রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১২

রোগ এবং সংক্রমণ সম্পর্কিত ভ্রান্তি: ১

ব্যক্তিগত জীবনে আমি দেখেছি এমনকি খুব সচেতন মানুষের মাঝেও রোগ এবং সংক্রমণ সম্পর্কিত মারাত্মক ভ্রান্তি রয়েছে! কুসংস্কার এবং প্রচলিত ধারনার সঙ্গে  দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা মিলিয়ে শিক্ষিত লোকেরাও এসব ভ্রান্তিকে সত্য বলে মনে করেন। এই সিরিজে আলোচনা করা হবে কেন এইসব ভ্রান্তি সত্য নয়, কেন আমরা এসব বিষয়কে সত্য বলে মনে করি, ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক বিষয়।

ভ্রান্তি ১: বাঙালির পেটে রোগজীবাণু সব হজম হয়ে যায়! যে পরিবেশে, যেরকম ভেজাল খেয়ে, কাদামাটি মেখে আমরা বড় হই তাতে জীবাণু আমাদের শরীরে পাত্তা পায় না! 
এই ধারনা কেন ভুল?

এই প্রসঙ্গে খুব প্রয়োজনীয় না হলেও একটি কথা এই সিরিজের সকল পর্বে বলা হবে। সেটি হচ্ছে, যখন কেউ কোন কিছু দাবী করেন, তখন যিনি দাবী করছেন তাঁর দ্বায়িত্ব হচ্ছে দাবীর পক্ষে যুক্তি দেখানো। তাঁর সেই দাবীকে প্রমাণ করা। সেটাকে ভুল প্রমাণ করা অন্য কারো দায়িত্ব নয়। আমি যদি দাবী করি যে, আমার একটি ডায়নোসর রয়েছে, তাহলে ডায়নোসরের উপস্থিতির প্রমাণ দেখানোটাও আমারই দ্বায়িত্ব। অন্য কারো কোন দায় নেই আমার কথা ভুল প্রমাণ করার। আমি নিজে যতক্ষণ না প্রমাণ করছি যে আমার ডায়নোসর রয়েছে ততক্ষণ আমার দাবী মিথ্যা।

এই জন্যে, যদি কেউ বলতে চান যে, বাঙালির পেটে সব হজম হয়, তাহলে তাঁকে সেটা প্রমাণ করতে হবে যে সত্যিই তা হয়। না হলে তাঁর কথা মিথ্যে।

এই সহজ দর্শনের পরেও আমরা এই প্রসঙ্গে আলোচনা করব, কেন এটি মিথ্যে। কেন বাঙালির পেটে সব জীবাণু হজম হয়ে যেতে পারে না।

আমাদের রান্না দেখেছেন? কড়া মশলা আর ঝাল! আর ভেজাল তো আছেই! ওতে মানুষই বাঁচে না, আর জীবাণু!

আমরা যখন খুব কড়া রান্না খাই, ধরা যাক খুব মশলাদার রান্না, অথবা খুব ঝাল হয়েছে এরকম রান্না, আমাদের মনে হতে পারে এইরকম মশলা (বা ঝাল), যা মানুষেরই সহ্য করতে কষ্ট হয় তাতে জীবাণু বাঁচতে পারেনা। কিন্তু আসলে সেরকম হয়না। কারণটি ব্যাখ্যা করছি ঝালের উদাহরণ দিয়ে। অন্যান্য মশলার ক্ষেত্রেও এটি সত্য।

আমাদের কেন ঝাল লাগে? ঝাল/মরিচের মধ্যে এমন একটি উপাদান রয়েছে (ক্যাপসেসিনয়েড) যেটি আমাদের এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের স্নায়ুতে পুড়ে যাওয়ার, তাপ সৃষ্টি হওয়ার সংকেত দিতে পারে। মরিচ খেলে তাই আমাদের ঝালের অনুভুতি তৈরি হয়। এবং আমরা বোকার মত ধরে নেই যে, জীবাণুদেরও ঝালে একই অনুভুতি হবে। কঠিন ঝালে তারা টিকতেই পারবে না! কিন্তু, জীবাণুদের কাছে ঝাল অথবা মশলা হচ্ছে শুধুই একটি খাদ্য উপাদান। স্বাদ বিষয়ক অনুভুতি তাদের নেই। কোন খাদ্য উপাদানে যদি বিশেষ কোন জাবাণুরোধী উপাদান থাকে তাহলেই কেবল বলা যাবে যে ওই খাবারে জীবাণু নেই। আবার সেই জীবাণুরোধী উপাদান খাবারে কেবল থাকলেই হবে না, যথেষ্ট পরিমাণে থাকতে হবে।

আমরা কেন ভেবে নেই যে সকল প্রাণির শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া একইরকম? আমাদের শারীরিক প্রক্রিয়া অন্য প্রাণির অথবা জীবাণুর মত হওয়ার কোন কারণ নেই। জীবাণুরা এই পৃথিবীর সবচে সহনশীল প্রাণি! এই গ্রহে যখন কোন প্রাণি ছিল না তখন তারা ছিল। যখন কোন প্রাণি টিকে থাকেনি তখন তারা টিকে থেকেছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। ১০০ ডিগ্রীরও কম তাপমাত্রায় যেকোন প্রাণিকে সেদ্ধ করে ফেলা যায়। অথচ ১৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় জীবাণু বেঁচে থাকে! ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা করে ফেললে তরল নাইট্রোজেনের ভেতরেও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকে! যাঁরা জানেন না, তাঁদের জানিয়ে রাখি, তাত্ত্বিকভাবে তরল নাইট্রোজেনের তাপমাত্রা -১৯৬ থেকে -২১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা কীরকম তা ধারনা করা শক্ত। উদাহরণ দিয়ে একটু ধারনা দেই। আপনি যদি আপনার একটি আঙুল তরল নাইট্রোজেনে ডুবিয়েই (আপনার পক্ষে যত দ্রুত সম্ভব) তুলে নেন তাহলেও সেটি পাথরের মত শক্ত কঠিন পদার্থ হয়ে যাবে। একটি হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলে আপনার আঙুলটি কাঁচের টুকরোর মত গুঁড়ো হয়ে যাবে!

জীবাণুরা কেবল তাপমাত্রাই সহ্য করতে পারে তা নয়। যে তীব্র এসিডে অন্য প্রাণি ঝলসে যায় সেই এসিডে জীবাণু বেঁচে থাকে! একেবারে উল্টো পরিবেশ, ক্ষারেও, জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে! সাগরের তলদেশের অকল্পনীয় চাপে (১০০০ এটিএম-এরও উর্দ্ধে), যার অর্ধেক চাপে সাবমেরিনও গুঁড়ো হয়ে যায়, সেই চাপে জীবাণু টিকে থাকে! মেঘের ভেতরের শূন্যতায় জীবাণু টিকে থাকে! শক্ত পাথরের ভেতরে জীবাণু টিকে থাকে! লবণের দলার ভেতরে জীবাণু টিকে থাকে! ধাতুর দ্রবণে জীবাণু টিকে থাকে! শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেটের ভেতরেও জীবাণু পাওয়া যায়!

সুতরাং পরীক্ষা না করে কখনোই বলা যাবে না কোন বিশেষ পরিবেশে একটি জীবাণু টিকে থাকবে কিনা। আপনি যদি বলতে চান আপনার ব্যবহৃত মশলায় জীবাণু টিকে থাকে না, তাহলে সেটি পরীক্ষা করে দেখতে হবে আগে। (সত্যিই আপনার মশলায় জীবাণুরোধী উপাদান থাকলে, সেটি সবসময় খুব ভালো সংবাদ নয়। মানুষের পেটে যে হাজারো জীবাণু থাকে সেসব বেঁচে থাকার জন্য অতিপ্রয়োজনীয়। এইসব জীবাণু মরে গেলে আপনিও মরবেন)।

কেবল মশলা অথবা রান্নার উপাদান নয়, ভেজাল, অন্যান্য রাসায়নিক ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আপনার জন্য যেটি বিষ সে জীবাণুর জন্যেও বিষ হবে এমন কোন কারণ নেই। মানুষের জন্য বিষাক্ত অসংখ্য উপাদানে জীবাণুরা চমৎকার বেঁচে থাকতে পারে। আপনার কোষের গঠন-গড়ন এবং জীবাণুদের কোষের গঠন-গড়ন এক নয়। আপনি প্রেমিকার ধোকায় পৃথিবীকে একটি অর্থহীন জায়গা বলে বিশ্বাস করতে পারেন, কিন্তু জীবাণুরাও সেরকম ভাববে তা মনে করার কোন কারণ নেই। আপনার জীবনের সঙ্গে জীবাণুর জীবনের সামান্যই মিল।

আপনার যদি কখনো মনে হয়, যে আপনার রান্নার উপাদান (তা সে ভেজাল হোক অথবা আপনার ব্যবহৃত মশলা হোক), জীবাণুদেরকে মেরে ফেলছে তাহলে আপনি একটি ছোট্ট পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যে খাবারে এই জীবাণুরোধী উপাদান আছে বলে আপনি মনে করছেন, সেই খাবার খানিটা কয়েক দিন একটি পাত্রে রেখে দিন। লক্ষ্য রাখুন সেটি যেন শুকিয়ে না যায়, ভেজা থাকে। নিশ্চিত থাকুন, দুয়েকদিনের মধ্যেই সেটিতে পচন ধরবে। মনে রাখুন, সাধারণ সকল পচনের কারণ জীবাণু। জীবাণু বেড়ে উঠলেই কোনকিছু পচে যায়।

সুতরাং রান্নার উপাদান অথবা ভেজালের জন্য সাধারণভাবে জীবাণু মরে যায় না। অথবা, ভেজাল হলেই তা জীবাণুমুক্ত নয়। মশলাদার হলেই কোনকিছু জীবাণুমুক্ত নয়।

কিন্তু বাঙালির পেটে সব জীবাণু হজম হয়ে যায়!

এই ধারনাটিকে আমরা বর্ণবাদ বলতে পারি। বাঙালি এবং অন্যান্য সকল মানুষ একটিমাত্র প্রজাতি। তাদের শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সাধারণভাবে একইরকম। বাঙালি এবং অন্যান্য জাতির পরিপাকতন্ত্রে কোন পার্থক্য নেই। অভ্যাসবশত আমরা মশলাদার খাবারে সহনশীল হতে পারি। কিন্তু তাতে জীবাণুদের কিছু যায় আসে না। আপনার ডানা গজালেও জীবাণুর কিছু যায় আসে না। যায় আসে তখন, যদি আপনার শরীরে এমন কোন পরিবর্তন আসে যেটি জীবাণুর জন্য ক্ষতিকর। সেরকম কোন ক্ষেত্রে হতে পারে তা আমরা পরে আলোচনা করব।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা দেখা যায় সারাদিন ধুলোমাটি মেখে/খেয়েও সুস্থ আছে!

না নেই। তারা সুস্থ নেই। তাদের বেশিরভাগেই অপুষ্টির শিকার। তারা নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত, আপনি জানেন না। আপনার শিশুটি একটি হাঁচি দিলে আপনি হায় হায় করে ওঠেন। সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা রোগে আধমরা হয়েও অসুস্থতা পাত্তা না দিতে শেখে! পাত্তা দেয়ার উপায় তাদের থাকে না। তারা সাধারণ সব শিশুর চাইতে বেশি অসুস্থ হয়! তাদের গড় আয়ু কম। তাদের জীবন যাত্রার মান নিন্ম। সুবিধাবঞ্চিত হয়ে জন্মানো কোন শিশুর অপরাধ নয়, কিন্তু সেটি প্রকৃতি হিসেবের মধ্যে নেয় না।

জ্বর, পেট ব্যাথা, পেটের অসুখ ইত্যাদি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনের অংশ। তারা এসব দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিশ্বাস করে! আপনি যে দুচার মুহূর্তের জন্য তাদেরকে দেখেন সেই সময়টুকুতে আপনার মনে হয় তারা বেশ সুস্থ আছে। আপনার অবচেতন মন নিজের সঙ্গে তাদের তুলনা করতে শুরু করে দেয়। আপনি ভাবতে থাকেন, যে পরিবেশে ওরা টিকে আছে সেই পরিবেশে আপনি থাকলে মরেই যেতেন। ওরা যেহেতু মরেনি, তাই ওরা বেশি সবল। বাস্তবতা সেরকম নয়। ওরা আপনার চাইতে অনেক বেশি দূর্বল, আপনি সেটি জানেন না!

এই কথাগুলি সুবিধাবঞ্চিত সকল শ্রেণীর জন্য প্রযোজ্য। দরিদ্র শ্রমিকদের কাজের দক্ষতা/শক্তি চমকপ্রদ নিশ্চয়ই। শারিরিক পরিশ্রম খুবই উপকারী অভ্যাস। কিন্তু জীবনযাত্রার নিন্ম মান কাউকে সবল অথবা বেশি জীবাণু সহনশীল করে তোলে না।

একটা বিদেশী এসে এইখানে টিকতে পারে না, বাঙালিরা পারে! নিজের চোখে দেখা!

অভ্যাস।
- ১০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় আপনি টিকতে পারবেন না। - ৪০ এ অনেক দেশের লোকে সুখেই থাকে! মরুর শুষ্কতায় আপনি শুকিয়ে মরবেন। আমার সুদানিজ বন্ধুটি মরবে না! চীনের মাছের চিপস এক কামড় খেলে আপনি পাকস্থলী উগরে দেবেন। চায়নিজরা কুড়মুড়িয়ে প্যাকেট শেষ করবে! আদিবাসীদের বাঁশের খোলে পঁচানো পোকা এক চামচ খেলে আপনি প্রেমিকার নাম ভুলে যাবেন! দু'চামচ খেলে বাপের নাম ভুলে যাবেন! যেই আদিবাসীরা সেটি বানিয়েছেন তাঁরা স্ত্রী-পুত্র নিয়ে রসিয়ে খাবেন! সবই সংস্কৃতি থেকে পাওয়া অভ্যাস। মানুষের সংস্কৃতিতে ভিন্নতা রয়েছে।

কিন্তু আপনার সংস্কৃতিতে জীবাণুদের কিছু যায় আসে না। আপনি চায়নিজ, বার্মিজ, ইউরোপিয়, বাঙালি, নাকি বেদুঈন সে জীবাণু জানে না। জীবাণু খোঁজে আপনার শরীর তার উপযুক্ত কীনা। আপনার কোষ তার লক্ষ্য। আপনার কোষের উপরিভাগের বিশেষ প্রোটিন অণুকে জীবাণু চেনে। আপনার সংস্কৃতি যদি সেই প্রোটিন অণুসমুহকে বদলে দিতে পারে, তাহলে চমৎকার। আপনি বিশেষ কোন জীবাণুরোধী! কিন্তু সেরকম কখনো হয়না।

ভিন্ন পরিবেশ, সংস্কৃতি, খাবারে অভ্যস্থতা আপনাকে সাধারণভাবে জীবাণু সহনশীল করে তোলে না।

কিন্তু পরিবেশ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে পারে!

পারে।

খুব সাধারণভাবে যদি ব্যাখ্যা করি, তাহলে আমাদের শরীরে কিছু কোষ আছে যারা জীবাণু চিনে রাখতে পারে। এই কোষেরা রোগ প্রতিরোধী কোষ। একবার এরা যে জীবাণুকে চিনে ফেলে সেই জীবাণু আর আমাদের ক্ষতি করতে পারে না। সেইজন্যে, আপনার পরিবেশে যেসব জীবাণু রয়েছে, সম্ভাবণা আছে সেসব জীবাণুর সঙ্গে আপনার শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষেরা পরিচিত হয়ে উঠবে এবং আপনি ওইসব জীবাণুতে আর আক্রান্ত/সংক্রামিত হবেন না।

তারমানে এই নয় যে আপনি সচেতনভাবে রোগজীবাণু সংক্রমিত হওয়া সম্ভাবণা রয়েছে এমন পরিবেশে থাকবেন। সেটি উপকারী হলে, আমরা এইডসের জীবাণু, জণ্ডিসের জীবাণু, যক্ষার জীবাণু শরীরে ঢুকিয়ে নিয়ে নিজেদেরকে রোগপ্রতিরোধী করে নিতে পারতাম। কিন্তু জীবাণুর সংস্পর্শে থাকলেই রোগপ্রতিরোধী হয়ে ওঠা যায় না। রোগপ্রতিরোধী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি দারুণ জটিল। এই প্রকৃয়া সবক্ষেত্রে একইরকম নয়।

যেমন দেখুন, কিছু জীবাণু রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে কখনোই আমাদের শরীরে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে না। যে রোগপ্রতিরোধী কোষেদের কথা বলেছি তারা কখনোই কিছু কিছু জীবাণুকে চিনে রাখতে পারবে না! আবার কিছু জীবাণুকে তারা চিনে রাখলেও কিছুদিন পরেই ভুলে যাবে। অনেক জীবাণু আবার নিজেকে বদলে নিতে পারে। শরীরের প্রতিরোধী কোষেরা যে জীবাণুকে চিনে রেখেছে, হয়ত সেই জীবাণুর সামান্য পরিবর্তিত স্ট্রেইনে (রূপে) আমরা আক্রান্ত হব।

সেইজন্যে, পরিবেশ আমাদেরকে রোগ প্রতিরোধী করে তোলে সেটি সত্যি হলেও আমরা গায়ে পড়ে জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই রোগপ্রতিরোধী হয়ে উঠব না। তাতে বরং সংক্রমণের সম্ভাবণা বাড়বে। 

মনে রাখুন, অতি সতর্কতা, যেমন মাটির কাছে যাওয়া যাবে না। অথবা, ধুলো লাগলেই জীবাণুরোধী দিয়ে গোসল করতে হবে। অথবা জীবাণুনাশক সাবান* দিয়ে অপ্রয়োজনে বারবার হাত ধুতে হবে সেরকম অভ্যাস ভালো নয়। সাধারণ জীবনযাপন, খোলা মাঠে খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদি অভ্যাস সুস্থ এবং উপকারী। এই অভ্যাস বরং আপনাকে রোগপ্রতিরোধী হতে পরোক্ষ বা কখনো কখনো প্রত্যক্ষভাবেও সাহায্য করতে পারে! কিন্তু সেটি কেবল বাঙালির জন্য বাঁধা নয়। সেটি সকলের জন্যেই সত্যি।
(* জীবাণু নাশক সাবান বলে কিছু নেই! যেটি আছে সেটি ল্যাবরেটরিতে ব্যবহার করা হয়। সাধারণে তা ব্যবহার করে না। সেটির নামও জানে না। প্রসাধনী কম্পানীর জীবাণু নাশক সাবান এবং কাপড় কাচা সাবানের কার্যকারিতা একই!) 

মূল ব্যাপারটা কী তাহলে?

মশলা বা ভেজাল উপাদান খাবারের জীবাণু যেমন মেরে ফেলে না তেমনি আপনাকেও জীবাণুরোধী করে তোলে না। মশলা এবং ভেজাল খেলেও আপনি রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হতে পারেন। সুতরাং জীবাণু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য আলাদাভাবে নিজের যত্ন নিন। উচ্চতাপে রান্না করা খাবার খান। পরিচ্ছন্ন খাবার খান। পরিচ্ছন্ন  থাকুন।

আপনি বাঙালি বলেই আপনার পাকস্থলী লোহা খেয়ে হজম করে ফেলতে পারে তা নয়। লোহা সব মানুষই খেয়ে হজম করতে পারে! লোহা (নাট-বল্টুর কথা বলছি না) খাওয়া জরুরি। যে কারণে শ্বাস নেয়া প্রয়োজন ঠিক সেই কারণে শরীরে লোহা প্রয়োজন। কিন্তু লোহা হজম করলেও আপনার কোষের গঠন-উপাদান ইত্যাদি বদলে যায় না। আপনি মোহাম্মদ আলী, অথবা আণ্ডারটেকার হয়ে উঠলেও আপনার পাকস্থলীর একেকটি কোষ জীবাণুদের কাছে সেই চিকনা চামেলিই থেকে যায়। আপনার পাকস্থলী/শরীরের কোষেরা কখনো আণ্ডারটেকার অথবা রজনীকান্ত হয়ে ওঠে না!

পরিবেশে আপনার সম্পৃক্ততা, যেমন, খেলাধুলা দৈনন্দিন কাজে ধুলোমাটির সংস্পর্শে আসা ইত্যাদি খারাপ অভ্যাস নয়। কিন্তু অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকলে আপনি জীবাণুরোধী হয়ে উঠবেন না। বরং জীবাণুতে সংক্রামিত হবেন। মনে রাখুন, পরিবেশ থেকে জীবাণুরাও শেখে। মাটির অ্যামিবাকে ফাঁকি দিতে দিতে জীবাণুরা আপনার শরীরের রক্ষীকোষেদেরও (যারা অনেকটা অ্যামিবার মত করে জীবাণু খেয়ে ফেলে) ফাঁকি দিতে শিখে যায়। সেইজন্যে, পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে যতটুকু জীবাণুর সংস্পর্শে আসবেন সেটি স্বাস্থ্যকর হলেও অপরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে বেশি রোগপ্রতিরোধী হয়ে ওঠা যায় না। (শিশুকে স্বাভাবিকভাবে পরিবেশের সংস্পর্শে আসতে দিন। এটি তার জন্য উপকারী। মায়ের ত্বক থেকে শিশুর শরীরে প্রথম জীবাণু প্রবেশ করে। সেইজন্যে মা'কে সেদ্ধ করে ফেলার প্রয়োজন নেই। মায়ের দুধের সঙ্গে শিশুর শরীরে জীবাণুরোধী উপাদানও প্রবেশ করে। মায়ের ত্বকের যে জীবাণু শিশুর শরীরে প্রবেশ করে সে সাধারণভাবে শিশুর জন্য উপকারী। এই জীবাণুরা সারাজীবন তাকে রক্ষা করে চলে।)

আপনার বাড়িতে একজন বিদেশী এসে জ্বর বাধিয়েছে অথচ আপনি এখানে ৫০ বছর আছেন, তারমানে আপনি বেশি রোগপ্রতিরোধী হবেন সেরকম কোন নিশ্চয়তা নেই। হয়তো কোন বিশেষ জীবাণু আপনাকে সংক্রামিত করে না। এমনও হতে পারে যে, অন্য একটি জীবাণু হয়ত ওই বিদেশীকে সংক্রামিত করবে না কিন্তু আপনাকে করবে। হয়তো আপনাকে যে জীবাণুটি সংক্রামিত করছে না, সেটি আপনার আপনজনকে সংক্রামিত করবে। সুতরাং একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে কোন সিদ্ধান্তে আসবেন না। বিজ্ঞানের এই যুগেও অণুজীবদের সম্পর্কে আমরা সামান্যই জানি! শুয়োরের পালেরা মানুষ না মেরে মানুষ বাঁচাবার চেষ্টা করলে হয়তো বেশি জানতে পারতাম।

প্রতিষ্ঠিত এবং সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ এবং বিশ্লেষণে প্রমাণিত না হলে আপনি আপাত দৃষ্টিতে যা দেখছেন অথবা আপনার যা মনে হচ্ছে সেটি সত্য নাও হতে পারে। মঙ্গলের মাটিতে মানুষের তৈরি রোবট চরে বেড়াচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এমন যুগেও এই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ নানারকম মিথ্যায় বিশ্বাস করে!

পুনশ্চ:
এই প্রসঙ্গে আপনার যুক্তি তর্ক আলোচনা এই লেখাটিকে আরো সমৃদ্ধ করবে। আমি জানতে আগ্রহী আপনি এই প্রসঙ্গে কী ভাবছেন। বাঙালি অধিক জীবাণুসহনশীল এই ধারনার পক্ষে অথবা বিপক্ষে যেকোন মন্তব্য এই পোস্টে খুব সাদরে গৃহীত হবে।

যেহেতু আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বজনদের মাঝেই রোগ এবং সংক্রমণ বিষয়ে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলো দেখেছি। তাই আমি মনে করি আপনার অথবা আপনার স্বজনদের এরকম অনেক ভ্রান্তি সম্পর্কে জানা থাকতে পারে। সেইসব ভ্রান্তি সম্পর্কে জানালে হয়তো সেই প্রসঙ্গে পরবর্তী পর্বটি লিখতে চেষ্টা করতে পারি।

সচলায়তনে প্রকাশিত।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন
.

কোন মন্তব্য নেই: