রবিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২

নোংরা জলপাই

জলপাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সহজ হয়ে উঠবে বলে আমরা চিরকাল আশা করে থাকি। আমরা খুব আশা করে থাকি রঙ বদলানো গিরগিটির নোংরামি দেখতে হবে না বাংলাদেশ জুড়ে।

আমাদের আশা পূরণ হয়না। একটি পরাজিত জাতি হয়ে ওঠার জন্য যতোরকমের গণিত মেলানো প্রয়োজন, সব মেলাতে থাকে বিক্রী হয়ে যাওয়ার পোকার দল।

কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ ১নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন। রঙ বদলে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী ৭৫ পরবর্তী সামরিক সরকারের সহচর হয়েছিলেন। বিএনপি সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

তবে মাঝে মাঝে মনে হত বাংলাদেশ বিরোধীদের কট্টর সমালোচক তিনি। ২০০৬ এ যখন দল ছাড়লেন তখন ভাসা ভাসা ভাবে মনে হল, জামায়াতের সঙ্গে আপোষ করতে চাননি বলেই দল ছাড়লেন।

তখন জনাব অলি বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে নানাবিধ বাক্যবান ছুঁড়ে অর্জুনের অবতার হয়ে উঠেছিলেন। বলেছিলেনজিয়াকে রাস্তা থেকে ডেকে এনে যুদ্ধে নামিয়েছি। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করিয়েছি। যেসব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বেগম জিয়ার জুতা স্যান্ডেল টানে তারাই কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে আমার (অলি) বিরুদ্ধে কথা বলছে।
বলেছিলেনবাংলাদেশে জঙ্গীবাদ উত্থানের জন্য খালেদা ও তার পুত্র তারেক দায়ী। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত-শিবির আশ্রিত ক্যাডাররা সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলার সাহস পেয়েছে। 

অথচ কী চমৎকার দেখা গেল! তিনি বাংলাদেশ বিরোধী রাজাকার নিজামী মুজাহিদ সাইদীর মুক্তি চাইলেন প্রকাশ্যে। গত ১২ তারিখে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত শিবিরের সংগঠন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদে হাজির হলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। তার সঙ্গে দেখা গেল জামায়াতের মহানগর আমীরকে। কী চমৎকার!

অলি আহমেদের সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রাক্তন জলপাই মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। জামায়াতের অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি মাতৃভূমির সঙ্গে বেঈমানীর চমৎকার নজির হয়ে রইল!

দেশ রক্ষায় ক্ষমতা হাতে নেয়া জলপাইয়ের যে নাটক গত নির্বাচনের আগে আমরা দেখেছিলাম। রাজনৈতিক মহলে নানান ডিগবাজি এবং ভুঁইফোড় গোষ্ঠীর তিড়িংবিড়িং সুশীলতাও সেই নাটকের অংশ ছিল। অলি আহমেদ প্রাক্তন জলপাই। পরিস্থিতি আঁচ করে তিনি মোক্ষম চাল চেলেছিলেন বলে সন্দেহ হয়। 

তবে এসবে আজকাল তেমন আগ্রহ জন্মে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে জলপাই কলঙ্ক বড্ড আটপৌরে হয়ে গেছে। জলপাইয়ের দেশরক্ষা এবং ইতরকূলের লাফানো দেখে তেমন বিকার হয়না আর।

নড়েচড়ে বসি মুক্তিযুদ্ধকে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ বলে একটা মোয়া যখন গেলাতে চান জলপাই অলি। দ্বীনি চেতনার যুদ্ধ বলে যখন বাংলাদেশের মুক্তির যুদ্ধকে রং করতে চান ইব্রাহিম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান গবেষক ইব্রাহিম জানেন না যে বাংলাদেশের মুক্তির যুদ্ধের গায়ে দ্বীনি চেতনার কোন রং কখনো ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা বরং ধর্মের নামে নরহত্য করেছে, নারী নির্যাতন করেছে, যুদ্ধাপরাধ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা ধার্মিক ছিলেন, বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু অসাম্প্রদায়ীকতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণও ছিলেন তাঁরাই। এই মুক্তিযুদ্ধেই সুজন-সুধীর কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন দীনের নামে নরহত্যা করা পাকি সেনা আর তাদের সহচর আলবদর-আলশামস-রাজাকার-জামায়াতের বাহিনীর বিরুদ্ধে। পাকিস্তান আর জামায়াতের প্রোপাগাণ্ডা "দ্বীন রক্ষা"র তত্ত্ব গিলে দেশ আর মানুষের সঙ্গে বেঈমানী তাঁরা করেন নি।

অলি আহমেদ, রাজাকারের কাছে বিক্রী হয়ে গেলেন। বাংলাদেশের বিরোধীদের প্রিয়ভাজন হওয়ার যে অর্জন, সেই কলঙ্কের অলীক বেদনায় তিনি ভুললেন না। বক্তব্য দিলেন, 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেনাবাহিনীর অধীনে হয়েছে'।

চমৎকার!

অলি আহমেদ তার বিক্রী হয়ে যাওয়া কণ্ঠে চাপা দিয়ে গেলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেনাভ্যুত্থানের মত কোন মধ্যযুগীয় বর্বরতার মাধ্যমে হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন গৃহযুদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ত্ব কোন জলপাই দেয় নাই! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে নির্বাচিত সরকারের অধীনে। সেনাবাহীনির যেসব সদস্য যুদ্ধ করেছে তারা রাষ্ট্রের অনুগত বেতনভোগী কর্মচারী হিসেবেই লড়েছে। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রবাসী সরকারের কর্মচারী হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সেনা খেদাতে লড়াই করেছেন।

আজকের যেই রাজাকারের সভায় রাজাকারের পাশে বসে অলি-ইবরাহিম বক্তব্য দিয়ে বেড়ান, সেইসব বরাহরা ৭১'র সেই স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধী। ৭১'র সেইসব রাষ্ট্রদ্রোহী আর তাদের অনুসারীদের সভায় বসে অলি-ইবরাহিম মুক্তির যুদ্ধের ইতিহাস নতুন করে বলার চেষ্টা করেন।

চমৎকার!

তবে এইখানে কেবল রঙ বদলানোতেরই সব হিসেব শেষ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে বিচার হচ্ছে সেই বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের উকিলদের জেরা দেখলে অলি-ইবরাহিম-জামায়াতের অন্য হিসেব খানিকটা বুঝতে পারা যায়। 

এই হিসেবের একপাশে থাকে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে পাকি সেনাদের যে সম্পর্ক নেই সেটা দেখানো। আর অন্য পাশে থাকে বাংলাদেশের মুক্তির যুদ্ধ যে সেনাবাহিনী পরিচালিত যুদ্ধ ছিল সেটি প্রচার করা।

যুদ্ধকে স্রেফ সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখাতে পারলে তাতে বরাহছানাদের বের করে নিয়ে আসার একটা উপায় হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বরাহদের উকিলেরা বারে বারে জিজ্ঞেস করে, অপরাধীরা সেনাবাহিনীর কেউ ছিলকি? পাকি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বরাহদের সম্পর্ককে মিথ্যে প্রমাণ করা দারুণ জরুরি। ভেতর থেকে বরাহদের সেনাবাহীনি থেকে মুক্ত করতে পারলে, আর বাইরে থেকে মুক্তিযুদ্ধকে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ বানাতে পারলেই সবদিক থেকে সব ঠিক থাকে। যুদ্ধাপরাধীরা বের হয়ে আসতে পারে নিরাপরাধ পীরফকির হয়ে! আর বাংলাদেশের জন্ম নিয়েও একটি দারুণ বিতর্ক তৈরি করা যায়! মুক্তির যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধ বানানো যায়। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের সবচে গৌরবময় অধ্যায়কে স্রেফ গুটিকয় বিদেশী অনুচরের রাষ্ট্রদোহ হিসেবে চালিয়ে দেয়া যায়। তাতে রাজাকারের দোষ কাটা যায়, পাকিসেনারা বীরের খেতাব পায়, পাকিস্তানের মুখ বাঁচে, তিরিশ লক্ষ হত্যার ইতিহাস চাপা পড়ে, নির্যাতনের কলঙ্কময় অধ্যায় একটি প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

জামায়াতের হিসেবে চমৎকার অংশগ্রহন অলি এবং ইবরাহিমের!

তবে ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না, এই স্বাধীনতা বিরোধীরা নিজের মা-বোনকে হাতে পায়ে দড়ি বেঁধে পাকি শুয়োরের ব্যারাকে দিয়ে এসেছে। তাদেরকে ক্ষমা করিনাই। করার কোন সম্ভাবণাও নাই। অলি-ইবরাহিম নিজেদেরকে শুয়োর-কুকুর যেই গোষ্ঠীর কাছে ইচ্ছে বিক্রী করুন, এসব আজকাল গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম এবং মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করার চেষ্টা সাধারণের নজর এড়াচ্ছে না!


প্রসঙ্গত, একটি খুব তীব্র কৌতুহলে ভুগছি। মায়ের সঙ্গে বেঈমানী করলে কি লজ্জার কোন অনুভূতি হয়? 

সচলায়তনে প্রকাশিত।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: