শুক্রবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

সুপারবাগ: নরকের কীট

একবার বছরের শেষ ভাগের এক বিকেলে ধুম ছোটাছুটির পর সন্ধ্যার দিকে আবিষ্কার করলাম হাঁটতে গেলে দু পায়ের পেছনের রগে হালকা ব্যথা পাচ্ছি। গ্রামে বছরের শেষ সময়টা অদ্ভুত ছিল। ধান উঠে যেতো বলে বিলগুলো ফাঁকা থাকতো, কেটে নেয়া ধান গাছের গোড়ার দিকটা গোছা গোছা রয়ে যেত সেখানে। নরম মাটি। বাতাসে ধানের গন্ধ, মাটির গন্ধ, তুলে নেয়া মটরশুঁটি গাছের গন্ধ। সব মিলিয়ে সবটা বিকেল-সন্ধ্যা সুগন্ধি হয়ে থাকতো। সময়েরও যে সুগন্ধ থাকতে পারে সেই অলৌকিক অনুভুতি বাংলাদেশের গ্রামে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় বলে আমার জানা নেই। এখন ভাবলে, সেই সময়টটাকে দালির ছবির চাইতেও মহান আর বিমূর্ত মনে হয়!

সেরকম পরাবাস্তব এক বিকেল পায়ের রগে ব্যথা টের পেলাম। মা'কে গিয়ে বললাম, পায়ে টান লাগছে। মা ছাদে গাছশুদ্ধ শুকোতে দেয়া মটরশুঁটির ঝাড় উল্টেপাল্টে দিচ্ছিলেন। আমাকে বললেন, খেলতে গিয়ে বোধহয় উল্টোপাল্টা টান পড়েছে। বিশ্রাম নাও, ঠিক হয়ে যাবে। সেদিন রাতের আর কিছু মনে পড়ে না। মনে পড়ে, পরদিন সকালে উঠেই তারস্বরে মা'কে ডাকতে লাগলাম। অলৌকিক মা ছিলেন আমার। কিছু না হলেও চিল্লিয়ে মা'কে ডাকতাম। মা এসে "সব ঠিক" করে দিতেন। আর সেদিন তো বড় কিছু হয়েছিল। সকালে উঠে আবিষ্কার করেছি আমি আর হাঁটতে পারছি না!

ডাক্তার বললেন, রিউম্যাটিক ফিভার। বাতজ্বর। আমার জ্বর ছিলনা। পায়ে ব্যাথা ছিল। সেটাকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বলে। সম্ভবত স্ট্রেপটোকক্কাস পায়োজেন্স নামের একটা ব্যাকটেরিয়া কিছুদিন আগে আমার শরীরে বাসা বেঁধেছিল। জীবাণু শরীরে বাসা বাধলে যা হয়, শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষ আর প্রোটিনেরা হা রে রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রোগপ্রতিরোধী কোষেদের মধ্যে থাকে গিলেখাদক, যারা জীবাণু গিলে খেয়ে ফেলে। কিন্তু জীবাণু রাজাকারদের মতই পিছলা। কাঁটাচামচ হলে খেতে সুবিধে। গিলেখাদকদের কাঁটাচামচের যোগান দেয় বি-কোষ নামের বিশেষ কোষেরা। এই কাঁটাচামচকে বলে অ্যান্টিবডি। অ্যান্টিবডির অনেক কাজের মধ্যে একটা হচ্ছে গিলেখাদকের কাঁটাচামচ হিসেবে কাজ করা। আর অ্যান্টিবডির বিশেষ গুণ হচ্ছে, এরা একেকটি জীবাণুর জন্য নির্দিষ্ট। ডায়রিয়ার রোগের জীবাণুর জন্য তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি গিয়ে কান কটকট রোগের জীবাণুর গায়ে বিঁধবে না!

স্ট্রেপটোকক্কাস পায়োজেন্সের সংক্রমণে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, মানে যে কাঁটাচামচ, সে কখনো কখনো গিয়ে হাড়ের সংযোগস্থলে বিঁধে যেতে পারে। এরকম হলে নানা গণ্ডগোল বাধে। আমার যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়েছিল। শরীরে রোগপ্রতিরোধী কোনোকিছু, যেটা জীবাণুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, যদি শরীরের বিরুদ্ধে কাজ করে তখন তাকে বলে অতিসংবেদনশীলতা। সে বড় ভয়ঙ্কর রোগ। আপনজন যদি পিঠে ছুরি মারে তবে তার চাইতে ভয়ঙ্কর আর কী হতে পারে!

অনেক পরে জেনেছি, স্টেপটোকক্কাস সংক্রমণে হৃদপিণ্ডেরও ভালো দফারফা হয়ে যায়। হৃদয়ের সর্বনাশ করে প্রাণনাশ করা প্রেমিকাদের মতো কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়ারও বিশেষত্ব। আমার অবশ্য সে যাত্রা কিছু হয়নি। জীবাণুর বাণ হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাবার আগেই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন স্কটল্যাণ্ডের জীববিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং। তিনি মানুষেরও অধিক মানুষ। তাঁর কাছে আমি আমার জীবনের জন্য ঋণী। আমি নিশ্চিত, আপনারা এই লেখাটি যারা পড়ছেন, আপনারা অথবা আপনাদের আপনজনদের অনেকেই আলেক্সান্ডার ফ্লেমিংয়ের কাছে জীবনের জন্য ঋণী।

স্যার আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন ১৯২৮ সালে। সেই আবিষ্কারের পরেই মানুষের হাতে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সত্যিকারের অস্ত্র আসে, আসতে থাকে। এতকাল মানুষের জীবণের উপর রাজত্ব করা সংক্রামক রোগের আধিপত্য দুম করে শেষ হয় যায়।

১৯৬২ সালে আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা দেয়, সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সেই যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছে!

বাস্তব কিন্তু মোটেই সেরকম ছিলনা! যে দুঃখজনক বাস্তবতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, সেটি বলার জন্যই এই লেখাটি লিখছি। কিন্তু তার আগে অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে সেটা একটুখানি বলে নেয়া দরকার।

অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে সেটির ভিত্তিতে একে অনেকগুলো ভাগে ভাগ করা যায়। একটা লেখায় সবগুলোর বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়। ঘটনাটা কীরকম ঘটে তা বোঝানোর জন্যের একটার কথা একটু বিস্তারিত বলছি। বাকিগুলো কেবল উল্লেখ করে দেব।

শিকারী যখন শিকার করতে চায়, তখন তাকে জানতে হয় শিকারের দূর্বলতা কোথায়। ব্যধ জানে, হৃদয়ে তীর গেঁথে দিতে পারলে শিকার মরবে ভালো। কিউপিডও জানে এই খবর। তাকে জানতে হয়। অণুজীববিজ্ঞানীকে যেমন জানতে হয় ব্যাকটেরিয়ার দূর্বলতা কোথায়! ব্যাকটেরিয়ার দূর্বলতা অনেক। একেক দূর্বলতার জন্য একেক অ্যান্টিবায়োটিক। যেমন, ব্যাকটেরিয়ার থাকে কোষ প্রাচীর। বেটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিক গোষ্ঠীর যেসব অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, সেসব ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরে বিরাট গণ্ডগোল বাধায়।

কীভাবে?

ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের কয়েকটা স্তর। স্তরগুলো গঠন-গাঠন রঙ-ঢঙ-এ ভিন্ন। যে স্তরটির কথা বলছি সেটাকে বলে পেপটিডোগ্লাইকেন লেয়ার। খটোমটো লাগছে? এখানে শিশিবোতল কিছু নেই। স্রেফ শর্করা আর আমিষ। এই দুটো অতি পরিচিত জিনিসের বৈজ্ঞানিক নাম মিলিয়ে ওই খটোমটো নাম। তো যা বলছিলাম, ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের এই বিশেষ স্তর তৈরি হয়  শীতল পাটি বোনার মতো কিছু শর্করা-আমিষের সুতো সারি সারি করে সাজিয়ে। কিন্তু পর পর অনেকগুলো সুতো রাখলেই কী আর সে চামড়ার মতো শক্ত একটা স্তর হয়ে যায়? যায়না। সুতোগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা আড়াআড়ি বেঁধে দেয়া গেলেই সেটা একটা আকার পায়। নাইলনের সুতো হলেই যেমন জাল হয়না, একটার সঙ্গে আরেকটা হিসেব করে বেঁধে  বুনতে পারলেই সে শক্ত জাল হয়ে ওঠে হয়। ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরে শর্করা-আমিষের সুতোর যে স্তর থাকে সেখানে সুতোগুলো ওরকম একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে থাকে। শর্করা-আমিষের লম্বা সুতোগুলোর ভেতরের এই বন্ধনটা তৈরি করে প্রোটিনের আরেক রকম ছোট ছোট সুতো। প্রোটিনের ছোট ছোট এইসব সুতো দিয়ে শর্করা-আমিষের লম্বা সুতোকে আড়াআড়ি বুনে ফেলার কাজটি করে "পেপটিডেজ" নামের এনজাইম (দুটা এনজাইম এই কাজটি করে)। এনজাইমের কথা তো সবাই জানে। এনজাইম হচ্ছে কারিগর। মানে যেমন সুঁচ-সুতো-কাপড় দিয়ে জামা হয়। তবে সে একা একা হয়না, দর্জি লাগে। এনজাইম ওরকম, জীবদেহের নানান কর্মের মহাকারিগর।

যে বেটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিকের কথা বলছিলাম, তাদের থাকে একটা সুদর্শন চক্র। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে বেটা-ল্যাকটাম রিং। শুনতে খটোমটো হলেও এ জিনিস বস্তুত খুব সরল। তিনটে কার্বন আর একটা নাইট্রোজেনের অণু (তারেক অণু নয়!) একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে যদি একটা রিং বানানো হয়, তবে সেটা বেটা-ল্যাকটাম রিং। সে যাই হোক, অ্যান্টিবায়োটিকের এই বেটা-ল্যাকটাম রিং গিয়ে শর্করা-আমিষের সুতোর জাল বোনা  কারিগর যে "পেপটিডেজ", সেই কারিগরের হাত বেঁধে ফেলে। তখন ওই জাল বোনা কারিগর নিষ্কর্মা হয়ে যায়! সাপের মুখে যদি একটা কাঠের টুকরো গুঁজে দেয়া হয় তাহলে সে বেচারা যেমন নির্বিষ হয়ে পড়ে, সেইরকম করে বেটা-ল্যাকটাম রিং গিয়ে পেপটিডেজকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

তাতে যা হয়, ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরে শর্করা-আমিষের ওই বিশেষ সুতোগুলো থাকে বটে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো বাঁধন থাকে না। আর বাঁধন না থাকায় সেগুলো আর একটা শক্ত জালের মতো তৈরি করতে পারে না! ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের ওই শক্ত স্তরটা না থাকলে সে একেবারে দূর্বল হয়ে পড়ে! তার পেটের সবকিছু তখন ফেটেফুটে ভুসভাস করে বের হয়ে যায় আর বেচারা টুপ করে মরে যায়।

বাজারে যে পেনিসিলিন, অ্যামপিসিলিন, সেফালোস্পরিন, কার্বাপেনেম, মনোব্যাকটাম এবং তাদের যতো জ্ঞাতিগোষ্ঠী, সব ওই বেটা-ল্যাকটামের গুণে জীবাণুনাশ করতে পারে। এসবই বেটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিক। একটার কথা একটুখানি বলতেই এ্যাতোখানি লিখতে হলো! বাকিগুলার কথা তাই একলাইনে বলি।

ধরন ভেদে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার,
- কোষ প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। যেরকম একটির উদাহরণ দিলাম।
- কোষ ঝিল্লী ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।
- কোষের অতি প্রয়োজনিয় যৌগ তৈরিতে বাধা দিতে পারে।
- প্রয়োজনিয় আমিষ তৈরিতে বাধা দিতে পারে।
- ডিএনএ অণুলিপি তৈরিতে বাধা দিতে পারে।
- ইত্যাদি ইত্যাদি।

বেশ তো। হয়ে গেল সব ব্যাকটেরিয়া মরে গেল। নাকি?

না তা নয়। ব্যাকটেরিয়ারোধী অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ যখন শুরু হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিকরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে তার অব্যহতি পর থেকেই। পেনিসিলিনের বিস্তৃত প্রয়োগ শুরু হয় ১৯৪১ সালে। প্রথম পেনিসিলিনরোধী ব্যাকটেরিয়া সনাক্ত হয় ১৯৪২ সালে! সে কীরকম?!

যে বেটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিকের কথা বলছিলাম, সেটার উদাহরণ দেই, কিছু ব্যাকটেরিয়া বেটা-ল্যাকটামেজ নামের এনজাইম বানাতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিকের যে বেটা-ল্যাকটাম রিং, তিনটে কার্বণ আর একটা নাইট্রোজেন অণুর চক্র। সেই চক্রটা এই বেটা-ল্যাকটামেজ এনজাইম ভেঙে দিতে পারে। একটা মালার গুণ নষ্ট করতে তো আর সেটা কুচি কুচি করে কাটতে হয়না! সেটার সুতো কোনোখানে একটুখানি ছিঁড়ে দিলেই হয়। বেটা-ল্যাকটাম চক্রও তেমনি, একটা কোণা কেটে গেলেই অকার্যকর হয়ে যায়। বিজ্ঞানের আলোচনায় তুলনাটা স্থুল হলো বটে। তবে এটা নিশ্চয়ই সবাই জানে যে, রাসায়নিক পদার্থ একটুখানি বদলে গেলেই তার স্বভাবচরিত্র আমূল বদলে যায়!  একটা অক্সিজেন আর দুটো হাইড্রোজেন মিলে যে প্রাণ বাঁচানো পানি হয়, সেই পানির অণুতে আরেকটা মাত্র অক্সিজেন জুড়ে দিলে তা মারাত্মক বিষ হয়ে ওঠে! যা বলছিলাম, যেসব ব্যাকটেরিয়া এই বেটা ল্যাকটামেজ এনজাইম বানাতে পারে, তাদের উপর বেটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। এই অ্যান্টিবায়োটিকে ডুবিয়ে রাখলেও ওসব ব্যাকটেরিয়া দিব্যি হেসে খেলে বেড়াতে পারে!

ব্যাকটেরিয়ারা অ্যান্টিবায়োটি প্রতিরোধী হতে পারে প্রধান তিনটা উপায়েঃ
- অ্যান্টিবায়োটিক ভেঙে নষ্ট করে দেয়ার মতো কিছু তৈরি করে। (যেমন বেটা-ল্যাকটামেজ এনজাইম)
- অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটা অকার্যকর করে দিতে পারে এরকম কিছু বানিয়ে।
- অ্যান্টিবায়োটিক কোষের ভেতর থেকে খুব দ্রুত কোষের বাইরে বের করে দিয়ে (যাতে তা কোষের ভেতরে কোনো ক্ষতি না করতে পারে)।

তাহলে?

তাহলে আর কী! কিছু বোকা লোক নাওয়া খাওয়া ভুলে নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির পথ খোঁজেন। তাঁরা খুঁজে বেড়ান,

ব্যাকটেরিয়া কী খায়? ওর খাবারে বিষ মেশানো যায় কীভাবে?
ব্যাকটেরিয়া কোন পথে বাজারে যায়? ওই পথে কাঁটা বিছানো যায়?
ব্যাকটেরিয়া কি গাধা? ওকে খুব দুঃখের কাঁদুনি শুনিয়ে পটানো যায়?
ব্যাকটেরিয়া কি ভয় পায়? ভূতের ছবি এঁকে ওকে দেখালে?
ব্যাকটেরিয়া বাচ্চা দেয়ার সময় কী করে? ব্যাটাকে খোঁজা করে দেয়া যায়না?
অথবা,
যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া ভেঙে ফেলছে সেটাকে একটুখানি বদলে দেয়া যায়না? যাতে ওটা আর ব্যাকটেরিয়ার হাতুড়ির ঘায়ে না ভাঙে?

এভাবেই তৈরি হয় নিত্যনতুন অ্যান্টিবায়োটিক। প্রথমে যে পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিকের কথা বলছিলাম, সেটা থেকে যেমন তৈরি হয়েছে পেনিসিলিন জি >> অ্যামোক্সিসিলিন  >>  টাইকারসিলিন  >>  পাইপারাসিলিন। একটা অ্যান্টিবায়োটিককে একটু একটু করে বদলে তৈরি হয়েছে এরকম পরবর্তী পর্যায়ের আরো শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক। যে অ্যান্টিবায়োটিকটা প্রথমে ছিল কুইনোলন। সেটা থাকে এসেছে নালিডিক্সিক অ্যাসিড  >>  সিপ্রোফ্লক্সাসিন  >>  লিভোফ্লোক্সিসিন  >>  মক্সিফ্লাক্সিন। এরকম একটা পরিচিত অ্যান্টিবায়োটিক টেট্রাসাইক্লিন থেকে এসেছে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন  >>  ডক্সিসাইক্লিন  >>  টাইগাসাইক্লিন।

তাহলে কী? হয়ে গেল? নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তো আছেই! নো চিন্তা, বগল বাজাও?

তা আসলে নয়। ফুর্তি করা যাচ্ছে না। ব্যাকটেরিয়ারা তীব্রভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল হয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন অ্যান্টিবায়ৌটিক আর কাজ হচ্ছে না। একেকটা ব্যাকটেরিয়া একেকটা গোষ্ঠীর অ্যান্টিবায়ৌটিকে সহনশীল হয়ে যাচ্ছে! এরকম কেন হচ্ছে সেটি আগে বলি। হচ্ছে প্রধাণত দুটি কারণে।

প্রথমত, আমরা যারা ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছি তারা ব্যাকটেরিয়াকে অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল বানিয়ে ফেলছি। ডারউইন যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের কথা বলেছিলেন শতাব্দী আগে, সেই প্রকৃয়ায় আমরা ব্যাকটেরিয়াদের অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল করে তুলছি প্রতিদিন। আর দ্বিতীয়ত, যেসব ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল তারা তাদের সেই ক্ষমতা ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রকৃতিতে। এরকম হতে পারে জিন বিনিময়ের মাধ্যমে। কে না জানে অ্যান্টিবায়োটিকে টিকে থাকার যেসব উপায় আছে সেসব ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করতে পারে কেবল প্রয়োজনীয় জিন থাকলেই। যে বেটা-ল্যাকটামেজ এনজাইমের কথা বলছিলাম, যেটা অ্যান্টিবায়োটিক ভেঙে দেয়, সেটা তো আর ব্যাকটেরিয়া বাজারে কিনতে পায় না! ব্যাকটেরিয়াকে ওই এনজাইম বানাতে হয়। আর বানানোর জন্য লাগে প্রয়োজনীয় জিন।

ডিএনএ-কে এক অর্থে কোষের ব্যবহৃত 'রেসিপি' বই বলা যায়। একেকটা 'জিন' একেকটা বিষয়ের রেসিপি। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে বাঁচতে গেলে কী বানিয়ে কী করতে হবে তাও ওই রেসিপি বইতে লেখা থাকে। বেটা-ল্যাকটাম থেকে বাঁচতে যেমন লাগে বেটা-ল্যাকটামেজ এনজাইম। বেটা-ল্যাকটামেজের রেসিপি যে ব্যাকটেরিয়ার কাছে আছে সে তাই ওই অ্যান্টিবায়োটিকে মরবে না! আশংকার বিষয় হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়ারা রেসিপি শেয়ার করতে পারে। যার কাছে আ্যান্টিবায়োটিকে সহনশীল হওয়ার রেসিপি, মানে জিন আছে, সে যার রেসিপি নেই তাকে সেটা দিয়ে দিতে পারে। একটি অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়া তাই তার নিজের প্রজন্ম তো বটেই, অন্য অনেক ব্যাকটেরিয়াকেও অ্যান্টিবায়োটিকে সহনশীল করে তুলে পারে। ব্যাকটেরিয়ারা রেসিপি, মানে জিন ছড়িয়ে দেয় কীভাবে?

প্রধাণত তিনটি উপায়ে:

- ব্যাকটেরিয়ারা প্রকৃতিতে উন্মুক্ত জিন 'সংগ্রহ' করতে পারে। ধরা যাক একটি ব্যাকটেরিয়া যার বেটা-ল্যাকটাম বানানোর জিন'টি ছিল সে কোনো কারণে মরে গেল। মরে গেলে তো বুদ্ধি ফুরোলো। তার কোষ ভেঙেচুরে যাবে! কোষ যেই ভেঙেচুরে যাবে, তার কোষের ভেতরের ডিএনএ-ও প্রকৃতিতে ঊন্মুক্ত হয়ে পড়বে। উন্মুক্ত ডিএনএ-র সংস্পর্শে আসা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়া সেই ডিএনএ-র অংশ নিজের কোষে ঢুকিয়ে নিতে পারে। এই প্রকৃয়াটিকে বলে ট্রান্সফরমেশন।

- একটি ব্যাকটেরিয়া নিজের শরীর থেকে একটা সরু পাইপের মতো প্রত্যঙ্গ (pilus) বানিয়ে অন্য ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে। তারপর ওই পাইপের মতো প্রত্যঙ্গ (pilus) দিয়ে নিজের এটাসেটা রেসিপির একটা কপি অন্য ব্যাকটেরিয়াকে উপহার দিয়ে দিতে পারে! এটাকে বলে কনজুগেশন।

- ধরা যাক, একটি ব্যাকটেরিয়াকে কোনো ভাইরাস সংক্রামিত করল। এখন ওই ব্যাকটেরিয়া থেকে ভাইরাসের ছানাপোনারা যখন বেরুবে, তখন তারা ওই ব্যাকটেরিয়ার কিছু কিছু জিনের অণুলিপি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে! ওই ভাইরাস যখন আবার আরেকটি ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রামিত করবে তখন প্রথম ব্যাকটেরিয়াটির জিনের অণুলিপি যা সে সঙ্গে করে এনেছিল তা দ্বিতীয় ব্যাকটেরিয়াতে জুড়ে যেতে পারে। এই প্রকৃয়াটিকে বলে ট্রান্সডাকশন। (তাত্ত্বিকভাবে, পৃথিবীর সকল প্রাণিকে সংক্রামিত করার মতো ভাইরাস রয়েছে।)

- জিন ট্রান্সফার এজেন্ট (জিটিএ) নামের কোষীয় একটা উপাদানও এরকম জিন বয়ে এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতে নিতে পারে। কিন্তু এই বিষয়টি জানা গেছে খুব বেশিদিন নয়। আমি নিজে বিস্তারিত জানিনা বলে, প্রসঙ্গটি কেবল উল্লেখ করে গেলাম।

সুতরাং সব মিলিয়ে যা বললাম, আমরা আন্দাজ মতো অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে খেয়ে ব্যাকটেরিয়াদের অ্যান্টিবায়োটিকে সহনশীল বানিয়ে ফেলছি। আর আমাদের তৈরি করা আ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়ারা ''সহনশীল হওয়ার রেসিপি'' বিলিয়ে বিলিয়ে বাকিদেরকে অ্যান্টিবায়োটিকরোধী করে তুলছে। এই ব্যপারটি শুনতে খুব সহজ মনে হচ্ছে। অনেকটা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের মতো! কিছু একটা বিপদ আসছে বলে সেই বিষয়ে বছরে একদিন হাহুতাশ করে একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দিলেই হয়! এমনিতে গ্লোবাল ওয়ামিং নিজে এসে কারো জীবননাশ করে না! কিন্তু ব্যাপারটি আসলে সেরকম নয়!

আমরা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম পৃথিবীতেই যে নরক দেখব সেই নরক তৈরিতে এইসব অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়ারা খুব বড় একটা ভূমিকা রাখবে। এখনই রাখছে। এই মুহূর্তেই তীব্রভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল এবং পুরোপুরি অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীতে। অনেক ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যেগুলোর বিরুদ্ধে কেবল একটি বা দুটি খুব আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে। আমরা আমাদের মূর্খামির চরম প্রমাণ দিয়ে ওই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে শেষ দুয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিকে সহনশীল করে তুললেই আগেরগুলোর সঙ্গে এই নতুনগুলোও একেবারে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যু হয়ে উঠবে।

অথচ আমাদের জীবন অন্যরকম ছিল! আপনি কি ভেবে দেখেছেন, অবচেতনভাবেই আমরা বেশিরভাগ সংক্রামক রোগকে পাত্তা না দিতে শিখেছি। কিছু মহামানব আমাদেরকে এই ক্ষমতা দিয়ে গেছেন। সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, কলেরা, ইত্যাদি হলে আমরা চিন্তিত হই বটে, কিন্তু ভয় পাইনা! আমরা জানি চিকিৎসা নিলেই এসব রোগ সেরে যাবে। অথচ আগে আমাদের এই দেশেই, সামান্য কলেরায় গ্রাম উজাড় হয়ে যেত! প্লেগের মতো একটা ফালতু রোগ ইউরোপের জনসংখ্যা অর্ধেক করে দিয়েছিল! কারো কোনো অপারেশন করা হলে, দূর্ঘটনায় কেটে গেলে, সন্তান প্রসবের সময়, ইত্যাদিতে কাটা জায়গায় ইনফেকশন হয়েই মরে যেত অর্ধেক লোকে! অথচ আমরা এমন একটা সময়ে বেড়ে উঠেছি, যখন কেটে গেলে আমাদের ভয় পেতে হয়নি! সাধারণ সংক্রামক রোগকে আমরা গ্রাহ্যই করিনি!

দুঃখের হলেও সত্যি হচ্ছে এই, আমাদের সেই সুখের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। যে ভয়ানক বাস্তবতার কথা বলছিলাম, সেটা এই যে, ক'দিন পরে সামান্য কাটা-ছেঁড়াও আর সেরে উঠবে না! যে যক্ষা হলে দূর অতীতের একটা সময়ে রক্ষা ছিলনা, সেই যক্ষা হলে ভবিষ্যতেও আর রক্ষা থাকবে না! সব ওষুধে সহনশীল যক্ষার জীবাণু ইতালি-ইরানের পর এই সেদিন ভারতেও পাওয়া গেছে! সবচে ভয়ের ব্যাপার হলো, অ্যান্টিবায়োটিকে দারুণভাবে সহনশীল কিছু ব্যাকটেরিয়া হাসপাতালেই বেশি বেশি পাওয়া যায়! সাধারণ একটা রোগে হাসপাতালে যাওয়া রোগী সংক্রামিত হয় প্রাণঘাতি ব্যাকটেরিয়ায়! কিছু ব্যাকটেরিয়া, ভাবা হতো কেবল হাসপাতালেই থাকে, সংক্রমণ হলে হাসপাতাল থেকেই হবে! অথচ গতসপ্তাহে ন্যাচারের একটা আর্টিকেলে পড়লাম, সে দিন গিয়েছে! যমদূতদের হাসপাতালের বাইরেও পাওয়া যাচ্ছে এখন!

এই লেখাটি অনেক দীর্ঘ হলো। তবুও কতকিছু বলাই হলোনা! এতো এতো ভয়ানক কথা বললাম, শেষ করার আগে খানিকটা আশার কথাও শোনাই। যেসব অ্যান্টিবায়ৌটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়ার কথা বলছিলাম, এদেরকে বলা হয় সুপারবাগ। সকল সুপারবাগের মধ্যে প্রথম সারিতে আছে এমআরএসএ (MRSA: methicillin-resistant Staphylococcus aureus)। ক'দিন আগে ন্যাচারে দেখলাম রবার্ট ডাউম আর তাঁর সহকর্মীরা এই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরো বেশি শক্তিশালী (বেশি ক্রিয়াশীল অর্থে) করার একটা পন্থা খুঁজে পেয়েছেন। এইমুহূর্তে এমআরএসএ-র বিরুদ্ধে আমরা প্রায় অসহায়। কেউ এটিতে সংক্রামিত হলে সবাই আশা করে থাকেন যেন কোনো একটি অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায় যেটি কাজ করে! সেই আশা সবসময় পূরণ হয়না! আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, আমি এইচআইভি বেশি ভয় পাই, নাকি এমআরএসএ, তাহলে আমি কিছু না ভেবেই বলব, এমআরএসএ বেশী ভয় পাই! আমি সকল সুপারবাগকে আক্ষরিক অর্থেই ভয় পাই! এরা ভয় পাওয়ার মতো। তবে ওই যে আশার কথা বললাম, রবার্ট ডাউম বলছেন, আমরা এটাকে সারাতে না পারি, প্রতিরোধ করব। সেরকম কিছু সম্ভাবনাও তাঁর এব তাঁর সহকর্মীদের হাতে এসেছে। সারা পৃথিবীতেই এই সময়ে অ্যান্টিবায়ৌটিকরোধী ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। আরো সফলতা নিশ্চয়ই আসবে।

তবে সুপারবাগের সংখ্যা কম নয়। তাছাড়া দিন দিন এই সংখ্যা আরো বেড়েই চলেছে। সেই তুলনায় গবেষণার পরিধি বিস্তৃত নয় বলেই আমার মনে হয়! গবেষণার কাজটি সারা মানবজাতির একসঙ্গে করার কথা ছিল! কিন্তু সেইরকম সভ্য মানুষ আমরা বোধহয় হয়ে উঠিনি এখনো! কিন্তু আমরা কি হেরে যাবো? নিশ্চয়ই না! আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং যে শুরু করে গিয়েছিলেন, শত প্রতিকূলতাতেও তাঁর উত্তরসূরীরা নিশ্চয়ই মানুষকে বাঁচানোর সেই যাত্রা এগিয়ে নেবেন।

[যে কথাটা বলে রাখা দরকার: এটি বিজ্ঞান ব্লগ। লেখাটি 'ভুল বিজ্ঞান' না হয়ে ওঠে তার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখানে অনেক তথ্যই নির্জলা বিজ্ঞান নয়। অনেক সরলীকৃত উদাহরণ। যেমন, সকল ব্যাকটেরিয়ার উপর বেটা-ল্যাকটাম কাজ করেনা, অনেক ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর নেই, অ্যান্টিবায়োটিক মাত্রই ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলেনা, ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক তথ্য এখানে আলোচনা করা হয়নি। এই প্রসঙ্গে আগ্রহী পাঠকের প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। কেবল অনুরোধ, এটাকে নির্জলা 'বিজ্ঞান প্রবন্ধ' ভেবে ভুল করবেন না।]

কোন মন্তব্য নেই: