সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

বাংলাদেশ ভারত সাইবার যুদ্ধ: কী হচ্ছে!


বাংলাদেশ ভারত সাইবার যুদ্ধ বলতে যে চলমান ঘটনাটিকে বোঝাচ্ছি সেটি সম্পর্কে খুব স্পষ্ট তথ্য পাচ্ছিনা। যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা কতটা নির্ভরযোগ্য সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বাংলাদেশি এবং ভারতীয় হ্যাকাররা দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাইট হ্যাক করছে বিরতিহীনভাবে।
ঘটনাটি শুরু হয়েছে জানামতে জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে। এই সময়ে বাংলাদেশের কিছু হ্যাকার ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক সীমান্তে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাইট হ্যাক করে। সেখানে তারা লিখে দেয়, তাদের সেইসব সাইট হ্যাক করার কারণ। টানিয়ে রাখে সীমান্তে নিহত কিশোরী ফেলানীর ছবি। এইসব হ্যাকাররা নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্লাক হ্যাট হ্যাকার দলের সদস্য হিসেবে।
এইখানে ঘটনাটি শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছে।
এই হ্যাকিংয়ের ঘটনার পরে ভারতের হ্যাকাররা হ্যাক করে বাংলাদেশ সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাইট। ইন্ডিশেল নামের ভারতীয় হ্যাকারদের একটি দল এই হ্যাকিং চালায়। বাংলাদেশের হ্যাকারদের পাল্টা হ্যাকিংও চলতে থাকে। বাংলাদেশের হ্যাকারদের তিনটি দলের নাম জেনেছি এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশ ব্লাক হ্যাট হ্যাকারস, বাংলাদেশ সাইবার আর্মি এবং এক্সপায়ার সাইবার আর্মি। শোনা যাচ্ছে দুপক্ষেই অন্যান্য বিভিন্ন দেশের হ্যাকাররা যোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের হ্যাকারদের পক্ষ নিয়েছে বিশ্বের সবচে বড় হ্যাকার দল অ্যানোনিমাস। অ্যানোনিমাসের কথা আপনারা সম্ভবত শুনে থাকবেন। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার এবং উইকিলিকস বিষয়ক গোলযোগের সময় অ্যানোনিমাস উইকিলিকসের পক্ষে বিশ্বের অনেকগুলো বড় সংস্থার ওয়েব সাইট হ্যাক করে প্রতিবাদ জানায়। সাম্প্রতিক সোপা/পিপা বিরোধী আন্দোলনেও অ্যানোনিমাস হ্যাক করে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাইট।

সব মিলিয়ে জানতে পারলাম ভারতীয় ১৫ হাজারেরও বেশিসাইট হ্যাক করেছে বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশের পক্ষে অন্য দেশের হ্যাকাররা। ভারতীয় হ্যাকারদের দল ইন্ডিশেল বলেছে, রবিবার রাতের মধ্যে বাংলাদেশীদের এই হ্যাকিং বন্ধ না হলে তারা বাংলাদেশের গুরুদ্বপূর্ণ সব ওয়েব সাইট গুঁড়িয়ে দেবে। তাতে অবশ্য বাংলাদেশের হ্যাকাররা থেমে নেই। বরং দেখতে পাচ্ছি ব্লগে-ফেসবুকে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে হ্যাকিংয়ে সম্পৃক্ত করছে হ্যাকাররা। বাংলাদেশের হ্যাকারদের দাবী, তারা এখনো তাদের আসল আক্রমণ শুরুই করেনি! দুপক্ষের থেকেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুইদেশেরই সাইবার স্পেসে আরো বড়রকমের ঝড়ঝাপ্টা আসতে পারে।
এই সবগুলো খবরই সম্ভবত পাঠকরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন। এই লেখাটির উদ্দেশ্য সংবাদ পরিবেশন নয়। বরং বুঝতে চেষ্টা করা, এই সাইবার আক্রমণের উদ্দেশ্য সৎ হলেও এর ফলাফল কতটা ইতিবাচক হবে!
বাংলাদেশের হ্যাকারদের ক্ষোভ এবং আবেগের সততায় কোনো সন্দেহ পোষণ করছি না আমি। বিএসএফ-এর কর্মকাণ্ড ঘৃণ্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর প্রতিবাদ করা দরকার। প্রতিবাদ যাঁরা করছেন তাঁদেরকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের হ্যাকারদের কর্মকাণ্ডও প্রতিবাদ। অবশ্যই যৌক্তিক প্রতিবাদ। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবাদের পদ্ধতিটি কতটুকু গ্রহনযোগ্য। অথবা যে পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করা হচ্ছে তাতে কী ফলাফল আশা করতে পারি আমরা?
একটি ব্যাপার নিশ্চিত, এরকম হামলার ভয়ে ভারত সরকার কখনো কোনো দাবী মেনে নেবে না। কোনো দেশের সরকারই নেবে না। নেয়া সম্ভব নয়। হ্যাকাররা যদি ভারতের সব সরকারী সাইটও হ্যাক করে ফেলে তবুও ভারত সরকার হ্যাকারদের দাবী মেনে নেবে না। তারা হ্যাকারদের সঙ্গে কখনোই কোনো সমঝোতায় আসবে না। আসার রীতি নেই। একটি রাষ্ট্র তা করতে পারে না। সুতরাং প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে ঠিক, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ফলাফল কেবল খানিকটা প্রতিশোধ নিতে পারার আনন্দ পাওয়া। এবং দেশের জন্য একটা যুদ্ধ করে ফেললাম সেই অদৃশ্য তৃপ্তি।
বস্তুত, সীমান্তে যে হামলা-হত্যা অনিয়ম সেগুলোর সমাধান বাংলাদেশের সরকারকে কূটনীতিকভাবেই করতে হবে। কূটনীতিক সমাধানের সদিচ্ছা সরকারের কতটুকু আছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। এবং দেশের নাগরিক হিসেবে যে কেউ সরকারকে সেই প্রশ্নটি করতে পারেন। সরকারকে দেশের নাগরিকদের জীবন-সম্মান রক্ষায় চাপ দিতে পারেন। সরকারকে জানিয়ে দিতে পারেন, নাগরিকদের কাছে তার দায়বদ্ধতার কথা। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে এইসব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা সাধারণ নাগরিক হিসেবে যে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে না সেটিও সরকারকে প্রতিমুহূর্তে জানিয়ে দেয়া দরকার।
সরাসরি ভারত সরকারকে প্রতিবাদ জানানোর একটি উপায় হিসেবে পহেলা মার্চ ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক এসেছে। এই প্রচেষ্টাতেও ভারত সরকার দুম করে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দেবে সেরকম সম্ভাবনা নেই। সেরকম চাওয়া নিয়ে এই উদ্যোগ নেয়াও হয়নি। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য একটি বার্তা যথাস্থানে পৌঁছে দেয়া। বার্তাটি পৌঁছে গেলেই আমরা খুশি। ভারতীয় পণ্য বর্জনের আয়োজনটিকে আমি ভালোভাবে নিচ্ছি। হ্যাকারদের আক্রমণকে নিচ্ছি না। তার কারণ এই দুই কর্মকাণ্ডে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। দুটি আয়োজনেরই উদ্দেশ্য সৎ, কোনো সন্দেহ নেই। আমি চাই সেই উদ্দেশ্য পূরণ হোক। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হোক, টিপাইমূখ বাঁধ ইত্যাদিও বন্ধ হোক। কিন্তু হ্যাকিং একটি অপরাধ। একটি রাষ্ট্রকে তার সমস্যা ন্যায়সঙ্গত কূটনৈতিক পথে সমাধান করতে হবে। সেই যোগ্যতা রাষ্ট্রের থাকা উচিত। রাষ্ট্র তার নাগরিককে হোক সে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, অন্যায় পথ অবলম্বন করতে দিতে পারে না।
কেউ একটি অপরাধের প্রতিবাদে আরেকটি অপরাধ করতে পারেনা। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবে আরেকটি অন্যায় কোনো হিসেবেই গ্রহনযোগ্য নয়। ব্লগে ফেইসবুকে যারা দেশের জন্য যুদ্ধ ইত্যাদি ভারী কথা বলে কীবোর্ড কাঁপিয়ে ফেলছেন, তাদেরকেও তারা যে কাজটি করছেন সেটির নৈতিকতা ভেবে দেখবার অনুরোধ করি।
আমি বরং মনে করি হ্যাকারদের যে দারুণ প্রতিভা আর প্রাণের প্রাচুর্য সেটি ব্যবহার করে তাঁরা সাইবার জগতেই ন্যায়সঙ্গতভাবে সরকারকে ভালো রকমের চাপ দিতে পারতেন এসব সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের জন্য। সাইবার জগতের ক্ষমতা আর বিস্তৃতি অসীম। হ্যাকাররা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড সাইবার জগতেই বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারতেন সুচারুভাবে। বিশ্বের সামনে এই বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে উঠে এলে সেই চাপ ভারত সরকারও নিশ্চয়ই অনুভব করত। আমি বিশ্বাস করি হ্যাকারদের যে দূর্দান্ত ক্ষমতা আমি দেখছি তাতে সেই কাজটি তারা অসম্ভব সফলভাবে করতে পারতেন।
এবং অবশ্যই, বাংলাদেশ সরকারকে সাইবার জগত সম্পকে আরো সচেতন এবং আধুনিক হবার প্রয়োজন আছে! এমনিতেই সরকারী ওয়েবসাইটগুলি বেশিরভাগই হালনাগাদ নয় এবং সেখান থেকে কারো প্রয়োজন সচারচর মেটে না। মুখে যতই বলা হোক, আমাদের নীতিনির্ধারকদের সাইবার জগত সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা আছে বলে মনে হয়না। আমাদের সরকারী আলয়-সংস্থা-সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকারের হিসেবে একটুও ডিজিটাল নয়। নামমাত্র যা রয়েছে সেখানে আধুনিকতা বলে কিছু নেই। অথচ দেশে আইটি বিশেষজ্ঞ অথবা দক্ষ আইটি জনশক্তির অভাব নেই। চাইলেই আধুনিক হয়ে যাওয়া সম্ভব। সেটির জন্য কেবল সাইবার জগত সম্পর্কে স্পষ্ট বোধ আর উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে কী হবে সেটা পরে। এইমুর্হর্তে আমাদের যে সাইটগুলি রয়েছে তা সে যে অবস্থায়ই থাকুক যোগ্য তত্ত্বাবধায়কের অধীনে থাকা প্রয়োজন। ভারতীয় নবীশ শ্রেণীর হ্যাকাররা ৫ মিনিটের চেষ্টায় যদি দেশের সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করে ফেলে তাহলে সেটা খুব সুখের বিষয় নয়। কোনোমতে ৬ মাসের আইটি ডিপ্লোমার সার্টিফিকেটের জোরে আর মন্ত্রীর আত্মীয় হবার সুবাদে কেউ দেশের গুরুদ্বপূর্ণ সরকারী সাইট রক্ষণাবেক্ষণের দ্বায়িত্ব পাননা বলেই বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে এরকম জায়গায় যোগ্য লোকেরাই আছেন। কিন্তু সেটি সত্য নয়। এইসব তত্ত্বাবধায়কের অযোগ্যতা প্রমাণ করে দিয়েছে ভারতের হ্যাকাররা।
আশা করছি এই হ্যাকিংয়ের ফলে অন্তত দেশের সরকারী সংস্থাগুলোর টনক নড়বে। সাইবার জগতে আরো শক্ত প্রতিরক্ষাবূহ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা বুঝতে পারবেন। দেশের জন্য যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটির তত্ত্বাবধান করবেন যোগ্য কেউ।
সবমিলিয়ে আমার বক্তব্য সহজ এবং স্পষ্ট, যে লোকটি আমার উপর অন্যায় করেছে আমি তাকে সেটা মুখোমুখি বলতে চাই। আমার যোগ্যতায় সেই অন্যায়কে যথাস্থানে তুলে ধরে তার প্রতিকার করতে চাই। আমার কষ্ট যতই থাকুক, গোপনে তার ঘরের চালে ঢিল মারতে চাইনা। সেটি আমার যোগ্যতা নয়, বরং কূটনৈতিক অযোগ্যতা এবং কাপুরুষতার প্রমাণ দেয়।

1 টি মন্তব্য:

Wasik Ovee বলেছেন...

বাহ! তুমি সাইবার ওয়র নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ তাহলে! ফেইসবুকে আমার নিয়মিত শেয়ার করা লিংকগুলোতে চোখ পড়লে লাইক দিও।:P
আর একটা ইউটিউব লিংক দিলাম bd black hat এর পক্ষ থেকে। :D
http://youtu.be/ZBRNLDwyJdI