মঙ্গলবার, ২০ মার্চ, ২০১২

প্রিয়ন: প্রাণের নিকটতম বিষ

মানুষের সবচে দারুণ শত্রু হতে পারে তার নিকটতম জন। তার মানে কোনো মূর্খ যদি 'জানরে' 'পাখিরে' বলে কারো জন্য প্রাণোৎসর্গ করে তাহলে যাকে প্রাণোৎসর্গ করা হলো সেই সৌভাগ্যবান অথবা সৌভাগ্যবতী হতে পারে ওই অপদার্থটির সর্বনাশ করার জন্য সবচে উপযুক্ত প্রাণি। গরল উঠে আসে অমৃতের সন্ধানেই। প্রেম বিষয়ক লেখা লিখতে বসিনি অবশ্য। ও লোকে ঢের জানে। ঢের মানে, খায়। আমি প্রাণের নিকটতম বিষের কথা বলি। মার্চের বিষ আজকে। প্রাণ এবং প্রাণের ভেতরে থাকা বিষ নিয়ে কথোপকথনের এরচে চমৎকার উপলক্ষ্য আর হয়না!
প্রাণের যতো নিকটে থাকে, যতো ভেতরে থাকে, বিষের তীব্রতা ততো দারুণ হয়। শরীরের বাইরে যেসব জীবাণুর বাস, তারা প্রায়শই নির্বিষ। যেসব চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে পারে তারা ভয়ঙ্কর। যারা শিরায় শিরায় বয়ে বেড়াতে পারে তারা ভয়ঙ্করতর। সবচে ভয়ঙ্কর যারা কোষের ভেতরে ঢুকে যায়। বেচারা কোষ, প্রাণের পুষ্টি দিয়ে সেই শ্বাপদ পালে। শেষ হয়ে যায়, শ্বাপদের খাদ্য হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তবে এসবও প্রাণের অতোটা নিকটে নয়, যতোটা নিকটে গেলে প্রাণের অংশ হয়ে ওঠা যায়!

প্রাণের অংশ হয়ে ওঠে ভাইরাস। এই অদ্ভুত 'সৃষ্টি'টি নিজে প্রাণ নয়। কিন্তু কোষের অংশ হয়ে সে কোষের সর্বনাশ করে ফেলতে পারে। ভাইরাস নিয়ে আমি আগে দুয়েকবার লিখেছি। আর তাছাড়া ভাইরাসকে আমি সত্যিকার প্রাণের অংশ মনে করিনা। পথের কাঁটার মতো আচমকা পায়ে গেঁথে গেলেই কী আর সে প্রাণের অংশ হয়ে ওঠে! সত্যিকারের প্রাণের অংশ তো যা প্রাণের থেকে জন্ম নেয়। প্রাণের ভেতরে বেড়ে ওঠে। সে নিজেই প্রাণ। প্রাণের নিকটতম। সে যখন বিষ হয়ে ওঠে, তখন তাকে 'প্রিয়ন' বলে।

এতক্ষণ যা লিখলাম, খানিকটা কাব্যিক মনে হচ্ছে! প্রিয়ন নিয়ে অবশ্য কাব্যিক হওয়ার সুযোগ নেই। কবিতার সঙ্গে বিষের কোনো সম্পর্ক নেই বলে। সুতরাং সহজে বলতে চেষ্টা করি।

১৯ শতকের প্রথম ভাগেই ছাড়ল ভেড়া জাতীয় পশুর একটা বিশেষ পাগলাটে রোগের কথা মানুষের জানা ছিল। এই রোগে আক্রান্ত পশুটি পাথর, গাছের গুড়ি ইত্যাদি শক্ত-এবড়োখেবড়ো কিছুর সঙ্গে অনবরত গা ঘষতে থাকতো। গায়ের ছালচামড়া উঠে গেলেও তার স্বস্থি হতনা! নিয়তিতে বিশ্বাস করলে এই শব্দটা এখানে ব্যবহার করা যেতে পারে। যে রোগের কথা বলছি, সেই রোগে আক্রান্ত পশুর নিয়তি হতো প্রাণ থাকা পর্যন্ত পাথরে গা ঘষতে থাকা। তারপর মরে যাওয়া!

এটি যে একটি রোগ, তা অবশ্য প্রথম বর্ণনা করেন ক্রুটসফেল্ট (হান্স গেয়ারহার্ড ক্রুটসফেল্ট, ১৯২০ সালে) এবং ইয়াকব (আলফন্স মারিয়া ইয়াকব, ১৯২১ সালে)। ছাগল ভেড়ার এই রোগটির নাম স্কার্পি। এটা যে রোগ সেই ঘোষণার প্রায় ১৫ বছর পরে আবিষ্কৃত হয় একটি ভয়ঙ্কর তথ্য। সেটি হচ্ছে, এই রোগটি সংক্রামক।

আরো প্রায় ১৫ বছর পর, ১৯৫৭ সালে, পপুয়া নিউগিনির ফোরে (Fore : উচ্চারণ নিশ্চিত নই!) আদিবাসীদের মধ্যে একটা রোগের উপস্থিতি দেখা যায়। সেটার নাম কুরু (অথবা 'কুরুকুরু')। এই রোগটির উপর বিস্তারিত গবেষণা, বিশেষত এই রোগটি যে সংক্রামক সেটি প্রমাণ করার জন্য ডানিয়েল কার্লেটন গাইডাশেক নামের আমেরিকান ডাক্তার ১৯৭৬ সালে চিকিৎসা এবং শরীরবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পান। এইমাত্র খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম, এই মহামানব মারা গেছেন মাত্র তিন বছর আগে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে।

যেসব রোগের কথা বলছি, এসবই একটি বিশেষ ধরণের রোগ। এই ধরণের একটি রোগের আপনারা নাম শুনে থাকবেন। ম্যাড কাউ। কোনো চিকিৎসা নেই। মৃত্যু নিশ্চিত। ব্রিটেনে এই রোগটি নিয়ে বেশ হইচই হয়েছিল এক সময়। চিকিৎসাহীন রোগ আছে ভুরি ভুরি। কিন্তু এই রোগটির সবচে চমকপ্রদ বিষয়, এটির কারণ। এই রোগটি হয় প্রিয়নের সংক্রমণে। প্রিয়ন। 'প্রাণের নিকটতম বিষ' বলে যার কথা শুরু করেছি।

আপনারা নিশ্চয়ই সবাই জানেন, শরীর যদি লৌহ সভ্যতার বাসিন্দা হয় তাহলে শরীরে লোহা হচ্ছে প্রোটিন। মানে শরীরের সব কাজ কারবারের যন্ত্র হচ্ছে প্রোটিন। কোথাও সংকেত পাঠাতে হবে, সংকেতের প্রোটিন বানিয়ে ছেড়ে দাও! জীবাণু এসেছে? জীবাণুরোধী প্রোটিন বানিয়ে তাকে মারো! শরীর গঠন করতে হবে? প্রোটিন দিয়ে গড়ো! এটা দরকার, সেটা চাই? প্রোটিন দিয়ে করো! এইসব নানা রকমের প্রোটিনের কলকব্জা বানাবে কীভাবে? হাতুড়ি প্রোটিন রয়েছে না! বেয়াড়া আথবা বুড়ো প্রোটিন ভাঙতে হবে? ভাঙারি প্রোটিন রয়েছে তার জন্য! সবমিলিয়ে শরীরের এটা সেটা স-অ-ব ওই নানা রকমের প্রোটিনের কাণ্ডকারখানা। প্রোটিনের চাইতে চমকপ্রদ জিনিস আর প্রকৃতিতে তৈরি হয়েছে বলে আমার মনে হয়না! একটা প্রোটিন নিয়ে কাজ করে একটা জীবন সুখে কাটিয়ে দেয়া যায়!

প্রোটিন নিজে কী, তা তো আপনারা জানেনই। কয়েকটা কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর একটা দুটো নাইট্রোজেনের অণু যদি ঠিকমতো জুড়ে দিতে পারেন তাহলে অ্যামাইনো অ্যাসিড বলে এক আশ্চর্য জিনিস তৈরি হয়। ওই আ্যামাইনো অ্যাসিডের খেজুরপাতা বুনে বুনে তৈরি হয় খেজুরপাতার পাটি। ওটাকে আপনারা চাইলে পেপটাইড বলতে পারেন। এখন দু'চারটে পেপটাইড ধরে যদি নিয়ম করে ভাঁজ করতে পারেন তাহলে সেটা হলো প্রোটিন। অন্যভাবে বলি, অ্যামাইনো এসিডকে সুতো মনে করুন। সুতো বুনে বুনে হয় কাপড়। অ্যামাইনো এসিড বুনে বুনে হয় পেপটাইড। কাপড় ভাঁজ করে সেলাই করলে হয় পোশাক। পেপটাইড নিয়ম করে ভাঁজ করলে হয় প্রোটিন।

মোটে বিশটা অ্যামাইনো অ্যসিডের সুতো বুনে শরীরে সব পেপটাইড তৈরি হয়। শরীরের সব প্রোটিন ওই বিশটা রঙে রাঙানো।

এখন যে পেপটাইড মানে অ্যামাইনো অ্যাসিড বুনে বানানো কাপড়ের কথা বলছিলাম, সেটার 'ভাঁজ' সম্পর্কে একটা দুটো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি। পেপটাইড হচ্ছে এক অত্যাশ্চর্য জিনিস। পেপটাইড নিয়ম মতো ভাঁজ না হলে তার কেরামতি দেখা যায় না! পাতলা কাগজ যেমন, নিয়ম করে ভাঁজ করে নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসানো যায়, আবার উড়োজাহাজ বানিয়ে উড়িয়েও দেয়া যায়। সেরকম পেপটাইড কীভাবে 'ভাঁজ' হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে সে কীরকম কাজ করবে। একটা পেপটাইডকে ঠিকমতো ভাঁজ করে দেয় কে? তারজন্যেও আলাদা প্রোটিন রয়েছে! পেপটাইডের কাপড় সেলাই করে প্রোটিন বানায় 'দর্জি প্রোটিন'।

প্রোটিন ছাড়া তাই প্রাণ হয়না! প্রোটিন প্রাণের নিকটতম, প্রাণের অংশ। প্রোটিন যখন বিষ হয়ে ওঠে তখন তাকে প্রিয়ন বলে। প্রিয়ন কথাটি এসেছে 'প্রোটিন' এবং 'ইনফেশন' শব্দ দুটো মিলিয়ে। প্রিয়ন নিজে তাই বিশেষ ধরণের প্রোটিন।

একটা কর্মক্ষম প্রোটিনকে অকার্যকর করে দেয়ার সবচে সহজ পদ্ধতি তাকে সেদ্ধ করা। উচ্চতাপে সাধারণ প্রোটিনের 'ভাঁজ' খুলে যায়। সে তখন অকার্যকর হয়ে পড়ে! পোশাকের সেলাই খুলে গেলে যেমন তা আর পোশাক থাকে না! কাগজের ভাঁজ খুলে গেলে সে যেমন আর নৌকা হয়ে পানিতে ভাসেনা, সেরকম! সেদ্ধ করা ছাড়াও প্রোটিন নষ্ট করার আরো অনেক পদ্ধতি রয়েছে। কোষের ভেতরে যেমন বললাম, প্রোটিন ভেঙে ফেলায় দক্ষ বিশেষ প্রোটিনের দল রয়েছে। (একটি যেমন, ইউবিকুইটিন প্রোটিয়াজোম সিস্টেম। কী যে চমৎকার এই সিস্টেমের কাজ! আগ্রহীদের পড়ে দেখার অনুরোধ করি। এতো চমৎকার কাণ্ডকারখানা শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ভাবতেই ভালো লাগবে!) বলছিলাম, প্রোটিন নষ্ট করার উপায় সম্পর্কে! প্রকৃতিতে প্রোটিন নষ্ট করবার মতো রয়েছে তাপ, এটাসেটা রসায়নিক, আরো অনেক কিছু! প্রিয়নের বিশেষত্ব হলো, বেশিরভাগ বিধ্বংসী বস্তুতেই তার কিছু হয়না! কোষের ভেতরে যেসব প্রোটিন ভেঙে ফেলার প্রোটিন, সেসব প্রিয়নের কিছু ক্ষতি করতে পারে না। প্রিয়ন তাপরোধী, সাধারণ অনেক রকমের রসায়নিকেও তার কিছু এসে যায় না!

ভালো বিষ হয়ে উঠতে গেলে হয়তো "কিছুতেই কিছু না এসে যাওয়ার" বিশেষ ক্ষমতাটি থাকতে হয়! প্রিয়নের এই ক্ষমতাটি রয়েছে দারুণ মাত্রায়। প্রাণ নাশক হতে গেলে স্পর্শকাতর হলে কী চলে?

প্রিয়ন যে পেপটাইড থেকে তৈরি হয়, সে স্তন্যপায়ীদের শরীরে যথেষ্ঠ মাত্রায় রয়েছে। মানে বিষ তৈরির মূল উপাদান এখানে হাজির। দরকার কেবল স্বাভাবিকভাবে ভাঁজ হয়ে প্রাণ হয়ে ওঠার যে নিয়ম, সেই নিয়মে একটুখানি বিচ্যুতি। শরীরে স্বাভাবিক প্রোটিনই একটুখানি অন্যরকম ভাঁজ হয়ে প্রিয়ন নামের বিষ হয়ে ওঠে। এই প্রিয়নই আবার গিয়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রোটিনের ভাঁজ বদলে দিয়ে তাকে প্রিয়ন করে তোলে। একটি বিষ গিয়ে আরেকটি ভালো প্রোটিনকে বিষ বানায়। চেইন বিক্রিয়ার মতো প্রিয়নের সংখ্যা তখন শরীরে বাড়তেই থাকে। আর যেমন বললাম, শরীরের স্বাভাবিক নিয়মে এই বিষ নষ্ট হয়না! সেজন্য শরীরে জমে যেতে থাকে প্রিয়নের পরিমাণ। এই বিষ থেকে কোনো নিস্তার নেই। যেখানে মানুষ অসহায় আমি তাকে নিয়তি বলি। প্রিয়ন মানুষের নিয়তি। নিয়তির বিষ।

সব মিলিয়ে যা বললাম তার সারমর্ম হচ্ছে, প্রিয়ন একধরণের প্রোটিন। শরীরের স্বাভাবিক প্রোটিন খানিকটা বদলে গিয়ে প্রিয়ন তৈরি হয়। এই প্রিয়ন গিয়ে আবার স্বাভাবিক প্রোটিনকে বদলে দিয়ে নতুন প্রিয়ন বানাতে পারে। এবং আজকে মার্চের বিষ তারিখ।

প্রিয়ন গবাদিপশু থেকে গবাদিপশু এবং মানুষের মাঝে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত পশুর মাংস খেলে পাকস্থলী থেকে প্রিয়ন শোষিত হতে পারে শরীরে। সেই প্রিয়ন, শরীরের বিশেষ প্রোটিনকে প্রিয়ন বানিয়ে ফেলতে পারে। যে প্রোটিন থেকে প্রিয়ন হয় তা স্তন্যপায়ীদের শরীরে আছে সে তো বললামই। আক্রান্ত পশুর মাংস ভালোমতো রান্না করে খেলেও ঝুঁকি থেকে যায়। প্রিয়ন উচ্চতাপেও নষ্ট হয়না। তবে সংক্রমণটা সবসময় জরুরি নয়। শরীরের প্রোটিন একা একা বিগড়ে গিয়েও প্রিয়ন হয়ে উঠতে পারে। এবং বলে রাখা ভালো, প্রিয়ন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কে মানুষের জানাশোনা কম। প্রমাণিত সত্যের চাইতে হাইপোথেসিসই বেশি। আর তাছাড়া আপনারা তো জানেনই, যে আমি নিজে জানি নিতান্ত কম!

১৯৮৪ সালে প্রথম ব্রিটেনে ম্যাড কাউ রোগে সংক্রামিত গরু পাওয়া যায়। রোগটির নাম দিয়ে এটাকে চিহ্নিত করা হয় অবশ্য তার পরের বছর। রোগের ঠিকুজি খুঁজতে খানিকটা সময় লেগে যায়। ম্যাড কাউ রোগটির পরীক্ষামূলক সংক্রমণ করিয়ে দেখা হয় ইঁদুরের মধ্যে। দেখা যায় এটি সংক্রমণযোগ্য রোগ। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত গবেষনায় ১৯ টি ভিন্ন প্রজাতির প্রাণির মধ্যে ম্যাড কাউ সংক্রমণের পরীক্ষা সফল হয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম ১৯ বছরের একটি তরুণ ম্যাড কাউ রোগে সংক্রামিত হয়ে মারা যায়। হতভাগ্য এই ব্রিটিশ তরুণের নাম স্টিফেন চার্চিল। মানুষের মধ্যে সংক্রামিত ম্যাড কাউ 'ক্রুটসফেল্ট-ইয়াকব ডিজিজ' নামে পরিচিত। মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হতে পারে এরকম প্রিয়ন ঘটিত রোগ অবশ্য বেশ কয়েকটি রয়েছে। ম্যাড কাউ যে মানুষের মাঝে সংক্রামিত হতে পারে সেটি ব্রিটেন ঘোষণা করে ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৭ সালের জুলাইতে স্ট্যানলি প্রুজিনার মানুষের মাঝে ম্যাড কাউ সংক্রমণের প্রমাণ দেন। এই আবিষ্কারটির/প্রমাণটির তাৎপর্য বোঝানোর জন্যে একটা তথ্য দেই। ন্যাচার পত্রিকায় প্রুজিনারের গবেষণাপত্র প্রকাশ পায় জুলাইতে। ৬ মাসের মাথায় ডিসেম্বরে তিনি নোবেল পুরষ্কার পান। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। সংক্রমণ হচ্ছে জানতে পেলেই ম্যাড কাউয়ের বিপদ কমে না। অনেকটা বিপদ আগেই ঘটে গেছে! কেবল নব্বইয়ের দশকে ব্রিটেনে প্রায় ৫ লক্ষ ম্যাড কাউ সংক্রামিত গবাদি পশু জবাই করে বাজারজাত করা হয়। সেই হিসেবে ব্রিটেনের লক্ষ মানুষ প্রিয়ন ঘটিত রোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এবং যেমন বললাম, প্রাণের নিকটতম এই বিষটি প্রাণঘাতি হতে সময় নেয়। এটি কতটা ঝুঁকি তা জানা যাবে আরো দীর্ঘ বছর পার হলেই!

প্রিয়ন আসলে করছেটা কী?

আমরা আসলে খুব কম জানি। নিতান্তই কম। গবেষণাগারে একটা প্রোটিন ক্লোন করে আলাদা করার জন্য সব মিলিয়ে মাসখানেকের বেশি সময় লাগার কথা নয়। অথচ আমার জানামতে এতোদিনেও বিশুদ্ধ প্রিয়ন নিষ্কাষণ করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি বলে প্রিয়ন দেখতে কেমন তা একেবারে ঠিকঠিক কেউ বলতে পারে না। আর এসব কারণে প্রিয়ন নিয়ে গবেষণা করাও সহজ নয়। প্রিয়ন কীভাবে এরকম বিশেষায়িত বিষ হয়ে ওঠে সেই হিসেব খুব ভালোমত তাই বলা যায় না। তবে একেবারেই যে হিসেব নেই তা নয়। প্রিয়ন কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্নায়ু কোষের গায়ে গিয়ে লেগে স্তরের মতো তৈরি করে। পানির পাত্রের গায়ে কেউ পানিতে থাকা ধাতুর আস্তর পড়ে যেতে দেখেছেন? স্নায়ু কোষের গায়ে প্রিয়নেরও ওরকম স্তর পড়ে যায়। এটা স্নায়ু কোষের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে দেয়। এরকম বেয়াড়া প্রোটিন নষ্ট করে দেয়ার পদ্ধতি শরীরে থাকে ঠিকই। কিন্তু যেমন বললাম, প্রিয়নের কিছুতেই কিছু এসে যায় না! প্রিয়নকে তাই শরীর তার স্বাভাবিক নিয়মে নষ্ট করতে পারেনা! প্রিয়নের আস্তরণের জন্য স্নায়ুকোষে সূক্ষ্ম ছিদ্র হয়ে যেতে পারে! প্রাণের নিয়তি তখন কেবল মৃত্যু! শরীরে প্রিয়নের উপস্থিতির পরও রোগ সৃষ্ট হতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু একবার তার লক্ষ্মণ দেখা দিলে রোগের প্রকোপ খুব দ্রুত বেড়ে যায়। সে থেকে কোনো নিস্তার নেই। মানুষ শত্রু খেকে পালাতে পারে। যে প্রাণের সবচে নিকটে থাকে সেই বিষ থেকে কেউ কীভাবে পালাবে?

এরকম একটা বিষ সম্পর্ক এতো ভয়ঙ্কর কথা লেখার পর আমার উচিত কিছু আশার বাণীও শোনানো। দুঃখের বিষয় সেটা আমি করতে পারছি না। প্রিয়ন ঘটিত রোগ থেকে কীভাবে সতর্ক থাকতে হয় তা আমার জানা নেই। নিরাময়ের উপায় যে নেই তা তো বললামই। আক্রান্ত গবাদিপশুর মাংস না খাওয়ার কথা বলতে পারি। কিন্তু বিপদ হচ্ছে, গবাদিপশু আক্রান্ত কিনা সেটা জানার উপায়ও সীমিত। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষণ দেখার আগেই পশুর মাংস হজম হয়ে যায়! পশুতে যে যে রোগেরই হোক, লক্ষণ দেখা দিলেই ব্যাবসায়ী তা দ্রুত কেটে বিক্রির ব্যবস্থা করে বলেই জানি। আর তাছাড়া সংক্রমণ ছাড়াও প্রিয়ন ঘটিত রোগ হতে পারে। আমি অদৃষ্টে আস্থা রাখতে বলছি না। কেবল প্রিয়নকে যে আমার নিয়তির মতো মনে হয় সেটা আবারো বলছি!

সবার জন্য শুভকামনা রইল। সবাই সুস্থ থাকুন। প্রাণের রূপ নিয়ে কারো প্রাণের নিকটে কোনো কুৎসিত নোংরা বিষের ঠাঁই না হোক...

সচলায়তনে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই: