিখিল ভদ্র! আমার ভাই! রোজ দুচারটে করে মন্ত্রী আমলা এসে শান্তনা দিয়ে যায়! শান্তনা দিয়ে কী করব আমি!

শ্বাপদের মতো আমার মায়ের বোনের শরীরে দাঁত বসানো পাকিস্তানি সেনা এই ক'দিনেই বেঈমানীর দায় আমার ভাইয়ের ঘাড়ে চাইয়ে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে করাচী থেকে! যে বেয়নেট, যে উর্দি থেকে এখনো আমার ভাইয়ের, বোনের রক্ত-মাংসের গন্ধ যায়নি, সেই উর্দি পরে বেয়নেট কাঁধে আমাদের দেশের মাটিতে সামরিক সন্মান পায় পাকিস্তানের সামরিক শুয়োর! পত্রিকা টিভিতে রাজনৈতিক সভায় ঘেউ ঘেউ করে অত্যাচারের দায় নির্লজ্জ অস্বীকার করে রাজাকার আর তাদের নব্য ছানাপোনারা! ২০/২১ বছরের ছেলেরা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হাড় ভেঙে দেয় ঈশানের! আচমকা উল্টো ঘুরে নির্বিকার হেঁটে চলে যায় সবটুকু ভরসা করে থাকা মানুষ! আহারে! বেঈমানী কি আমাদের রক্তে! আরেকটু মায়া থাকলে কী হতো! আরেকটু মানুষ হয়ে উঠতে পারতাম না আমরা! এতো এতো দুঃসময়, অন্তর ফাঁকা করে দেয়! আহারে!

দুঃসময় সঙ্গে করেই এগোতে হয়! আর কোনো উপায় জানা নেই! বস্তুত আর কোনো উপায় খুঁজিও না! অষ্টপ্রহর কেবল জপে যাই, আরো খানিকটা কাজ বাকি আছে! আরো খানিক দায় রয়ে গেছে! কাজ করো, কাজ! দায় মেটাও। আমার কথাগুলো, আমার দুঃসময়গুলো আমার গল্পগুলো লিখে ফেলে তবে ছুটি! আর কবে আমি লিখতে শিখব ঠিকঠাক? আমার অক্ষরেরা কবে স্পষ্ট আর ইস্পাত হবে? যে বোধ আমার প্রাণ থেকে বেরোয়, সেসব কবে আমার আঙুল গলে অক্ষর হবে!

আমি খুব আশা করে থাকি। একদিন, ঠিক একদিন আমি লিখতে পারব যেমন লিখতে চাই, যেমন লেখা দরকার, যেমন লিখতে হয়! দুঃসময় থেকে মুক্তি নেই। না থাকুক। আমি আমার দায় থেকে মুক্তি চাই। আমার দায়মুক্তি কেবল অক্ষরে, আমি জানি। আমি অষ্টপ্রহর কেবল অক্ষর পূজা করে চলি...

কোন মন্তব্য নেই: