শুক্রবার, ২৪ আগস্ট, ২০১২

কামড়াত্মক!


আমার বন্ধুটি বলল, অ্যাঁ? বলিস কী! কচকচ করে খেয়ে ফেলে?
আমি বললাম, কচকচ করে তো নয়, ওনার চুকচুক করে খাওয়ার অভ্যেস!

আমার বন্ধুটি, ধরে নেই তার নাম কামু, বেশ মুষড়ে পড়ল!

কামু'র কবিতা লেখার শখ! সেই শখ সৌখিনতার গণ্ডী ছাড়িয়ে বাতিক হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিন হয়! ও ফুল ফুটলে সুখের কবিতা লেখে! ফুল না ফুটলে দুঃখের কবিতা লেখে! যখন ফুল ফুটবো ফুটবো করছে তখনও কবিতা লেখে! সেই কবিতা সুখের না দুঃখের তা ঠিক বোঝা যায় না, তবে খানিকটা অশ্লীল বলে জনশ্রুতি আছে!

সে যা-ই হোক, কবিতা লেখা তো আর অপরাধ হতে পারেনা! আমরা নতুন একটি কবিতা লিখতে যুদ্ধ করি...!

কিন্তু একেবারে পাকড়ে ধরে কবিতা পড়াতে চাইলে খানিকটা বিপদ বটে! সেই বিপদের আছে এক বিরাট ইতিহাস!

ঘটনার প্রথম পর্যায়ে সে সাদা ব্যাকগ্রাউণ্ডে কবিতা লিখে ছবি বানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করত! কবিতার ছবির একপাশে রমণীর হাতে ধরা রক্তাভ গোলাপ! কখনো কখনো বিক্ষত হৃদয় থেকে খেজুরের রসের মত চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত! ছবির প্রতি দুষ্টু লোকের দূর্বলতা থাকতে পারে মানি, কিন্তু কবিতার ছবি তো সক্ষম লোককেও দূর্বল করে ফেলে! সেই ছবি একবার দেখে আমি রাতদুপুরে দুঃস্বপ্নের ঘোরে চিৎকার করে জেগে উঠেছি! আধোঘুমে বিছানা ছেড়ে দৌড়ে পালাতে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিট হয়ে পড়েছি!

পরে দিলাম ট্যাগে পাহারা বসিয়ে। চাইলেই সে আর কবিতার ছবিতে আমাকে ট্যাগ করতে পারেনা!

কিন্তু সে দমে না গিয়ে তার কবিতার ছবিতে জ্ঞাত-অজ্ঞাত, মৃত-অর্ধমৃত অথবা যারা দিব্যি হেসেখেলে বেড়াচ্ছেন সবাইকে ট্যাগ করে ফেলতে লাগল! ছবিতে যতনা জায়গা নেয়, ছবিতে যারা বাঁধা পড়েছে তাদের নামের তালিকা জায়গা নেয় চারগুণ! কী বিপদ! লোকেদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! নিরীহ ফেসবুক বাসীরা, যারা ট্যাগে পাহারা বসানোয় বিশেষ দক্ষ ছিলনা তারা অপঘাতে মরতে লাগল! দুঃস্বপ্ন দেখে লোকেদের ঘুম হারাম হলো! আধোঘুমে দৌড়ে পালাতে গিয়ে পেলভিসের হাড় আর ল্যাপটপ ভাঙলেন একজন! ল্যাপটপ ভেঙে ভালই হল, কবিতার ছবি থেকে মুক্তি মিলল! বেচারা পেলভিসটা গেল খালি অপঘাতে!

এইসব ঘটনার পর লোকে রীতিমত ক্ষেপে উঠল। ক্ষেপে উঠলেন না কেবল মনোরোগ চিকিৎসকরা। তাঁদের পসার বাড়তে লাগলো। আমি নেহাৎ বন্ধু মানুষ বলে উচ্চবাচ্য করলাম না। কিন্তু লোকের ভালোবাসা কম! কবিকে তারা ভালোবাসলো না!

ফেসবুক ছেড়ে কামু তাই ও পাড়ার ব্লগে কবিতা পোস্টাতে লাগল! ফেসবুক ছেড়ে যাওয়ার আগে লিখে গেল তার বিদায় কবিতা,

কবিতার মত ভালোবাসাকে করলে আঘাত
দীর্ঘ বিরহে যাই।
মুখের পুস্তক, বিদায় বিদায়...![১]

তবে ওপাড়ার ব্লগেও বিষয়টা সহজ হলনা। একবারে একসঙ্গে ২৬ টি কবিতা দেয়ায় সার্ভার ধ্বসে যেতে যেতে বাঁচল! ব্লগের পাষণ্ড লোকেরা একাউন্ট ব্লক করে দিল! তারপরও আরো নানাবিধ জটিল ঘটনা ঘটেছে শুনেছি। বিস্তারে জানতে চাইনি। জেনেছি কেবল এই যে, বেচারা এখন শুধু দুঃখের কবিতা লেখে!

আধফোঁটা রক্তগোলাপের মত তোমার হৃদয় লুকিয়ে রাখো যে চামড়ার খোলসে
সেও যেন অমৃতের ভাণ্ড!
কী ক্ষতি বলো
কবি যদি চায় দুদণ্ড গণ্ড ঘষিতে...[২]

কামু আজ এসেছে আমার কাছে। সচলে নাকি ভালো ভালো কবিতা ছাপা হয়। আর সেসব লোকে সত্যি সত্যি নিজে থেকে পড়ে আর মন্তব্য করে! সচলে তাই সে ক'খান কবিতা ছাপতে চায়।

তার আফসোস, সচলে যখন লোকে কবিতা পড়ছেই, আর সেসব যদি ভালই হয়ে থাকে, তাহলে সে অ্যাতো কিপ্টেমি করে কেন! কেন অ্যাতো কম কম! সুযোগ পেলে সে সচলের কবিতা খরা ঘুচোবে বলে আমাকে হাত মুঠো করে দেখাল!

কামু'র সংগ্রামের পথে একটাই বাঁধা। সে কোত্থেকে শুনেছে সচলের এক নির্দয় মডু নাকি রোজ রোজ কবিতা পোস্টালে ধরে কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে! আর ঠাঁ ঠাঁ ঠাঁ করে হুঙ্কার দেয়! আমি মাঝেসাঁঝে সচলে লিখি বলে, আমার কাছে এসেছে জিজ্ঞেস করতে!

তারপর ওই কাহিনী। বললাম, কচকচ নয়, চুকচুক!

কামু বলল, ওতে আর পার্থক্য কী! কামড়ে খেয়েই তো ফেলে!
বললাম, কামড়ালেও বেশ যত্ন করে কামড়ায় শুনেছি! ওনার ইভটিজিং কার্ডেই লেখা রয়েছে, প্রফেশনাল আদরকামড়াত্মক! বিফলে দ্বিতীয় সুযোগ! ত্রিফলে মূল্য ফেরত!

কামু বলে, ত্রিফল কীরে! আবার পয়সাও নেয় নাকি?
- আরে নাহ! ওটা বিজ্ঞাপনের স্টাইল!
- তাহলে খান কতক কবিতা পোস্ট করে দেই কী বল?
কামু'র বেশ খুশি খুশি চেহরা দেখে আমি খানিকটা মনমরা হয়ে যাই...! বলি, তুই এক কাজ কর, একটা পোস্ট করে দেখ। ছাপা হলে আরো পোস্ট করিস!
বন্ধুটি বলল, বলছিস যখন। পাঁচটা মিনিট সময় দে। কবিতা আমার সঙ্গেই আছে। এই দেখ ‍"সঞ্চয়ীতন্বী"!
সঞ্চয়ীতন্বী'কে দেখলাম। কামুর ৩২ জিবি পেনড্রাইভ!

আমি খানিকটা মুষড়ে পড়ি। মানবিক বোধ থেকে আজকের দিনটা কামুকে নিবৃত্ত রাখতে চাইছিলাম। বললাম, শোন, আজকে বাদ দে। আজকে একটা বিশেষ দিন।
কামু চোখে প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে তাকায়।
আমি ব্যাখ্যা করি। সে এক বিরাট ইতিহাস।

একদা ছিল এক কোমল পরাণ ভোলাভালা বালক। তার নাম দন্তহীন নাবিক।
তারপর যা হয় আরকি! এটা সেটা ওটা।
দশগ্রামে তার নাম ছুটল! সে নাকি দস্যু হয়েছে!
পত্রিকা থেকে লোক এলো। দস্যুকে পাওয়া গেল না। গ্রামের লোকের ইন্টারভিউ হতে লাগল। লোকে তার বিষয়ে বিশেষ কিছু বলতে পারল না। যা বলল বালিকারাই।
সে নাকি দস্যু মারাত্মক?
দু-তিনটে বালিকা খিল খিল খিল করে সম্মতি জানালো।
একজন বলল, দস্যু কোথাকার! অমনি দশজনে মিলে, খিল খিল খিল খিল...!
কেউ বলল, দাঁতোয়াল দস্যু! অমনি এগারো জনে মিলে, হি হি হি হি...!
তিনজনে বলল, নখও আছে! পাঁচজনে একে অন্যকে চোখ টিপি দিল!
কেউ কেউ কী বলল তা বোঝা গেল না! চোখের ভাষা প্রত্রিকাওয়ালারা পড়তে পারত না!

ইন্টারভিউওয়ালারা জানতে চাইল, দস্যু করেছেটা কী?
একজন বালিকা বলল, ইস...! অমনি সকলে মিলে, খিল খিল খিল খিল খিল খিল...!
একজন শমাট পত্রিকাওয়ালা বলল, দস্যু যখন, দস্যুপনাই করেছে!
সকল বালিকা হি হি হি হি খিল খিল খিল করে সায় দিল!

সেই দস্যুর আজকে জন্মদিন। দস্যুর জন্মদিনে কবিতা মানায় বল?
কামু বলল, তা ঠিক! আমার অবশ্য বিদ্রোহী কবিতাও ছিল...!
আমি বললাম, ওসব রেখে দে তুই! জেলে বসে প্রকাশ করতে হবেনা?
কামু বলল, তা ঠিক! জেলে বসে কবিতা না লিখলে সুনাম হয়না! কাজী নজরুল, নাজিম হিকমেত, অস্কার ওয়াইল্ড...!
আমি বলি, মোক্ষম!

কামু ক্ষ্যান্ত দেয়। আমি খানিকটা অবাকও হই! অ্যাতো সহজে তার রণেভঙ্গ দেয়ার কথা নয়!

তবে ভালোও লাগছে। জন্মদিনের দিনটা দস্যু বেচারা বেঁচে গেল! ভাবলাম এই সুখবর লিখে জানাই। তাই লিখলাম।

পদস্থ টিকা:
১, ২: কামু'কে নিয়ে এই লেখাটা লিখব বলেছিলাম। একটা শর্তে অনুমতি দিয়েছে। তার লেখা অন্তত দুটো কবিতা ব্লগের ভেতর ছেপে দিতে হবে। লেখার স্বার্থে রাজি হয়েছি।
৩: কবিতায় আপাতত থামলেও কামু শুনলাম একটা বিদ্রোহী গল্প লিখছে, "ব্লগ কারো বাপের নয়"। সেটা নাকি সে সচলে পোস্ট করবে। আহা, বেচারা মডুরাম! তাদের উপর আল্লা রহম করুক!
৪: এই লেখাটা গত বছর লেখা শুরু করেছিলাম। মাঝখানে একদিন খসড়া ঘাটতে গিয়ে নজরে পড়ার আরো খানিকটা লিখেছিলাম। কয়েকদিন আগে আবার খানিকটা লিখলাম। ভাবলাম, শেষ করার চেষ্টা করি। আজকে গোলমাল করে শেষ করতে হল। আরেক বছর কামুকে ঠেকিয়ে রাখা যেত না!
৫: পাঁচ নাম্বারে কিছু নাই। ৫ না লিখলে ৬ লেখা যাবে না তাই লিখলাম।
৬: আর কতো টিকা চান?
৭: ইত্যাদি ইত্যাদি...!

[শুভ জন্মদিন দস্যুভাই। হাঁটুপানিতে আর কত! এইবার ভালোমত ডুব দেন! আমরাও খানিক ভালোমন্দ খাই!]


সচলায়তনে প্রকাশিত।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: