রবিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০১২

এইচআইভি-এইডস মহামারীর অস্তিত্ব নেই?!

শুক্রবারে এক্সপেরিমেন্টের ফাঁকে অভ্যসবশত পরিচিত বিজ্ঞান পত্রিকাগুলোতে ঢুঁ মারছিলাম। ন্যাচারে (nature.com) বিশেষ প্রজাতির সাধারণ পিঁপড়াদের  দৈত্যাকার প্রহরী পিঁপড়া হয়ে ওঠা বিষয়ক খবরটা নজর কাড়ল। বিজ্ঞানের পৃথিবীতে চমক না থাকাটাই অস্বাভাবিক। অভ্যেস হয়ে যাওয়ায় এসব খবরে এখন আর চমকাই না। তবে সত্যি সত্যি দারুণ চমকে উঠলাম পরের খবরটাতেই। একটা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে অস্বীকার করা হয়েছে  এইচআইভি ভাইরাসসের সঙ্গে এইডসের সম্পর্ক ! গবেষণাপত্রটি ন্যাচারে প্রকাশিত হয়নি। ন্যাচার বরং এটির উপর একটি নিবন্ধ ছেপেছে। নিবন্ধটি এবং পরবর্তীতে মূল গবেষণাপত্রটিও আমি আক্ষরিক অর্থেই হাঁপাতে হাঁপাতে পড়েছি! এইচআইভি ভাইরাস এইডসের জন্য দায়ী নয়? এইডস কোনো মহামারী নয়? এইডসের টিকা/ওষুধের যে যুগব্যপী গবেষণা, পরীক্ষামূলক ব্যবহার সেসবের দরকার ছিলনা? এইডস পূর্ববর্তী/পরবর্তী নানা সামাজিক-রাষ্ট্রীয় আয়োজন সব অর্থহীন? বলে কী!

১৯৮৪ সালের পর থেকে এইচআইভি/এইডস-এর কারণে বিশ্বের সমাজ-রাষ্ট্র-অর্থনীতি-স্বাস্থ্য যেভাবে ওলটপালট হয়েছে সেটার খুব অস্পষ্ট একটা ধারনা নিয়েই আমি বলতে পারি, এই গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানের বিশ্বে অন্তত গোটা দশেক নাইন-ইলেভেন-এর প্রভাব ফেলবে! ফেলা উচিত।

ন্যাচারের নিবন্ধটির শিরোনাম মূল গবেষণাপত্রটি সম্পর্কে একটা ধারনা দেয়। শিরোনামটি এরকম: Paper denying HIV–AIDS link secures publication. এটার বাংলা করা যায় অনেকটা এরকম: এইচআইভি-এইডসের সম্পর্ক অস্বীকার করা গবেষণাপত্র (নিজের) প্রকাশ নিশ্চিত করেছে! এভাবেও বলা যেত, একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে যেটিতে এইচআইভি এবং এইডসের সম্পর্ক অস্বীকার করা হয়েছে! কিন্তু শিরোনামের  "প্রকাশ নিশ্চিত করেছে (secures publication)" অংশটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি বলে দেয় যে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হবার কথা ছিল না। অথবা এটি প্রকাশিত হবার মতো "যোগ্য" হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু সেই যোগ্যতাটি এই গবেষণা অর্জন করতে পেরেছে! এই গবেষণাপত্রের যোগ্যতা বিষয়ক ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সেদিকে যাওয়ার আগে, পাঠকদের এইচআইভি এইডস বিষয়ে কিছু তথ্য মনে করিয়ে দেই।

এইডস রোগটিতে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেড়ে পড়ে। এইচআইভি নামক ভাইরাস এইডস রোগের জন্য দায়ী। এই ভাইরাসটি মানুষের শরীরের একটি বিশেষ রোগপ্রতিরোধী কোষ ('টি কোষ' T lymphocyte)-কে সংক্রামিত করে। এইচআইভি সংক্রমণে শরীরের এই বিশেষ রোগপ্রতিরোধী কোষের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে এদের উপর নির্ভরশীল শরীরের রোগপ্রতিরোধী বড় একটি অংশ! রোগপ্রতিরোধের এরকম একটি স্তর ভেঙে পড়লে যেসব জীবাণুর সঙ্গে সহজেই মানুষ লড়াই করে বেঁচে থাকত সেসব জীবাণূর সংক্রমণেই মানুষ মারা যায়। একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, এইচআইভি ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করলেই এইডস হয়না। এইচআইভি সংক্রমণ থেকে এইডস হতে সময় লাগে। কখনো এই সময়ে ১০-১৫ বছরের মতো দীর্ঘও হতে পারে। এই সময়টি নির্ভর করে, এই ভাইরাসটি কত দ্রুত শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারছে তার উপর! শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে যখন আপাত ক্ষতিকর নয় এরকম জীবাণুর আক্রমণে মানুষ দূর্বল হয়ে পড়ে, অথবা যখন খুব সাধারণ অসুখ বিসুখ আর সারেনা তখন সেই পর্যায়টিকে মোটাদাগে এইডস বলা যায়।
 
এইডস রোগটির কারণ হিসেবে এইডস ভাইরাসকে প্রথম চিহ্ণিত করা হয় ১৯৮৪ সালে একটি গবেষণাপত্রে। সারা পৃথিবীতেই এরপর এইডস আতঙ্ক বেড়েছে বই কমেনি। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই এইডস প্রতিরোধে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে। এইডস প্রতিরোধ, সচেতনতা থেকে শুরু করে এইচআইভি-এইডস বিষয়ে গবেষণার জন্যে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যয় করা হয়েছে অকল্পনীয় পরিমাণের অর্থ। এই বিষয়টিতে সারা পৃথিবীতে নানা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ! এইডস বিষয়ক গবেষণা, আবিষ্কার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে নিয়মিত। লক্ষ মানুষ-পরিবার যেমন এই রোগে সর্বশান্ত হয়েছে তেমনি এই রোগটিকে মোকাবেলায় নতুন উদ্যমও এসেছে প্রতিদিন। এইডস বিষয়টি অপরিচিত নয় কারো কাছেই! যে কেউ চারপাশে তাকালেই বুঝতে পারে এই রোগটিকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়! সারা পৃথিবীতেই এর চাইতে বেশী প্রচারণা অন্য কোনো সংক্রামক রোগ পেয়েছে বলে আমার জানা নেই‍!!।

এখন যদি কেউ আচমকা একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে যেটিতে এইচআইভি এবং এইডসের সর্ম্পকটিকেই অস্বীকার করা হয় তাহলে সেটি কীভাবে গ্রহনযোগ্যতা পাবে! এরকম আজগুবি কোনো ব্যাপার তো প্রকাশযোগ্যই হতে পারেনা! কিন্তু সেটিই হয়েছে। এই গবেষণাপত্রটি আপন যোগ্যতাতেই প্রকাশিত হয়েছে! অথচ এই গবেষণাপত্রটিরই একটি পুরনো সংস্করণ (২০০৯-এ) প্রকাশের পর আবার ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল! তখন যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল সেগুলো এরকম:

  • সারা পৃথিবীর বিজ্ঞান মহল ক্ষেপে উঠেছিল।
  • গবেষণাপত্রটি এবং গবেষক  পিটার ডুয়েসবার্গ চরমভাবে নিন্দিত হয়েছিলেন (গবেষণাপত্রটি পুনর্নীরিক্ষিত/peer reviewed ছিলনা)
  • পরবর্তীতে গবেষণাপত্রটি ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল।
  • দারুণভাবে নিন্দিত হয়েছিল/মান হারিয়েছিল গবেষনাপত্র প্রকাশকারী ম্যাগাজিন Medical Hypotheses
  • চাকরি হারিয়েছিলেন ম্যাগাজিনের সম্পাদক ব্রুস চার্লটন
  • ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া গবেষক পিটার ডুয়েসবার্গ-এর বিরুদ্ধে বিজ্ঞান সাধনায় অসদাচারণের (scientific misconduct) অভিযোগ এনেছিল।

একবার যে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করে এরকম হাঙ্গামা হয়েছে সেটিই আবার প্রকাশ করতে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটাকে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হয়েছে তাতে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এবার অবশ্য এটি পুরোপুরি নতুন সংস্করণ নয়। এটিতে পুরনো সংস্করণটির অনেক যুক্তিকেই আবার উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে যেটি করা হয়েছে সেটি পুনর্নীরিক্ষণ (peer review)! পুনর্নীরিক্ষণ বা পিয়ার রিভিউ বিষয়ে সংক্ষেপে বলি, একটি গবেষণাপত্র যখন কোনো বিজ্ঞান সাময়িকীতে পাঠানো হয় তখন সেই সাময়িকীর সম্পাদক যদি সেই গবেষণাপত্রটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অন্য গবেষকদের কাছে পাঠান। এবং অন্য গবেষকরা পর্যালোচনা করে রায় দেন ওই গবেষণাপত্রটি যথার্থ কীনা! তখন সেই প্রকৃয়াটিকে বলা হয় পুনর্নীরিক্ষণ। 

উদাহরণ দেই, ধরা যাক রোনালদো একটা বিশেষ পদ্ধতিতে বলে লাথি দিয়ে গোল দেয়া যায় বলে আবিষ্কার করেছে। সেটি তথ্য-প্রমাণ সহ একটা গবেষণাপত্র আকারে লিখে শাঁখারিবাজার ফুটবল ম্যাগাজিনে পাঠালো। শাঁখারিবাজারের সম্পাদক সেটিকে তখন পুনর্নীরিক্ষণের জন্য মেসি এবং অন্যান্যদের কাছে পাঠাবেন। তাঁরা ওই গবেষণাপত্রে লেখা পদ্ধতি যাচাই করে দেখবেন, আসলেও ওই বিশেষ লাথিতে গোল হয় কীনা! মেসি এবং অন্যান্যরা যাচাই করে রায় দিলে তখন সেটি পুনর্নীরিক্ষিত গবেষণাপত্র হিসেবে শাঁখারিবাজার ফুটবল ম্যাগাজিনে প্রকাশ পাবে।

বিজ্ঞানের গবেষণাপত্রের পুনর্নীরিক্ষিত হওয়া খুব জরুরী। এটি কোনো গবেষণার/আবিষ্কারের গ্রহনযোগ্যতা নিশ্চিত করে! এইচআইভি এইডসের সম্পর্ক অস্বীকারকারী ডুয়েসবার্গের গবেষণাপত্রের এই সংস্করণটি পুননীরিক্ষিত। এটি প্রকাশিত হয়েছে ইটালিয়ান জার্নাল অব এনাটমি এণ্ড এমব্রায়োলজি'তে। গবেষণাপত্রটির পুনর্নীরিক্ষকদের একজন এই জার্নালেরই প্রধান সম্পাদক, গবেষক পাওলো রোমাগনলি। রোমাগনলি বলেন, তিনি এই গবেষণাপত্রটি পুনর্নীরিক্ষা করেছেন কারণ পূর্বে এটি প্রকাশের পরও ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল এটির কোনো তথ্য বিভ্রান্তি/বিকৃতির জন্য নয়, বরং এটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল বলে! যদি একটি গবেষণার তথ্য সঠিক হয় তাহলে সেটি কেবল বিতর্কিত হওয়ার কারণে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে না!

ডুয়েসবার্গের বিরোধীরা (এঁরাই সংখ্যায় বেশি, ডুয়েসবার্গ ভয়ানকভাবে সংখ্যালঘু) কী বলছেন? 


এইডস গবেষণা এবং  প্রচারণার হর্তাকর্তারা তো এই গবেষণাপত্র কীভাবে পুনর্নীরিক্ষিত হতে পারে সেটা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন! অনেকে বলছেন এটি প্রকাশিত হয়েছে একটা নিন্মশ্রেনীর বিজ্ঞান সাময়িকীতে। খুব কম লোকই এই সাময়িকীর বিষয়ে জানে! এটার কোনো গ্রহনযোগ্যতা নেই! এই কথাগুলো অবশ্য খানিকটা সত্যি, বিসমিল্লা বলে শুরু করলেই একটি প্রকাশনা বিজ্ঞান সাময়িকী হয়ে যায় না! সেটি একটি গ্রহনযোগ্য মানের হওয়া আবশ্যক! গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠাও সহজ নয়! বিজ্ঞান সাময়িকীর গ্রহনযোগ্যতা/মান নির্ণয়ের একটি উপায় তার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর। ইটালিয়ান জার্নাল অব এনাটমি এণ্ড এমব্রায়োলজি'র ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ০.৪৮৮ (তথ্যটি যাচাই করে দেখিনি)। এটি নিঃসন্দেহে খুব সুখকর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর নয়! বরং বেশিরভাগে এই তথ্য শুনেই নাক কুঁচকাবেন!

 ন্যাচারের নিবন্ধটি থেকে ডুয়েসবার্গ বিরোধীদের কয়েকটা বক্তব্য তুলে দেই:

  • আমার মতে এই গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানে একটি "মূর্খামী" এবং এটির পুনর্নীরিক্ষিত হওয়া উচিত হয়নি! এইচআইভি থেকে এইডস হয়না এই তথ্যের কোনো বৈজ্ঞানিক গ্রহনযোগ্যতা নেই। -দক্ষিণ আফ্রিকাস্থ ট্রিটমেন্ট অ্যাকশন ক্যাম্পেইন এর নাথান গিফেন।
  • এই গবেষণাপত্রটির মান সন্তোষজনক নয় এবং এটি বিশ্বব্যপী জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্থ করবে। -এই গবেষণাপত্রটির পূর্ববর্তী সংস্করণ বিষয়ে নীরিক্ষকের মন্তব্য।
  • এটি এতো বিচ্ছিন্ন যে এই বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেয়া কঠিন! এটা দূর্ভাগ্যজনক যে ডুয়েসবার্গ এমন একটি বিপজ্জনক এবং ক্ষতিকর পথে এগোচ্ছেন যা কিছু মানুষকে এইডসের চিকিৎসা না নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে! -হার্ভাড ইউনিভার্সিটির এইডস এপিডেমিওলজিস্ট ম্যাক্স এসেক্স। (এইডসের চিকিৎসা এবং এইডস মহামারী বিষয়ক এই গবেষকের গবেষণাকেই ভুল বলেছেন ডুয়েসবার্গ।)

নিঃসন্দেহে, এইইচআইভি-এইডস এতো দীর্ঘসময় ধরে গবেষণার বিষয়বস্তু যে এটি এখন একটি অকল্পনীয় মহাবৃক্ষ! এক কোপে এটিকে বিনাশ করা সম্বব নয়। এক কথায় এতদিনের প্রমাণিত এই বিজ্ঞানকে উড়িয়ে দেয়াও সম্ভব নয়! কিন্তু ডুয়েসবার্গও বিজ্ঞানের জগতে নতুন কেউ নন, পাত্তা না দেয়ার মত কেউ নন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এই গবেষক দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশী সময় ধরে এইচআইভি-এইডস সম্পর্কের বিরোধীতা করে আসছেন। এই সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে তিনি বিরোধীতা করলেন এইডসের চিকিৎসারও। তার ভাষ্যমতে এটি অপ্রয়োজনীয় তো বটেই, ক্ষতিকরও! যুগ যুগ ধরে চালানো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের আর অকল্পনীয় শ্রমের গবেষণা সম্পর্কে এরকম মন্তব্য সহজ নয়। পৃথিবীর জনস্বাস্থ্য যে এই একটি ২১ পাতার গবেষণাপত্রে কতটা নাড়া খেতে পারে তা না বোঝার মতো বোকা তিনি নন। গবেষণায় সততা না থাকলে এতোবড় ঝুঁকি তাঁর নেয়ার কথা নয় বলেই আমার মনে হচ্ছে!

ডুয়েসবার্গ বলেন, এই গবেষণাপত্রটি এইডসের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিয়ে আমাদের দীর্ঘ যুদ্ধের বিজয়। অনেকেই অবশ্য বলছেন, ডুয়েসবার্গের কথায় কেউ পাত্তাও দেবে না। ডুয়েসবার্গের তত্ত্ব এখন কবরে এক পা দিয়ে বসে আছে! অবশ্য পাত্তা না দেয়ার কথা বললেও বিজ্ঞান মহলে ঝড় কম হচ্ছে না। কেউ বলছেন, বোকা বুড়োটা ক্ষেপেছে! কেউ বলছেন, দূর দূর! কিন্তু অনেকই ভাবছেন। ভাবার মতো কথাই ডুয়েসবার্গ বলেছেন তার গবেষণাপত্রে।

তিনি বলছেন, এইচআইভি এইডসের জন্য দায়ী সেটি নিশ্চিত নয়! এইডস কোনো মহামারী নয়! এবং এখনকার যে এইডস বিরোধী চিকিৎসা সেটির ক্ষতি বিবেচনা করে সেটির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা তা আবার ভেবে দেখা দরকার। যতদিন না এইচআইভি-এইডস সম্পর্ক নিশ্চিত হচ্ছে ততদিন এইচআইভি সংক্রমণের প্রমাণ মিললেই এইডসের চিকিৎসার প্রয়োজন নেই! এবং অবশ্যই সারা বিশ্বে এইডস মহামারীতে মৃতের যে হিসাব, সেই মহামারীর কোনো অস্তিত্বই নেই!

৩৫ বছর ধরে সারা পৃথিবীর মানুষ যে দুঃস্বপ্নে অস্থির হয়ে আছে! আজকে ডুয়েসবার্গ বলে দিলেন সেই দুঃস্বপ্নের অস্তিত্ব নেই? এতোই ক্ষমতা অখ্যাত সাময়িকীতে প্রকাশিত পাওয়া ২১ পাতার একটি গবেষণাপত্রের? 


ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে ভাবছি। কুল কিনারা পাচ্ছি না! আমার গোবর ভরা মাথায় তা পাওয়ার কথাও নয়! এমনিতে এ পর্যন্ত যতো বিরোধীতা এসেছে তাতে ডুয়েসবার্গের যুক্তির বিরোধীতা কাউকে করতে দেখিনি! সবই রাজনৈতিক ঝোপঝাড় পেটানো বিরোধিতা বলে মনে হচ্ছে! অখ্যাত সাময়িকীর যে যুক্তি তাতে আমি নিজে মনে করি, বিতর্কিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই নামী সাময়িকীগুলো এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেনি। ডুয়েসবার্গের গবেষণাপত্রটি শক্ত, কিন্তু এরকম একটা ভয়াবহ বিষয়ে কথা বলে পরে ভুল প্রমাণিত হওয়ার ঝুঁকি নামী সাময়িকীগুলো নেবে না! সমস্যা হচ্ছে, এইচআইভি-এইডস বিষয়ে আমি অন্য সব বিষয়ের মতই মূর্খ। তাই নিশ্চিত করে কিছু মানতেও পারছি না! কেবল দেখার জন্য অপেক্ষা করছি, এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে বিশ্বাসী বিজ্ঞানের বড় মাথারা ডুয়েসবার্গের গবেষণার যুক্তিযুক্ত বিরোধীতা করবেন কীভাবে! নাকি অদূর ভবিষ্যতে আরো গবেষণার মাধ্যমে এই ক্ষ্যাপা বুড়ো বিজ্ঞানী আরো শক্তভাবে প্রমাণ করে দেবেন, এইডসের মহামারী এমন একটা দুঃস্বপ্ন যার সত্যিকারের কোনো অস্তত্বই নেই!  

*** *** ***

এই লেখাটি এমনিতেই যথেষ্ট বড় হয়েছে। মূল গবেষণাপত্রে কীভাবে/কেন এইচআইভি-এইডস সম্পর্ক অস্বীকার করে এইডসের মহামারীকেই গায়েবী বলা হয়েছে সেই আলোচনা দীর্ঘ হবে বলেই মনে হচ্ছে। আজকে আর সম্ভব নয়! ব্যস্ত থাকলেও এরকম টাটকা গরম বিষয় এড়িয়ে যেতে পারলাম না বলে একটা লেখা লিখে ফেললাম। ডুয়েসবার্গের মূল গবেষণাপত্রটি সহজ ভাষায় লেখা। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। তা নয়তো সেটি নিয়ে আগামী ১১ তারিখের পর সেটি নিয়ে আরেকটি লেখা লেখার ইচ্ছে রইল। 

ডুয়েসবার্গের মূল গবেষণাপত্র (সবার জন্য উন্মুক্ত): http://www.fupress.net/index.php/ijae/article/view/10336/9525
চলায়তনে প্রকাশিত

২টি মন্তব্য:

কাজী মাহবুব হাসান বলেছেন...

ধন্যবাদ ..লেখাটার লিঙ্ক এর জন্য। আমি মিস করেছি... :)
আবার বোম ফোটালেন পিটার ডুয়েসবার্গ।
কোন সন্দেহ নেই অ্যান্টি রেট্রোভাইরাল গুলো টক্সিক। তবে টক্সিসিটি কমছে, এছাড়া অন্তত একটা প্রমিজিং ভ্যাক্সিন ফেজ ওয়ানে ঢুকেছে। কষ্ট বেনিফিট রেশিও টা ভাবা দরকার। HIV এর সাথে AIDS এর সম্পর্ক এটা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত। অসংখ্য স্টাডি গ্রুপ এর প্রমান দিয়েছে। ম্যাক্স এসেক্স আর হার্ভার্ড গ্রুপের HIV-2 এর স্টাডিটার বেশ কিছু ইস্যু ছিল। কিন্তু তারপর HIV রেট্রোভাইরোলজী বহুদুর এগিয়েছে। সেকারনেই এই পেপারটা বিস্ময়ের।
প্রথম রিভিউয়ার যেটা বলেছেন, খু্বই স্পেকুলেটিভ। দেখা যাক বিতর্ক কতদুর গড়ায়।

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। এইচআইভি এবং এইডসের সম্পর্ক নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে ঠিক। কিন্তু ডুয়েসবার্গের গবেষণাপত্রও উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে রইল। বিতর্ক কতদূর গড়ায় তা দেখার জন্য আমিও অপেক্ষা করছি।