মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট, ২০১২

তপু ভাই, রুমালী আপু এবং সুখবর!


সে বহু বছর আগের কথা! কমাণ্ডোজ খেলার লোভে লোভে গিয়ে বসতাম তপু ভাইয়ের কম্পিউটারে! গ্রীন ব্যারেট যখন বুকে হেঁটে ছুরি মুঠোয় সন্তর্পণে উঁকি দিত নাজি ক্যাম্পের আনাচে কানাচে, তখন আমার মনটা দুপ দুপ করত, আহারে, এইতো তপু ভাই এসে পড়লেন! উঠতে হবে কম্পিউটার ছেড়ে! মেরিন' যখন দীর্ঘ ডুব সাঁতারে নিঃশব্দে নাজী সৈন্যের পেছনে গিয়ে উঠত আচমকা, তখন আমিও দম ধরে থাকতাম, আরেকটু, আরেকটু হলেই মিশন সফল হয়!

তপু ভাই লোকটা নির্বিষ ছিলেন। মূর্তিমান উৎপাত হিসেবে আমাকে কখনো পাত্তাও দিতেনা না! কম্পিউটার ছেড়ে আমার ওঠা উচিত হত চক্ষুলজ্জার খাতিরে! কিন্তু মহানদের চক্ষুলজ্জা থাকতে নেই! আমি উঠতাম মেজ আপুর ভয়ে! পড়তে বসতে হত বলে! আমি তপু ভাইকে দেখতাম আর ভাবতাম, যে লোকটার আস্ত একটা কম্পিউটার আছে, আর যার আস্ত কম্পিউটারে কমাণ্ডোজ খেলা যায়, আর যার ঘরে তাকভর্তি আছে না-পড়া গাট্টি গাট্টি বই, আর বিশেষত যার কোন মেজ আপু নেই, সেই লোকটা পড়ালেখা কেন করে! এই লোকটা কেন বোর্ড পরীক্ষায় নির্বিকার ভাবে সব হেলিয়ে দিয়ে হেলতে দুলতে গিয়ে বসে বুয়েটে! এই লোকটা কেন পদার্থবিজ্ঞান এত চমৎকার করে বোঝাতে পারে! এই লোকটা কেন চোখ বড়বড় করে দেখার মত একজন!
আমার কোন হিসেব মিলত না! হিসেবে সবচে বড় গোলমাল হয়ে গেল যেবার রুমালী আপুর কথা শুনলাম! রুমালী আপু বৃষ্টি ভালোবাসতেন! বৃষ্টি আর রুমালী আপুকে নিয়ে গল্প লিখে তপু ভাই পুরষ্কার পেলেন! হূমায়ূন আহমেদ আহা উহু করতে লাগলেন, ছেলেটা বড্ড ভালো লেখে!
সেই তপু ভাইয়ে সঙ্গে যোগাযোগ হল দীর্ঘ বছর পর!
আজকে তপু ভাইয়ের জন্মদিন। মনে হল শুভেচ্ছা জানাই।
সময় নিয়ে ব্লগ লেখার সময় আমার একদণ্ডও নেই! তাও কীবোর্ডে খুটখাট থামলো না! ভাবছি, ঘন্টাখানিক বিরতি নেয়া হোক!
এইখানে এসে বড় ঝামেলাটা বাধলো! এইবার কী লিখব! ব্যক্তিগত বকবকানি একটা পর্যায়ের পর যন্ত্রণাদায়ক! ভয়াবহ কিছু কথাবার্ত বলে একটা ভালো খবর দেই বরং!
ভয়াবহ কথাবার্তা:
মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার একটা রোগ আছে। এই রোগ হলে মস্তিস্ক ওলট পালট হয়ে যায়! স্মরণ শক্তি নষ্ট হয়ে যায়, মাতৃভাষা ভুলে যায় মানুষ, বোধশক্তি থাকে না, বিচার-বিবেচনা নষ্ট হয়ে যায়, মানবিক অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়, আচরণ বদলে যায়, চিন্তার ধরণ বদলে যায়, চিন্তা শক্তিও নষ্ট হয়ে যেতে পারে! এই রোগটা হলে মানুষের প্রাণটাই কেবল থাকে, মানুষটা আর থাকে না! তাতেই শেষ নয়! নীলমণি প্রাণটাও শেষপর্যন্ত টেকে না এই রোগ হলে!
একশোবছর আগে, এক জার্মান নিউরোলজিস্ট একজন নারীর মস্তিস্ক কোষের গঠনে অদ্ভুত ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন! ওই নারী রোগী মারা গিয়েছিলেন অদ্ভুত ধরনের মানসিক রোগে! কৌতুহলী সেই নিউরোলজিস্ট আলোইজ আলঝাইমারের নামে মস্তিস্কের এই রোগটির নাম হয় আলঝাইমার'স ডিজিজ।
কেবল আমেরিকাতে এখন ৫০ লক্ষেরও বেশী লোক আলঝাইমারে আক্রান্ত বলে মনে করা হয়! আমেরিকাতে প্রতি ৫৮ সেকেণ্ডে নতুন একজন এই রোগে আক্রান্ত হন। ২০৫০ সাল নাগাদ রোগের হার বাড়বে তিনগুণ! এই লেখাটি যারা পড়ছেন, কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে যাদের বয়স, তারা তখন সবচে বেঝি ঝুঁকিতে থাকবেন সেই সময়! এই খবরটি দেয়ার জন্য দুঃখিত। আমি নিজেও ঝুঁকির বাইরে নই!
আরো ভয়াবহ খবর দেই, আলঝাইমারের কোন চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা সংক্রান্ত এযাবত কালের কোন গবেষণাই সেরকম সফলতা দেখায় নি!
আলঝাইমার কেন হয়?
এখনো আমাদের জানতে বাকি অনেক কিছু! আমাদের কোষের ত্বকে অসংখ্য প্রোটিন থাকে। তাদের নানা জনের নানা কাজ। এদের অবস্থানও তাই ভিন্ন ভিন্ন। কোষের ত্বক ভেদ করে যাওয়া অনেক রকমের প্রোটিনের মধ্যে দুটি হচ্ছে, প্রিসেনিলিন ১ আর প্রিসেনিলিন ২।
এই প্রোটিন ভেঙে গিয়ে তৈরি হতে পারে "বেটা-অ্যামাইলয়েড" নামের একটা পেপটাইড।
পেপটাইড কী তা তো সবার জানা। কয়েকটা কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন অনু মিলে তৈরি হয় অ্যামাইনো অ্যাসিড। আর অনেকগুলো অ্যামাইনো অ্যাসিড মিলে তৈরি হয় পেপটাইড।
কার্পাস তুলো যদি হয় কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর নাইট্রোজেনের অণু,
তুলো দিয়ে বানানো সুতো তাহলে অ্যামাইনো অ্যাসিড।
কাপড় হচ্ছে পেপটাইড।
কাপড় সেলাই করে জামা বানালে, সেটাকে প্রোটিন বলা যাবে।
বেটা-অ্যামাইলয়েড নামের যে পেপটাইড আছে, সেটা গিয়ে মস্তিস্কের কোষে স্তরে স্তরে জমে যেতে পারে! প্রিয়নের কথা বলেছিলাম একটা লেখাতে! বেটা অ্যামাইলয়েড প্রিয়নের মত অতটা না হলেও খানিকটা স্বশাসিত! নিজেরা নিজেরা জুড়ে গিয়ে নানা আকার নিতে পারে, নানা ভাবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ফন্দি ফিকির করতে পারে!
অনেক বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাব না। সময় খানিকটা কম। শুধু আরেকবার মনে করিয়ে দেই, বেয়াড়া একটা পেপটাইড তৈরি হয় শরীরে। সেটা গিয়ে মস্তিস্কের কোষে কোষে স্তর ফেলতে পারে! তখন আলঝাইমার রোগ হয় বলে আমরা জানি। জেনেটিক কারণে বেয়াড়া পেপটাইড তৈরি হতে পারে। তবে সবসময় যে তাই হবে সেরকম নয়। ৬০ থেকে ৬৫ বছর বয়সে এই রোগ শুরু হয়। তবে বয়সের সঙ্গে রোগের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত নয়!
এখন উপায়?
উপায় হচ্ছে ওই বেয়াড়া পেপটাইডটাকে সামলানো। সামলানোর উপায় বলতেই অ্যাতো কথা জুড়লাম! তপু ভাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে, গত মার্চে, সায়েন্সে একটা ঘোষণা দিয়ে ক্রামার আর তার সহগবেষকরা জানিয়েছেন, বেক্সারোটিন নামের একটা ওষুধ একেবারে ফকিরের কেরামতির মত মস্তিস্কের কোষ থেকে বেয়াড়া পেপটাইডের আস্তর সরিয়ে দিতে সক্ষম! পরীক্ষাটি যদিও করা হয়েছে ইঁদুরের উপর কিন্তু এরকম চমকপ্রদ সাফল্য এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই! এই সাফল্য এতই চমকপ্রদ যে বিশ্বাস হতে চায়না! মাত্র ৭২ ঘন্টায় পেপটাইডের স্তর ৫০% সাফ! আর সেই সঙ্গে আলঝাইমার রোগে মস্তিস্কের কর্মক্ষমতায় যে নেতিবাচক পরিবর্তন আসে সেটাও কমে গেছে!
গবেষকরা বলেছেন, মস্তিস্কের যে গৃহপালিত গিলেখাদক কোষ আছে, মানে মস্তিকে থাকা যেসব কোষ জীবাণু আর বেয়াড়া আবর্জনা সব খেয়ে সাফ করে ফেলে সেইসব কোষেরা বেয়াড়া পেপটাইডকেও খেয়ে সাফ করে ফেলতে পারে নতুন এই ওষুধের খোঁচায়! মূল ব্যাপারটা আসলে আরো খানিকটা জটিল। আর আমি নিজেও ভালোমত জানিনা। তাই যারা বিস্তারিত জানতে চান তাদের জন্য লিঙ্ক রেখে যাই:
তপু ভাইয়ের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে চাইছিলাম। এই সুখবরটা দিয়ে সেই শুভেচ্ছা জানাই। আলঝাইমারের চিকিৎসার এক অভূতপূর্ব সম্ভাবনা আমাদের সামনে। আমাদের অগ্রজদের জীবন আলঝাইমার মুক্ত কাটবে বলে আমরা আশা করতে পারি। আশা করতে পারি আমাদের জীবনের শেষের দিনগুলিও কাটবে আনন্দ বেদনার স্মরণে ডুবে! বিস্মৃতির অন্ধকার আমার আমাদের পরাণ ছোঁবে না!
গত কয়েকটি লেখার পর শুনেছি আমি নাকি কেবল খারাপ খবর দেই! ভালো ভালো কথা লেখার সময় পাইনা কেন, ইত্যাদি হেনতেন বলতেও ভালো লাগেনা। লিখতে ইচ্ছে করে। যখন সময় পাব, সুযোগ পাব, লিখব। ততদিন পর্যন্ত সবার জন্যসুখবর অপেক্ষা করুক।
শুভ জন্মদিন তপু ভাই
এইবার রুমালী আপুর বিষয়টা স্পষ্ট করেন! রুমালী আপু বৃষ্টি ছাড়া আর কী কী পছন্দ করেন?
সচলায়তনে প্রকাশিত।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: