মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০১২

কবিতার উৎপাত

কবিতা লেখার মতো ডেঁপোমি আর হয়না। আমার মতে দুনিয়ার সব আজাইরা আপদেরা দিনভর ছড়ছড় করে কবিতা লিখে চলে, আর প্রাণপনে সেই কবিতা সকলকে পড়িয়ে বেড়ায়। পরিচয় পাওয়া মাত্রই তাই কবিদের আমি আমার চতুর্সীমানা থেকে দূর দূর করে তাড়াবার পাঁয়তারা করি।

কিন্তু কবি এবং কবিতা বরাবরই নাছোড়বান্দা হয়। নিতান্ত অনিচ্ছাতেও তাই প্রিয়তম ডেপোঁদের বই আমার বইয়ের তাকে শোভা পায়। আমি যে বোকা তার অনেকগুলো প্রমাণের একটি হচ্ছে, আমার অনেক প্রিয় প্রিয়তম কবি আছেন। এবং একটি ভালো লাগা কবিতা বছরের পর বছর ধরে বারবার পড়ার পরও প্রতিবারই আমি নতুন করে মুগ্ধ হয়ে তব্ধা খেয়ে থাকতে পারি!

আমি যে একজন অথর্ব আজাইরা গণ্ডুস হয়ে বেড়ে উঠব সেই লক্ষণ আমার ভেতরে অনেক আগে থেকেই দেখা দিয়েছিল। লোকে যাকে বলে মর্নিং শোওজ দ্য ডে। আমার ক্ষেত্রে কেবল একটু ব্যতিক্রম, ইভিনিং শোওড দ্য নাইট! আমি স্কুলে পড়তে কবিতা লিখে লিখে বসে থাকতাম কবে আমার বোন ভার্সিটি থেকে ছুটিতে বাড়িতে ফিরবে আর আমি তাকে সেইসব কবিতা পড়াবো। আমার জানামতে ব্রক্ষ্মাণ্ডে সেই ছিল আমার কবিতার সমঝদার। আর ছিল আমার বন্ধু রনি। আমরা দু'জনেই বাংলা সিনেমা ধরনের লুতুপুতু ছিলাম। আমি তাকে কবিতা লিখে উপহার দিয়েছি সম্ভবত দুয়েকবার। সেই গল্প ওই ফকির* আমাকে দেশ ছাড়ার আগে যখন দেখা করতে গিয়েছি তখনও শুনিয়েছে! [*ফকির গালি'টা সুরঞ্জনার কাছ থেকে ধার করেছি।]

স্কুলে আর কলেজেও, নিয়মিত প্রেমে পড়ে পড়ে কবিতা লেখা নেশার মতো হয়ে উঠেছিল। আমার কয়েকটা বিষাক্ত বন্ধুবান্ধব সেই কবিতার বিষবৃক্ষে সুধা ঢালতো বলে আমার কবিতার গরলভাণ্ডও আর নিঃশেষ হয়নি কখনো। এমনকি এই যে দেশে আসব, তার আগে আমার বন্ধু তাপসী আর হাসিব বলেছে, কবিতাগুলো যেন তাদেরকে দেয়া হয়। স্ক্যান করে, নয়তো লিখে, নয়তো খাতাপত্রগুলো ওদের কাছে দিলেই হবে।

আমার মূর্খতার সর্বোৎকৃষ্ঠ উদাহরণ আমার প্রেম। কথা নেই বার্তা নেই শেষ বয়সে গিয়ে, যে বয়সে মানুষ মূলত প্রেম থেকে নির্বাণ পেয়ে যায়, তখন আমি প্রেমে পড়ে গেলাম। সেও একেবারে শরৎচন্দ্র ধরনের প্রেম। পরাণের সঙ্গে আঁটি বাঁধা, প্রেম গেলে পরাণও যায়। সেই সময়ের অনেক কু-অভ্যাসের মধ্যে একটা হলো আমার কবিতার আপাত ভাটা পড়া হলাহল সিন্ধুতে পানি বাড়ল। আমি সোনা-ময়না-ঘুঘু ধরনের কবিতা লিখে লিখে প্রেমিকাকে দিতে লাগলাম। আমার সৌভাগ্য সেই মেয়েটি বুদ্ধিমতি ছিলেন। কবি এবং কবি বিষয়ক কাণ্ডজ্ঞান থাকায় তিনি কবিতা তো পড়তেনই না, পাত্তাও দিতেন না। ফলে অনুৎসাহে আমার ভেতর কবিতার বান আর ডাকতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। যদিও, বইমেলায় সেই প্রেমিকাকে কবিতার বই ছাড়ার আর কিছু কিনে দেবার পেতাম না। ভাবতাম, ও বালিকের হেদায়েত না হোক, আমার তো দাওয়াত দিতে মানা নেই! বলতে বেশ গর্ব হয়, আমার ওই প্রেমিকাটি, ভুলতে তো বটেই, ভোলাতেও অদ্বিতীয়া ছিলেন। তাঁর ভোলানোর গুণে কবিতা, বেহালা, এমম্বিধ নানাবিধ কূঅভ্যাস থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে প্রায় জাতে উঠে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যেমন বললাম, বালিকে বুদ্ধিমতি। তিনি আমাকে জাতে তোলার প্রকৃয়া থামিয়ে নিজে কারো পাতে উঠতে মনোনিবেশ করলেন। আমিও নির্বাণ পেলাম। সেই গল্প চমকপ্রদ। কিন্তু আজকে কেবল কবিতার কথা।

আমার জ্ঞানবুদ্ধি হবার কোনো সম্ভাবনা ছিলনা, কিন্তু আমার কারণে আমার নির্দোষ মাতৃদেবীর বদনাম হবে তা প্রকৃতি চায়নি। আর চায়নি বলেই, একটা সময়ে আমার কবিতা না লেখার বোধোদয় হলো। সেই বোধোদয়ে বস্তুত উৎপাদন বন্ধ হলো না। হবার মধ্যে, প্রচার বিজ্ঞাপন আর বাজারজাতকরণ বন্ধ হলো। কবিতা লিখে আমি কেবল মাঝেসাঁঝে আমার মা'কে পাঠাতে লাগলাম। আমার মা আমার পরেও আমার সেই বাড়তি যন্ত্রণা মাতৃস্নেহেই সহ্য করতে লাগলেন। নিয়ম করে সেসব অখাদ্য পড়তে লাগলেন। বাকি সবার মতো হারিয়ে না ফেলে একটা নোটবুকের মধ্যে গুছিয়ে রাখতে লাগলেন।

তবে সে-ও অনেককাল আগের কথা। আম্মাকে আমার কাছ থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারিনি। আমার কবিতার কাছ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছি। এখন তিনি কেবল আমার কলেজ আমলের কবিতার গল্পই করতে পারেন। পরবর্তী সময়ের কিছু বলার সুযোগ পান না! কারণ আমি ভালো হয়ে গেছি তা নয়। বস্তুত ইচ্ছে না হলেও মেনে নিয়েছি যে, সবার কবিতা না লিখলেও হয়। আমি সেই না লিখিয়েদের দলে পড়ি। তবে নিজের সঙ্গে সন্ধির শর্ত হচ্ছে, যে কাব্যপ্রতিভা আমার মধ্যে ছিল সেটার প্রমাণ দেয়ার জন্য বছরে একটা করে কবিতা লিখতে পারব।

সম্প্রতি যখন গুরুজনদের কাছেও শুনলাম, বছরে একটি কবিতা লেখা নাযায়েজ নয়! তখন সেই পুরোনো সন্ধির কথা মনে পড়ল। বড় অস্থির সময় কাটাচ্ছিলাম। একটি কবিতা বলা যায়, উগরে বেরুলো। ফুটনোটে দিয়ে দিচ্ছি। পড়লে পড়তে পারেন, না পড়াই ভালো।

আমার বুকের কাছে থেমে আছে উচ্ছল নদী
বুকের ভেতরে যেই অচিন-অচিনতম দেশ
সেইখানে যাবে বলে, ছলছল তার নিরবধি
রঙে ঢঙে বদলায়, বদলায় পরনের বেশ।
বলে, শোন, ওইখানে সহজিয়া পরাণের বাস
তাকে দিই ছুঁয়ে, দিই অলৌকিক অমৃতের স্বাদ
পথ খোল, খুলে ফেল অকরুণ পাথরের খাঁদ
প্রাণ খোল, খুলে দেই জলরূপ স্পর্শের রাশ। 
আমি জানি পাঁজরের আড়ালে কী নির্মোহ ফাঁকা
বহুদূরে, ভাবনাও পৌঁছেনা কখনো যেখানে,
সেইখানে মানবিক স্পর্শের সব সাধ রাখা
সাধ করে একদিন বেঁচেছিল বালক পরাণে।
আজ কোনো মোহ নেই, সুদূরেও নেই কোনো ঋণ
থেমে থাকো মায়াবতী, ভুলে থাকি বাঁচবার দিন।

২টি মন্তব্য:

জুয়েইরিযাহ মউ বলেছেন...

"থেমে থাকো মায়াবতী, ভুলে থাকি বাঁচবার দিন।"
........ কোন পথই কোথাও ফুরোলো না কভু...
কিছু লিখলি তবে ভাইয়া... বেশ... :)

অনার্য সঙ্গীত বলেছেন...

কেমন আছিস রে তুই? কোনো সাড়াশব্দ পাইনা তোর দীর্ঘদিন!