বৃহস্পতিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০১২

গল্প অপচেষ্টা (২): বাঁধাইকর

আমাদের মফস্বলে ওই একটিই বাঁধাই ঘর ছিল।

বাঁধাইকর ছিল কালো একটা লোক। শুকনো, অথচ কেমন খানিকটা তেলতেলে লোকটা মোটা ফ্রেমের চশমা পরে সারাদিন মুখ গুঁজে বই সেলাই করে চলত! লোকটার সরু লম্বা আঙুল দেখে সেগুলোকে মায়াবী ভাবার কিছু ছিলনা! কিন্তু কীরকম মায়া করে লোকটা বইয়ের পুরনো মড়মড়ে পাতাও নরম মাংসের মতো সেলাই করে ফেলত! বই যেন না, পুরনো কাপড়! বইগুলোও যেন গলে পড়ে যেত লোকটার হাতে! সুলতা বৌদি আমার চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটলে যেমন আমার অদ্ভুত আদর লাগত, সেরকম। অথবা সেইবার যখন আমি আর তনি ওদের পোড়ো ভিটের শুকনো ডোবায় পালিয়েছিলাম! তনি কেবল আমার হাত জাপটে ধরে আমার গায়ে হেলান দিয়ে পড়ে ছিল! আর আমি ওকে যতই ধাক্কাই উঠতে চাচ্ছিলোনা, সেরকম!

আমি দেখেছি, অনেক আদর না হলে বইয়ের পাতা সেলাই করা যায় না! পুরনো বইয়ের পাতাগুলো খানিকটা লালচে আর শক্ত হয়ে ওঠে! একটা পাতা পড়ে যে ভাঁজ করে চিহ্ন রাখবে, তার উপায় নেই! ভাঁজ করলে সে ওখানেই বোবা পাঁপড়ের মতো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাবে!

আমার বইগুলো অবশ্য আমি পুরনো হতে দিতাম না। ফি সপ্তাহে ঝেড়ে মুছে তাকে তুলে রাখতাম। বই বলতে আমার ছিল ওই তনির দেয়া বইগুলোই। তনি বলত, "একটা বই হচ্ছে একটা গল্প, বুঝলি? আমার দেয়া গল্পগুলো হারাসনা!" আমি বলতাম, "একটা বই একটা গল্প কীরে! কত বইয়ে তো অনেকগুলো গল্প থাকে!" তনি বলত, "ধুর বোকা! একটা বই একটাই গল্প! একটা গল্পে অনেকগুলো পাখি থাকে!" আমি হাসতাম, তনিটা বড্ড অদ্ভুত কথা বলত। 

বড় রাস্তায় যেখানে  আমাদের স্কুলের রাস্তাটা এসে মিশেছে সেই মোড়ে ছিল আমাদের বাঁধাইঘর। স্কুলে যেতে আসতে ঠিক ওই মোড় থেকে আমাকে দৌড়ে গিয়ে চলতি ভ্যানে উঠতে হতো। ভ্যানের জন্যে স্কুলের পর অনেক্ষণ ওখানে দাঁড়ানো হতো প্রায়ই! যাওয়া আসার পথে দেখতাম কী নিবিষ্ট হয়ে বাঁধাইকর লোকটা সেলাই করতো পুরোনো বই! ধ্যান করছে যেন! দিস্তে কাগজ সেলাই করে আমি খাতা বানাতে পারতাম! কিন্তু বই সেলাইয়ের অন্য ধরন! সে অনেক্ষণ চেয়ে থাকলেও শিখে ওঠা যেতো না! বইয়ের থাকতো থাক থাক ছোট ছোট ভাগ! সেগুলো সব আলাদা সেলাই হতো। কিন্তু শেষে আবার সেগুলো জুড়েই শরীর পেত আস্ত বইটা। তার উপর শক্ত মলাট লাগাতে হত! মলাটের নিচে থাকত লাল রঙা পাতলা কাপড়!


ভারী ভারী পুরনো বই সেলাই করে করে বাঁধাইকর থান ইট চাপা দিয়ে মৃদু রোদে শুকোতো। একেবারে সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে শেষবেলায় পুরনো শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে ঘষে সমান করে দিত বইয়ের ধারগুলো।

আমার খুব শখ হত, বাড়ির সব পুরনো বই নিয়ে বাঁধাইকরের কাছে দিই। আর ঝামা ইট দিয়ে ঘষা লোহার পাতিলের মতো নতুন চকচকে করে নিয়ে আসি। কিন্তু মা যেভাবে আগলে রাখতো বাড়ির সব বই, সাহস পেতাম না বাইরে নেয়ার! মাও বোধহয় আমার কাছে বইগুলো দেয়ার সাহস পেতেন না! মনে মনে ভাবতাম, তনির দেয়া বইগুলো পুরনো হলে ঠিক যাবো। সারাদিন বসে থেকে সব বই নতুন করে নিয়ে আসব। অদ্ভুত কতকিছুই না ভাবতাম সে সময়! সময় যে এমন বদলাতে পারে, মনেই হতো না!

 ***   ***   ***

মফস্বলের বাঁধাইঘরটা উঠে গিয়েছিল ক'বছর পর! কোথায় গিয়েছিল কে জানে! বাঁধাইকর হয়তো পেশা বদলেছিল। নতুন কাজ না শিখলে সেই বাজারে খেতে পাওয়ার কথা না বেচারার!

আর আজকাল তো বই বাঁধাইয়ের চলটাই উঠে গেছে। পুরনো রদ্দি বই ফেলে দিয়ে লোকে এখন ঝটপট নতুন বই কিনে ফেলে। আমার কেবল মাঝে মাঝে বাঁধাইকর লোকটার কথা মনে হয়। মায়া লাগে। আহারে লোকটা! কীভাবে বেঁচেছিল সে? নতুন কোনো কাজ কি সে শিখে উঠতে পেরেছিল?

কোন মন্তব্য নেই: